নয়াদিল্লির ইন্ডিয়া গেটে ‘অমর জওয়ান’ নামে একটি স্মৃতিস্তম্ভ রয়েছে। লম্বালম্বি ভূমিতে পুঁতে দেয়া রাইফেলের নল ও এর গোড়ালির ওপর স্থাপিত একটি হেলমেট দিয়ে এ স্তম্ভ তৈরি। যে জওয়ানের রাইফেল ও হেলমেট দিয়ে এ স্মৃতিস্মারকটি তৈরি, সেই সৈনিক শহীদ হয়েছিলেন যশোরের উপকণ্ঠে একটি ধানক্ষেতে। নাম না জানা ওই সৈনিকটির মতো আরো কয়েক হাজার সেনার রক্তের বিনিময়ে ১৯৭১ সালে এক সর্বাত্মক যুদ্ধে চিরশত্রু পাকিস্তানকে পরাজিত করেছিল বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথবাহিনী। ভারত-বাংলাদেশের যৌথ বাহিনীর সামনে কোনো শক্ত প্রতিরোধই গড়তে পারেনি পরাক্রমশালী পাকিস্তান। বৈরী জনতা, প্রতিকূল পরিবেশ আর কুশলী সমর নেতৃত্বের কাছে অল্প সময়েই জেনারেল নিয়াজি আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়। ওই সময় কার্যকর সমর পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে যেসব ভারতীয় সেনাধ্যক্ষ বিশেষ ভূমিকা পালন করেন, তাদের শীর্ষে ছিলেন লে. জেনারেল জেএফআর জ্যাকব। ১৯৭১ সালে তিনি ভারতের ইস্টার্ন আর্মির চিফ অব স্টাফ ছিলেন। উচ্চতায় একটু খাটো, সদালাপী, প্রখর সামরিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন, মোটাসোটা গড়নের এক ব্যক্তি ১৯৬৯ সালে ভারতের গুরুত্বপূর্ণ এ কমান্ডের দায়িত্ব পান। যার জীবনের সবচেয়ে জটিল ও রোমাঞ্চকর অ্যাসাইমেন্ট ছিল ঢাকা অভিযান। জীবনের সবচেয়ে কঠিন ও জটিল সেই সময়ের বর্ণনা পাওয়া যায় জ্যাকবের ‘সারেন্ডার অ্যাট ঢাকা’ বইটিতে। জ্যাকবের যুদ্ধস্মৃতির সেই দলিল থেকে চূড়ান্ত অভিযানের আগের যুদ্ধ পরিস্থিতি সম্পর্কে জানাই এ নিবন্ধের লক্ষ্য।
ইস্টার্ন আর্মির চিফ অব স্টাফের দায়িত্ব নিয়ে জ্যাকব যখন কলকাতার ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে অফিস শুরু করেন, তখনকার পরিস্থিতি খুব একটা সুবিধাজনক ছিল না। রক্তাক্ত নকশাল আন্দোলন নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে তখন টানটান উত্তেজনা। আসন্ন লোকসভা নির্বাচন অনুষ্ঠান নিয়ে চারদিকে প্রবল দোলাচল। এরই মধ্যেই পূর্ব বাংলায় ১৯৭০ সালের ডিসেম্বরের নির্বাচনে শেখ মুজিবুর রহমানের আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। ইয়াহিয়া ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতি জানালে শুরু হয় এক জটিল পরিস্থিতির। যা চূড়ান্ত রূপ লাভ করে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাতে অপারেশন সার্চলাইটের মাধ্যমে।
