দক্ষিণ
কোরিয়ায় বাংলাদেশীদের
সংখ্যা
আমার জানা মতে ১৯৯০ সালে বা তার আশপাশের সময় থেকে বাংলাদেশীরা কোরিয়ায় আসতে শুরু করে। বেসরকারিভাবে ব্যবসাজনিত কাজের উদ্দেশ্যে প্রবাসী শ্রমিকরা কোরিয়ায় পাড়ি জমান। এরপর ধীরে ধীরে সেখানে বাংলাদেশীদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। যখন তারা এখানে সেটেল অবস্থায় চলে আসেন, তখন তারা তাদের পরিবার-পরিজনও নিয়ে আসতে শুরু করে। এরপর ধীরে ধীরে বাংলাদেশী শিক্ষার্থীরাও কোরিয়ায় উচ্চশিক্ষার জন্য আসতে থাকে। ২০১৮ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী দক্ষিণ কোরিয়ায় মোট বাংলাদেশী আছেন ১৬ হাজারের মতো। এর মধ্যে ১০ হাজার ৫০০ জন সরকারিভাবে কোরিয়ায় আছেন। ২০০৮ সাল থেকে বাংলাদেশ সরকারের অধীনে অনেকে কোরিয়ায় আসা শুরু করেন। বর্তমানে এটার কোনো সমীক্ষা নেই, তবে আমার জানা মতে ২০২২ সালে প্রায় ২৪ থেকে ২৫ হাজারের মতো বাংলাদেশী এখানে আছেন। তার মধ্যে ব্যবসায়ী, ছাত্র-ছাত্রীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক, শিক্ষক হিসেবেও অনেকেই আছেন। তবে কোন এলাকাজুড়ে বাংলাদেশীরা বেশি বসবাস করেন এটা বলা সম্ভব হচ্ছে না। কারণ বাংলাদেশীরা কোরিয়াজুড়েই বিভিন্ন প্রভিন্সে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছেন। এখানে তারা তাদের কর্মক্ষেত্রে সফলতার সঙ্গেই অবস্থান করছেন।
দক্ষিণ
কোরিয়ায় বাংলা
ভাষা চর্চার
সুযোগ
বাংলা ভাষার চর্চা সত্যিকার অর্থে তেমন একটা ছিল না। সবারই ইচ্ছা ছিল তাদের সন্তানদের বাংলা ভাষা শেখানোর, যেন এর চর্চা হয়। বাংলা ভাষার সংস্কৃতি যেন প্রবাসীদের সন্তানদের দেয়া যায়। এর আগে এসব সম্ভব হয়নি। ২০২২ সালে দক্ষিণ কোরিয়ায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেই স্কুলের নাম বাংলাদেশ কমিউনিটি স্কুল। এখানে শিশুরা ১ সেপ্টেম্বর থেকে অনলাইনে ক্লাস শুরু করেছে। তাদের প্রি স্কুলিং করানো হচ্ছে। এটা মূলত অনলাইনভিত্তিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। পরবর্তী সময়ে হয়তো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থায় রূপান্তর করা হবে। শিশুরা এখানে বাংলা ভাষা শিখবে, তাছাড়া বাংলা ভাষার সংস্কৃতি ও বাংলা ভাষা সম্পর্কে আরো ভালোভাবে এখানে জানতে পারবে। এটাকে বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষার যে কারিকুলাম সেভাবে একসঙ্গে চালানোর লক্ষ্য আছে। আমরা সে লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছি।
বাংলাদেশীদের
কমিউনিটি লাইফ
