নাৎসিদের বিরুদ্ধে ইহুদিদের লড়াই করারই কথা।
ইহুদি বংশোদ্ভূত জ্যাকব বলেছেন, ‘নাৎসিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতেই আমি ব্রিটিশ সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়েছিলাম।’
তার জীবনের সবচেয়ে গৌরবময় সাফল্য ১৯৭১-এ পাকিস্তানকে পরাস্ত করা এবং স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের অভ্যুদয় দেখা। ১৯৭১-এ তিনি ছিলেন ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ।
পুরো নাম জ্যাক-ফার্জ-র্যাফায়েল জ্যাকব, সংক্ষেপে জেএফআর জ্যাকব। অবশ্য তার সমালোচকরা নামের ‘এফ’কে বলেন ‘ফিকটিশাস’।
জন্ম ১৯২৩ সালে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির কলকাতায়, ইরাক থেকে আগত এক বাগদাদি ইহুদি পরিবারে। আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে পরিবারটি কলকাতায় এসে বসতি স্থাপন করে। তার বাবা এলিয়াস ইমানুয়েল ধনাঢ্য ব্যবসায়ী। জ্যাকব পড়াশোনা করেছেন দার্জিলিংয়ের বোর্ডিং স্কুলে। ১৯৪২-এ দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ-ইন্ডিয়ান আর্মিতে যোগ দেন। ১৯৪৩-এ তাকে আর্টিলারিতে স্থাপন করা হয়। আফ্রিকান ক্যাম্পেইন, সুমাত্রা ও বার্মায় তিনি সক্রিয় থাকেন।
ইংল্যান্ড ও আমেরিকার আর্টিলারি স্কুলের গ্র্যাজুয়েট জ্যাকব ১৯৬৫-র ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে রাজস্থানে একটি ইনফেন্ট্রি ডিভিশনের নেতৃত্ব দেন। ১৯৬৭-তে মেজর জেনারেল হিসেবে পদোন্নতি পান। ১৯৬৯ থেকে ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ। এ সময়ই তিনি পান পেশাগত জীবনের সবচেয়ে বড় সাফল্য। ১৯৭১-এ ঢাকার রেসকোর্সে পাকিস্তানি জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজির আত্মসমর্পণের প্রধান কারিগর জেনারেল জ্যাকব। সেনাবাহিনী থেকে অবসর গ্রহণের পর গোয়া ও পাঞ্জাবের গভর্নর ছিলেন। চিরকুমার জেনারেল জ্যাকব ২০১৬ সালের ১৩ জানুয়ারি মৃত্যুবরণ করেন।
রামানন্দ সেনগুপ্তের নেয়া রেডিফ ইন্টারভিউভিত্তিক আত্মজীবনীমূলক রচনাটি মূলত ১৯৭১-এর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, নিয়াজির আত্মসমর্পণ ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়কে কেন্দ্র করে। জ্যাকবকে জানার জন্য এটিকে একটি গুরুত্বপূর্ণ রচনা বিবেচনা করে অনুবাদ করা হলো:
একাত্তরের ৩ থেকে ২৬ মার্চ পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের ওপর ক্র্যাকডাউন চালাল। পূর্ব পাকিস্তান থেকে আসা বিপুলসংখ্যক শরণার্থী ভারত সরকারকে উদ্বিগ্ন করে তুলল।
এপ্রিলের শুরুতে সেনাপ্রধান জেনারেল মানেকশ ডেকে বললেন, ‘পূর্ব পাকিস্তানে সেনাবাহিনী পাঠানোর দরকার হতে পারে বলে সরকার মনে করছে।’ আমি তাকে বললাম, এটা সম্ভব নয়। আমাদের মাউন্টেন ডিভিশন রয়েছে, কিন্তু কোনো ব্রিজ নেই। আমাদের এবং ঢাকার মাঝখানে অনেক বড় বড় প্রশস্ত নদী, তাতে সেতু নেই।
বর্ষাকাল প্রায় এসে পড়েছে। নদীবহুল অঞ্চলে যুদ্ধ করার প্রশিক্ষণ আমাদের এ ডিভিশনের নেই, আমাদের সে ধরনের যানবাহন নেই (মাউন্টেন ডিভিশনের যানবাহন এমনিতেই খুব কম), কাজেই আমাদের পক্ষে এগোনো সম্ভব নয়।
তিনি বললেন, পরদিন আমার সঙ্গে আবার কথা বলবেন। পরদিন যখন কথা বললেন তিনি জানালেন, সরকার অভিযোগ করছে যে সেনাবাহিনী বড্ড ভীতু।
আমি তাকে বললাম, আপনি বলুন আপনার দোষ নেই, ইস্টার্ন কমান্ড এগোতে চাচ্ছে না।
তিনি তাচ্ছিল্যের সঙ্গে প্রশ্ন করলেন, তাহলে তুমি কবে এগোতে পারবে?
আমি বললাম, আপনি যদি আমাকে প্রয়োজনীয়সংখ্যক ব্রিজ এবং অন্যান্য সামগ্রি দেন, সৈনিকদের প্রশিক্ষণ দেয়ার সময় দেন, তার পরও ১৫ নভেম্বরের আগে সম্ভব নয়।
তিনি জিজ্ঞেস করলেন কেন?
