ক.
সেদিন ছিল বৃষ্টির দিন। ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ভেতর অস্ট্রেলিয়ায় পা রাখলাম। দেশের কথা ভেবে মন খারাপ ছিল। কিন্তু সিডনি শহরে নেমেই আমার মাথায় ঘুরছিল বই। বিমানবন্দরে বইয়ের বেশ বড় একটা দোকান ছিল। আমি সেখানে গিয়ে হাজির হলাম। থরে থরে বই সাজানো। ইংরেজি ভাষার বইয়ের পাশাপাশি চাইনিজ, জাপানিজ, স্প্যানিশ ভাষায় লেখা বইও দেখলাম। ভাবছিলাম, দু-একটা বাংলা বই পেলে মন্দ হয় না। তবে বাংলায় লেখা কিছু পেলাম না। দেশের কথা আবারো বেশ জোরেশোরে মনে পড়ল। আহা! দেশে থাকলে কত সহজেই না বাংলা বই পেয়ে যেতাম।
খ.
বইয়ের প্রতি আমার আগ্রহ প্রবল। যেকোনো ধরনের বই পেলেই আমি খুশি। যেহেতু সাহিত্যের ছাত্র ছিলাম, সেহেতু সাহিত্যের বই পেলে আমি আরো খুশি! দেশে থাকতে লেখালেখি করতাম। সে সুবাদে প্রচুর বই পড়তে হতো, সংগ্রহ করতে হতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার হলের পাশেই ছিল নীলক্ষেত। হাঁটলেই বই, রহস্য পত্রিকা থেকে শুরু করে মার্কেজের বইয়ের ঢাকাইয়া সংস্করণ—কী নেই সেখানে! আবার আজিজ সুপার মার্কেটে গেলেই বইয়ের বিশাল দুনিয়া। তবে আধুনিক ইংরেজি বই বেশ দুষ্প্রাপ্য ছিল (যেমন আমার ক্লাসে মার্গারেট অ্যাটউডের হ্যান্ড মেইডস টেইল পাঠ্য থাকলেও বইয়ের অভাবে সেটি পড়ানো হয়নি!) আমার
ভাবনা ছিল, বিদেশে গেলে নতুন নতুন বই পাওয়া নিয়ে আর চিন্তা করতে হবে না। অস্ট্রেলিয়া ইংরেজিপ্রধান দেশ হওয়ায় সাহিত্য নিয়ে আমার অভিজ্ঞতা সেখানে আরো সমৃদ্ধ হবে। আমার আরো ধারণা ছিল, ওখানে সমমনা (যারা সাহিত্য-সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করেন) বাংলা ভাষাভাষীদের পেলে সাহিত্যচর্চা আরো বেগবান হবে। দেশে থাকতে কানাডা, আমেরিকা ও ইংল্যান্ড প্রবাসী বাঙালিদের সাহিত্য পরিমণ্ডল নিয়ে যে খবর পেতাম, সে খবরই আমার এ ধরনের ধারণা গড়ে ওঠার পেছনে কাজ করেছিল (২০০৯ সালে আমি যখন অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমাই তখনো বাংলাদেশে ইন্টারনেটের এমন বহুল ব্যবহার শুরু হয়নি। খবরের কাগজ থেকেই মূলত যা জানার জানতাম। পরে বিভিন্ন ব্লগ থেকে বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বাংলা ভাষাভাষীদের সাহিত্যচর্চার খবর পেতে থাকি।) ইউরোপ ও আমেরিকায় বসবাসরত বাংলাভাষীদের সাহিত্যকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড দেখে আমি নিশ্চিত ছিলাম যে অস্ট্রেলিয়ায়ও আমি এ রকমের একটি সাহিত্যমনা পরিমণ্ডল পেয়ে যাব। তাই পৌঁছানোর পরের দিনই আমি সিডনিতে বাংলা সাহিত্যচর্চার কেন্দ্র খুঁজতে বের হয়ে পড়লাম।
গ.
