১৯৮৪ সালের অক্টোবরে যখন জাপানে আসি জাপানি ভাষা ও সংস্কৃতির ছাত্র হিসেবে, তখন শতাধিক বাংলাদেশী জাপানে ছিল কি ছিল না। বাংলাদেশীদের ঢল নামে ১৯৮৮ সাল থেকে। আদম ব্যাপারীর মাধ্যমে প্রচুর তরুণ জাপানি ভাষার ছাত্র ও ট্যুরিস্ট হিসেবে প্রবেশ করে। এসেই কলকারখানা, গৃহনির্মাণ, রেস্টুরেন্ট ও পানশালায় অনুমোদন ছাড়াই কাজে লেগে পড়ে। তখন জাপান বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তি। কায়িক শ্রমিকের সুতীব্র সংকট। লাখ লাখ শ্রমিক দরকার। কিন্তু সরকার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করছে না। চায় দক্ষ, শিক্ষিত শ্রমিক ও প্রযুক্তিবিদ। ওদিকে অগণন কলকারখানার অবস্থা তথৈবচ। বাধ্য হয়ে অবৈধ লাখ লাখ বিদেশী শ্রমিককে নিয়োগ করছে মালিকরা গোপনে। পুলিশ মাঝেমধ্যে হামলা করে ধরে এবং স্বদেশে ফেরত পাঠায়। আবার লঘু অপরাধের কারণে মামলা ঠুকে দেয় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ। কিন্তু বিদেশীদের আসা বন্ধ নেই। তখন টোকিও, সাইতামা ও চিবা প্রদেশে ৩০ হাজারের বেশি বাংলাদেশী তরুণ। যাদের বড় একটি অংশ ভিসাহীন। ছাত্ররা বাসাবাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকলেও ভিসাহীন শ্রমিকরা একটি কক্ষে ১০-১২ জন গাদাগাদি করে বসবাস করছে। ভাষা জানে না কেউ। দিনে হাড়ভাঙা পরিশ্রম, রাতে মৃতপ্রায় ঘুম। ছুটির দিনে খোলা উদ্যানে পারস্পরিক কুশল বিনিময়, কাজের খবরাখবর আদান-প্রদান। নেই কোনো বিনোদন, আনন্দ-উৎসব, পত্রপত্রিকা, দোকানপাট। দু-তিনটি হালাল ফুড তথা মুদির দোকানে দ্রুত কেনাকাটা করেই ঘরে ফিরে যাওয়া পুলিশের ভয়ে। সর্বত্র সন্ত্রস্ত অবস্থা। কখন সাদা পোশাকধারী ইমিগ্রেশন পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায়! এই অস্থিরতার মধ্যেই দুটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে ১৯৯০ ও ৯১ সালে। একটি বঙ্গবন্ধু পরিষদ জাপান শাখা গঠন, অন্যটি জাপানে প্রথম মুদ্রিত বাংলা কাগজ মানচিত্র প্রকাশ। এরপর সমিতি গঠনের ও ম্যাগাজিন প্রকাশের হিড়িক পড়ে যায়।

শত ভয়ভীতি, ধরপাকড়, অভাব, সংকট, ভাষাজনিত সমস্যা কোনোটাই নতুন প্রজন্মকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি। জাতীয়তাবোধ, দেশপ্রেম ও সংস্কৃতির প্রবল টান প্রবাসীদের একটার পর একটা উদ্যোগ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে তোলে। তারই কিছু বয়ান এই প্রতিবেদন।

বাংলাদেশ সোসাইটি জাপান নামক একটি সংগঠনের ১৯৮৯-৯০ কার্যকরী পরিষদের সাংস্কৃতিক সম্পাদক হয়েছি। এটা কতিপয় এলিট বাংলাদেশী ১৯৭২ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বাংলাদেশ দূতাবাসের সহায়তায়। তাই এর পৃষ্ঠপোষক রাষ্ট্রদূত। যাদের ভিসা বা অনুমোদন আছে, তারাই এর সদস্য হতে পারে। সোসাইটি ও জাপান প্রবাসী চৌকস তরুণ শরীফ চৌধুরীর মধ্যে তর্ক-বিতর্ক, বোঝাপড়া চলছিল এ বিষয়ে। সিদ্ধান্ত হয় নির্বাচনের। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলে পরে বৈধ-অবৈধ বাংলাদেশীর ভোটে আমরা জয়ী হই। নতুন কার্যকরী পরিষদের প্রেসিডেন্ট হন শরীফ চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক অজিতকুমার বড়ুয়া। শরীফ চৌধুরী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের টোকিওস্থ জেনারেল সেলস এজেন্ট। এ বছরই অভিষেক অনুষ্ঠান ও মহান বিজয় দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ থেকে জাপানে আসেন কণ্ঠশিল্পী সৈয়দ আবদুল হাদির নেতৃত্বে নাশিদ কামাল, শাম্মী আখতার, শাকিলা জাফর, আলাউদ্দিন আলী, নৃত্যশিল্পী শিপ্রা দাস প্রমুখ। টোকিওর সুবিশাল সেনদাগায়া কুমিন কাইকান মিলনায়তনে তিল ধারণের ঠাঁই ছিল না।

সোসাইটিতে খেয়াল করলাম, কেউ বঙ্গবন্ধুর নাম মুখে নেন না!
অগ্রজ প্রবাসীরাও না! দূতাবাসে কর্মরত বঙ্গবন্ধুর একজন আত্মস্বীকৃত খুনি লে. কর্নেল (অব.) এএম রাশেদ চৌধুরী। একদিন সস্ত্রীক দেখলাম তাকে শিবুইয়া শহরে অবস্থিত রয়েল বেঙ্গল রেস্টুরেন্টে। দেখে রক্ত গরম হয়ে গেল!

