লেফটেন্যান্ট জেনারেল জেএফআর জ্যাকবের সাক্ষাত্কার নিয়েছিলেন রেডিফ ইন্ডিয়ার রামানন্দ সেনগুপ্ত। এটি তার কিছু অংশ। মুক্তিযুদ্ধের সময় জেনারেল জ্যাকব ছিলেন ভারতীয় সেনাবাহিনীর চিফ অব স্টাফ অব ইস্টার্ন আর্মি কমান্ড।

পূর্ব পাকিস্তানের (বর্তমান বাংলাদেশ) ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের সামরিক জান্তাদের ক্র্যাকডাউন বা বর্বরোচিত হামলা শুরু হয় ২৬ মার্চ। ভারতে আসতে থাকা বিপুলসংখ্যক শরণার্থী নিয়ে ভারত সরকার খুব উদ্বিগ্ন ছিল।

এপ্রিলের শুরুতে সেনাপ্রধান জেনারেল (এসএইচএফজে) মানেকশ আমাকে ডেকে পাঠান এটা জানানোর জন্য যে, অবিলম্বে পূর্ব পাকিস্তানে পাঠানোর জন্য সরকারের সেনাবাহিনীর প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। আমি তাকে জানাই, এটা সম্ভব নয়। কারণ আমাদের মাউন্টেন ডিভিশন রয়েছে, কোনো সেতু নেই এবং আমাদের ও ঢাকার মধ্যে অসংখ্য নদী রয়েছে, যেগুলো খুব প্রশস্ত ও সেতুবিহীন।

বর্ষা মৌসুম শুরু হতে যাচ্ছে এবং আমাদের সৈন্যদের নদীযুদ্ধের কোনো প্রশিক্ষণ নেই। আমাদের কাছে কোনো পরিবহন নেই (মাউন্টেন ডিভিশনের কাছে খুব কম রয়েছে) এবং ভেতরে প্রবেশ করা আমাদের জন্য সম্ভব নয়।

এসব শুনে তিনি জানান, তিনি এ নিয়ে আমার সঙ্গে পরে কথা বলবেন। যখন তিনি পরদিন ফিরে এলেন, তিনি বললেন, তারা (ভারতীয় সরকার) আমাকে তিরস্কার করছে এবং বলছে, সেনবাহিনী কাপুরুষের পরিচয় দিচ্ছে। তাই আমি তাকে বললাম, ‘আপনি তাদের বলেন, এটি আপনি বলছেন না, বরং ইস্টার্ন (পূর্বাঞ্চলীয়) কমান্ড যেতে চাইছে না।’ তিনি আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, ‘কী পেলে তুমি যেতে চাইবে?’

আমি উত্তরে বলি, ‘আপনি যদি আমাকে সেতু ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী দেন এবং প্রশিক্ষণের সময় দেন, তবেই যেতে পারি। তবে তা ১৫ নভেম্বরের আগে নয়।’ তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কেন?

আমি বললাম, ১৫ নভেম্বরের মধ্যে মাটি শুকিয়ে যাবে এবং আমরা ভেতরে প্রবেশ করতে পারব। এই হলো কারণ। এরপর মানেকশ মিসেস গান্ধী ও কেবিটের কাছে গেলেন তাদের জানানোর জন্য।

তাই আমরা জানতাম, একটি যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে এবং পূর্ব পাকিস্তানকে নিয়ন্ত্রণে নেয়ার জন্য আমি একটি পরিকল্পনা তৈরি করি। আমি জানতাম, পাকিস্তানিরা শহরগুলোকে রক্ষা করবে। তাই আমার পরিকল্পানার প্রধান কৌশল ছিল, ঢাকা হবে আমাদের চূড়ান্ত ও প্রধান লক্ষ্য। কেননা এটি ভূরাজনৈতিক ও ভূকৌশলের দিক থেকে তত্কালীন পূর্ব পাকিস্তানের হূিপণ্ড ছিল। অন্যান্য প্রতিটি সেক্টরে, যেমন যশোর সেক্টরের ক্ষেত্রে আমাদের লক্ষ্যগুলো নির্ধারণ করেছিলাম এমন, যেমন যোগাযোগ কেন্দ্র।

তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিই শহর এড়িয়ে যাওয়ার ও সহায়ক রাস্তা ব্যবহার করার এবং সোজা গিয়ে ঢাকায় হাজির হওয়ার। আমরা কখনই কোনো শহর দখল করতে চাইনি। কারণ একটি শহর দখল করতে বেশ লম্বা সময় লাগে। আমি জানতাম, এ যুদ্ধ সংক্ষিপ্ত হবে। আমি জানতাম, জাতিসংঘ এখানে হস্তক্ষেপ করবেই। তাই আমরা শহর দখলে সময় ব্যয় করতে পারি না।

তাই কৌশল ছিল তাদের সীমান্তের কাছে টেনে নিয়ে আসা, শহর এড়াতে সহায়ক পথ ব্যবহার করা, নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা এবং সব দিক থেকে ঢাকার দিকে অগ্রসর হওয়া।

তাই সরকার আমাদের আদেশ দেয় মুক্তিবাহিনীকে সাহায্য করার জন্য। সীমান্ত এলাকায় ক্যাম্প ফেলা হয় এবং তারা (মুক্তিবাহিনী) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ছিল ও বিভিন্ন সংস্থার অস্ত্র তাদের কাছে ছিল।

মুক্তিবাহিনীর— যা পরবর্তী সময়ে হয় ইস্ট বেঙ্গল ব্যাটালিয়ন— বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে একটি বড় ভূমিকা পালন করার ছিল। তারা এমন একটি পরিবেশ তৈরি করেছিল, যেখানে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পুরোপুরি হতোদ্যম হয়ে গিয়েছিল এবং আক্রমণ থেকে বেঁচে তারা এক এলাকা থেকে অন্য এলাকায় যেতে পারত না। মুক্তিবাহিনীর অবদান ছিল বিশাল। তারা পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর যোগাযোগ ব্যবস্থায় আঘাত হেনেছিল এবং পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর মনোবল ভেঙে দিয়েছিল, যা আমাদের কাজকে আরো সহজ করেছিল।

যুদ্ধের পরিকল্পনা হিসেবে আমি যখন ব্রিগেড কমান্ডার ও একই সঙ্গে ১২তম ডিভিশনের জেনারেল অফিসার কমান্ডিং (জিওসি) ছিলাম, তখন একটি কৌশল তৈরি করেছিলাম। ১৯৬৯ সালে মরুভূমিতে যুদ্ধবিষয়ক আমার একটি বই প্রকাশিত হয়, যেখানে আমি এ কৌশলগুলো লিখেছি। এটি পরবর্তী সময়ে সেনাবাহিনীর প্রশিক্ষণ ম্যানুয়ালে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

ভারতীয় সেনাবাহিনী তখন পর্যন্ত ধাতব সড়কে চলাচলে অভ্যস্ত ছিল, সরঞ্জাম ওই পথ অনুসরণ করত। আমি বললাম, ‘ননসেন্স! তুমি সহায়ক পথে এগিয়ে যাও এবং পরে সরবরাহের জন্য পথ তৈরি করো। বাইপাস ধরে এগিয়ে যাও। প্রধান সড়ক পরে খুলে দেয়া যেতে পারে। তাই কিছু সময়ের জন্য এর ওপর তোমার নির্ভর করে থাকলে চলবে না।’

প্রধান সমস্যা ছিল লজিস্টিকস নিয়ে, যেটি যুদ্ধ জেতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তাই ১৯৭১ সালের মে মাসে, এমনকি যখন আমরা কারো কাছ থেকে কোনো আদেশ পাইনি তার আগেই আমরা ত্রিপুরায় একটি সৈন্যদলের জন্য লজিস্টিকস গড়ে তোলা শুরু করি; পুরো বর্ষা মৌসুমজুড়ে সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর থেকে কোনো আদেশ পৌঁছার আগেই।