সিডনিতে যারা পরিচিত ছিল তারা এই শহরে বাংলা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেক কিছু বলল। এখানে বাংলা মেলা হয়, মেলায় বাংলাদেশ থেকে আসা সংগীতশিল্পীরা গান গায়, এখানে পিঠা উৎসব হয়, ঈদমেলা হয়, ফ্যাশন শো হয়, হলে বাংলা সিনেমা দেখানো হয়; কিন্তু তারা কেউই এই শহরে বাংলা সাহিত্যকেন্দ্রিক কর্মকাণ্ড নিয়ে তেমন কিছু বলতে পারল না। তবে তারা আমাকে বাংলাদেশী বাজারের খোঁজ জানাল। সিডনিতে লাকাম্বা নামে একটি এলাকা আছে। সেখানে অসংখ্য বাংলাদেশীর বসবাস। জায়গাটি বাংলাদেশী দোকানপাট, রেস্তোরাঁয় ঠাসা। সেখানে গেলে সাহিত্যের খবর মিলতে পারে। শুনে তর সইছিল না। এক বিকালে সেখানে গেলাম। বাংলাদেশের কারওয়ান বাজারের মতোই সেখানে আলু বিক্রি হচ্ছে, পটল বিক্রি হচ্ছে, বরফ দেয়া ইলিশ মাছ বিক্রি হচ্ছে; দোকানে বাংলা গান বাজছে, রাস্তায় দাঁড়িয়ে মানুষ আলুপুরি-মোগলাই খাচ্ছে—দেখে মনে হলো, পুরান ঢাকার চকবাজারে ফিরে এসেছি! কিন্তু আমি যা খুঁজছিলাম—বইয়ের দোকান—কোথাও সেটা খুঁজে পেলাম না। এমনকি বিভিন্ন দোকানে জামাকাপড়, গানের সিডি থাকলেও, একটা বই কেউ দিতে পারল না! বইয়ের কথা বলতেই কেউ কেউ সিডনি থেকে প্রকাশিত কয়েকটি খবরের কাগজ ধরিয়ে দিল। সেসব কাগজে অস্ট্রেলিয়ার বাঙালি কমিউনিটি নিয়ে নানা তথ্য আছে, যৎসামান্য সাহিত্যপাতাও আছে, কিন্তু মন ভরানো সাহিত্য নেই! হতাশ হলাম! কেউ একজন একুশে একাডেমির কথা জানাল। তারা এখানে বাংলা ভাষা চর্চায় নিবেদিত। তাদের হাত ধরে সিডনির একটি পার্কে শহীদ মিনারও করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারির একদিন সেখানে বইমেলা হয়। বিষয়টি জেনে আপ্লুত হলাম। ভাবলাম, বইমেলায় ঢুঁ মারলে নিশ্চয়ই বাংলা সাহিত্যানুরাগীদের সঙ্গে
চেনা পরিচয় হবে।
ঘ.
অ্যাশফিল্ড এলাকার ছোট্ট একটি পার্কে বইমেলাটি হয়। সকাল সকাল সেখানে গিয়ে উপস্থিত হলাম। বেশ কয়েকটি বইয়ের দোকান দেখে মনটা ভালো হয়ে গেল। যাক অবশেষে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে বাংলা বইয়ের ঘ্রাণ পেলাম! আস্তে আস্তে মেলায় লোক বাড়তে লাগল। কিন্তু বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ কম। খাবারের দোকানগুলো ঘিরে আড্ডা জমে উঠল। ফুচকা, চটপটি, বিরিয়ানি, পুরি, শিঙাড়া, মোগলাই, চা, পরোটা দেদার বিক্রি হচ্ছে। সে তুলনায় বই তেমন চলছে না! একটা বিক্রি হয় তো দশটা পড়ে থাকে—অবস্থা এমন! সিডনি থেকে যারা বই প্রকাশ করেছেন, তাদের বই হয়তো চেনাজানার খাতির পরিচিতজনেরা কিনছেন, কেউ কেউ দেশের দু-একজন জনপ্রিয় লেখকের বই হয়তো সংগ্রহে রাখার