১৭৭০ সালের ২৩ এপ্রিল ক্যাপ্টেন জেমস কুক ‘এনডিভার’ নামের জাহাজ বহর নিয়ে অস্ট্রেলিয়া আবিষ্কার করেন। তিনি জাহাজগুলো নোঙর করে মাটিতে পা রেখেই দেখলেন, এক আদিবাসী নারী তার তিন সন্তান নিয়ে গাছের শুকনো ডাল কুড়াচ্ছে। ওদের পরনে এক টুকরো কাপড়ও নেই। তিনি হেঁটে গিয়ে খানিকটা দূরে দেখতে পান, চারটি ছোট নৌকায় আটজন আদিবাসী পুরুষ সমুদ্রের কিনার ধরে বর্শা দিয়ে মাছ ধরছে।

তিনি তার সঙ্গে আসা তাহিতিয়ান সর্দার তোপিয়ার মাধ্যমে ওদের সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন। কিন্তু ওরা ভীত হয়ে তত্ক্ষণাৎ নৌকা নিয়ে পালিয়ে যায়। ক্যাপ্টেন কুক অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে যেখানে প্রথম পা রাখেন, সে স্থানটি এখন আধুনিক সিডনির বোটানি বে। সমুদ্রের দিকে হেলে পড়া অসংখ্য গাছ দেখে তিনি এ নামকরণ করেছিলেন।

ক্যাপ্টেন জেমস কুক ছিলেন অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রধান ইংরেজ অভিযাত্রী, নাবিক ও মানচিত্রবিদ। নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়া ভ্রমণ করে তিনি প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের মানচিত্র তৈরি করেন, যা পশ্চিমাঞ্চলের ভৌগোলিক রহস্য উন্মোচন করে।

ক্যাপ্টেন জেমস কুকের অস্ট্রেলিয়া দখলের মাত্র ২৭ বছর পর স্কটিশ ব্যবসায়ী উইলিয়াম ক্লার্কের সঙ্গে ১২ জন বাঙালি আসেন অস্ট্রেলিয়ায়। অর্থাৎ আজ থেকে ২২৪ বছর আগে প্রশান্ত মহাসাগর তীরের ভূমিতে বাঙালির প্রথম পদচিহ্ন অঙ্কিত হয়েছিল। তাদের গন্তব্য ছিল সিডনি। নতুন গড়ে ওঠা সিডনি শহরে তখন লোকসংখ্যা ছিল মাত্র ১ হাজার ৫০০। বর্তমানে সিডনির জনসংখ্যা ৫০ লাখ।

উইলিয়াম ক্লার্কের সফরসঙ্গী হিসেবে ১২ জন বাঙালি ছাড়াও ছিলেন চারজন ব্রিটিশ। ১৭৯৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তারা কলকাতা থেকে একটি জাহাজ নিয়ে ব্যবসার উদ্দেশ্যে যাত্রা করেন। তখন চট্টগ্রাম থেকে অনেক বাঙালি কলকাতা গিয়ে জাহাজে কাজ করতেন। অস্ট্রেলিয়ার ভিক্টোরিয়া রাজ্য থেকে ৯০ মাইল দূরের একটি সমুদ্রসৈকতের কাছে তাদের জাহাজটি প্রবল ঝড়ের কবলে পড়ে। ১৭৯৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তাদের জাহাজটি ঝড়ে বাস স্ট্রেটের ফার্নাক্স দ্বীপপুঞ্জে ধ্বংস হয়। তারা সাঁতার কেটে একটি দুর্গম ছোট দ্বীপে আটকা পড়েন। ওই দ্বীপটি সিডনি থেকে ৭০০ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত। বেঁচে যাওয়া ১৭ জন হেঁটে সিডনির দিকে রওনা হন।

অস্ট্রেলিয়ায় স্থায়ীভাবে বাংলাদেশীদের বসবাস প্রায় ৭০ বছর। দেশটির মূলধারার রাজনীতিতে বাংলাদেশীরা সবসময়ই সক্রিয়। এর পরেও এই দীর্ঘ সময়ে ফেডারেল কিংবা রাজ্যের পার্লামেন্টে বাংলাদেশীদের প্রতিনিধিত্ব নেই। অথচ অস্ট্রেলিয়ান পার্লামেন্টে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অধিকাংশ দেশেরই প্রতিনিধি আছে।