যেহেতু পুরো কোরিয়ায়ই বাংলাদেশীরা ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে। হয়তো নির্দিষ্ট কোনো প্লাটফর্ম নেই, যেখানে সবাই মিলিত হতে পারে। তবে বিভিন্ন রকম ছোট ছোট কমিউনিটি আছে। যেমন ছাত্রদের আলাদা কমিউনিটি আছে। প্রবাসীদের আলাদা কমিউনিটি আছে। এভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনেরও আলাদা কমিউনিটি আছে। তাছাড়া বাংলাদেশীরা যেখানে যেখানে অবস্থান করছেন সেখানেও ছোট ছোট কমিউনিটি আছে। যেহেতু সবাই ব্যস্ত থাকেন, সেহেতু বিভিন্ন বন্ধের দিনে তারা একসঙ্গে মিলিত হয়ে খাওয়া-দাওয়া, ঘোরাফেরা এসব করে থাকেন। এভাবেই বাংলাদেশের লোকজন কোরিয়ায় তাদের জীবনযাপন করছেন।
স্থানীয়দের
সঙ্গে বাংলাদেশীদের
সম্পর্ক
এটা একটা কঠিন প্রশ্নই বলতে হবে। ভালো-খারাপ দুই ধরনেরই অভিজ্ঞতা আছে সবার। কেউ কেউ খুব ভালো ব্যবহার করেন। আবার কারো কারো একটু খারাপ অভিজ্ঞতা আছে। আমি মনে করি, বাংলাদেশীরা যে দেশেই থাকুক এমন ছোটখাটো সমস্যা থাকে। কিছু বৈষম্য থাকে। কোরিয়ায় সবচেয়ে বড় সমস্যা এখানকার ভাষা। এখানকার ভাষা পুরোই ভিন্ন। এ ভাষাটা যতদিন বাংলাদেশীরা রপ্ত করতে না পারবে, ততদিন কোরিয়ানদের সঙ্গে মেশা কষ্ট হয়ে যায়। সাধারণ লোকজন ইংরেজিটাও ভালোভাবে না জানার কারণে কোরিয়ান স্থানীয়দের সঙ্গে মেলামেশা বা তাদের সঙ্গে সম্পর্কটা গড়ে ওঠে না। বাংলাদেশীরা অনেকেই এখন কোরিয়ান ভাষায় পারদর্শী। তাদের সঙ্গে কোরিয়ানদের সম্পর্ক খুবই ভালো। আমি যেহেতু একাডেমিয়া লাইনে আছি এখানে কোরিয়ান যারা আছেন তারা বেশ শিক্ষিত। তারা বিদেশীদের সঙ্গে খুব ভালোভাবেই মেশে। তেমন কোনো সমস্যা হয় না। যেহেতু ভাষার কোনো সমস্যা এখানে নেই। ইংরেজিতেই কথাবার্তা বলা যায়। তবে ভাষা না জানা থাকার কারণে তাদের সঙ্গে খুব ক্লোজলি মনের ভাব প্রকাশ করা যায় না।
স্থানীয়
রাজনীতি/অর্থনীতিতে
বাংলাদেশীদের অবস্থান
এখন পর্যন্ত কেউ এখানের স্থানীয় রাজনীতিতে সংযুক্ত হতে পারেননি। তবে অদূর ভবিষ্যতে তারা সে প্রক্রিয়ায় আছেন। কেউ কেউ হয়তো এখানকার রাজনীতিতে শিগগিরই যুক্ত হবেন বলে আমি মনে করছি। আর অর্থনীতিতে অবদান অবশ্যই তৈরি করেছেন বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা। এখানে অনেকেই কোরিয়ান নাগরিকত্ব নিয়ে সফলভাবেই তাদের ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। এখানে বাংলাদেশীরা বিভিন্ন রকমের কোম্পানিও প্রতিষ্ঠা করেছেন। আবার হালাল ফুডের যে ব্যবসা সেটাও অনেক বেশি এখানে চোখে পড়ে। প্রতিটি শহরেই অন্তত একটা করে হালাল খাবারের দোকান রয়েছে। এসব দোকানে হালাল খাবার যেমন গরুর মাংস, মুরগির মাংস, খাসির মাংসসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়া যায়। এছাড়া ট্রাভেল এজেন্সির সঙ্গে অনেক বাংলাদেশী যুক্ত আছেন। আর অনেকের রেস্টুরেন্ট বিজনেসও রয়েছে। শিক্ষা-দীক্ষায়ও বাংলাদেশীরা ভালো অবদান রাখছেন। এখানে যারা গবেষক আছেন তারাও নিজেদের ভালো অবস্থান তৈরি করেছেন।