জন্য কিনছেন, বাকি সবার যেন শুধু মেলায় ঘোরাঘুরি করেই আনন্দ! বই কিনেছে এমন দু-একজনের সঙ্গে কথা বলে জানলাম, প্রতি বছর এমনই হয়। এখানে বইয়ের প্রতি মানুষের আগ্রহ খুব কম। ফলে অন্য মেলাগুলোয়ও বইয়ের দোকানের চেয়ে কাপড়-জামার দোকান দেয়া হয় বেশি। অর্থাৎ, বই হচ্ছে এখানে সবচেয়ে বেশি অবহেলিত জিনিস। কানাডা, আমেরিকায় যেমন বাঙালি সাহিত্যমনা মানুষ—বিশেষ করে দেশে থাকতে যারা সাহিত্য নিয়ে মেতে থাকতেন—তাদের আনাগোনা বেশি, অস্ট্রেলিয়ায় তেমন নয়। হতে পারে, ওখানে অনেক আগে থেকেই শিক্ষিত সাহিত্যমনা মানুষজনের যাতায়াত বেশি। বিদেশগামীদের পছন্দের দিক থেকে অস্ট্রেলিয়া পেছন দিকে থাকায় এখানে ওই মানসিকতার মানুষ আগে থেকে বেশি আসেননি। আর তাই, সাহিত্য-সংস্কৃতিচর্চার দিক থেকে বাঙালিরা এখানে বেশ পিছিয়ে আছে—এ কথা ভাবার অবকাশ রয়েছে। কথাগুলো বেশ নিরাশার। বুঝতে পারলাম, অস্ট্রেলিয়ায় বাঙালি সাহিত্যচর্চার যে আশাব্যঞ্জক ছবিটি আমি মনের মধ্যে গেঁথে এ দেশে এসেছিলাম, সেটি আসলে নিছকই আমার কল্পনা। সিডনি হচ্ছে এ দেশের সবচেয়ে জনবহুল শহর। এখানে সবচেয়ে বেশি বাঙালির বসবাস। এখানেই যদি সাহিত্যের এ অবস্থা হয় তাহলে অন্য শহরগুলোর অবস্থা সহজেই অনুমেয়। মনে মনে খুব ভেঙে পড়লাম। এখানে আসার পর নতুন কিছু লিখতে পারছিলাম না। ভেবেছিলাম, সাহিত্যমনা লোকজনের গণ্ডির সঙ্গে যুক্ত হতে পারলে নতুন দেশে নতুন করে লেখার উদ্যম পাব। সে গুড়ে বালি! পরিচিত একজন পরামর্শ দিলেন, লাইব্রেরিতে যান, ওখানে বাংলা পত্রপত্রিকা আছে। ভালো লাগবে।
ঙ.
বাঙালিপাড়া লাকাম্বার লাইব্রেরিটি আকারে ছোট হলেও বেশ ছিমছাম। ওখানে গিয়ে কয়েক র্যাক ভর্তি বাংলা বই পেলাম। বেশির ভাগই পুরনো বই। তাতে কী! সিডনির লাইব্রেরিতে বাংলা বই সাজানো আছে, দেখেই বুকটা ভরে গেল। বাংলাদেশ এবং কলকাতার দুটো ম্যাগাজিনও নিয়মিত সেখানে আসে; হাতে নিয়ে ভালোই লাগল। আমার আগ্রহ দেখে লাইব্রেরিয়ান এসে কথা বললেন। তার কাছ থেকে জানলাম, আমাদের কমিউনিটির লোকেরা বই বেশি পড়ে না। তাই অন্য ভাষার বইয়ের সংখ্যা বাড়লেও আমাদের ভাষার বই কমছে! যেহেতু পাঠক কম, ফলে বাংলা বই কেনার জন্য যে বাজেট বরাদ্দ তা দিয়ে অন্য ভাষার বই কেনা হচ্ছে। লাইব্রেরিয়ান আমাকে দেখালেন, চাইনিজ লোকেরা তাদের ছেলেমেয়েসহ বই পড়ছে। আর বাংলা বই নিয়ে আমি একাই বসে আছি! অধিকাংশ সময় নাকি এমনটাই হয়: বাংলা পড়তে আসার লোক খুব কম। লাকাম্বার পাশের এলাকা ক্যাম্পসি। সেখানেও বাঙালিরা থাকেন। ওখানকার লাইব্রেরিতে গিয়েও একই অভিজ্ঞতা হলো—বাংলা বইয়ের পাঠক নেই! মন খারাপ করা একটা ব্যাপার।
চ.