ঢাকায় পাকবাহিনীর আক্রমণের আঁচ স্বল্প সময়ের মধ্যেই ভারতে লাগতে শুরু করে। শুরু হয় শরণার্থী স্রোত। নকশাল আন্দোলনের জটিল পরিস্থিতি ও শরণার্থী স্রোত নিয়ে বিচলিত হয়ে ওঠে ইন্দিরা গান্ধীর সরকার। পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি সম্পর্কে আশু করণীয় নিয়ে এপ্রিলের শুরুতে জ্যাকবের সঙ্গে কথা বলেন ভারতীয় সেনাপ্রধান স্যাম মানেকশ। তিনি ইস্টার্ন কমান্ডের সেনাদের অবিলম্বে পূর্ব পাকিস্তানে প্রবেশের কথা জানান। কিন্তু এ প্রস্তাবের তীব্র বিরোধিতা করেন জ্যাকব। তার মতে এটা ছিল ‘নিতান্তই অবাস্তব’ প্রস্তাব। কারণ ওই সময় ইস্টার্ন কমান্ডের হাতে ছিল মাউন্টেন ডিভিশন, যারা পূর্ব পাকিস্তানের জলাভূমিতে অভিযান পরিচালনায় অদক্ষ। অন্যদিকে তখন ভরা বর্ষা কাল। মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এই বর্ষা মৌসুমে বাংলাদেশে অভিযান চালানো প্রায় অসম্ভব। অন্যদিকে তিনটি বড় নদী (ব্রহ্মপুত্র, পদ্মা ও মেঘনা) বর্ষাকালে খুবই ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করে। মানেকশকে জ্যাকব জানান, বর্ষার পানি নেমে যুদ্ধের অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি হতে নভেম্বর লেগে যাবে। জ্যাকবের যুক্তিতে বিরক্ত হন ভারতীয় সেনাপ্রধান। তবে যুক্তি যুক্তিযুক্ত হওয়ায় তা মেনে নেন। সঙ্গে জ্যাকবকে অভিহিত করে ‘অতি সাবধানী’ সেনাধ্যক্ষ হিসেবে।
চূড়ান্ত অভিযানের জন্য অপেক্ষার কথা বললেও জ্যাকব কিন্তু থেমে থাকেননি। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ আর শরণার্থীদের আশ্রয় নিশ্চিত করতে গিয়ে তাকে রীতিমতো হিমশিম খেতে হয়। উল্লেখ্য, এত অধিকসংখ্যক শরণার্থী এত অল্প সময়ে ভারতে আশ্রয় নেবে, তা কারো কল্পনায় ছিল না। অন্যদিকে তিনি তৈরি করতে থাকেন কার্যকর একটি যুদ্ধ পরিকল্পনা। ভারতীয় শীর্ষ কর্তাদের তাগিদ ছিল এ যুদ্ধ হতে হবে খুবই দ্রুত ও সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য। কারণ দীর্ঘায়িত যুদ্ধ নকশালদের জন্য নতুন ক্ষেত্র খুলে দেয়ার পাশাপাশি সম্ভাব্য চীনা হস্তক্ষেপের সম্ভাবনা তৈরি করবে। এসব বিষয় মাথায় রেখে জ্যাকব মধ্য মে মাসে একটি যুদ্ধ পরিকল্পনা তৈরি করেন, যাতে পাকিস্তানের জন্য ভূকৌশলগত ও ভূরাজনৈতিক প্রাণকেন্দ্র হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেন ঢাকা শহরকে। আর ঢাকায় আক্রমণের জন্য বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা সেনা দলকে পাশ কাটিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। আর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়, বিভিন্ন আক্রমণ চালিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীকে যতটা সম্ভব সীমান্তের কাছে নিয়ে আসা। যাতে ভেতরে তাদের নিরাপত্তা বলয় শিথিল হয়ে যায়। আর এ বিষয়ে পরিকল্পনার সময়ে জ্যাকবকে ভুটানের নিরাপত্তা কথাও চিন্তা করতে হয়। কারণ ১৯৭১ সালে ভুটানে চীনা আক্রমণের শঙ্কা ছিল।
