মালয়েশিয়া আমাদের খুব কাছের একটি বন্ধুদেশ। আকাশপথে যেতে লাগে ৪ ঘণ্টারও কম। ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি আসিয়ান অঞ্চল থেকে সর্বপ্রথম স্বাধীন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দানকারী, বন্ধুপ্রতীম রাষ্ট্র মালয়েশিয়ার সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক বিস্তৃত হতে চলেছে।

দেশটির রাজনৈতিক স্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলের কিছুটা চিন্তা থাকলেও অর্থনীতিতে তার লাগাতার প্রবৃদ্ধি সেই চিন্তা ম্লান করছে। বরং একটি চিত্র ছবির মতো পরিষ্কার যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় মালয়েশিয়া ইতিবাচক অর্থে বাংলাদেশীদের জন্য একটি নির্ভাবনাময় সেকেন্ড হোম হয়ে উঠছে।

সেকেন্ড হোম নিয়ে একটা উদ্বেগ আমাদের সমাজে আছে। সেকেন্ড হোমের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ওপরের দিকে রয়েছে। এ পর্যন্ত সাড়ে তিন হাজারেরও বেশি বাংলাদেশী সেকেন্ড হোম নিয়ে বসবাস করছেন। 

ওয়াকিবহাল সূত্রের ধারণা, সেকেন্ড হোমের সুযোগ গ্রহণকারী ব্যক্তিদের বেশির ভাগ উচ্চবিত্ত। বাংলাদেশে তাদের গড়ে ৫০-৬০ কোটি টাকার সম্পদ রয়েছে। তারা সবাই সহায়-সম্পদ ত্যাগ করে এসেছেন, তা নয়। তারা সাধারণত আসা-যাওয়ার মধ্যে থাকেন। বেশির ভাগ কুয়ালালামপুরের আশপাশে থাকেন। বাংলাদেশ সরকারের অন্যতম উদ্বেগ হলো নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ, যেটা জমা দিতে হয়, হুন্ডির মাধ্যমে আনা হলো কিনা। কিন্তু এটা চিহ্নিত করা কঠিন। যেমন কারো পক্ষে কোনো মালয়েশীয় নাগরিক টাকাটা দান হিসেবে শোধ করেন। এরপর তিনি তা হুন্ডিতে পেয়ে যান। আইন ধরতে পারে না।

এদিকে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যও বাড়ছে। ১৯৭২ সালের ৩১ জানুয়ারি বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের পর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে যেখানে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের মোট রফতানি ছিল ২৩২ দশমিক ৪২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

সেখানে রফতানি বাজার ধীরে ধীরে সম্প্রসারণ হয়ে ২০১৮-১৯ অর্থবছরে প্রায় ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ২৭৭ দশমিক ২৩ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়।

সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দুই দেশের বাণিজ্য ক্রমবর্ধমানভাবে প্রসারিত হওয়ায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে ভারতের পরে দ্বিতীয় বৃহত্তম বাণিজ্য অংশীদার হয়ে উঠছে বাংলাদেশ।

পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গত কয়েক বছরে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের রফতানি হয়েছে ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩৩৭ মিলিয়ন, ২০-২১ অর্থবছরে ৩০৬, ১৯-২০ অর্থবছরে ২৮০, ১৮-১৯ অর্থবছরে ২৭৭ দশমিক ২৩, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ২৩২ দশমিক ৪২, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ২১১ দশমিক ৫২, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ১৯১ দশমিক শূন্য ৫, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৪০ দশমিক শূন্য ৯, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১৩৫ দশমিক ৬৪, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১০০ দশমিক ১১ মিলিয়ন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, মালয়েশিয়ার বাজারে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প, হিমায়িত মাছ, কাঁকড়া, পাট ও পাটজাত পণ্য, মসলা, চামড়া ও চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, আলু, সিরামিক টেবিলওয়্যার ও হালাল খাদ্যপণ্য রফতানি হচ্ছে। এর মধ্যে তৈরি পোশাক ও কৃষিজাত পণ্য সবচেয়ে বেশি রফতানি হয়েছে মালয়েশিয়ায়।