আমি বললাম, ১৫ নভেম্বরের মধ্যে মাটি শুকিয়ে আসবে এবং তাহলেই আমরা এগোতে পারব। ব্যাপারটা এমনই।
এরপর মানেকশ ইন্দিরা গান্ধী ও মন্ত্রিপরিষদের কাছে গিয়ে ব্রিফ করলেন।
কাজেই আমরা জেনে গেলাম আমাদের সামনে রয়েছে একটি যুদ্ধ, আমি পূর্ব পাকিস্তান দখল করার পরিকল্পনা করলাম। আমি জানতাম পাকিস্তানিরা তাদের শহরগুলো প্রতিরক্ষার চেষ্টা করবে। আমাদের পরিকল্পনার মূল লক্ষ্য ও কৌশল হচ্ছে ঢাকা দখল— কারণ ঢাকাই পূর্ব পাকিস্তানের ভূরাজনৈতিক ও ভূকৌশলগত হূিপণ্ড।
সবগুলো সেক্টরেই, যেমন যশোর— আমরা সেখানে কমিউনিকেশন সেন্টার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলাম।
আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম শহরগুলোকে পাশ কাটিয়ে বিকল্প রাস্তা ধরে সরাসরি ঢাকার দিকে এগিয়ে যাব। আমরা কখনো কোনো শহর দখল করতে চাইনি, কারণ দখল করতে বেশি সময় লাগে। আমি জানতাম যুদ্ধটা হবে সংক্ষিপ্ত এবং জাতিসংঘ অবশ্যই হস্তক্ষেপ করবে। কাজেই শহর দখল করে ব্যয় করার মতো সময় আমাদের নেই। ইরাকের ফালুজা শহর দখল করতে আমেরিকানদের কত লম্বা সময় লেগেছে, দেখলেনই তো।
কাজেই আমাদের কৌশল হলো পাকিস্তানি সৈন্যদের সীমান্তের দিকে টেনে আনা, শহর ও পাকিস্তানিদের প্রতিরক্ষা ব্যূহগুলো এড়িয়ে বিকল্প পথ ধরে চারদিক থেকে সোজা ঢাকার দিকে চলে যাওয়া।
ততদিন পূর্ব পাকিস্তান থেকে শরণার্থী আসা অব্যাহত রয়েছে। তাজউদ্দীন আহমদ (পূর্ব পাকিস্তানের নেতা এবং পরে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী) ও অন্যরা কলকাতায় স্থিত হয়েছেন। শুরুতেই স্বাধীনতার ঘোষণার খসড়া সরবরাহ করে সহায়তা করি, তারা এর সঙ্গে সুবিধামতো সংযোজন করে বর্ধিত করেন।
মুক্তিবাহিনীকে সহায়তা করতে সরকারের আদেশ পাই, সীমান্ত এলাকায় ক্যাম্প স্থাপন করা হয়, আমাদের বিভিন্ন এজেন্সি তাদের প্রশিক্ষণ দেয় এবং অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে সহায়তা করে।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে এ মুক্তিবাহিনী পরে ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়ন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা এমন একটি পরিবেশ সৃষ্টি করে, যেখানে পাকিস্তানি সৈন্যবাহিনী সম্পূর্ণভাবে মনোবল হারিয়ে ফেলে; আক্রান্ত না হয়ে তাদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যাওয়ার কোনো উপায় ছিল না। তাদের অবদান অপরিসীম। তারা পাকিস্তানিদের যোগাযোগ পথ ও মাধ্যমে আক্রমণ চালায়, তাদের মনোবল ভেঙে দিয়ে আমাদের অগ্রগতি অনেক সহজ করে দেয়।
যখন আমি ব্রিগেড কমান্ডার এবং দ্বাদশ ডিভিশনের জিওসি, তখন নিজেই যুদ্ধের পরিকল্পনা ও কৌশল ঠিক করতাম। ১৯৬৯ সালে আমি মরুভূমিতে লড়াইয়ের ‘ওয়ারফেয়ার বুক’ প্রণয়ন করেছিলাম, তাতে নীতিমালা সন্নিবেশিত হয়েছে, যা পরে আর্মি ট্রেনিং ম্যানুয়ালে সংযোজিত হয়।
এতদিন ভারতীয় সেনাবাহিনী পাকা রাস্তা ধরে চলেছে, রসদ তাদের অনুসরণ করেছে। আমি বলি, এসব বাদ দাও, আগে বিকল্প পথে এগিয়ে রসদ সরবরাহের রুট ঠিক করে দাও। পুরো স্বনির্ভর হয়ে আগে যাও, বাইপাস করো, যাতে এসব নিয়ে কিছু সময় টিকে থাকতে পারো— প্রধান সড়ক পরে খুলে দেয়া যাবে।