অস্ট্রেলিয়ানরা প্রবাসী বাংলাদেশীদের সবসময় রাজনীতি সচেতন জাতি হিসেবে বিবেচনা করেন। সে হিসেবে দেশটির প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলেও তাদের যথেষ্ট গুরুত্ব আছে।

বেশ কয়েকটি অঞ্চলে দল দুটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মতো দায়িত্বশীল পদেও বাংলাদেশী আছেন।

অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রশান্ত মহাসাগর পাড়ে উত্থানের ইতিহাসটিও রাজনৈতিক। ১৯৭১ সালে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী মাত্র পাঁচজন বাংলাদেশী শিক্ষার্থী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে জনমত গঠনের জন্য গড়ে তুলেছিলেন ‘বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব অস্ট্রেলিয়া’। তারা অস্ট্রেলিয়ার শপিং সেন্টার, ফেরিঘাট, ট্রেন স্টেশন ও বাস স্টপেজে মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষে ব্যানার, ফেস্টুন টাঙিয়েছিলেন। বিভিন্ন দেশের দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন বাংলাদেশের পক্ষে বক্তব্য দেয়ার জন্য। সে সময় পুরো অস্ট্রেলিয়ার মানুষ বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে ছিলেন। এরই প্রেক্ষাপটে পাশ্চাত্য ও অন্যান্য উন্নত দেশগুলোর মধ্যে অস্ট্রেলিয়াই প্রথম স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছিল। এছাড়া ১৯৭২ সালে যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ও বীরাঙ্গনাদের চিকিৎসার জন্য যখন বিভিন্ন দেশ থেকে বাংলাদেশে চিকিৎসকরা যান, তখন অস্ট্রেলিয়া থেকেও একদল চিকিৎসক সদ্য স্বাধীন হওয়া দেশটিতে গিয়েছিলেন।

অস্ট্রেলিয়ান রাজনীতিকরা বাংলাদেশীদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ার জন্য প্রচুর সুযোগ দিলেও তা কাজে লাগাতে পারেননি বঙ্গোপসাগর তীরের বাংলাদেশীরা। ২০০১ সালে ক্যানবেরার ইডেনমনরো থেকে অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল নির্বাচনে অংশ নেন প্রথম বাংলাদেশী নাজিয়া আহমেদ। এরপর ২০১৬ সালে তত্কালীন ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টি থেকে নির্বাচন করেন শাহে জামান টিটু। ২০২২ সালে নির্বাচনে অংশ নেন সাজেদা আক্তার সানজিদা ও এনাম হক। তাদের কেউই জয়লাভ করতে পারেননি।

অস্ট্রেলিয়ান পার্লামেন্টে ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, চীন, আফগানিস্তান, সিঙ্গাপুরসহ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিত্ব থাকলেও বাংলাদেশের কোনো প্রতিনিধি না থাকার কারণ জানতে চাইলে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী গবেষক ও লেখক ড. রতন কু বলেন, ‘উন্নত বিশ্বের রাজনীতি আর তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতির মধ্যে বিস্তর ব্যবধান। অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার রাজনীতির জন্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা প্রয়োজন, তা আমাদের অপ্রতুল। আর যাদের এ জ্ঞান আছে, তারা রাজনীতি থেকে দূরে। এখানে যারা মূলধারার রাজনীতি করেন, তাদের অধিকাংশই বৃহত্তর পরিসরে কাজ করার চেয়ে ছোট বাংলাদেশী কমিউনিটি নিয়ে কাজ করতেই বেশি পছন্দ করেন। স্বাভাবিকভাবেই মূলধারার বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে তাদের কোনো সম্পৃক্ততা নেই।’

কলাম লেখক ও শিক্ষাবিদ আবুল হাসনাত মিল্টন বিষয়টি ব্যাখ্যা করলেন ভিন্নভাবে। তার মতে, অস্ট্রেলিয়ায় বাংলাদেশীরা বসবাস করছেন প্রায় ৭০ বছর। তবে গত ৩০ বছর ধরে এ সংখ্যা বেড়েছে। প্রথম প্রজন্মের অভিবাসীদের নতুন ভূখণ্ডে থিতু হতে হতেই সময় কেটে যায়।