একইভাবে মালয়েশিয়া থেকে পণ্য আমদানিও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে ১ হাজার ৪০৬ দশমিক ৭০, ২০১২-১৩ অর্থবছরে ১৯০৩ দশমিক ১০, ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ২ হাজার ৮৪ দশমিক ১০, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১ হাজার ২৮৭ দশমিক ৫০, ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৯৫২ দশমিক ৩০, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে ১ হাজার ১৭ দশমিক ৫০, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে ১ হাজার ৪১০ দশমিক ৪০ শতাংশ মালয়েশিয়া থেকে আমদানি করেছে বাংলাদেশ। আমদানিজাত পণ্যগুলো হলো ভোজ্যতেল, পেট্রোলিয়াম পণ্য (ভ্যাসলিন), ইলেকট্রনিক সামগ্রী, রাসায়নিক, ইস্পাত, রাবার, আসবাব ইত্যাদি।

গত বছরের ডিসেম্বরে নতুন করে বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নিয়োগে চুক্তি স্বাক্ষরের পর দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে মালয়েশিয়ায় কর্মী যাওয়া শুরু হয়েছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) ছাড়পত্র নিয়ে ৮ আগস্ট রাতে ঢাকা থেকে কুয়ালালামপুরের উদ্দেশে যাত্রার মাধ্যমে শুরু হয়েছে শ্রমিক নিয়োগ।

মালয়েশিয়ায় নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার গোলাম সারোয়ার বিমানবন্দরে উপস্থিত থেকে তাদের স্বাগত জানান। এ সময় হাইকমিশনের শ্রম উইংয়ের মিনিস্টার নাজমুস সাদাত সেলিমসহ মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা ও দুই দেশের সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।

২০১৮ সালের আগস্টে বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগ বন্ধের ঘোষণা আসে মালয়েশিয়ার পক্ষ থেকে। দীর্ঘ আলোচনা ও যোগাযোগের পর গত ১৯ ডিসেম্বর দুই দেশের মধ্যে এ-সংক্রান্ত একটি সমঝোতা সই হয়। পরে গত জুন মাসে ঢাকায় যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকে শ্রমবাজার খোলার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। একই সঙ্গে জুনের মধ্যে মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর বিষয়ে ঘোষণা দেন প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইমরান আহমদ। কিন্তু দীর্ঘসূত্রতা কিছুতেই পিছু ছাড়ছিল না মালয়েশিয়ার শ্রমবাজারে। সব কাটিয়ে অবশেষে দেশটিতে যাচ্ছে বাংলাদেশী কর্মীরা।

বিএমইটি সূত্র বলছে, ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের মাধ্যমে এসব কর্মী ফ্যাক্টরি ওয়ার্কার হিসেবে মালয়েশিয়ায় গিয়েছেন। তাদের বেতন ১৫০০ মালয়েশিয়ান রিংগিত, বাংলাদেশী মুদ্রায় ৩২ হাজার টাকা। শর্ত অনুসারে তাদের চুক্তি তিন বছরের। ওয়ান ওয়ে প্লেন ভাড়া, বাসস্থান ও যাতায়াত ফি পাবেন কর্মীরা। তবে খাবার ব্যবস্থা করতে হবে নিজেকে।

দীর্ঘ চার বছরের অচলায়তন ভেঙে মালয়েশিয়ায় নতুন করে বাংলাদেশী কর্মী নিয়োগ শুরু হওয়ায় হাইকমিশনার গোলাম সারোয়ার সন্তুষ্টি প্রকাশ করে বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন। 

আশা করা যাচ্ছে, আগামী তিন বছরের মধ্যে মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের পাঁচ লক্ষাধিক নতুন লোকের কর্মসংস্থান হবে এবং এর মাধ্যমে মালয়েশিয়া থেকে বাংলাদেশের প্রেরিত মোট রেমিট্যান্স তিন বিলিয়ন ডলার অতিক্রম করবে।

মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার নিয়ে অস্থিরতাও কম নেই। মালয়েশিয়া সরকার একাদিক্রমে তিন দফায় শ্রমিকদের বৈধ হওয়ার সুযোগ দিয়েছে। এ সুযোগে প্রায় লক্ষাধিক বাংলাদেশী বৈধতা নিয়েছেন।

তবে কিছু টানাপড়েনে ও দালালদের দৌরাত্ম্য সত্ত্বেও মালয়েশীয় শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য ক্রমেই আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে।