রসদের সরবরাহ হচ্ছে যুদ্ধের প্রধান সমস্যা। যুদ্ধ জয়ের জন্য সরবরাহের নিশ্চয়তা অনিবার্য। কাজেই কোনো জায়গা থেকে এমনকি সেনা সদর থেকেও কোনো আদেশ পাওয়ার আগেই আমরা সারা বর্ষা মৌসুম ধরে ত্রিপুরায় রসদের মজুদ গড়ে তুলি। তুরা এবং অন্যান্য জায়গায় বর্ডার্স রোডস অর্গানাইজেশন আমাদের রাস্তাঘাট, এয়ারফিল্ডস ও হাসপাতাল তৈরি করে দেয়। ঢাকাকে মূল লক্ষ্য সাব্যস্ত করে এবং সৈন্য বণ্টনের পরিকল্পনা দেখিয়ে ১৯৭১-এর মে মাসে আমি সেনা সদরে আমার পরিকল্পনা পাঠিয়ে দিই। সদর দপ্তর কিছু সময় এই পরিকল্পনা হাতে নিয়ে বসে থাকে। আগস্টে জেনারেল মানেকশ এবং মিলিটারি অপারেশন্সের ডিরেক্টর কে কে সিং আমার পরিকল্পনা নিয়ে বসলেন এবং একটি ভিন্ন পরিকল্পনা অনুমোদন করলেন:
লিখিত সে আদেশে বলা হয়, আমাদের সামুদ্রিক প্রবেশপথ খুলনা ও চট্টগ্রাম বন্দর দখল করতে হবে। আর সেভাবেই আমার পরিকল্পনা করতে হবে।
আমি যুক্তি দেখালাম, আমাদের ঢাকা দখল করতে হবে, তা প্রত্যাখ্যান করা হলো। আমাকে বলা হলো খুলনা ও চট্টগ্রাম দখলে নিতে পারলে যুদ্ধ শেষ হয়ে যাবে। আমি বললাম, কেমন করে তা ঘটবে— আমাদের সীমান্ত থেকে ৩০ মাইল ভেতরে খুলনা একটি অগুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর আর চট্টগ্রামও প্রান্তদেশে। আমাদের এ যুক্তিতর্ক কিছু সময় ধরে চলতেই থাকল, মানেকশ তেমন কিছুই বদলাতে রাজি হলেন না।
সুতরাং খুলনা ও চট্টগ্রাম দখলের আদেশ নিয়ে আমরা যুদ্ধে নামি— সেখানে কোথাও ঢাকার উল্লেখ ছিল না।
আমরা খুলনাও নিইনি, চট্টগ্রামও দখল করিনি, তবু আমরা যুদ্ধে জিতে যাই।
ঢাকা দখলে নেয়ার জন্য আমাকে সৈন্যসামন্ত খুঁজে বের করতে হয়েছে। ভুটানের উত্তরে মোতায়েন ছিল ৬ মাউন্টেন ডিভিশন। আমি সেখান থেকে ট্রুপস চাইলাম। কিন্তু আমাকে বলা হলো সেখান থেকে পাওয়ার কোনো উপায় নেই, কারণ চীন আক্রমণ করতে পারে। ঢাকায় নেয়ার জন্য উত্তর থেকে আমাকে কোনো সৈন্য দিতে মানেকশ অস্বীকৃতি জানালেন।
আমাকে দেয়া হলো একটি প্যারাট্রুপার ব্যাটালিয়ন গ্রুপ। পরিকল্পনা করলাম এ দলটিকে টাঙ্গাইলে নামাব, আমি অক্টোবরেই সেই আদেশে সই করেছিলাম। তাতে বলা হয়েছে, যুদ্ধ শুরুর সপ্তম দিন প্যারাট্রুপার অবতরণ করানো হবে এবং তারা ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মূল বাহিনীর সঙ্গে অঙ্গীভূত হয়ে যাবে। বাস্তবে তাই ঘটেছে— আমরা যেমন পরিকল্পনা করেছিলাম হুবহু একই রকম।
টাঙ্গাইলে টাইগার সিদ্দিকীর সঙ্গে ৫০ প্যারা ব্রিগেডিয়ার ক্যাপ্টেন পিকে ঘোষকে পাঠাই। টাইগার সিদ্দিকী পাকিস্তানের সাবেক সেনাসদস্য, তার সঙ্গে আলাপ করে অবতরণক্ষেত্র নির্ধারণ করবেন। কিন্তু আমাকে তো ট্রুপস পেতে হবে। মিজোরাম ও নাগাল্যান্ডে যে দুই ডিভিশন ছিল, তাদের সঙ্গে গোলন্দাজ বাহিনী ছিল না। কাজেই এ ডিভিশনগুলো শক্তিশালী করতে চীন সীমান্ত থেকে গোলন্দাজ বাহিনী ডেকে পাঠাই। ঢাকায় পাঠানোর জন্য তিন ব্রিগেড প্রস্তুত করি। সবকিছুই পরিকল্পনামতো এগোতে থাকে।
৩০ নভেম্বর ১৯৭১ মুক্তিবাহিনীর অপারেশন শেষ করা হয়। আমি আর্মি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরাকে আমার ঢাকা পরিকল্পনা অবহিত করি। তিনি বললেন, এটা সেনাপ্রধান মানেকশকে জানাবেন। আমি তাকে বললাম মানেকশকে জানানোর দরকার নেই, কারণ তিনি মনে করেন চীন আক্রমণ করতে পারে। এর মধ্যে আমি যেসব পদক্ষেপ নিয়েছি এগুলো তার অজানা। তাছাড়া তিনি ঢাকাকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন না।