ধীরে ধীরে মন খারাপটা আরো বাড়তে লাগল। যেখানেই যাই কথাবার্তা হয়—কাগজ নিয়ে। কাগজ হচ্ছে পারমানেন্ট রেসিডেন্সি পেপার। এটি হলো অস্ট্রেলিয়ায় সিটিজেনশিপ পাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ একটি ধাপ। এখানে পারমানেন্ট রেসিডেন্সি পাওয়া মানে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ভোগের দিক থেকে এক ধাপ এগিয়ে যাওয়া। যেমন চিকিৎসা খরচ (একাংশ) ফ্রি, পড়ার খরচে ছাড়, বেকার ভাতা পাওয়া ইত্যাদি। তাই রেসিডেন্সি পাওয়াটা এখানে বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি ব্যাপার। এটি আবার মর্যাদার সঙ্গেও জড়িত। ধরা যাক, আবদুল হক সাহেব আজকে রেসিডেন্সি পেলেন। কাল থেকেই তিনি করিম মিয়া—যিনি এখনো কাগজ পাননি—তার দিকে করুণার চোখে তাকাবেন। একটু ভাব নিয়ে বলবেন, কী এখনো কাগজ হলো না! এই হলো বাস্তবতা। এখানকার বাঙালি মানুষজন কাগজ নিয়ে কথা বলে, খাবার নিয়ে কথা বলে, বাড়ি কেনা নিয়ে কথা বলে, নতুন গাড়ি নিয়ে কথা বলে, কে কত বেতন পায় সেটা নিয়ে কথা বলে, বউয়ের গয়না নিয়ে কথা বলে, সন্তানের প্রাইভেট স্কুলিং নিয়ে কথা বলে, কিন্তু সাহিত্য নিয়ে বলে না! রেস্তোরাঁয় খেতে বসলে রাজনৈতিক আলাপে কান পাতা দায়; এখানে বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দলের শাখা আছে। এসব শাখার আবার আট-দশটা উপশাখা আছে। অথচ কোনো সাহিত্য সংগঠন নেই! এ নিয়ে কারো মাথাব্যথাও নেই। এমনও হয়েছে, আমি লেখালেখি করি এ কথা শুনে অনেকে মুখের সামনেই হো হো করে হেসে উঠেছেন। ভাবখানা এমন, আমার মতো গাধা মানুষ (যে কী না কাগজ পাওয়ার চেয়ে সাহিত্য নিয়ে বেশি চিন্তা করে!) এই
সিডনিতে আর একটাও নেই। শুধু যে আমার অভিজ্ঞতা এমন, তা নয়। পরে কবি সুব্রত অগাস্টিন গোমেজের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর তিনিও আমার মতোই হতাশা প্রকাশ করেছিলেন। সুব্রতদা আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের বড় ভাই। তিনি আমার বিভাগেই পড়েছেন। আমারও অনেক আগে তিনি অস্ট্রেলিয়া এসেছেন। সুব্রতদার কাছ থেকে জেনেছি, তিনি যখন এসেছেন তখনো অবস্থা প্রায় একই রকম ছিল। যারা লেখালেখি করেন—এমন নিরাশ করা পরিবেশে—তারা আসলে লেখার উৎসাহ ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলেন। সুব্রতদার ক্ষেত্রেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। এখন তিনি নতুন লেখা লেখেন না বললেই চলে! বলা যায়, লিখতে পারেন না। সুব্রতদার এ অবস্থা আমাকে আরো হতোদ্যম করে দেয়।
ছ.
এ হতাশার মাঝেই আমি বেশকিছু মানুষের সঙ্গে পরিচিত হই। তারা সিডনিতেই থাকেন এবং বাংলা সাহিত্য নিয়ে ভাবেন। এর মধ্যে একজন হলেন—আকিদুল ইসলাম। আমি একদিন তার বাসায় গিয়ে উপস্থিত হই। আকিদ ভাই বাংলাদেশ থেকে বই নিয়ে আসেন। তার ঘরভর্তি বাংলা বই! যতটুকু পারেন বাংলায় লেখার চেষ্টা করেন। এখানকার বাঙালি কমিউনিটির ভেতর বাংলাচর্চা বাড়ানোর চেষ্টা করেন। তার সঙ্গে কথা বলে ভালো লাগল। এভাবেই পরিচিত হই শাখাওয়াৎ নয়নের সঙ্গে। নয়ন ভাইও সাহিত্যপ্রাণ মানুষ। সিডনিতে বসে যতটা পারেন সাহিত্যচর্চা করে যাচ্ছেন। বইমেলার সময় এখানে যে সাহিত্য পত্রিকা বের হয়, তিনি সেটির সম্পাদনা করেন। তিনি এমনই বাংলা সাহিত্যপ্রাণ, বাংলাদেশ থেকে কুরিয়ারে নিত্যনতুন বাংলা বই নিয়ে এসে