মালয়েশিয়ার অনেক বড় বড় ভবন নির্মাণে বাংলাদেশী শ্রমিকদের ঘাম লেগে আছে। বহু উচ্চ ভবন ও স্থাপনার কারিগর তারা।

মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত বাংলাদেশীদের সংখ্যা ৮-১০ লাখ বলে ধারণা করা হয়। শ্রমিক আমদানির উৎস দেশ হিসেবে ২০১৬ সালে বাংলাদেশকে অন্তর্ভুক্ত করা একটি মাইলফলক অগ্রগতি। বাংলাদেশ হলো ১৫তম ও সর্বশেষ উৎস দেশ। অন্যরা হলো ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, নেপাল, মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, তুর্কমেনিস্তান, উজবেকিস্তান ও কাজাখস্তান।

মালয়েশিয়ার উন্নয়ন অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০১৬ সালের মার্চ থেকে একটি গবেষণা শুরু করে বিশ্বব্যাংক। ২০২০ সালের এপ্রিলে ‘হু ইজ কিপিং স্কোর এস্টিমেটিং দ্য নম্বর অব ফরেন ওয়ার্কার্স ইন মালয়েশিয়া’ শীর্ষক ওই গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ হয়। সেখানে দেখানো হয়, মালয়েশিয়ার টেকসই অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রয়েছে বিদেশী শ্রমিকদের।

দেশটির লেবার ফোর্স সার্ভের তথ্য ব্যবহার করে বলা হয়, সেখানে প্রায় ২২ লাখ ৭০ হাজার বিদেশী কর্মী বিভিন্ন খাতে কর্মরত। সে হিসেবে দেশটিতে অবৈধভাবে কর্মরত প্রায় ১২ লাখ বিদেশী।

বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মালয়েশিয়ায় অবৈধ হয়ে পড়া বিদেশী কর্মীর ৪১ শতাংশই বাংলাদেশী, ৩০ শতাংশ ইন্দোনেশিয়ার, ১২ শতাংশ ভারতের, ফিলিপাইনের ৬ শতাংশ ও নেপালের ৫ শতাংশ, ২ শতাংশ করে পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও মিয়ানমারের নাগরিক। এছাড়া শ্রীলংকা ও থাইল্যান্ড থেকে প্রবেশ করা কর্মীরাও মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে অবস্থান করছেন।

অবৈধ হলেও মালয়েশিয়ার অর্থনীতিতে অবদান রাখায় এসব কর্মীর নব্বইয়ের দশক থেকেই বৈধ হওয়ার সুযোগ দিচ্ছে, সম্প্রতি ছয় পি, রি হায়ারিং, রিকেলাইব্রাসি এবং কোম্পানি পরিবর্তন করার সুযোগও দিয়েছে দেশটি। এসব কর্মসূচির আওতায় বৈধ হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন বিদেশী কর্মীরা।

তাদের মধ্যে বাংলাদেশের কর্মীদের অংশ সর্বাধিক। ফলে এটাই প্রমাণ করে যে বাংলাদেশের কর্মীরা বৈধভাবে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করতে বেশি আগ্রহী। আবহাওয়া, খাবার, ধর্মীয় মিল থাকায় বাংলাদেশীদের জন্য পছন্দের অন্যতম দেশ মালয়েশিয়া।

অবৈধ হওয়ার কারণ হিসেবে বিশ্বব্যাংকের গবেষণা মতে, বিভিন্ন দেশ থেকে উল্লেখযোগ্য একটা অংশ সেখানে গিয়েছিলেন ট্যুরিস্ট ভিসায় এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিজ দেশে না ফিরে তারা সেখানে বিভিন্ন কাজে নিযুক্ত হয়ে থেকে যাচ্ছেন। দেশটির আইন অনুযায়ী, আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকরা ট্যুরিস্ট ভিসায় গিয়ে মালয়েশিয়ায় ৩০ দিনের বেশি অবস্থান করতে পারবেন না।

তবে আসিয়ানের সদস্য নয় এমন দেশগুলোর নাগরিকরাও অন অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা নিয়ে মালয়েশিয়ায় অবৈধভাবে অবস্থান করেছেন। এসব নাগরিকের বেশির ভাগ ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও শ্রীলংকার। এ কারণে মালয়েশিয়া সরকার ২০১৯ সালে বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, পাকিস্তান, ভারত, চীন, নেপাল ও মিয়ানমারের নাগরিকদের অন অ্যারাইভাল ভিসা সুবিধা বন্ধ করে দেয়।