একইভাবে তুরা ও অনান্য জায়গায় সড়ক তৈরি, হাসপাাতল, এয়ারফিল্ড নির্মাণ করার জন্য আমরা পেলাম বর্ডার্স রোডস অর্গানাইজেশন। মে মাসে আমি একটি পরিকল্পনা সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরে পাঠাই, যেখানে ঢাকাকে প্রধান লক্ষ্য ও সৈনদল বরাদ্দের কথা ছিল। সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর কিছু সময় এটি আটকে রাখে এবং আগস্টে এসে জেনারেল মানেকশ ও তার ডিরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশনস কেকে সিং আবির্ভূত হন এবং আমাদের পরিকল্পনা ধরিয়ে দেন।

আদেশগুলোয় যেগুলো লিখিতভাবে ইস্যু করা হয়েছিল এবং কখনো পরিবর্তন করা হয়নি, বলা হয়েছিল, আমরা খুলনা ও চট্টগ্রামের সব বন্দর দখলে নেব এবং পরিস্থিতি বা গুরুত্ব অনুযায়ী এগিয়ে যাব। ব্যস, এই।

আমি যুক্তি দেখাই, আমাদের ঢাকা দখল করতে হবে এবং আমাকে নেতিবাচক উত্তর দেয়া হয়, আমরা যদি খুলনা ও চট্টগ্রাম দখল করি, তবে যুদ্ধ শেষ হয়ে যেতে পারে। আমি জিজ্ঞাসা করি, কীভাবে। কেননা খুলনা শুধু একটি ছোট নৌবন্দর, যা আমাদের সীমান্ত থেকে ৩০ মাইল দূরে। চট্টগ্রামও সীমান্তবর্তী। তাই এ ধরনের তর্ক বেশকিছু সময় ধরে চলে এবং মানেকশ শুধু যে পরিবর্তনটা করেন, তা হলো, আদেশ থেকে ‘ওয়েট (গুরুত্ব বা পরিস্থিতি)’ শব্দটি বাদ দেয়া হয়।

তাই আমার যে পরিকল্পনা নিয়ে যুদ্ধে যোগ দিই, সেখানে খুলনা ও চট্টগ্রামকে দখল করার কথা বলা ছিল। কোনো জায়গায় ঢাকার কথা উল্লেখ ছিল না। আমরা খুলনা দখলে নিইনি এবং আমরা চট্টগ্রামও দখল করিনি, তার পরও আমরা যুদ্ধে জয়ী হয়েছিলাম।

আমাকে ঢাকার জন্য সৈন্যদলের খোঁজ পেতে হতো। ছয়টি মাউন্টেন ডিভিশন ছিল, যেগুলো উত্তরে ভুটানের জন্য রাখা হয়েছিল। তাই আমি ওই ডিভিশন থেকে সৈন্যদল প্রার্থনা করি। কিন্তু আমাকে বলা হয়, আমাকে তা দেয়া হবে না। কারণ চীনারা আক্রমণ করতে পারে। ঢাকা দখলের জন্য উত্তর থেকে কোনো সৈন্যদল আমাকে দেয়া প্রত্যাখ্যান করেন মানেকশ।

আমাকে দেয়া হয় প্যারাব্যাটালিয়ন গ্রুপ। আমি এটিকে টাঙ্গাইলে নামানোর পরিকল্পনা করি এবং এজন্য আমি অক্টোবরে আদেশে সই করি। আমরা পরিকল্পনা করি, ডি+৭-এ নামা হবে এবং পরবর্তী ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লিংকটি কার্যকর থাকবে। আমরা যে পরিকল্পনা করেছিলাম, হুবুহু সেটাই হয়েছিল।

আমরা ৫০ প্যারো ব্রিগেডের ক্যাপ্টেন পিকে ঘোষকে নভেম্বরে টাঙ্গাইলে পাঠাই। সঙ্গে ছিল ‘টাইগার’ সিদ্দিক— পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর সাবেক সদস্য— ড্রপিং জোন তৈরি করার জন্য। কিন্তু আমাকে সৈন্যদল খুঁজতে হতো। মিজোরাম ও নাগাল্যান্ডে যে দুই ডিভিশন ছিল, তাদের কোনো আর্টিলারি ছিল না। এজন্য আমি চীনা সীমান্ত থেকে সব আর্টিলারি সরিয়ে ফেলি, যাতে এসব ডিভিশন উন্নত করা যায়। আমি ঢাকায় হস্তক্ষেপ করার জন্য তিনটি ব্রিগেডকেও নামিয়ে আনি। পরিবর্তন আসছিল।

