নভেল করোনাভাইরাস মহামারীর ধকল কাটিয়ে আবারো প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে পেল বাংলাদেশীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শ্রমবাজার দক্ষিণ কোরিয়া। সেই সঙ্গে গুরুত্ব পাচ্ছে এখানে বসবাসরত সব প্রবাসী বাংলাদেশী নতুনদের নিয়ে আগামী দিনে মিলেমিশে দেশের উন্নয়নে কাজ করা। ২০০৭ সালে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে কোরিয়ান সরকারের শ্রমিক নিয়োগের জন্য চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর ২০০৮ থেকে আজ পর্যন্ত আনুমানিক ৩৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশী ইপিএসের (Employment
permit system) মাধ্যমে কোরিয়ায় প্রবেশ করেছে। তার মধ্যে ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকেই এখন পর্যন্ত প্রায় ৩৬০০ জনের বেশি প্রবেশ করেছেন। বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের (বোয়েসেল) তথ্যমতে গত আগস্টেই দুই হাজারেরও বেশি বাংলাদেশী ইপিএসের অধীনে এখানকার মালিকের সঙ্গে শ্রমচুক্তি সম্পন্ন করেছে। যারা আগামী তিন মাসের মধ্যে কোরিয়ায় প্রবেশ করার অপেক্ষায় আছেন।
আগের তুলনায় এ বছর এত বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশী নিয়োগের কারণগুলো কী ছিল? এখানে বসবাসরত পুরনো বাংলাদেশীরা খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে বিভিন্ন কোম্পানিতে কাজ করছেন। পাশাপাশি বেশি বেতন পাওয়ার আশায় আগের মতো কোম্পানি পরিবর্তন করেনি। এছাড়া নিজের মেধা আর শ্রমে কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি করে মালিকদের খুশি করতে সমর্থ হয়েছে। সে কারণে করোনাভাইরাস মহামারী- পরবর্তী সময়ে অন্যান্য দেশের শ্রমিকরা যখন কোম্পানি পরিবর্তন করছে, সেখানে পুরনো বাংলাদেশীরা শূন্যতা পূরণ করার জন্য নিজেরা দায়িত্ব নিয়ে মালিকদের অনুরোধ করছেন যেন বাংলাদেশী শ্রমিক নিয়ে আসেন। আবার অনেক নতুন কোম্পানি অন্যান্য মালিকের পরামর্শ নিয়ে বাংলাদেশী শ্রমিক নিয়োগ দিচ্ছে।
পুরনো বাংলাদেশীরাও নতুনদের যাতে কোনো ধরনের সমস্যা না হয়, সেজন্য যার যার অবস্থান থেকে খোঁজ নেয়ার চেষ্টা করছে। কোনো কোম্পানিতে বাংলাদেশী না থাকলে খবর পাওয়া মাত্রই সেই নতুন ভাইয়ের প্রয়োজনীয় বিষয় নিজে থেকে সমাধান করার চেষ্টা করছে। দেখে মনে হয় সেই নতুন ভাই তারই আপন কেউ। আসলে এসব কিছুই দেশের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা। আর যেন সম্প্রীতির মিলনমেলা। এমন মিলনমেলার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে ইপিএস বাংলা কমিউনিটি ইন কোরিয়াসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন। প্রতিটি প্রদেশে ইপিএস বাংলা কমিউনিটি ইন কোরিয়ার সদস্য আছে। যেকোনোভাবে যেকোনো সমস্যা সম্পর্কে জানার সঙ্গে সঙ্গেই তারা সমস্যা সমাধানে চেষ্টা করে। কমিউনিটির প্রতিটি সদস্যই আবার এখানকার কোম্পানিতে কাজ করে, অবসর সময়ে পরিবারকে সময় কম দিয়ে দেশের মানুষের সমস্যা সমাধানে কাজ করে। আবার এ যান্ত্রিক জীবনে একটু বিনোদন দিতে প্রতি বছরই জুলাই-আগস্টে প্রবাসী বাংলাদেশীদের নিয়ে আয়োজন করে গ্রীষ্মকালীন মিলনমেলার। যেখানে নিজের দেশের পতাকাকে সারা বিশ্বে তুলে ধরার জন্য গড়ে তুলে মানব পতাকা। দেশে গিয়ে নিজে কীভাবে উদ্যোক্তা হয়ে দেশের অথনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারে, সে বিষয়েও বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন করে। এছাড়া ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, দাবা, ক্যারম বোর্ডের মতো টুর্নামেন্টের আয়োজনও করে।