পড়েন! তাকে দেখে সাহস পেলাম। পরিচয় হলো আবুল হাসনাত মিল্টনের সঙ্গে। পেশায় অধ্যাপক, কিন্তু মনেপ্রাণে একজন কবি। মিল্টন ভাই বাংলায় হরদম লিখে যাচ্ছেন। কবিতা বিকেল নামের একটা সংগঠনের খবর জানলাম, যারা কবিতা পাঠের আসর করেন। শীর্ষেন্দু নন্দীর সঙ্গে পরিচয় হলো, তিনি একটি লিটল ম্যাগাজিন বের করেছেন। রাজন নন্দীকে চিনলাম, তিনিও বাংলায় লেখালেখি করছেন। সিডনি এবং সিডনির বাইরেও কয়েকজনের কথা জানলাম, যারা বিচ্ছিন্নভাবে বাংলা সাহিত্য চর্চা করে যাচ্ছেন। এদের দেখেই আমি অনুপ্রাণিত হলাম। ভাবলাম, নাহ! হতাশ হয়ে লেখা থামানো যাবে না। যতটা পারি লিখব। বাংলা বইয়ের অভাব কাটানোর জন্য নয়ন ভাইয়ের কাছ থেকে ঠিকানা নিয়ে আমিও দেশ থেকে কুরিয়ারে বই আনাতে শুরু করলাম (যদিও খরচ অনেক বেশি পড়ে। তাতে কী! নিজেকে মনে করিয়ে দিই, বই কিনে কেউ দেউলিয়া হয় না)। যেহেতু অস্ট্রেলিয়ায় প্রয়োজনীয় বাংলা বই পাই না, তাই দেশে গেলেও ব্যাগ ভর্তি বই নিয়ে আসি। ঢাকায় বিমানবন্দরে প্রতিবার ব্যাগ খুলে বই দেখে। সন্দেহ সন্দেহ চোখে জিজ্ঞেস করে, এত বই দিয়ে কী করবেন, কেন নিচ্ছেন—আরো কত কী! এসব নজরদারির বিড়ম্বনা সয়েও আমার বই পড়া চাই।
সিডনিতে আমার পুরনো বন্ধু এটিএম গোলাম কিবরিয়া এক্ষেত্রে টনিকের কাজ করেছে। সেও আমার মতো সাহিত্যপাগল মানুষ। বই নিয়ে তারও অনেক আগ্রহ। তার সঙ্গে আড্ডা দেয়াটাও অনেক কাজে দিয়েছে। এদের আন্তরিক সান্নিধ্যে সিডনিতে বসে বাংলা সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যাওয়ার ইচ্ছেটা অন্তত ধরে রাখতে পেরেছি।
জ.
আসলে সাহিত্যচর্চা একা হয় না। এর জন্য সংঘের প্রয়োজন হয়। একা একা হয়তো লেখা যায়। তবে সেই লেখার জন্য সাহিত্য নিয়ে আলোচনা, মতের বিনিময় এবং নতুন-পুরনো জ্ঞানের আদান-প্রদান জরুরি। দেশে এসবের সুযোগ ছিল। ইচ্ছে হলেই নানা সাহিত্য আড্ডায় যেতাম। ইচ্ছে হলেই সাহিত্য বোঝে এমন কারো সঙ্গে কথা বলতাম। মুখোমুখি তর্কবিতর্ক হতো। সিডনিতে তেমন সুযোগ নেই। এখানে সবাই প্রচণ্ড পরিমাণে ব্যস্ত। এত ব্যস্ততার ভেতর সাহিত্য নিয়ে সিরিয়াসলি ভাবার সময় কই! আর সাহিত্য দিয়ে আসলে কী লাভ হয়? এর চেয়ে বরং রাজনীতি নিয়ে কথা বললে আখেরে লাভ (দেশে গেলে নগদে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা পাওয়া যায়)। সাহিত্য দিয়ে সেটা সম্ভব নয়। এ কারণে হয়তো আমাদের প্রবাসীদের কাছে সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা অনেক অনেক পেছনে। আর তাই এখন ফেসবুকের যুগ হওয়া সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়ায় বাঙালি সাহিত্যচর্চার সঙ্গে যারা যুক্ত, তাদের কোনো ফেসবুক গ্রুপ নেই (আমার চোখে পড়েনি)। এখানে সাহিত্যচর্চা মূলত একটি বিচ্ছিন্ন ব্যাপার। যারা সাহিত্য নিয়ে ভাবেন, সাহিত্যকে ঘিরে কিছু একটা করতে চান বা সাহিত্য নিয়ে স্বপ্ন দেখেন, তারা একা একাই চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এ চেষ্টায় যেটুকু ফল হয় তা হয়তো যোগাযোগের অভাবে সবার কাছে পৌঁছায়ও না। এভাবেই চলছে। অস্ট্রেলিয়ায় বাঙালি ডাক্তার বাড়ছে, ইঞ্জিনিয়ার বাড়ছে, চাকরিজীবী বাড়ছে, কিন্তু সাহিত্যিক বাড়ছে না! ঝালমুড়ি, চানাচুরের বিক্রি বাড়ছে অথচ বাংলা বই হাতের কাছে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না!