মুক্তিবাহিনীর অপারেশন ৩ নভেম্বর শেষ হয়। তাই আমি আর্মি কমান্ডার লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিএস আরোরাকে বলি, এই হলো ঢাকার জন্য পরিকল্পনা এবং তিনি বলেন, তিনি মানেকশকে বিষয়টি জানাবেন। আমি বলি, তাকে জানাবেন না, কারণ মানেকশ বলেছেন, চীনারা আক্রমণ করতে পারে এবং তিনি এ পদক্ষেপ সম্পর্কে কিছু জানেন না। তিনি এও মনে করেন না যে, ঢাকা গুরুত্বপূর্ণ।

নতুন ডিরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশনস (ডিএমও) ইন্দার গিল ও আমার মধ্যে বেশ বনত এবং তিনি এক্ষেত্রে আমাকে সাহায্য করেছিলেন। কিন্তু এর কোনো কিছুই ৩০ নভেম্বরের আগে মানেকশকে জানানো হয়নি। ৩০ নভেম্বর আরোরা মানেকশকে একটি সিগনাল পাঠিয়ে জানান, আমি এ ব্রিগেডগুলোকে নামিয়ে এনেছি ঢাকা দখল করার জন্য। ২ ঘণ্টার মধ্যে জবাব আসে এবং উত্তর ছিল এমন, ‘এসব ব্রিগেড চালাতে কে তোমাকে বলেছে? তুমি অবিলম্বে এগুলোকে ফেরত নিয়ে আসো!’

তাই উত্তেজিত আরোরা আমার কাছে এসে বলেন, ‘আমরা কী করব এবং আমি তাকে জানাই, আমি বিষয়টি দেখব। যখন আমি গিলকে ডাকি, তিনি বলেন, কেন তুমি বোকার মতো এ বার্তা পাঠাতে গেছ? তাকে কোনো কিছু না জানানোর জন্য এখন মানেকশ আমার ওপর চিল্লাচ্ছে।’

আমি জানাই, আমি বার্তা পাঠাইনি এবং আমি কোনোভাবেই এ বিগ্রেডগুলোকে ফেরত আনছি না। আমরা সবাই জানি, যুদ্ধ শুরু হতে যাচ্ছে এবং আমরা এও জানি, আমি যদি এদের ফেরত পাঠাই, তবে প্রয়োজনের সময় এদের কখনই পাব না।

তিনি বলেন, ‘জ্যাক, তাদের ফেরত পাঠিও না, কিন্তু সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরের অনুমোদন ছাড়া দয়া করে তাদের বাংলাদেশে পাঠিও না, কেননা সেনাপ্রধান অনমনীয়।’

আমি উত্তর দিই, ‘ইন্দার, আমি তোমাকে কথা দিলাম।’ আমি কখনই জানতাম না, যুদ্ধ শুরু হয়ে যাওয়ার পর মানেকশ ৮ ডিসেম্বরের আগে আমাদের এ ব্রিগেডগুলোকে এগিয়ে যাওয়ার অনুমোদন দেবে না।

ডিসেম্বর ৩, সন্ধ্যায় মানেকশ আমাকে ফোন করে জানান, পাকিস্তানের সেনাবাহিনী আমাদের পশ্চিম এয়ারফিল্ডে বোমা ফেলেছে এবং আমি বললাম, এতে কি আমি ধরে নেব, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। তিনি বললেন, হ্যাঁ, আপনি এগিয়ে যান। তিনি বললেন, মিসেস গান্ধী কলকাতায় রয়েছেন। তাই দয়া করে তাকে জানান এবং আমি বলি, ঠিক আছে।

এরপর আমি আরোরাকে জানাই, যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। আমাকে আদেশের প্রস্তুতি নিতে হবে। তাই আপনি অনুগ্রহ করে রাজভবনে যান এবং মিসেস গান্ধীকে অবহিত করুন। আমি আদেশ ইস্যু করি। যুদ্ধ শুরু হয়।

ইংরেজি থেকে ভাষান্তর সাঈদ সরকার