এত কিছুর পরও নতুনদের নিয়ে বেশকিছু সমস্যা দেখা যায়। যার মধ্যে রয়েছে ভাষাগত সমস্যা। এখানে আসার আগে অনেকে রাতারাতি অনেক টাকার মালিক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে আসেন। কিন্তু তার জন্য নিজেকে দক্ষ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার বিষয়ে কিছুটা উদাসীন থাকেন। অথচ তিনি এখানে কেন এলেন বা কাদের ভূমিকা ছিল সেসব ভুলে যান।
সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কোরিয়ায় এসে অনেকে নিজের কাজের দক্ষতা বৃদ্ধি করার পাশাপাশি ভিসা ক্যাটাগরি বদলে কোরিয়ান পাসপোর্ট গ্রহণ করে বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আছেন। তার মধ্যে অন্যতম আল ইয়াছিন মার্টের স্বত্বাধিকারী ইয়াছিন। তিনি ২০১২ সালের শেষে E9 ভিসায় এসে মাত্র ছয় বছরের মধ্যে কোরিয়ান পাসপোর্ট গ্রহণ করে পুচ্ছন সউরি (Songwori) এলাকায় হালাল ফুডের ব্যবসা করছেন, যা আগামী দিনে নতুনদের জন্য উদাহরণ। এছাড়া ইপিএস বাংলা কমিউনিটি ইন কোরিয়ার সভাপতি কামরুল হাসান রাজও E9 থেকে আজকে কোরিয়ান নাগরিক।
ইপিএসের আওতায় বোয়েসেলের তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশী শ্রমিক দক্ষিণ কোরিয়ায় প্রবেশের পাশাপাশি এখানে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের জন্যও অনেক বাংলাদেশী আসেন। সময়ের পরিক্রমায় তারাও তাদের প্রতিভা আর মেধাকে কাজে লাগিয়ে এখানে ভালো রেজাল্ট করছেন। পাশাপাশি কাজের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়ে তারাও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করছেন। সামনের দিনগুলোতে কোরিয়াতে যেন শ্রমিক সংকট না হয়, সেজন্য স্থায়ীভাবে বসবাসের সুযোগ দিতে বিভিন্ন আইন-কানুনও শিথিল করছে দেশটি।
নতুনের আগমন আর পুরনোদের ভূমিকার বিষয়ে ইপিএস বাংলা কমিউনিটি ইন কোরিয়ার সভাপতি কামরুল হাসান রাজ বলেন, অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বাংলাদেশীরা তাদের মেধা, দক্ষতা দিয়ে সুনাম বৃদ্ধিতে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তবে নতুনদের মাঝে ভাষাগত সমস্যা গুরুত্বপূর্ণ, তাই যারা আসার অপেক্ষায় আছেন, তারা অবশ্যই কোরিয়ান ভাষার ওপর গুরুত্ব দেবেন। সেজন্য ডিজিটাল যুগে ইউটিউবসহ বিভিন্ন মাধ্যম ব্যবহার করে ভাষার বিষয়ে ধারণা নিতে পারেন। সাধারণ সম্পাদক নয়ন কুমার দে জানান, কোরিয়ায় আসার আগে সব ধরনের দুশ্চিন্তা মাথা থেকে সরিয়ে মনোযোগের সঙ্গে কোম্পানিতে কাজ করার পরিকল্পনা নিয়ে আসেন। আর যেকোনো সমস্যায় ইপিএস বাংলা কমিউনিটি ইন কোরিয়ার প্রতিটি সদস্য আপনাদের পাশে থাকবে।
শ্রমবাজার প্রসারের পাশাপাশি দক্ষিণ কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষায় ব্যাপক আগ্রহের ফলে বাংলাদেশীদের আসা বৃদ্ধি পাচ্ছে। প্রদেশগুলোতে প্রবাসী বাংলাদেশীরা একে অন্যের সহযোগিতায় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছে। সেই আলোকে আগামী দিনে ইপিএস বাংলা কমিউনিটি ইন কোরিয়ার মতো সামাজিক সংগঠনগুলোর ধারাবাহিক সহযোগিতার ফলে শ্রমিক-শিক্ষার্থী মিলে দক্ষিণ কোরিয়ার বুকে বাংলাদেশকে উচ্চ আসনে নিয়ে যাবে। আর উভয়ের মিলনমেলায় অতীতের মতো আগামীতেও গড়ে তুলবে লাল-সবুজের পতাকার বাংলাদেশের সম্প্রীতির মিলনমেলা। সেই প্রত্যাশাই দক্ষিণ কোরিয়ায় বসবাসরত সব প্রবাসী বাংলাদেশীর।
শামছুল আলম: দক্ষিণ কোরিয়া প্রবাসী