নতুন যোগ দেয়া ডিএমও (ডিরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশনস) ইন্দর গিলের সঙ্গে আমার বেশ ভালোই যাচ্ছে, আমার এই পরিকল্পনায় তিনি সাহায্য করেছেন। ৩০ নভেম্বর পর্যন্ত এ বিষয়ে মানেকশকে কিছুই জানানো হয়নি। সেদিন অরোরা তাকে পাঠানো সিগনালে জানান, ঢাকা দখল করার জন্য আমি এই ব্রিগেডগুলো ঢাকামুখো করিয়েছি।
২ ঘণ্টার মধ্যে যে জবাব আসে, তা ঠিক এমন: ‘তোমাকে ব্রিগেড মুভ করাতে কে বলছে? এখনি ফিরিয়ে আনো।’
উত্তেজিত জগজিৎ সিং অরোরা জিজ্ঞেস করলেন, ‘আমি এসব কী করছি?’ আমি তাকে বললাম, আমি এটা সামাল দেব। আমি যখন ইন্দর গিলকে ফোন করলাম, তিনি জিজ্ঞেস করলেন, আপনি মানেকশর কাছে এ আহাম্মকি সিগনাল পাঠাতে গেলেন কেন? আমি তাকে কেন জানাইনি এ নিয়ে তিনি আমার সঙ্গে চেঁচামেঁচি করেছেন।’
আমি বললাম, আমি তার কাছে কোনো সিগনাল পাঠাইনি আর এখন এ ব্রিগেডগুলো ফেরানোর আর কোনো পথ নেই। আমরা সবাই জানি যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে আর আমরা সবাই এটাও জানি, যদি ফেরত পাঠিয়ে দিই, কখনো আর ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই।
তিনি বললেন, ‘জ্যাক, ফেরত পাঠানোর দরকার নেই কিন্তু সদর দপ্তরের অনুমোদন না নিয়ে বাংলাদেশে পাঠাতে যাবেন না। সেনাপ্রধান এ নিয়ে খুব গোয়ার্তুমি করছেন।’
আমি বললাম, ইন্দর আমি আপনাকে কথা দিচ্ছি, তাই হবে।
আমি কখনো ভাবিনি যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পরও ৮ ডিসেম্বর পর্যন্ত এ ব্রিগেডগুলো মুভ করানোর অনুমোদন মানেকশ দেবেন না।
৩ ডিসেম্বর মানেকশ আমাকে ফোন করে জানালেন, পাকিস্তান পশ্চিমে আমাদের এয়ারফিল্ডগুলোয় বোমা বর্ষণ করেছে।
আমি বললাম, তা হলে আমি ধরে নিতে পারি যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
মানেকশ বললেন, ‘হ্যাঁ, মিসেস গান্ধী কলকাতায় আছেন তাকে বিষয়টি জানাও।’
আমি জবাব দিই, ওকে।
তারপর আমি অরোরাকে বলি, যুদ্ধি শুরু হয়ে গেছে। আমাকে আদেশ তৈরি করতে হবে। রাজভবনে গিয়ে প্রধানমন্ত্রীকে বিষয়টি জানান। আমি বিমান বাহিনীকে যুক্ত করে আদেশগুলো জারি করলাম।
যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে।
১৩ ডিসেম্বর ভারতীয় বাহিনী ঢাকার বাইরে। উত্তর দিক থেকে বাহিনীর অগ্রগতি বেশ ভালোই হয়েছে, যদিও দুটো ব্রিগেডকে দেরিতে যাত্রা করতে হয়েছে, যথাসময়েই প্যারাট্রুপারদের অবতরণ করানো হয়েছে। ১৩ ডিসেম্বর ঢাকার বাইরে আমাদের তিন হাজার সৈন্য। ততক্ষণে মালাক্কা প্রণালি দিয়ে আমেরিকান নৌবহর এগিয়ে আসছে। দিল্লিতে কেউ পিকনিকের আমেজে আছেন। ইসলামাবাদ থেকে পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলে যে সামরিক সিগনাল পাঠানো হচ্ছে আমরা তাতে ইন্টারসেপ্ট। বার্তায় বলা হয়: ‘যুদ্ধ চালিয়ে যাও। তোমরা উত্তর দিক থেকে হলুদের (চীন) সাহায্য পাবে আর দক্ষিণ দিক থেকে সাদার (আমেরিকা)।’
সিগনালে পাঠানো এ বার্তা নিয়াজি বিশ্বাস করে বসলেন।
১৩ ডিসেম্বর জাতিসংঘে একটি আমেরিকান প্রস্তাব উত্থাপিত হলে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেটো দেয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন জানায়, আর ভেটো নয়। চিফ অব আর্মি স্টাফ জেনারেল মানেকশ বার্তা পাঠালেন, ‘ঢাকা ছাড়া সবগুলো শহর দখল করে ফেলো। আমরা যে শহরগুলো পাশ কাটিয়ে এসেছি, সেই শহরগুলোর তালিকা তাতে।’
আমাদের বাহিনী তখন ঠিক ঢাকার বাইরে, অথচ ঢাকা দখলের কোনো নির্দেশ নেই। শুধু তাই নয়, তিনি আর তিন স্তর নিচ পর্যন্ত তার আদেশের কপি দিয়েছেন। কাজেই ফোন করে আমাদের জানাতে হলো এ আদেশ উপেক্ষা করো।