তিনি বলেন, ‘এ পর্যন্ত বাংলাদেশীদের অস্ট্রেলিয়ার রাজনীতিতে অংশগ্রহণ ও ভূমিকা রাখা একেবারেই নগণ্য নয়। আমি আশাবাদী, আমাদের নতুন প্রজন্ম আগামী এক-দুই দশকের ভেতরে সংসদেও প্রতিনিধিত্ব করবে।’

অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন রাজ্যের সিটি কাউন্সিলে কাউন্সিলর হিসেবে বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী থাকলেও পার্লামেন্ট মেম্বার হিসেবে কেউ সফলতা পাননি।

২০০১ সালে ক্যানবেরার ইডেনমনরো থেকে অস্ট্রেলিয়ার ফেডারেল নির্বাচনে অংশ নেন প্রথম বাংলাদেশী নাজিয়া আহমেদ। এরপর ২০১৬ সালে তত্কালীন ক্ষমতাসীন লিবারেল পার্টি থেকে নির্বাচন করেন শাহে জামান টিটু। ২০২২ সালে নির্বাচনে অংশ নেন সাজেদা আক্তার সানজিদা ও এনাম হক। তাদের কেউই জয়লাভ করতে পারেননি।

এ প্রসঙ্গে অস্ট্রেলিয়া-বাংলাদেশ জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ আব্দুল মতিন বলেন, ‘প্রবাসে যেসব বাংলাদেশী রাজনীতি করছেন, মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য ইংরেজি ভাষায় যতটুকু দক্ষতা, ভৌগোলিক, অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক জ্ঞান থাকা প্রয়োজন, সেটির ঘাটতি আছে বলে আমি মনে করি। যাদের এসব যোগ্যতা আছে, তারা রাজনীতিতে এগিয়ে আসছেন না। আর কেউ এগিয়ে এলেও তাকে সহযোগিতা না করে বরং বিরোধিতা করা হচ্ছে।’

অন্যান্য দেশের দ্বিতীয় প্রজন্ম অস্ট্রেলিয়ার মূলধারার রাজনীতিতে সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে। অথচ বাংলাদেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে, আগ্রহও দেখা যায় না। এর কারণ জানতে চাইলে বহুজাতিক বাংলাদেশী টেলিকমিউনিকেশন কোম্পানি টেলিওজের সিইও জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘এর কারণ হতে পারে নতুন প্রজন্ম আমাদের দেশের নেতিবাচক রাজনীতি দেখে হতাশ হয়েছে। তাদের খুবই বাজে অভিজ্ঞতা রয়েছে। এখনকার নতুন প্রজন্ম অনেক প্রগতিশীল। তারা নিজেদের ক্যারিয়ার রাজনীতিবিদ হিসেবে গড়তে চায় না। আমার মনে হয়, এজন্য অন্য জাতির ছেলেমেয়েদের তুলনায় আমাদের ছেলেমেয়েদের রাজনীতিতে একটু বেশি অনীহা।’

দেশটির ফেডারেল পার্লামেন্টে বাংলাদেশীদের অংশগ্রহণ না থাকলেও অস্ট্রেলিয়ার বিভিন্ন রাজ্যের সিটি কাউন্সিল নির্বাচনে দেশটির প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের প্রার্থী হিসেবে কাউন্সিলর পদে নির্বাচিত হয়েছেন বেশ কয়েকজন বাংলাদেশী।

এ বছর অস্ট্রেলিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়ে গেল দেশটির অন্যতম প্রধান রাজ্য নিউ সাউথ ওয়েলসের সিটি কাউন্সিল নির্বাচন। আর এ নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে অংশগ্রহণকারী উল্লেখযোগ্যসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশী নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন। যে বাংলাদেশীরা জয়লাভ করেছেন তারা হলেন মাসুদ রানা চৌধুরী (ক্যাম্বেলটাউন), সুমন সাহা (ক্যাম্বারল্যান্ড), সাবরিন ফারুকি (ক্যাম্বারল্যান্ড), সাজেদা আক্তার (ক্যান্টাবেরি-ব্যাংকসটাউন) ও শিবলি চৌধুরী (ডাব্বু)।

 

আকিদুল ইসলাম: অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী লেখক, সাংবাদিক