এসব পরিকল্পনার মাঝেই ১৯৭১ সালের আগস্টে জেনারেল মানেকশ জগজিৎ সিং অরোরাকে নিয়ে ফোর্ট উইলিয়াম দুর্গে আসেন। বাংলাদেশে সেনা বিন্যাস ও অপারেশন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এ আলোচনায় ভারতীয় সেনাবাহিনীর ডিরেক্টর অব মিলিটারি অপারেশনস মেজর জেনারেল কে.কে. সিংও ছিলেন। তিনি যুক্তি দেন চট্টগ্রাম ও খুলনা পাকিস্তানিদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ দুই বন্দরের দখল নিতে পারলেই পাকিস্তানিরা পরাজিত হবে। মানেকশ ও অরোরা তার এ ব্যাখ্যায় তৃপ্ত হলেন। ওই আলোচনায় জ্যাকব তার মতামত তুলে ধরেন। তিনি মতামতে বলেন, খুলনা নিতান্তই একটি ছোট বন্দর। আর পূর্ব পাকিস্তানে কর্তৃত্ব বজায় রাখতে হলে খুলনা নয়, বেশি গুরুত্ব দিতে হবে ঢাকাকে। কাজেই ঢাকা হতে হবে প্রাথমিক ও প্রধান টার্গেট। কিন্তু অরোরা ও কে.কে. সিং কিছুতেই এ যুক্তি মানছিলেন না। তারা বারবার খুলনা আর চট্টগ্রাম দখলের কথা বলছিলেন। একপর্যায়ে মানেকশ, কে.কে. সিং ও অরোরা ঢাকার গুরুত্ব অনুধাবনে ব্যর্থ হলে জ্যাকব ভীষণ বিরক্ত হন। কিন্তু তিনি হাল ছাড়েননি। বিষয়টি নিয়ে মানেকশর সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেন। তাকে ঢাকার গুরুত্ব বোঝানোর চেষ্টা করেন। যদিও পরে জ্যাকবের এ যুক্তি সেনা কর্তৃপক্ষ মেনে নেয়। তার পরিকল্পনা অনুযায়ীই চূড়ান্ত হয় যুদ্ধ পরিকল্পনা।
যুদ্ধ শুরুর পর থেকেই কলকাতা তথা পশ্চিমবঙ্গকেন্দ্রিক প্রায় সব কার্যক্রমের কেন্দ্রে ছিলেন জ্যাকব। যুদ্ধ পরিকল্পনা থেকে শুরু করে বিদেশী সাংবাদিকদের সহযোগিতা— সবকিছুর কেন্দ্রে তিনি। নিউইয়র্ক টাইমসের সিডনি শ্যানবার্গ, লন্ডন সানডে টাইমসের নিকোলাস টমালিন ও নিউজউইকের টনি ক্লিফটনসহ অন্যান্য ঝানু সাংবাদিকদের তিনি সামলিয়েছেন অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে। অনেক সাংবাদিককে যুদ্ধক্ষেত্রে যেতে সহযোগিতা করেছেন। বিবিসি, সিবিএস এবং এনবিসি চ্যানেলগুলোকে যুদ্ধ বর্বরতার তথ্য ও ভিডিও সংগ্রহে সাহায্য করেছেন। সংবাদকর্মীদের সঙ্গে গড়ে তুলেছেন পেশাদার সুসম্পর্ক। যার ফলে যুদ্ধদিনে বিদেশী গণমাধ্যমের, বলা যায় একচ্ছত্র মনোযোগ পেয়েছে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ। ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের দিনও বিদেশী সাংবাদিকরা অনুসরণ করেছেন জ্যাকবকে। ঢাকায় নিয়াজির দপ্তরে আত্মসমর্পণের সব কিছু চূড়ান্ত হওয়ার পর নিয়াজির আমন্ত্রণে দুপুরে খেতে মেসে গিয়েছিলেন জ্যাকব। ওই সময় ওই অফিসে ছিলেন বিবিসির অ্যালান হার্ট ও অবজারভারের গ্যাভিন ইয়াং। নিয়াজির আমন্ত্রণে দুপুরের খাবার খেতে যাওয়ার ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে গ্যাভিন ইয়াং তার প্রতিবেদন তৈরি করেন। যার শিরোনাম ছিল ‘দ্য সারেন্ডার লাঞ্চ’, যে দুপুরের খাবার বা লাঞ্চের জন্য একজন সেনা কর্মকর্তা জ্যাকবকে কঠোর পরিশ্রম করতে হয়েছে। প্রজ্ঞা আর মেধার স্বাক্ষর রাখতে হয়েছে ক্ষণে ক্ষণে। ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে সফল যুদ্ধ এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখা লে. জেনারেল জেএফআর জ্যাকবের সেই বিশেষ অবদান সমর ইতিহাসে অক্ষয়, অবিনশ্বর হয়ে থাকবে চিরকাল।
লেখক: প্রভাষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়