ইস্টার্ন কমান্ডের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা উত্তেজিত হয়ে আমার রুমে এসে এই সিগনাল দেখিয়ে বললেন, এ ভুলগুলো সব আমার। তিনিও চেয়েছিলেন শহরগুলো দখল করতে। আমি তার অভিমতকে গুরুত্ব দিইনি। অধিকন্তু সিলেট, রংপুর ও দিনাজপুর এবং পূর্ব পাকিস্তানের অন্যান্য শহর দখলে বাধা দিয়েছি।
সে রাতে আমি ওয়্যারলেসের মাধ্যমে নিয়াজিকে ধরি এবং তার কাছে ব্যাখ্যা করি যে ঢাকার বাইরে আমাদের যে বাহিনী, তা অত্যন্ত শক্তিশালী। মুক্তিবাহিনীর ব্যাপক উত্থান আসন্ন। তারা যদি আত্মসমর্পণ করে, তাহলে জাতিগত সংখ্যালঘিষ্ঠদের রক্ষা করা হবে এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সঙ্গে মর্যাদাপূর্ণ আচরণ করা হবে। ১৪ ডিসেম্বর আমি ইন্টারসেপ্ট করা একটি বার্তা থেকে খবর পাই ঢাকা গভর্নমেন্ট হাউজে বৈঠক চলছে। ঢাকায় দুটি গভর্নমেন্ট হাউজ। আমরা হিসাব-নিকাশ করে যেটা বের করি, তা সঠিকই ছিল। ২ ঘণ্টার মধ্যে ভারতীয় বিমান বাহিনী সেখানে বোমা বর্ষণ করল।
পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর পদত্যাগ করলেন। বিকাল ৪টার দিকে নিয়াজি এবং মেজর জেনারের ফরমান আলী নিচের প্রস্তাবগুলো নিয়ে আমেরিকান কনসাল জেনারেলের সঙ্গে দেখা করতে গেলেন:
* জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে অস্ত্রবিরতি
* জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে প্রত্যাহার
* জাতিসংঘের কাছে সরকারের ক্ষমতা অর্পণ
* যুদ্ধাপরাধজনিত কোনো বিচার নয়
একটি দূতাবাসের মাধ্যমে আমি এগুলো জানতে পারি। আমি মানেকশকে জানালাম। তিনি আমেরিকান রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে কথা বললেন। রাষ্ট্রদূত এ সম্পর্কে কিছুই জানেন না।
সেদিনই ইসলামাবাদে আমেরিকান দূতাবাস তাদের প্রস্তাব নিউইয়র্ক পাঠায়। ১৫ ডিসেম্বর এটি তখনকার পাকিস্তানি পররাষ্ট্রমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে হস্তান্তর করা হলে তিনি প্রস্তাব গ্রহণ করতে অস্বীকৃতি জানান। আমেরিকানরা তারপর প্রস্তাবটি আমাদের কাছে পাঠায়।
১৫ ডিসেম্বর অস্ত্রবিরতির আদেশ হয়। সোভিয়েত ব্লকের দেশ পোল্যান্ড নিউইয়র্কে ১৫ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় জাতিসংঘ অধিবেশনে পোলিশ রেজল্যুশন উত্থাপন করে। তখন এ প্রান্তে ১৬ ডিসেম্বর ভোরবেলা। এ প্রস্তাবে ভারতকে আগ্রাসনের জন্য দায়ী করে নিন্দা না জানানোর কারণে ক্ষিপ্ত হয়ে ভুট্টো তা ছিঁড়ে ফেলেন।
১৬ ডিসেম্বর সকালে মানেকশ আমাকে ফোন করে বললেন, ‘যাও, ওদের আত্মসমর্পণ করাও।’
আমি জিজ্ঞেস করি, কোন শর্তে? আমি এর মধ্যে একটা খসড়া আত্মসমর্পণপত্র পাঠিয়েছি। আমি কি এটা নিয়ে দরকষাকষি করব। তিনি বললেন, ‘কী করতে হবে তুমি জানো, যাও।’
আমি তখন একটা ভুল করে ফেললাম। তাকে বললাম যখন নিয়াজির সঙ্গে কথা বলি, তিনি আমাকে মধ্যাহ্নভোজে দাওয়াত করেছেন। আমি এটা ভুলে গিয়েছিলাম। সিঁড়িতে মিসেস আরোরার সঙ্গে দেখা। তিনি বললেন, তার স্বামীর সঙ্গে ঢাকা যাচ্ছেন, ‘আমার স্বামীর পাশের সিটটিই আমার।’
ঢাকার পথে আমি যশোরে হেলিকপ্টার বদলালাম। এ সময় সেনা সদরের একটি বার্তা নিয়ে একজন দৌড়ে আমার কাছে এল, খুললাম, ভাবলাম, আমার জন্য কোনো আদেশ আছে।
খুলে দেখি তাতে বলা হয়েছে: ‘ভারত সরকার নিয়াজির সঙ্গে জেনারেল জ্যাকবের মধ্যাহ্নভোজ অনুমোদন করেছে।’— কে তাদের অনুমোদন চেয়েছে?