পরের বছরও কার্যকরী পরিষদের নির্বাচনে জয়ী হলাম প্রকাশনা সম্পাদক হিসেবে। আবার অভিষেক অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে এলেন শাহনাজ রহমতুল্লাহ, সুবর্ণা মুস্তাফা, হুমায়ুন ফরীদি প্রমুখ। সেদিন রাষ্ট্রদূতসহ অনেকেই বক্তৃতা করলেন, দেশাত্মবোধক গান হলো, কিন্তু কেউ ভুলেও বঙ্গবন্ধুর কথা বললেন না! আশ্চর্য ব্যাপার! প্রচণ্ড রাগ ও ক্ষোভে জ্বলে উঠলাম। সংগঠিত করলাম আমিনুল ইসলাম খান, শামসুল আলম মেহমুদ, কাজী মাহফুজুল হক লাল, টিএইচ তসলিমসহ আরো অনেক তরুণকে। বন্ধু রফিকুল আলম দূতাবাসের প্রথম সচিব মো. মিজারুল কায়েসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। তিনি ঢাকার বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। তার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু পরিষদ গঠন নিয়ে আলোচনা করলাম। তিনি অভয় দিলেন।

১৯৯০ সালে ঘটনাক্রমে সোসাইটি ছেড়ে দিয়ে বঙ্গবন্ধু পরিষদ জাপান শাখা গঠনের উদ্যোগ গ্রহণ করি। কাজী লালকে আহ্বায়ক করে একটি কমিটি গঠিত হয়। তাকে ঢাকায় পাঠানো হয় অনুমোদন লাভের জন্য। কাজী লাল আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। অনুমোদন পাওয়া গেলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে গবেষণারত ডা. সরদার নাঈমকে সভাপতি ও মহিউদ্দিন আহমেদ মানিককে সাধারণ সম্পাদক করে বঙ্গবন্ধু পরিষদের শাখা গঠিত হয়। পরিষদের প্যাড, খাম, চাঁদার বই, প্রচারপত্র ইত্যাদির ডিজাইন করি আমিই। মানিক ছাপার ব্যবস্থা করে। আমাদের কাজ শুরু হয় সদস্য সংগ্রহ ও বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচারের বাস্তবায়ন নিয়ে। এ সময় বাংলাদেশে স্বৈরাচারী শাসক এরশাদবিরোধী আন্দোলন তুঙ্গে। আমরাও টোকিওর য়োয়োগি উদ্যানে বিক্ষোভ প্রদর্শন করি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করি। সিদ্ধান্ত হয় ১৯৯১ সালে জাপানে জাতীয় শোক দিবস উদযাপন করা হবে।

১৯৯১ সালের মার্চ মাসে আমার স্বপ্ন পরীক্ষামূলক কাগজ সাদা-কালো ট্যাবলয়েড ‘মানচিত্র’ অ্যাপল ম্যাকিনটোস কম্পিউটারে প্রসেস করে প্রকাশ করি। মানচিত্র প্রকাশের পর ব্যাপক সাড়া পড়ে যায় বাংলাদেশী কমিউনিটি ছাড়িয়ে জাপানের গণমাধ্যমেও। কারণ সে সময় না ছিল বাংলা অক্ষর, না ছিল প্রেস, কিন্তু জাপানে আধুনিক অফসেট প্রিন্টিং মেশিনে মুদ্রিত ঝকঝকে পত্রিকা দেখে অভিভূত, যারাই দেখেছেন! ২০০০ কপি সোসাইটির স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে বিলি করা হলে কাড়াকাড়ি পড়ে যায়। সেই যে শুরু হলো পত্রিকা প্রকাশের ধুম, চলল ২০০০ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত।

যথারীতি বিপুল উৎসাহ ও উদ্দীপনাসহ জাপানে প্রথম জাতীয় শোক দিবস উদযাপিত হলো টোকিওয়। লোকে-লোকারণ্য বিশাল মিলনায়তন। আমন্ত্রিত হয়ে এলেন বিচারপতি কেএম সোবহান ও কণ্ঠশিল্পী আবদুল জব্বার। টানা দুই ঘণ্টার অনুষ্ঠান পাগলপারা করে দিল প্রবাসীদের। অতিদ্রুত ইনডেমনিটি বিল বাতিল এবং বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করা হলো সমবেত কণ্ঠে। এ অনুষ্ঠানের প্রচারপত্র, চাঁদার রসিদ, ঘোষণাপত্র সবই আমি ডিজাইন করেছিলাম। শুধু তাই নয়, অসুস্থতার কারণে ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব ও অনুষ্ঠান পরিচালনাও করতে হয়েছিল। মানচিত্রের তৃতীয় সংখ্যায় এ ঘটনার সংবাদ ও প্রতিবেদন প্রকাশ করলাম। যা আজকে ইতিহাস। বঙ্গবন্ধু পরিষদ গঠনের পর আওয়ামী লীগ গঠিত হয় কাজী মাহফুজুল হক লাল এবং ছালেহ্ মোহাম্মদ আরিফকে সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক করে। কিন্তু সেখানেও মতবিরোধ, নেতৃত্বের কোন্দল দেখা দেয়। দুই ভাগ হয়ে যায় আওয়ামী লীগ জাপান শাখা কাজী লাল ও টিএইচ তসলিমের মধ্যে। নেতৃত্ব নিয়ে, অনুষ্ঠান নিয়ে দুপক্ষের মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিরোধ লেগেই ছিল। পুলিশি ঝামেলা পর্যন্ত হয়েছে! পরবর্তীকালে আওয়ামী যুবলীগ গঠিত হয় কফিলউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বে। বঙ্গবন্ধু পরিষদ জাপান শাখা এখন একটি এনপিও ও তত্পর। বঙ্গবন্ধু পরিষদ বিভিন্ন সময় আমন্ত্রণ করেছে জননেতা আবদুর রাজ্জাক, ড. কবীর চৌধুরী, গাজীউল হক, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত প্রমুখকে। আওয়ামী লীগের উদ্যোগে আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী নির্মিত ‘পলাশী থেকে ধানমন্ডি’ চলচ্চিত্রটি প্রদর্শন একটি উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