দক্ষিণ
কোরিয়ায় আমার
জার্নি
আসলে এটা একটা মিশ্র অনুভূতি। ভালো-খারাপ দুটোই আছে। নিজের মাতৃভূমি ছেড়ে এসে অন্য দেশে অবস্থান নেয়াটা খুবই কষ্টসাধ্য ব্যাপার। মেনে নেয়াও একটু কষ্ট। তার পরও খারাপ অভিজ্ঞতাটাকে পাশে রেখে যদি বলি, আমি কোরিয়ায় আসি ২০১২ সালে। আমার মাস্টার্স ডিগ্রি করার জন্য। মাস্টার্স করার পর আমি এখানে পিএইচডিতে ভর্তি হই। ২০১৭ সালে পিএইচডি শেষ করি। এরপর এক বছর পোস্টডক্টরাল রিচার্স ফেলো হিসেবে কাজ করি এখানে। এরপর ২০১৮ সাল থেকে বর্তমান পর্যন্ত আমি যে ডিপার্টমেন্ট থেকে মাস্টার্স, পিএইচডি করেছি সে ডিপার্টমেন্টেই আমি এখন শিক্ষক হিসেবে আছি। আমি বর্তমানে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে ডিপার্টমেন্ট অব ফুড সায়েন্সে কর্মরত আছি।
বাংলাদেশী
অভিবাসীদের বিশেষ
স্বীকৃতি
বাংলাদেশীরা এখানে যেমন ব্যবসায়ীরা ও গবেষণার কাজে নিয়োজিত, তারা অবশ্যই তাদের কাজ ভালোভাবে সম্পন্ন করছেন। বাংলাদেশের গবেষকরা এখানে খুব ভালো ভালো প্রকাশনা করছেন এবং তারা অবশ্যই স্বীকৃতি পাচ্ছেন। তাদের কর্মক্ষেত্রে তারা সফল। আর আমাদের একাডেমিয়া লাইনের স্বীকৃতি হলো আমরা যে পাবলিকেশনগুলো করি সেগুলো জার্নালগুলোতে পাবলিশড করা। বাংলাদেশী গবেষকরা সে কাজটি সফলভাবেই করছেন এবং বিশ্বমানের জার্নালগুলো তারা পাবলিশড করে যাচ্ছেন, যা সারা বিশ্বের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করেই পাবলিশড করেন।
বাংলাদেশী
কমিউনিটির বিশেষ
দিক
কমিউনিটির বিশেষ দিকগুলো নিয়ে আমি বলতে পারি, এখানে একজন প্রবাসী আরেকজন প্রবাসীকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করে। তারা একে অপরের যেকোনো বিপদে-আপদে এগিয়ে আসে। উদাহরণস্বরূপ বাংলাদেশের কোনো প্রবাসী যদি মারাত্মকভাবে আহত হন কিংবা শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকেন। আর তার যদি চিকিৎসার ব্যয় বহন করার সক্ষমতা না থাকে তখন সব বাংলাদেশীই তার সাহায্যার্থে এগিয়ে আসেন। এছাড়া যদি কারো মৃত্যু ঘটে সে ক্ষেত্রেও বাংলাদেশীরা অর্থ সংগ্রহ করে মরদেহ দেশে পাঠানোর উদ্যোগ নেন। তবে গত দু-এক বছরে কোরিয়ায় অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস মরদেহগুলো হস্তান্তর করে। বাংলাদেশ সরকার যদি নানাভাবে আরো পাশে থাকে তাহলে বাঙালি কমিউনিটি আরো ভালো থাকবে বলে আমি বিশ্বাস করি।
ড. মো. ফুরকানুর রহমান মিজান: সহকারী অধ্যাপক, ডিপার্টমেন্ট অব ফুড সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি, চুং-আং ইউনিভার্সিটি, দক্ষিণ কোরিয়া