দিল্লি থেকে পাঠানো সেই কাগজ হাতে নিয়ে আমি ঢাকায় নামি। জাতিসংঘের প্রতিনিধি এসে আমার সঙ্গে দেখা করে বললেন, পাকিস্তানি সেনাবাহিনী প্রত্যাহার ও সরকারের দায়িত্ব গ্রহণে সহায়তার জন্য আপনার সঙ্গে আসছি।
আমি বললাম, ধন্যবাদ, আমার সাহায্যের প্রয়োজন নেই।
ঢাকার চারদিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সঙ্গে মুক্তিবাহিনীর লড়াই চলছিল। এয়ারফিল্ডে একজন ব্রিগেডিয়ার এসে আমার সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন এবং নিয়াজির কাছে পৌঁছা পর্যন্ত গাইড হিসেবে কাজ করলেন।
পথে মুক্তিবাহিনীর একটি ইউনিট আমাদের সামনে এগোতে বাধা দিল। বলল, তারা নিয়াজির সদর দপ্তর আক্রমণ করতে যাচ্ছে। আমি বললাম, নিয়াজি আত্মসমর্পণ করছে, আমাকে যেতে যাও।’
সেখানে উপস্থিত টাইম ম্যাগাজিনের রিপোর্টার লিখেছেন, আমি তাদের গুলি করার হুমকি দিই। এমন কিছু আমি বলিনি, গুলি করার মতো কোনো অস্ত্র আমার ছিল না।
মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে লম্বা তর্ক করতে হলো। বললাম, দেখো কাল নতুন সরকার আসছে। নিয়াজি আত্মসমর্পণ করতে চাচ্ছে, দোহাই আল্লাহর আমাদের এগোতে দাও। শেষ পর্যন্ত নিয়াজির সদর দপ্তরে পৌঁছলাম, সেখানে আত্মসমর্পণ দলিলের খসড়াটি পড়ে শোনালাম।
নিয়াজি বললেন, এতে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের কথা বলা হয়েছে। আপনি তো যুদ্ধবিরতি এবং পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রত্যাহারের কথা বলতে এসেছেন।
আমি বললাম, জেনারেল সেটা তো নিঃশর্ত হতে পারে না। আমি কিছু সময় ধরে এর ওপর কাজ করেছি। জাতিগত সংখ্যালঘু ও তাদের পরিবারের নিরাপত্তা এবং জেনেভা কনভেনশন অনুযায়ী সম্মানের সঙ্গে অফিসার ও সৈনিকদের সঙ্গে আচরণের নিশ্চয়তা এতে দেয়া হয়েছে। কাজেই এটা নিঃশর্ত নয়। এসব শর্ত লিখিত দলিল আর কোথায় পাবেন?
কিন্তু তিনি অস্বীকার করলেন।
আমার ধারণা ছিল ঢাকায় তার ২৫ হাজার সৈন্য রয়েছে। তিনি বললেন ৩০ হাজার; আমি কিছুক্ষণ তার যুক্তি শুনে যাচ্ছিলাম। তার সহযোগী ফরমান আলী তাকে আত্মসমর্পণ না করার পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। শেষ পর্যন্ত আমি বললাম, জেনারেল আপনি আত্মসমর্পণ করুন আমি আপনার, আপনার পরিবারের, সংখ্যালঘিষ্ঠদের এবং সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করব। আপনাদের সঙ্গে সম্মানজনক আচরণ করা হবে। যদি তা না করেন আপনার বা আপনার পরিবারের ভাগ্যে কী ঘটবে, আমি কোনো দায়িত্ব নিতে পারব না। আরো বলতে হচ্ছে, তাহলে এখনি যুদ্ধ পুনরায় শুরু করা ছাড়া আমাদের আর কোনো পথ খোলা থাকবে না। আমি আপনাকে ৩০ মিনিট সময় দিচ্ছি।
আমি বেরিয়ে আসি।
আত্মসমর্পণ দলিল সই করার জন্য জগজিৎ সিং আরোরার কিছুক্ষণের মধ্যেই ঢাকায় অবতরণের কথা। আমি এটাই আশা করছি যে খসড়া মানেকশকে পাঠিয়েছিলাম, তিনি সেটার অনুমোদন নিয়েই আসছেন। একটি বৈরী পরিবেশে তখন আমি সম্পূর্ণ একা।
বিবিসি এবং অন্যান্য সংবাদপত্রের প্রতিনিধিরা তখন সেখানে আমাকে প্রশ্ন করছে, আমি কী বলব জানি না।
হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্ট লিখছে: ওখানে জেনারেল জ্যাকব, শান্তভাবে উপর-নিচ করে তার পাইপ ফুঁকছেন।
আমি ভাবছিলাম, তিনি যদি আত্মসমর্পণ না করেন আমি তখন কী করব? তার আছে ৩০ হাজার সৈন্য, আমার তিন হাজার। তিনি কমপক্ষে তিন সপ্তাহ যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারবেন।
হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্টে বলা হয়েছে, যখন নিয়াজিকে জিজ্ঞেস করা হয় কেন আত্মসমর্পণ করলেন? তিনি বলেছেন, জেনারেল জ্যাকব আমাকে ব্ল্যাকমেইল করেছে। তিনি আমাকে এই বলে হুমকি দিয়েছেন যে, আমাদের মুক্তিবাহিনীর হাতে তুলে দেবেন, তার বেয়নেট চার্জ করে আমাদের হত্যা করবে।