মালয়েশিয়া ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজের পরিসংখ্যান বলছে, মালয়েশিয়ায় অবৈধদের অধিকাংশই অদক্ষ ও স্বল্পশিক্ষিত শ্রমিক। তারা দেশটির নিম্নমানের পেশায় কাজ করেন। এ অদক্ষ শ্রমিকদের মধ্যে বড় অংশ প্রতিবেশী দেশ ইন্দোনেশিয়া, নেপাল ও বাংলাদেশের। এ অনিয়মিত কর্মীদের মধ্যে অনেকেই দেশটির মধ্যে পালিয়ে থেকেই কাজ করে। মালয়েশিয়া সরকার এ অনিয়মিত শ্রমিকদের বৈধতা দিতে ‘জিরো ইরেগুলার মাইগ্রেশন বাই ২০২০’ পরিকল্পনা গ্রহণ করে। মালয়েশিয়ার ইমিগ্রেশন আইন অনুযায়ী অবৈধভাবে প্রবেশ, পাসপোর্ট-ভিসা না থাকা, ভিসার অপব্যবহার করা এবং ওভার স্টে করা দণ্ডনীয় অপরাধ।

প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলছে, দীর্ঘ নিয়োগ প্রক্রিয়া ও অধিক অভিবাসন খরচ হওয়ায় প্রবাসী শ্রমিকদের মধ্যে অবৈধ হওয়ার হার বাড়ছে। বিশ্বব্যাংক মালয়েশিয়াকে প্রস্তাব করেছে, প্রবাসী কর্মীদের জন্য অভিবাসন নীতি তৈরি করলে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে আরো এগিয়ে যেতে পারবে এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলো তাদের সহযোগিতায় আরো এগিয়ে আসবে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, মালয়েশিয়া প্রতিনিয়ত উন্নত হলেও তাদের শ্রমবিষয়ক সুযোগ-সুবিধা অপরিবর্তিত রয়েছে। স্বল্প দক্ষ প্রবাসীদের ওপর তুলনামূলক কাজের চাপ বেশি থাকে। দেশটির উৎপাদন খাতে শ্রম উৎপাদনশীলতা কমেছে বলেও উল্লেখ করেছে।

সম্প্রতি মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় ও আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা মালয়েশিয়ায় থাকা কর্মীদের মিথ্যা আশ্বাস, কাজের মিথ্যা তথ্য, অতিরিক্ত অভিবাসন খরচ, বেতন, আবাসন, পাসপোর্ট আটকে রাখা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনসহ ২২টি বিষয়ে তথ্য দিতে অনুরোধ করেছে এবং কিছু এনজিও এ নিয়ে কাজ করছে। অন্যদিকে মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় একই বিষয়ে বা কর্মীর যেকোনো সমস্যার বিষয়ে অবহিত করার জন্য ওয়ার্কিং ফর ওয়ার্কার নামক অ্যাপ চালু করেছে।

বাংলাদেশীরা ১৯৭১ সালে বিজয় অর্জন করেছে, সম্মিলিত প্রচেষ্টার জন্যই। আমাদের জাতীয় জীবনের প্রতিটি অর্জন সম্ভব হয়েছে একতার প্রয়াসেই। বিপরীতে দেখেছি, একতার অভাবে প্রাণখোলা সুন্দরের মৃত্যু হতে।

ঐক্যবোধের অভাবে কত সুরকে অসুর হতে দেখেছি। লাগেজে করে রাজনীতি, মগজে করে আমদানি করা অনৈক্য আমাদের ডুবিয়েছে, শত অর্জনকে ম্লান করেছে।

বিভেদ, অনৈক্যর ক্যান্সার কিলবিল করছে সর্বত্র। আমি পুরো ১৪ বছর ধরে মালয়েশিয়া প্রবাসী, বলতে পারেন আপাদমস্তক খেটে খাওয়া মানুষ। মালয়েশিয়ায় স্থানীয়দের রয়েছে ঈর্ষান্বিত অর্জন, পাশাপাশি এই অর্জনে অংশীদার হয়েছে নানা দেশের প্রবাসী। এই উন্নত দেশটিতেও বাংলাদেশীদের ব্যক্তিগত অর্জন আকাশসমান।