জিয়া পরিষদ, বিএনপি জাপান শাখা বঙ্গবন্ধু পরিষদ গঠনের পর পরই গঠিত হয় এবং পূর্ণোদ্যমে বাংলাদেশের রাজনীতি প্রবাসী বাংলাদেশীদের প্রধান এনার্জি হয়ে দাঁড়ায়। গঠিত হয় জাতীয়তাবাদী যুবদলের শাখাও। জাতীয় পার্টিই বা বাদ যাবে কেন? জাতীয় পার্টির শাখাও জাপানে গঠন করেন একদল তরুণ বাংলাদেশী। কিন্তু প্রত্যেকটি দলেই অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মতবিরোধ ছিল, এখনো আছে। তবে রাজনীতির চরম রমরমা অবস্থা জাপানে এখন নেই। একসময় প্রতি ছুটির দিনে কোনো না কোনো দলের সভা অনুষ্ঠিত হতোই। আবার একই ভবনের পাশাপাশি কক্ষে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের সভা হলেও অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি কোনোদিন। কারণ পরমতসহিষ্ণু, শান্তিবাদী জাপানি সমাজের প্রভাব। জাপানে কর্মজীবনের কঠিন বাস্তবতা ও ব্যস্ততায় বাংলাদেশীরাও অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে। কর্মক্লান্তি দূরীকরণে ও স্বাদেশিকতার টানে এসবের বাইরেও নানা ধরনের সংগঠন জাপানে এ পর্যন্ত গড়ে উঠেছে এবং বন্ধ হয়ে গিয়েছে। যেমন বাংলাদেশ ফিল্ম মুভমেন্ট, জয় বাংলা সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী, মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি সংসদ, মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতার রজতজয়ন্তী পরিষদ, বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন, বাংলাদেশ বুড্ডিস্ট অ্যাসোসিয়েশন, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, প্রথম আলো বন্ধুসভা ইত্যাদি। করোনার কারণে দুই বছর ধরে কর্মকাণ্ড অনেকটাই স্থবির।

জেলা ও আঞ্চলিক সংগঠন গঠনের প্রবল ঝোঁক দেখা দেয় পুরো ৯০-এর দশক জুড়ে। প্রথম বৃহত্তর কুমিল্লা সোসাইটি অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের কোন্দলে ভেস্তে যায় দ্রুত। এরপর বিক্রমপুর কল্যাণ সংঘ, ঢাকা সোসাইটি, নরসিংদী সোসাইটি, ময়মনসিংহ সোসাইটি, বরিশাল সোসাইটি, নোয়াখালী সোসাইটি, চট্টগ্রাম সোসাইটি, খুলনা সোসাইটি ইত্যাদি।

পাশাপাশি বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন চিন্তা ও জাপান-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগের প্রচেষ্টাও শুরু হয় নব্বইয়ের মাঝামাঝি থেকে। বিইডিএ তথা বাংলাদেশ ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অ্যাসোসিয়েশন গঠিত হয়েছিল রফিকুল আলমের নেতৃত্বে। বাংলাদেশে জাপানি প্রযুক্তি সম্প্রসারণ ও বিনিয়োগ বিষয়ক একাধিক সেমিনারের আয়োজন করা হয় টোকিও ও ঢাকায়।

বাংলাদেশী হিসেবে প্রথম টেলিকমিউনিকেশনস ও প্রবাসী টিভি সম্প্রচারের ক্ষেত্রে ওয়াইসিসি তথা ইয়োর চয়েজ করপোরেশনের উদ্যোক্তা মাসুদ আহমেদ, দেশ মিনি সুপার স্টোরের কর্ণধার মোতালেব শাহ আইউব, ঢাকা ক্লাবের কর্ণধার এস কে শাহেদ রুমী, ইয়াকুব নবী, দুলাল চৌধুরী প্রমুখ মিলে বাংলাদেশ ব্যবসায়ী সমিতি গঠন করেছিলেন ১৯৯৫ সালে। বর্তমানে বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ইন জাপান (বিসিসিআইজে) বেশ তত্পর। জাপানে অবস্থিত নতুন প্রজন্মের ব্যবসায়ীরা এ সংগঠনকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। জাপানি রিকন্ডিশন্ড গাড়ির ব্যবসায়ীরাই মূলত এর উদ্যোক্তা। বর্তমানে সংস্থার সভাপতি বাদল চাকলাদার ও সাধারণ সম্পাদক হাকিম মো. নাসিরুল।

৯০-এর দশকজুড়ে প্রচুর বাংলাদেশী রেস্টুরেন্ট ও শর্ট বার গড়ে উঠেছিল। ৭০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে এ ব্যবসার সূচনাকারী হচ্ছে রয়েল বেঙ্গল রেস্টুরেন্ট। পরবর্তীকালে ঢাকা ক্লাব, আল্পনা, সুন্দরবন, ঢাকা রেস্টুরেন্ট, অরুণস বার, বিনোদন প্রভৃতি বেশ সুনাম অর্জন করেছিল।

বিগত ৩৫-৪০ বছরে অনেক বাংলাদেশী যেমন জাপানে এসে থিতু হয়েছেন বিয়েশাদি, ব্যবসা, চাকরি, শিক্ষকতা, গবেষণা প্রভৃতি ক্ষেত্রে, তেমনি ভিসা না থাকার কারণে বহুজনকে ফিরে যেতেও হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে হাজার বিশেক বাংলাদেশী প্রবাসী সমাজকে চমকপ্রদ, বৈচিত্র্যময় ও সমৃদ্ধ করেছেন। সেসব কর্মকাণ্ড অত্যন্ত উজ্জ্বল ইতিহাস। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পথিকৃৎও বটে! বিশেষ করে সংগীত, শিল্পকলা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, প্রকাশনা, শিক্ষাক্ষেত্রে অনেক উদাহরণ রয়েছে। ১৯৯১-২০০২ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত মানচিত্র কাগজের অসংখ্য সংখ্যাই এর সুস্পষ্ট প্রমাণ।

