সিঙ্গাপুরে সম্ভবত   সোয়া লাখের মতো বাংলাদেশী রয়েছেন। টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ আর কুমিল্লার অনেকে আছেন এখানে। এখানকার বিভিন্ন শহরে তারা ছড়িয়ে আছেন, আর সেখানে কর্মজীবীদের সংখ্যাই বেশি। এখানে কোম্পানির ডরমিটরি বলে, সেখানেই বেশির ভাগ অভিবাসী থাকেন। কোনো ঘরে ১২ জন, কোনো জায়গায় ১৬ জন করে থাকেন। কোনো ডরমিটরিতে রান্না করার ব্যবস্থা আছে, কোনোটায় নেই। সেখানে সবাই নিজেরাই রান্না করে খায়। এসব বাসার ভাড়া প্রতিষ্ঠানই দেয়। সাধারণত যারা কর্মী তারা পরিবার ছাড়া সিঙ্গেলই থাকে। তারা তাদের স্ত্রীদের আনতে পারে, তবে তিন মাস পর্যন্ত রাখা যায়। হোস্টেল সিস্টেমে এখানে থাকে সবাই। সত্যি বলতে এখানে জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক। যদি নতুন আসে, তাহলে বাংলাদেশীদের বেতন একটু কম দেয়। তার ওপর তাদের কিছু ওভারটাইম থাকে। ওভারটাইমে দেড় গুণ টাকা দেয়। সব মিলিয়ে মাসে ৫০ হাজার বাংলাদেশী টাকার মতো আয় করে থাকে। সেখান থেকে নিজের খরচ বাদ দিয়ে ৩০ হাজার টাকার মতো তারা সঞ্চয় করতে পারে। পরে ধীরে ধীরে তারা নিজেদের আপডেট করে। ধীরে ধীরে এগোলে পরে বেতন বাড়ে। আবার নিজের দক্ষতা উন্নয়ন হলেও বেতন বছরে বছরে বাড়তে থাকে। যে যত দক্ষ, তার বেতন তত বাড়তে থাকে।

কর্মক্ষেত্র

মূলত তারা কনস্ট্রাকশন ও শিপইয়ার্ডে বেশি কাজ করেন। কেউ কেউ ফ্লোর ক্লিনার হিসেবেও কাজ করেন। তবে ফ্লোর ক্লিনার বা শিপইয়ার্ডে কাজ করতে এলে স্কেল করতে হয় না। কনস্ট্রাকশনের কাজে এলে স্কেল করতে হয়। শিপইয়ার্ডে কাজে এলে আগে বেতন আরো কম দেয়া হতো, এখন কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। যারা এক্সপার্ট আছে, তারা শপিং সেন্টারে কাজ করতে পারেন। যারা ওয়ার্ক পারমিট হোল্ডার, তারা নিজের কোম্পানির বাইরে অন্য কোনো কাজ করতে পারবেন না। যদি করেন তাহলে সেটা অবৈধ হয়ে যায়। যদি পুলিশে ধরে, তাহলে তাদের জরিমানাও করতে পারে, আর দেশেও ফেরত পাঠাতে পারে। তাই কোম্পানিতে কাজ করার বাইরে তাদের আর কোনো কিছু করার সুযোগ নেই। শুধু নিজের কোম্পানিতেই কাজ করতে হবে। এটা বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, শ্রীলংকা সবার জন্য সমান। আমি যে কোম্পানির জন্য পারমিট পেয়েছি শুধু সেখানকারই কাজ করতে পারব।