ঝ.
এই যখন অবস্থা, তখন সিডনিতে বসে বাংলা সাহিত্যচর্চা কি ছেড়ে দেয়া উচিত? মাঝে মাঝে মনের ভেতর এ রকম প্রশ্ন আসে। এভাবে সাহিত্যশূন্য একটা পরিবেশে বসে আসলে কি সাহিত্য নিয়ে ভাবা যায়? ব্যাপারটা অবশ্যই কঠিন। তবে যারা সত্যিকারভাবে সাহিত্য ভালোবাসেন, তারা অস্ট্রেলিয়ায় বসে এই কঠিন কাজই করে যাচ্ছেন। আমি তাদের দেখে অনুপ্রাণিত হই। যেমন কিছুদিন আগে অপু সরোয়ারের সঙ্গে পরিচিত হলাম। তিনিও সিডনিতে বহুদিন আছেন। এখানে সাহিত্য নিয়ে মিথস্ক্রিয়ার সুযোগ অনেক কম বিধায় একা একাই সাহিত্যচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন। নিশ্চয় এমন আরো অনেকেই এখানে আছেন। কিন্তু একে অন্যের সঙ্গে যোগাযোগ নেই। হয়তো ধীরে ধীরে কোনো একসময় যোগাযোগ হবে, সাহিত্য চিন্তার আদানপ্রদানের পরিধি বড় হবে। আমি স্বপ্ন দেখি। কল্পনা করি, এখানেও একদিন সমস্ত বাঙালি লেখককে নিয়ে আমেরিকার মতো লেখক সম্মেলন হবে। আজ না হোক, কাল হবে। কাল যদি না হয় তবে পরশু। আমার মনে হয় লেখক হিসেবে এ আশা ধরে রাখা জরুরি। আশা ছেড়ে দেয়া মানে ইতিবাচক মানসিকতা থেকে দূরে সরে যাওয়া। এমন দূরে গিয়ে কেউ কখনো ভালো সাহিত্য সৃষ্টি করেছেন, তেমনটি আমার জানা নেই। অতএব আমি আমার আশা জারি রেখেছি, আমি আমার সাহিত্যচর্চা আমার মতো করে চালিয়ে যাচ্ছি।
পুনশ্চ
সিডনিতে অবশেষে একটি বইয়ের দোকান হয়েছে—প্রশান্তিকা বইঘর। এখানে নতুন নতুন বাংলা বই পাওয়া যায়, যা ছোট পরিসরে হলেও খুব আশা জাগানিয়া। পানের দোকান, শাড়ির দোকান, মুড়ির দোকানের পাশে একটি বইয়ের দোকানের খুব দরকার ছিল। প্লেটো বলেছেন, বই হলো জগতের আত্মা—সবকিছুর জীবনীশক্তি। বইয়ের দোকানটি হয়তো সিডনিবাসী বাঙালিকে কিছুটা হলেও বইমুখী করবে, কিছুটা হলেও সাহিত্যপ্রেমিক করবে। সাহিত্য হলো একটি সংস্কৃতির অন্যতম চালিকাশক্তি। সাহিত্য থেকে দূরে গিয়ে কখনো কোনো জাতি সামনে এগিয়েছে, তার কোনো নজির নেই। সাহিত্য আমাদের পরিচয়ের ধারক বাহক। ছোট্ট বইয়ের দোকানটি তাই তাত্পর্যপূর্ণ। হয়তো এর মাধ্যমেই অস্ট্রেলিয়ায় বাঙালির সাহিত্যচর্চা নতুন পথের দেখা পাবে।
মূর্তালা রামাত: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী কবি ও লেখক