প্রথমেই আসা যাক উত্তরণ কালাচারাল গ্রুপ জাপান, যা গঠিত হয়েছিল ১৯৮৮ সালে। সংগীতপাগল খন্দকার ফজলুল হক রতনের নেতৃত্বে চৌধুরী টিপু, বরকত উল্লাহ, চৌধুরী সাওয়ার মান্না, নূর মোহম্মদ, কাজী কামাল, সঞ্জয় দত্ত, মোহম্মদ এ নাসিম, খোকন, হাসান, নিয়াজ আহমেদ জুয়েল, যেরোম গোমেজ, বিমান পোদ্দার, কণ্ঠশিল্পী ববিতা পোদ্দার, মো. নাজিমউদ্দিন, বিশ্বজিৎ দত্ত বাপ্পা, নীলাঞ্জনা দত্ত ছুটি, শরাফুল ইসলাম, তানিয়া মিথুন প্রমুখের মেধাদীপ্ত নান্দনিক উপস্থাপনায় ঋদ্ধ বহু অনুষ্ঠান এ পর্যন্ত প্রবাসীদের প্রচুর আনন্দদান করেছে। ‘উত্তরণ’ এখনো জনপ্রিয়তার শীর্ষে। এর অনুষ্ঠান পরিকল্পনা, উপস্থাপনা অভিনব। আমাদের সৌভাগ্য, জাপানে দুজন রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী রয়েছেন—নীলাঞ্জনা দত্ত, তিনি বিশ্বভারতীর ও শাম্মী বাবলী রবীন্দ্রভারতীর প্রাক্তন ছাত্রী। শাম্মীর অ্যালবামও প্রকাশ হয়েছে কলকাতা থেকে ২০১৯ সালে ‘নীরব আশা’ নামে। উত্তরণ কর্তৃক প্রতি বছর রবীন্দ্র-নজরুল-লালন তথা ‘রনলা’ সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়, যা রুচিবোধসম্পন্ন, শ্রুতিমধুর ও নান্দনিক আয়োজন।

উত্তরণের পর স্বরলিপি কালচারাল একাডেমি গঠন করেছিল সংগীতপ্রিয় এসকে শাহেদ রুমী ১৯৯২ সালে। সহযোগী ছিলেন মুন্সী কে আজাদ, রেণু আজাদ, ড. মিনহাজ আহমেদ, শিউলী নাকাগাওয়া প্রমুখ। মূলত সংগীতচর্চা ও বাংলা ভাষা শিশুদের শেখানো ছিল উদ্দেশ্য। কিছুদিন বাংলা ভাষার ক্লাসও হয়েছিল। সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও ছিল চিত্তাকর্ষক গানে, আবৃত্তিতে ও মঞ্চাভিনয়ে। প্রতিষ্ঠানের রুবেল হাই কামরুল, মৌসুমী মিনহাজ, বহ্নি আহমেদ, তাহমিনা জাদিদ ডেইজী, ঝুমা মাহফুজ প্রমুখ মাতিয়ে রাখতেন গান, আবৃত্তি, উপস্থাপনায়।

কিন্তু এ বছরই একাডেমি ছেড়ে শাহেদ রুমী তার সতীর্থদের নিয়ে গঠন করেন শিল্পী ফোরাম। জাপানি নারীর সঙ্গে বিবাহিত রুমী আসলেই ছিল মেধাবী এক তরুণ। তার ঢাকা ক্লাব রেস্টুরেন্ট বনাম মিউজিক বার ছিল জাপানি তরুণ-তরুণীদের মিলনক্ষেত্র। আমেরিকা থেকে আগত সে কালচারে বাঙালি তরুণরাও পিছিয়ে ছিল না। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্য, অনাকাঙ্ক্ষিত এক ঘটনার কারণে তাকে জাপান ছাড়তে হয় ১৯৯৬ সালে।

দোয়েল সাংস্কৃতিক গোষ্ঠী ১৯৯২ সালে কবি ও সাংস্কৃতিক কর্মী মোতালেব শাহ আইউব প্রিন্সের উদ্যোগে গঠিত হয়েছিল। বেশকিছু বড় মাপের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেছিল দোয়েল। পুরস্কারও পেয়েছিল সোনি করপোরেশন থেকে। দোয়েল টিকিটের বিনিময়ে অনুষ্ঠান করত এবং সেই অর্থ দিয়ে বিক্রমপুরের রাঢ়িখালে বিজ্ঞানী জগদীশচন্দ্র বসুর জন্মস্থানে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করার পর কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দেয়া হয়।

উল্লেখ্য, ৯০-এর দশকে প্রবাসীরা একাধিক বড় মাপের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান করেছেন, যাতে আমন্ত্রিত হয়ে এসেছিলেন বাংলাদেশ ও ভারতের অনেক জনপ্রিয় অভিনয়শিল্পী, জাদুশিল্পী ও কণ্ঠশিল্পী। যেমন জুয়েল আইচ, হানিফ সংকেত, রুনা লায়লা, বাপ্পি লাহিড়ী, কুমার বিশ্বজিৎ, ফকির আলমগীর, মান্না দে, পঙ্কজ উদাস, মুনমুন সেন, বিপাশা হায়াত, রাইসুল ইসলাম আসাদ, আইউব বাচ্চু প্রমুখ। অনেক খ্যাতিমান কবি, কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক, সাংবাদিক ও আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বকে সংবর্ধনা প্রদান করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য কিছু নাম যেমন নোবেল বিজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূস, আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী, ফখরুজ্জামান চৌধুরী, ড. নওয়াজেশ আহমেদ, দিলারা জামান, ইমদাদুল হক মিলন, গোলাম মোর্তোজা, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, শ্যামল দত্ত, মতিউর রহমান, তানভীর মোকাম্মেল, সৈয়দ শামসুল হক, আনিসুল হক, সাজ্জাদ শরিফ, শিবনারায়ণ রায়, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, শাইখ সিরাজ, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা প্রমুখ।

মাচিয়ার দেশ এন্টারপ্রাইজ তথা দেশ মানে টোকিওর মাচিয়া শহরে অবস্থিত অতি চেনা মুখ প্রিন্সের মিনি সুপার স্টোরস চালু হয়েছিল ১৯৯৪ সালে। একটি চমত্কার রুচিশীল প্রতিষ্ঠান ছিল এই দেশ। দেশ ও মাচিয়া শহর হয়ে উঠেছিল দীর্ঘকাল মিনি বাংলাদেশ। দেশের কাছেই মাচিয়া বুনকা সেন্টার এবং মুভ হলে প্রতি সপ্তাহান্তে বিভিন্ন সংগঠনের সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান লেগেই থাকত। অনুষ্ঠান শেষে দেশ থেকে সদাই কিনে, আড্ডা দিয়ে ঘরে ফেরা একটি রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