দিনলিপি

ওয়ার্কারদের জীবন অনেকটা একরকম, তারা সকালে ঘুম থেকে ওঠেন। তারপর ফ্রেশ হয়ে সাড়ে ৬টার দিকে লরিতে করে সাইটে আসেন। আসার পরে সুপারভাইজাররা সবকিছু বুঝিয়ে দেন। ১০টায় কফিটাইম ১৫ মিনিট, তারপর ১২টা থেকে ১টা পর্যন্ত লাঞ্চ টাইম ১ ঘণ্টা। ৩টার দিকে আবার কফি টাইম ১৫ মিনিট। এরপর ৫টার দিকে ডরমিটরিতে চলে যান। ৫টা পর্যন্ত হলো বেসিক ডিউটি। তার পরের যতটা সময় কাজ করবে, সেটা হবে তাদের ওভারটাইম। মানে তাদের বেসিক স্যালারি যদি ৩ টাকা হয়, তাহলে ওভারটাইমের জন্য পাবে সাড়ে ৪ টাকা। বেসিকের দেড় গুণ ওভারটাইম। ৭টার দিকে হয়তো লরি নিয়ে রুমে চলে যায়, পরে রান্নাবান্না করে। আর যারা ক্যাটারিংয়ে খায় তারা অর্ডার দেয়। যারা ১০টা পর্যন্ত কাজ করে তখন তাদের লরি আসে, তারপর তারা চলে যায়। পরের দিন আবার তাদের একই রুটিন। সোম থেকে শনি এভাবেই চলে তাদের দিন। রোববার সাপ্তাহিক ছুটি। এদিন কাজ থাকলে তারা কাজে যায়। বিকাল ৫টার পরে বাঙালিরা অনেকেই এক জায়গায় হয়। সে সময় তারা বন্ধুবান্ধব বা অন্যদের সঙ্গে দেখা করে। কিছু রিক্রিয়েশন সেন্টার আছে, যেখানে খেলাধুলা হয়। কিন্তু ওখানে সবাই খুব কম যায়। রোববারের দিন সময় পেলে বেশির ভাগই মোস্তফা সেন্টারে যায়। সেখানে বড় মার্ট, মিনি মার্ট আর তেঁতুলতলা নামে তিনটি জায়গা আছে। সেখানে বাংলাদেশী বেশি, বাংলাদেশী দোকানগুলো ওখানে বেশি। তাই সেখানেই সবাই একত্রিত হন। সিঙ্গাপুরের নাগরিকত্ব থাকা কিছু বাংলাদেশী ওই সব দোকান চালান। এখানে সাধারণত ইংলিশ, চায়নিজ, তামিল আর মালয় ভাষা চলে। বাঙালিরা বাংলা বলে নিজেদের মধ্যে। সাধারণত ইংরেজি বেশি বলে।

স্থানীয়দের সঙ্গে বাংলাদেশীদের সম্পর্ক ও অবস্থান

বাংলাদেশীরা যে কোম্পানিতে কাজ করেন সেখানকার কিছু মানুষজন ছাড়া তাদের আর ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে না। এমনিতে সিঙ্গাপুরিয়ানদের কথাবার্তা ও আচরণ ভালো। তারা কোনো সময় কাউকে বিরক্ত করবে না বা কিছু বলবেও না। তবে এখানে বাংলাদেশীদের অবস্থান ততটা ভালো না। ভারতীয়দের বেশি ভালো হয়। সিঙ্গাপুরে সুপারভাইজার বা ড্রাইভার সবচেয়ে বেশি ভারতের। আগে ভারতীয়রা লাইসেন্স থাকলে ডিগ্রি পরীক্ষা দিয়ে সিঙ্গাপুরের লাইসেন্স নিতে পারত। ছয় মাসের অভিজ্ঞতা থাকলেই তারা সেটা পারত। বাংলাদেশীদের ক্ষেত্রে ওটা ছিল না। ফলে সেসব জায়গায় ভারতীয়রা অভিজ্ঞতা দেখিয়ে সিঙ্গাপুরিয়ান লাইসেন্স নিয়ে নিয়েছে। এখন সেই জায়গায় কিছুটা বদল এসেছে। তার পরও বলা যায়, মোটামুটি ভালোই আছেন বাংলাদেশীরা। ভালো-খারাপ মিলিয়েই তারা এখানে আছেন। নিরাপত্তার শঙ্কা এখানে কম। কাজের ক্ষেত্রেও বা কাজের বাইরেও সবাই পুরোপুরি নিরাপদ। সিঙ্গাপুরের আইন অনেক কড়া। তাই অপরাধ বা এমন কিছু নেই। এখানে ছেলেমেয়ে কেউ হেঁটে গেলেও তার দিকে তাকাবে না বা বিরক্ত করবে না।

যোগ করতে চাই

তবে এ দেশে আসার ক্ষেত্রে এজেন্সির প্রভাবটা অনেক বেশি। ভারত থেকে এখানে আসতে খরচ হয় দুই-আড়াই লাখ আর বাংলাদেশ থেকে আসতে খরচ হয় ৮ লাখ টাকা। কিন্তু খাওয়া-দাওয়া সবকিছুর খরচ মিটিয়ে বছরে ২ লাখ টাকা সঞ্চয় করতে পারেন না প্রবাসীরা। বাংলাদেশে এজেন্সিরা অতিরিক্ত টাকা নেয়। অন্যান্য দেশের তুলনায় তিন গুণ টাকা দিতে হয়। বাংলাদেশের ট্রেনিং সেন্টারগুলো এমন করে। নতুন আসতে গেলে এমন করে। পাসপোর্টের ক্ষেত্রেও একটা সমস্যা দেখা দেয়, ভোটার আইডি কার্ডের সঙ্গে পাসপোর্টে থাকা বয়সের বা অন্য তথ্যের কোনো কোনো ক্ষেত্রে মিল নেই। এটা নিয়ে বর্তমানে অনেকের সমস্যা হচ্ছে। এক্ষেত্রে দূতাবাস ও সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।

 

শামীম শফিক: সিঙ্গাপুর প্রবাসী