এগুলো সব বাজে কথা। আমি তার ওপর চাপ দিয়েছি সত্য, কিন্তু তাদের হত্যা করার জন্য মুক্তিবাহিনীর কাছে তুলে দেয়ার কথা বলিনি। আমি বলেছি, (এরপর যা ঘটবে) আমি তার দায়িত্ব নেব না। আমি কখনো তাদের হস্তান্তর করার কথা বলিনি। এটা সম্পূর্ণ মিথ্যা। সে সময় উপস্থিত একজন কর্মকর্তা কমিশনকে বলেছেন, জ্যাকব কখনো বেয়নেট শব্দটি উচ্চারণই করেননি।
যাকগে, আধা ঘণ্টা পর আমি যখন ফিরে আসি এরপর কী ঘটবে আমি তাই ভাবছিলাম। আমি যে কাগজটা দিয়েছিলাম তা টেবিলের ওপর পড়ে আছে।
আমি জিজ্ঞেস করি, জেনারেল ডু ইউ অ্যাকসেপ্ট দিস পেপার? আপনি কি এই কাগজ গ্রহণ করছেন।
তিনি চুপ করে রইলেন, তিনি উত্তর দিলেন না। আমি তিনবার তাকে একই কথা জিজ্ঞেস করলাম।
আমি কাগজটা হাতে নিয়ে উপরে তুলে বললাম, তাহলে আপনি এটা গ্রহণ করেছেন বলে আমি ধরে নিতে পারি।
তার চোখ তখন অশ্রুসিক্ত। অন্যান্য পাকিস্তানি জেনারেল ও অ্যাডমিরালদের ক্ষুব্ধ চাহনি।
আত্মসমর্পণ গ্রহণ করা ছাড়া আমার জন্য কোনো আদেশ নেই, কোনো পরামর্শ নেই। কী সই হতে যাচ্ছে তাও আমি জানি না।
সই হওয়ার জন্য যা এল দুই সপ্তাহ পর তা কলকাতায় আবার সই করতে হলো। স্বাক্ষরিত আত্মসমর্পণ দলিলটি ভুল ছিল। নিয়াজি বললেন, আমি আমার অফিসে আত্মসমর্পণ করব। আমি বললাম, ঢাকার মানুষের সামনে রেসকোর্সে আত্মসমর্পণ হবে, আমি সেভাবেই নির্দেশনা পাঠিয়েছি।
তিনি বললেন আমি তা করব না।
আমি বললাম, আপনি অবশ্যই করবেন। আমরা আপনাকে সেখানে গার্ড অব অনার দেব।
আত্মসমর্পণ অনুষ্ঠানের জন্য আমার করণীয় ঠিক করে নিলাম। এ এক অনুপম আত্মসমর্পণ— ইতিহাসে একমাত্র ঘটনা, যেখানে যুদ্ধবিরতিকে আত্মসমর্পণে রূপান্তরিত করা হয়েছে এবং ৪ ঘণ্টার মধ্যে তা ঘটেছে। আরো দু-তিন সপ্তাহ যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষমতা নিয়াজির ছিল, তখন জাতিসংঘের অধিবেশনও চলছিল।
হামুদুর রহমান কমিশন রিপোর্টে নিয়াজিকে গালমন্দ করা হয়েছে। বলা হয়েছে তিনি শুধু আত্মসমর্পণ করেননি। লজ্জাজনকভাবে জনসমক্ষে আত্মসমর্পণ করতে ও গার্ড অব অনার গ্রহণে সম্মতি দিয়েছেন, তার উচিত ছিল লড়াই চালিয়ে যাওয়া, তাহলে জাতিসংঘ হস্তক্ষেপ করতে পারত।
তারপর রুপার বাসনকোসনে সেই মধ্যাহ্নভোজ, যা গ্যাভিন ইয়ংয়ের ভাষায় সারেন্ডার লাঞ্চ (গ্যাভিন লন্ডনের দ্য ইনডিপেনডেন্ট পত্রিকার প্রতিনিধি। ১৯৭১-এর ঢাকা রিপোর্ট তাকে এনে দিয়েছে আইপিসির ইন্টারন্যাশনাল রিপোর্টার অব দ্য ইয়ার)।
খারা (আমার স্টাফ অফিসার) এবং আমি পাশে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমরা কিছুই খাইনি, এক ফোঁটা পানিও না।
এরপর আমরা যখন নিয়াজির গাড়িতে এয়ারপোর্ট যাচ্ছিলাম, মুক্তিবাহিনী আমাদের গাড়ি থামিয়ে তাতে লাফিয়ে উঠে পড়ল। সৌভাগ্যবশত খারা একজন শিখ, পাগড়ি পরা মাথা তার বাইরেই ছিল, সে তাদের দিকে চেঁচিয়ে উঠল।
এয়ারপোর্টের কাছাকাছি এসে দেখি আমাদের অল্প কিছু সৈন্য ঢাকায় ঢুকে পড়েছে। একটি জিপে আমাদের দুজন প্যারাট্রুপারকে দেখলাম, তাদের আমাদের সঙ্গে নিলাম। আমি যখন এয়ারপোর্টে পৌঁছি টাইগার সিদ্দিকী ট্রাকভর্তি মুক্তিবাহিনী নিয়ে চলে আসে। আমি জানি না কেন, তবে আমার মনে হয় নিয়াজিকে গুলি করতে চাচ্ছেন।
নিয়াজি যদি এয়ারপোর্টে নিহত হন তাহলে আত্মসমর্পণ ঘটবে না।
নিয়াজিকে রক্ষা করার জন্য আমি প্যারাট্রুপারদের বলে সিদ্দিকীর দিকে এগিয়ে যাই এবং তাকে এয়ারফিল্ড থেকে বেরিয়ে যাওয়ার নির্দেশ দিই।
স্ত্রীসহ অরোরা এবং তার সফরসঙ্গীরা অবতরণ করেন। নিয়াজি ও অরোরার সঙ্গে আমার যাওয়ার কথা, কিন্তু মিসেস অরোরার জন্য যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিতে আমাকে বলা হয়— তিনি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ। সবাই চলে যাওয়ার এটাই শেষ গাড়ি। আমি একটি ট্রাকে চেপে ফিরে এলাম।
আত্মসমর্পণ দলিল স্বাক্ষর হয়ে যাওয়ার পর জনতা নিয়াজিকে হত্যা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। সেখানে আমাদের সৈন্য সংখ্যা খুবই কম। কাজেই আমরা চারদিক থেকে নিয়াজিকে কর্ডন করে একটি মিলিটারি জিপে তুলে দিই, জিপ তাকে নিয়ে বেরিয়ে যায়।