মাচিয়ার দেশ আরো তিনটি কারণে প্রিয় ছিল। প্রথমত, জাপানে প্রথম বাংলা গ্রন্থবিতানের পথিকৃৎ প্রিন্স। দ্বিতীয়ত, আওয়ামী লীগ জাপান শাখার সহসভাপতি, ফলে গুরুত্বপূর্ণ সভা দেশেই হতো। তৃতীয়ত, কবি, লেখক, সাংবাদিক, সম্পাদক, বোদ্ধা পাঠক ও কণ্ঠশিল্পীদের জন্য নৈশ আড্ডা ও পানাহারের স্বর্গ ছিল দেশ। প্রবাসে স্বদেশের মুখ সেই দেশ ১৯৯৮ সালে বন্ধ হয়ে গেল! সরকারের কঠোর এক অধ্যাদেশে ভীত হয়ে হাজার হাজার ভিসাহীন বিদেশী জাপান ত্যাগ করে। বাংলাদেশীদের একটি বড় অংশ চলে যায়, যাদের মধ্যে কবি, লেখক, সাংবাদিক ও পাঠক কম ছিল না! স্বাভাবিকভাবেই ক্রেতার সংখ্যা কমে যাওয়ায় প্রিন্সের দেশও গুটিয়ে ফেলতে হয়।

‘আড্ডা টোকিও’ জাপানে কবি, লেখক ও সাংবাদিকদের লেখা, পাঠ ও সৃজনশীল আড্ডাবিষয়ক সংগঠন, যা ১৯৯৪ সালে মাচিয়া শহরের এক পানশালায় বসে গঠন করেছিলাম। সেদিন উপস্থিত ছিলাম বাবলু রহমান, বিপুলকৃষ্ণ দাস, পিআর প্ল্যাসিড, সজল বড়ুয়া, আরিফুর রহমান ববি, প্রিন্স ও আমি। ব্যস্ততম জাপানে মূল্যবান সময়টা যেন সুশৃঙ্খল ও অর্থকরী করে তোলা যায় নান্দনিকভাবে—আমার এই প্রস্তাব থেকে জন্ম হয় ‘আড্ডা টোকিও: একটি সৃজনশীল পাঠচক্র’। প্রচলিত কাঠামোর বাইরে একজন পরিচালক, একজন পরিকল্পক, একজন প্রচারক, একজন হিসাবরক্ষক ও বাকি সদস্য এ পদ্ধতিতে পরিচালক প্রিন্স, পরিকল্পক প্রবীর, সজল প্রচারক, ববি হিসাবরক্ষক। রাতারাতি জনপ্রিয় হয়ে গেল আড্ডা টোকিও। ২০০৩ সালে জাপানে প্রথম বাংলা কবিতা উৎসবের আয়োজন করা হয়। বিশেষ অতিথি হয়ে এলেন সকন্যা কবি নির্মলেন্দু গুণ। একদিনব্যাপী জমজমাট আয়োজনে তিনজন জাপানি খ্যাতিমান লেখক ও গবেষক অধ্যাপক ড. পেমা গিয়ালপো, কম্পিউটার নির্ভর ব্যাংক-প্রযুক্তিবিদ ওওত্সুকা তোশিআকি এবং পরিবেশবাদী কর্মী, রাজনীতিবিদ, গবেষক ও প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী জেনারেল তোজো হিদেকির পৌত্রী তোজো ইউকো অংশগ্রহণ করে অনুষ্ঠানটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছিলেন। তারা সবাই বাঙালি ও বাংলাদেশের পরম ভক্ত, রবীন্দ্রনাথ, নেতাজি, টোকিও মিলিটারি ট্রাইব্যুনাল খ্যাত বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল ও বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের কারণে। কবি নির্মলেন্দু গুণ অত্যন্ত আনন্দিত হয়েছিলেন। জাপানি রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী মাদাম কাম্বে তোমোকো ও নীলাঞ্জনা দত্ত ছুটি অনবদ্য রবীন্দ্রসংগীতে আপ্লুত করেন দর্শক ও শ্রোতাকে।

২০০৩ সালেই আমার ১৫টি রাজনৈতিক ছড়া নিয়ে ‘ছড়া প্রদর্শনী’ অনুষ্ঠিত হয়। এ রকম প্রচেষ্টা বাংলা সংস্কৃতিতে এই প্রথম। এরপর ২০০৬ সালে জাপান-বাংলা কবিতা উৎসব, তাতে আমন্ত্রিত অতিথি ছিলেন কবি ও সাংবাদিক সমুদ্র গুপ্ত। বাংলাদেশী ও জাপানি কবিরা কবিতা পাঠ করেন। বিশেষ আকর্ষণ ছিল মঞ্চে সমুদ্র গুপ্ত ও মোতালেব শাহ আইউবের ১ ঘণ্টাব্যাপী তাত্ক্ষণিক কবিতা রচনা ও আবৃত্তি। সেটাও আজ ইতিহাস। প্রবাসী গুণী শিল্পী যেরোম গোমেজকে সম্মাননা প্রদান করা হয়। অনিয়মিত ‘আড্ডা টোকিও’ নামে ট্যাবলয়েড বুলেটিনও প্রকাশ করেছে আড্ডা টোকিও।

বাংলাদেশ সাংবাদিক-লেখক ফোরাম গঠিত হয় ১৯৯৮ সালে। প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন এনএইচকে বেতারের বাংলা সম্প্রচার বিভাগে কর্মরত সাংবাদিক সুমন রহমান ও সাধারণ সম্পাদক প্রবীর বিকাশ সরকার। একমাত্র উপদেষ্টা সাংবাদিক ও অধ্যাপক মনজুরুল হক। প্রতি মাসে কবি ও সাহিত্যিকদের লেখা পাঠ ও আলোচনা হতো। জাতীয় দিবস উপলক্ষেও হতো। খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার তানভীর মোকাম্মেল নির্মিত চলচ্চিত্রও প্রদর্শিত হয়েছে। সংবর্ধনা জানানো হয়েছে একাধিক ব্যক্তিত্বকে। কিন্তু কোনো সাহিত্য সংকলন বা স্মরণিকা প্রকাশ করতে পারেনি। উপরন্তু, ২০১৯ সালে টোকিওয় বইমেলার আয়োজনকে কেন্দ্র করে সংগঠনটিতে বিভক্তি দেখা দেয়।

টোকিও বৈশাখী মেলা জাপানে বাংলাদেশীদের প্রাণের উৎসব, ২০০১ সাল থেকে বিপুল উৎসাহ-উদ্দীপনা ও আনন্দ-বিনোদনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে ইকেবুকুরো নিশিগুচি পার্কে। নেতৃত্ব দিচ্ছেন ডা. শেখ আলীমুজ্জামান, সুখেন ব্রহ্ম, ছালেহ মোহাম্মদ আরিফ, মো. জসীমউদ্দিন প্রমুখ। যৌথ উদ্যোক্তা তোশিমা-ওয়ার্ড, টোকিও ও জাপান-বাংলাদেশ সোসাইটি। সারা দিনব্যাপী বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে জাপানি ও বিদেশীরাও অংশগ্রহণ করে কবিতা আবৃত্তি, বাংলা গান ও নৃত্য পরিবেশ করেন। রয়েছে শিশুদের জন্য বিশেষ আয়োজন। উল্লেখ্য, এ পার্কেই ২০০৫ সালে স্থাপন করা হয়েছে ভাষা আন্দোলনের প্রতীক শহীদ মিনার।

প্রবাস প্রজন্ম জাপান সংগঠনটি শিশুদের নিয়েই অনুষ্ঠান করে থাকে। প্রতিষ্ঠাতা সুপরিচিত সাংবাদিক রাহমান মনি। কাজী ইনসান ও মুন্সী কে আজাদ সহযোগী। বাংলাদেশকে বর্তমান প্রজন্মের কাছে পরিচিত করার জন্যই এ আয়োজন। নিঃসন্দেহে একটি মহৎ উদ্যোগ। এ পর্যন্ত সুবীর নন্দী, সাদি মহম্মদ, রফিকুল আলম, আবিদা সুলতানা, সামিনা চৌধুরী, মুন্নী সাহা, ড. জাফর ইকবাল, রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, ড. ইয়াসমিন হক, ফাহমিদা নবী, বারী সিদ্দিকী, মুস্তফা মনোয়ার, ফরিদুর রেজা সাগর প্রমুখ প্রবাস প্রজন্ম সম্মাননায় ভূষিত হয়েছেন।

প্রবাসীদের গণমাধ্যম ক্ষেত্রে জাপান প্রবাসীরা উজ্জ্বল ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন। ১৯৯১ সালে হাতে লিখিত ফুজি জেরক্স কপিয়ারের সাহায্যে পাক্ষিক ‘সোচ্চার’ নামে আট পৃষ্ঠার এ-ফোর সাইজের কাগজ প্রকাশ করেছিল কয়েকজন তরুণ। সম্পাদক মাহবুবুর রহমান, নির্বাহী সম্পাদক মো. নাজিম। বেশ জনপ্রিয়তা পায় কাগজটি, কারণ বাংলাদেশ থেকে কোনো পত্রপত্রিকা জাপানে আসত না সে সময়। এ স্থানটি পূরণ করেছিল মাসিক মানচিত্র। এর পরই একটার পর একটা বাংলা কাগজ প্রকাশ হতে থাকে। ছাপা হয়ে আসে বাংলাদেশ থেকে। কমপক্ষে ২০টি ম্যাগাজিন প্রকাশ হয়েছিল। যেমন অবয়ব (সম্পাদক এমএইচ কবীর), বাংলার মুখ (অপু সারোয়ার), চেতনা (নূরুল আবেদীন), বিবেক (পরে বিবেকবার্তা, পিআর প্ল্যাসিড), সময় (গাজীউর রহমান চৌধুরী), মাকু (মশিউর রহমান পারভেজ), প্রবাহ (মুন্সী এ আলম), বক্তব্য (নূর হোসেন দর্পন), শাপলা (মোল্লা জাহাঙ্গীর আলম), প্রবাসী (মো. আসাদুজ্জামান), দিগন্ত, প্রবাসের ডাক (এমডি আলাউদ্দিন), বাংলার রূপ, নিউ অয়ন (এসএইচএম তসলিম উদ্দিন), আড্ডা টোকিও (প্রবীর বিকাশ সরকার), টোকিও জার্নাল (প্রবীর বিকাশ সরকার), পরবাস (কাজী ইনসানুল হক), দশদিক (সানাউল হক), নতুন কণ্ঠ (মুহাম্মদ সানাউল হক) ইত্যাদি। একমাত্র মানচিত্র প্রায় ১২ বছর ও পরবাস ছয় বছর ছাড়া সবগুলো কাগজই এক থেকে তিন বছরের বেশি টেকেনি। প্রত্যেকটি কাগজই ছিল গভীর জাতীয়তাবোধ, দেশপ্রেম ও মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে উৎসারিত। দুই বাংলার বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক, গবেষক ও শিল্পীরা লিখেছেন। এক মানচিত্রেই খ্যাতিমান দেশী-বিদেশী ২০০ জনের বিশেষ সাক্ষাত্কার প্রকাশ হয়েছে। মানচিত্র জাপানি গণমাধ্যমকে এতটাই আকৃষ্ট করেছিল যে এনএইচকে বেতারের বাংলা বিভাগ, একাধিক জাতীয় দৈনিক ও বার্তা সংস্থা কিয়োদো নিউজ এজেন্সি কর্তৃক আমার সাক্ষাত্কার প্রকাশ হয়েছিল। ১৯৯৮ সালে প্রভাবশালী নিহোন কেইজাই শিম্বুনের ইংরেজি সংস্করণ ‘নিকি উইকলি’ পত্রিকার বিশেষ প্রতিবেদন ‘রিজিওনাল ফোকাস: আ সিরিজ অব ইন্টারভিউজ অব কি এসিয়ানস ইন জাপান ফ্রম আদার কান্ট্রিজ’-এর গণমাধ্যম ক্যাটাগরিতে আমাকে নির্বাচন করে একটি সাক্ষাত্কার তুলে ধরে। যা হোক, এত বাংলা কাগজ ১৯৯১-২০১০ সাল পর্যন্ত অন্য কোনো দেশে প্রকাশ হয়েছিল কিনা, প্রবাসীদের দিয়ে সন্দেহ জাগায়। বিভিন্ন অনুষ্ঠান উপলক্ষেও বেশকিছু সমৃদ্ধ স্মরণিকাও প্রকাশ হয়েছে। ঢাকার বাংলা একাডেমির উচিত ছিল এসব কাগজ সংগ্রহ করে প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা। বর্তমানে বিবেকবার্তা ডট কম, নিহোন-বাংলা ডট কম, দশদিক ডট কম ও টোকিও বাংলা নিউজ নামে চারটি অনলাইন নিউজ পোর্টাল চালু রয়েছে।