আমরা ১ হাজার ৪০০ সৈন্য হারাই, আহত হয় চার হাজার। পাকিস্তানের কঠোর প্রতিরোধের মুখে আমাদের বিজয়ের কৃতিত্ব বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করা অফিসার ও সৈন্যদের দিতে হবে।
উপযুক্ত কৃতিত্ব অবশ্যই ইন্দিরা গান্ধীকে দিতে হবে, যিনি সংকটের পুরো সময়টায় সাহস ও দৃঢ় প্রত্যয় দেখিয়েছেন। তিনি আমেরিকান প্রেসিডেন্ট নিক্সন ও জাতিসংঘকে তোয়াক্কা না করে দেশের জন্য বৃহত্তম বিজয়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন।
আমরা ৯৩ হাজার যুদ্ধবন্দি নিয়ে যাই। নয়াদিল্লির অমর জোয়ান স্মৃতিস্মারক রাইফেল ও বেয়নেট— যশোর সেক্টরে প্রাণ দেয়া এক অজানা সৈনিকের। আমরা যেন তাদের আত্মত্যাগ ভুলে না যাই।
লেফটেন্যান্ট জেনারেল জ্যাকবের সাক্ষাত্কারভিত্তিক রচনাটির সমাপ্তি এখানেই। কোনো সন্দেহ নেই, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে তার স্মরণীয় অবদান রয়েছে। কিন্তু মুক্তিবাহিনী বিজয়ের যে ক্ষেত্রটি তৈরি করে দিয়েছে, সে গৌরবটুকু প্রদান করতে তিনি কার্পণ্য করেছেন। জ্যাকবের স্মৃতিকথা ‘সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা: বার্থ অব এ নেশন’ সুখপাঠ্য। কিন্তু এতে তিনি নিজেকে যতটা কীর্তিমান হিসেবে দেখাতে চেয়েছেন, বাস্তবে তা সত্য ছিল কিনা এ নিয়ে তখনকার ভারতীয় সৈনিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা প্রশ্ন রেখেছেন। ১৯৭১-এ তিনি ছিলেন মেজর জেনারেল এবং ভারতীয় ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফ। তার সরাসরি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ছিলেন ইস্টার্ন কমান্ডের কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা। সবার উপরে সেনাপ্রধান জেনারেল স্যাম মানেকশ।
জ্যাকব দুজনকে প্রায় ধূলিসাৎ করে দিতে চেয়েছেন এবং ১৯৭১-এর ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের মূল রণকৌশল প্রণেতা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইছেন— এটা বিশ্বাসযোগ্য নয় বলে কেউ কেউ মনে করেন। তিনি মানেকশ ও অরোরাকে নিয়ে নেতিবাচক কথা বলেছেন। তিনি একাত্তরের যুদ্ধে যেসব কার্যক্রম গ্রহণ করেছেন বলে দাবি করছেন, তার অনেকগুলোই ইস্টার্ন কমান্ডের চিফ অব স্টাফের ক্ষমতার বাইরে।
জেনারেল জ্যাকবের একটি বড় সাফল্য, ভারতের সঙ্গে ইসরায়েলের একটি নিবিড় সম্পর্ক সৃষ্টি করা। ইহুদি জেনারেল হিসেবে জ্যাকবও ইসরায়েলে অত্যন্ত সমাদৃত ছিলেন। অবশ্য ইহুদিবিরোধী ভারতীয়দের কেউ কেউ মনে করেন, জেনারেল জ্যাকবের খ্যাতির পেছনে রয়েছে ইসরায়েল এবং ইহুদিদের সম্মিলিত প্রচারণা।
১৯৭১-এর যুদ্ধ জয়ের কৃতিত্ব তিনি অরোরা কিংবা মানেকশকে দেননি। দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী এবং প্রতিরক্ষামন্ত্রী জগজীবন রামকে। যুদ্ধে জেতার জন্য যা দরকার এই দুই নেতৃত্ব সবকিছুরই জোগান দিয়েছেন।
যুদ্ধদিনের শ্রেষ্ঠ বন্ধুদের একজন হিসেবে জেনারেল জ্যাকবকে বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদান করেছে।
একটি পাদটীকা:
১৯৯৫-এর শেষ দিকে বিলেতে লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিকসের উল্টো দিকের একটি কফিশপে ক’জন পাকিস্তানি তরুণের অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় বেশ কৌতুক বোধ করি। তাদের কথার সারাংশ হচ্ছে: ১৯৭১-এর যুদ্ধে পাকিস্তান হেরেছে, বাংলাদেশ হয়েছে সবই সত্য। কিন্তু আর একটি সত্য হচ্ছে, পাকিস্তানের মুসলমানদের ভারতের কোনো হিন্দুর কাছে আত্মসমর্পণ করতে হয়নি। কারণ ১৯৭১-এর যুদ্ধে তিন গুরুত্বপূর্ণ জেনারেল— মানেকশ হচ্ছেন পারসিক, জগজিৎ সিং অরোরা শিখ এবং জ্যাকব হচ্ছেন ইহুদি।
পরাজিত মানুষও সুখ পেতে জানে।
লেখক ও অনুবাদক: সাবেক সরকারি ও বেসরকারি বিমান কর্মকর্তা