বাংলাদেশের প্রথম গানের সিডি ১৯৯২-৯৩ সালে জাপান থেকেই প্রকাশ হয়েছিল। প্রকাশ করেছিলেন এনাম ও সাগর নামে দুজন জাপান প্রবাসী তরুণ। প্রথমটি ছিল বেবী নাজনীনের ‘ও কালিয়া!’ ও দ্বিতীয়টি রুনা লায়লার ‘উথালি পাথালি’। দুটোরই কভার ডিজাইন করে দিয়েছিলাম আমি।

প্রবাসীদের গ্রন্থ মানে আরেক ঈর্ষণীয় দৃষ্টান্ত। জাপানে কোনো বাংলাদেশী প্রথম গ্রন্থ প্রকাশ করেছিলেন জানা নেই, তবে ১৯৯৫ সালে আমার একটি ছড়াগ্রন্থ ‘উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে’ প্রকাশ হয়। এরপর তালা, অবাক কাণ্ড, জানা অজানা জাপান চতুর্থ খণ্ড, রবীন্দ্রনাথ ও জাপান: শতবর্ষের সম্পর্ক তিন খণ্ড, জাপানে গণিকা সংস্কৃতি, রাহুল, অপরাহ্ন বৃষ্টি, কলকাতার স্মৃতিকথা, অতলান্ত পিতৃস্মৃতি, সূর্যোদয়ের দেশে সত্যজিৎ রায়, ক্রান্তি, জাপানে বাঙালি: অজানা ইতিহাস ইত্যাদি প্রকাশ হয়। ২০০৬ সালে জাপান প্রবাসী এমএ সোবহান সূর্যোদয়ের দেশে নামে একটি গ্রন্থ লেখেন জাপানের বিভিন্ন জনপ্রিয় বিষয় নিয়ে। কথাসাহিত্যিক বাকের মাহমুদের ভালোবাসার এপিঠ ওপিঠ (গল্প সংকলন), গবেষক ও সাহিত্যিক ড. আরশাদ উল্লাহর রয়েছে তিনটি উপন্যাস, ক্যাপ্টেন তানি, ইয়ুকি একটি মেয়ের নাম, তৃতীয় জনম ও ইরাকের পথে পথে, এক বাঁশ কাঠুরের মেয়ে, জাপানি রূপকথার অনুবাদ ছাড়াও জাপানি রূপকথা গল্প সংকলন ও তিনটি কাব্যগ্রন্থ। লেখক, সাংবাদিক কাজী ইনসানুল হকের সাপ্তাহিক ‘যায় যায় দিনে’ লিখিত জনপ্রিয় কলামগুলোর সংকলন মেড ইন জাপান, প্রবন্ধ সংকলন দূর পরবাস ও করোনাবিষয়ক স্মারক সংকলন করোনাকাল জাপান ২০২০ সম্পাদনা। অত্যন্ত মূল্যবান একটি কাজ, এতে প্রায় ১০০ জন প্রবন্ধ-নিবন্ধ লিখেছেন। সাংবাদিক ও অধ্যাপক মনজুরুল হকের বঙ্গ মহিলার জাপান যাত্রা (সম্পাদিত), পূর্ব ইউরোপের কাব্য সংকলন: প্রতারিত পৃথিবীর দিকে মেলে ধরা গোলাপ, ওকুর সরু পথ ও ফরাসি কবি গিয়োম আপোলিনেরের কাব্যসংকলন অশ্রুভেজা চোখে করাঘাত (অনুবাদ), হিরোশিমা নাগাসাকির কথা, আমার প্রবাস জীবন: সোভিয়েত পর্ব, কবির কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী নেই এবং রবীন্দ্রনাথের জাপান, জাপানে রবীন্দ্রনাথ। কবি মোতালেব শাহ আইউবের কাব্যগ্রন্থ অচল আধুলি, ঘরমুখো প্রজাপতি, ভার্জিন ভোর, দুঃখ আছে কষ্ট নেই, বৃষ্টির উৎসব, কোথাকার আমি, মুক্ত ডানার প্রজাপতি (কবি সমুদ্র গুপ্তর সঙ্গে যৌথ), দ্য ড্রিম টু রিয়েলিটি, রোদবিকেলের গল্প ও একলা মানুষ। সাংবাদিক ও কথাসাহিত্যিক পিআর প্ল্যাসিডের এক পলকে, একটি লাল গোলাপের জন্য, গর্ভধারিণী, বইমেলায় পরিচয়, আত্মহনন, পাখির বয়স ছিল কম, দোলন, দোলা, জাপানের গল্প, নুহাশ পল্লীতে একদিন, মেয়েটি খুনি ছিল, বিপরীত ভালোবাসা, বড় দিনের গল্প, বেরসিক প্ল্যাসিডের অজানা কথা ও হিরোশিমা কথা বলে (উয়েদা কওজির সঙ্গে যৌথ)। অধ্যাপক আশির আহমেদের জাপান কাহিনী ৮ম খণ্ড, জাপানের অজানা সমাজ ও সংস্কৃতির অনবদ্য বয়ান। কথাসাহিত্যিক কামরুল আহসান জুয়েলের আমার সন্তানকে কোলে নিয়ে (কাব্য), ইম্পসিবল ইজ নাথিং (গল্প), এঞ্জেলার সান্নিধ্যে, সহস্র অন্ধকার পেরিয়ে, দেশে বিদেশে (অভিজ্ঞতার গল্পকথা), দুর্দম্য কৈশোর, বাল্টিক সাগরের নীলাভ জ্যোত্স্না, জাপানে ভালো ভূত মন্দ ভূত (শিশু-কিশোর গল্প), নাতনির কাছে দাদির চিঠি (গল্প), দ্বীপদেশের জেলখানা, সাকুরা, কিমোনো কন্যা। সাংবাদিক বাবলু রহমানের হূদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল (কাব্য)। কবি ও সম্পাদক মুকুল মুস্তাফিজ ‘মুক্তিযুদ্ধে রংপুর’ (ইতিহাস)। কবি চৌধুরী হোসাইন মুনির ‘অর্ধেক কবিতা অর্ধেক হাইকু’। কবি শাহীন আক্তার স্বাতীর চিলেকোঠা, হূদস্পন্দন, আহ্ মরি বাংলা ভাষা, ভূতুর পড়াশোনা। সাংবাদিক, লেখক ও কণ্ঠশিল্পী শরাফুল ইসলামের প্রথম বিজয়ের উচ্চারণ। কবি, সাংবাদিক, সংগঠক ও সংগীতশিল্পী গোলাম ফারুক জিকোর অচিন নকশাল (কাব্য)। কবি রওনক জাহানের মেঘভাঙা তুমুল প্লাবনে (কাব্য)। ইয়াকুব নবীর আধ্যাত্মিক গ্রন্থ সুখী হতে চান যারা।

সাম্প্রতিক কালে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হতে শুরু করেছে। আশি-নব্বইয়ের দশক ও নতুন শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত লাগাতার রাজনৈতিক অস্থিরতা, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বন্যা-মহামারী, জঙ্গি হামলা ইত্যাদির কারণে বাংলাদেশের বিবর্ণ, সকরুণ, হতাশাব্যঞ্জক ভাবমূর্তি বজায় ছিল জাপানিদের কাছে। সেটা সাম্প্রতিক কালে প্রচুর রেমিট্যান্স ও বিদেশী বিনিয়োগের বদৌলতে ব্যাপক উন্নয়নচিত্র জাপানি গণমাধ্যমে প্রকাশিত হচ্ছে। সব শ্রেণীর জাপানির আগ্রহ বৃদ্ধি পাচ্ছে বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে। প্রায় ৪০ বছর ধরে প্রবাসী যারা কলকারখানায় লবণাক্ত কঠোর পরিশ্রমের পাশাপাশি দেশীয় শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে জাপানে তুলে ধরার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভাবমূর্তিকে ক্রমে উজ্জ্বলতর করেছেন, এখনো করছেন, তারা শিক্ষণীয় ও অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবেন অনাগত প্রজন্মের কাছে। তরুণ প্রজন্মের মধ্যে উদীয়মান বহুমুখী প্রতিভা গোলাম মাসুম জিকোর সংগীত ব্যান্ড ঝিঁঝি পোকা, নতুন প্রকাশিত সাহিত্য ম্যাগাজিন রি, চিত্রগ্রহণ, গ্রাফিক ডিজাইন; শাম্মী বাবলীর রবীন্দ্রসংগীত সাধনা, সাব্রিনা জাহানের অনন্য চিত্রকলাচর্চা; তরুণ চিত্রশিল্পী কামরুল হাসান লিপুর প্রতিষ্ঠিত কাহাল গ্যালারি; কিয়ুশু বিশ্ববিদ্যালয়ে তথ্যবিজ্ঞান বিষয়ে অধ্যাপনারত সম্ভাবনাময় শিক্ষক আশির আহমেদের প্রচেষ্টা; নিগাতা সানজো সিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে এই প্রথম কোনো বাংলাদেশী অধ্যাপকের আচার্য পদে অধিষ্ঠান; বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত জাপানি জনপ্রিয় শীর্ষ মডেল লোরার অগ্রযাত্রা; বাংলাদেশীদের দ্বারা জাপানি ভাষায় গ্রন্থ প্রকাশ ইত্যাদি নতুন এক বাংলাদেশকে জাপানে পরিচিত করছে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। এরই মধ্যে কাহাল গ্যালারিতে তিন-তিনটি অনুষ্ঠান যথাক্রমে বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবর্ষ উপলক্ষে বঙ্গবন্ধু চিত্রায়িত চিত্রাঙ্কন প্রদর্শনী, এ বছর প্রবাসী লেখকদের প্রকাশিত গ্রন্থ পরিচিতি অনুষ্ঠান এবং এক সপ্তাহব্যাপী জাপানে গৃহীত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আলোকচিত্র ও দলিলচিত্র প্রদর্শনী নতুন বার্তা দিচ্ছে বলে মনে করি।

পরিশেষে বলব, শ্রম ও প্রচেষ্টার মূল্যায়ন সভ্যতার অগ্রযাত্রাকে উৎসাহিত করে। জাপানে ও বিদেশে যারা সৃজনশীল কাজে অবদান রাখছেন, স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের পুরস্কৃত করছে বিবেকবার্তা পত্রিকা। ২০০৫ থেকে বিবেকবার্তা যাদের পুরস্কৃত করেছে তারা হলেন ইমদাদুল হক মিলন, সাইফুল্লাহ মাহমুদ দুলাল, প্রফেসর ড. ত্সুয়োশি নারা, সাবেক জাপানি রাষ্ট্রদূত হোরিগুচি মাত্সুশিরোও, প্রবীর বিকাশ সরকার, পুলক বসু, রাজু শেখ ও তাপস মোদক। বিবেকবার্তা প্রতিষ্ঠাতা পিআর প্ল্যাসিডকে আমরা পুরস্কৃত করতে পারিনি এখনো।

 

তথ্যসূত্র: মানচিত্র কাগজ, কাজী ইনসান, পিআর প্ল্যাসিড, মোতালেব শাহ আইউব, মো. জসীমউদ্দিন, বিশ্বজিৎ দত্ত বাপ্পা, ড. আরশাদ উল্লাহ, কামরুল হাসান জুয়েল

 

প্রবীর বিকাশ সরকার: জাপান প্রবাসী লেখক ও গবেষক