কেউ গবেষণায়, কেউ চাকরিতে, কেউ প্রযুক্তিতে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, সমষ্টিগতভাবে কোনো ভালো অর্জন হয়নি, কোনো প্রাণোচ্ছল উপমা নেই বললেই চলে, আমাদের আয়োজনে সংকীর্ণতা প্রচ্ছন্ন লক্ষণীয়। অনৈক্য জাতীয় ক্যাসিনো। বড় কোনো প্লাটফর্ম নেই। সবাই মিলে উদ্যোগ নেয়ার পর কিছুদিনের মধ্যে বহুধাবিভক্ত।

জুতসই প্রাণখোলা বড় উদ্যোগের অভাবে বাংলাদেশের শৈলী সৌন্দর্য অনুপস্থিত। কয়েকটি বছরজুড়ে বাংলাদেশ উপস্থাপিত হচ্ছে ক্ষুদ্র উদ্যোগে। এতে বাংলাদেশের টোটাল সংস্কৃতি, শিল্প, কৃষ্টি পরিপূর্ণ ফুটে উঠছে না। মালয়েশিয়ায় গড়ে ওঠেনি সর্ববৃহত্তম সংগঠন বাংলাদেশ কমিউনিটি, একই সঙ্গে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোও নিজেরা বহুধাবিভক্ত।

অভিযোগ রয়েছে, বাংলাদেশ দূতাবাসেরও কৌশলগত ভুল রয়েছে। বাংলাদেশ মিশনের নানা আয়োজনেও সব পক্ষকে একই শামিয়ানার নিচে আনা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে গোটা মালয়েশিয়া দেখছে বিভক্ত বাংলাদেশকে। এক পক্ষ ভিন্ন ধারার কিছু আয়োজন করলে অন্য পক্ষও এদের অনুসরণ করছে। মালয়েশিয়ায় এক হওয়ার বদলে হচ্ছে বিভক্ত। কমিউনিটিগুলোর প্রতি আগ্রহ হারিয়েছে প্রবাসীরা।

মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশীরা শুধু ভাবমূর্তি হারায়নি, একই সঙ্গে হারিয়েছে জৌলুস, আকাশচুম্বী জনপ্রিয়তা, হারিয়েছে সম্ভাবনা, সামনে চলার প্রেরণা। মালয়েশিয়ায় প্রায় ২৫টির মতো সংগঠন রয়েছে। বাংলাদেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন থেকে শুরু করে সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনও বাদ যায়নি। রয়েছে গান চর্চার সংগঠন।

ইদানীংকালে বেশি গড়ে উঠেছে বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, থানা, গ্রাম অ্যাসোসিয়েশন।

সবচেয়ে কষ্ট দেয়, হূদয়ে রক্তক্ষরণ যখন দেখি, এসব সংগঠন নিয়ে দেশের মানুষকে একে অন্যের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কুৎসা রটাতে, একে অন্যকে সামাজিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন করতে।

মালয়েশিয়ায় প্রত্যেকে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, নিজের রক্ত-ঘামের, মেধার, পরিশ্রমের, ত্যাগের বিনিময়ে মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। প্রতিনিয়ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করছে। সেই সূর্যবীররা নিজেদের মূল্যবান সময়, অর্থ ও শ্রম দিয়ে সংগঠন দাঁড় করাচ্ছে। কিন্তু তা ছোট পরিসরে। যার যা মন চায়, তাই করতে পারে, তা যদি হতো বৃহৎ পরিসরে কতই না কল্যাণ হতো। বৃহৎ প্লাটফর্মেই বৃহৎ আয়োজন, বৃহত্তম উপস্থাপন হয়। হাসি, বেদনা খুনসুটি আদান-প্রদান হয়। একে অন্যের পাশে সম্মিলিতভাবে দাঁড়ানোর সুযোগ হয়। কিন্তু ফেসবুকে এত কুৎসা কেন, এত অনৈক্য কেন, কী লাভ, কখনো কি ভেবেছেন এতে বাংলাদেশের গুড ব্র্যান্ডিং না ডিব্র্যান্ডিং হয়।

বাংলাদেশের রাজনীতি মালয়েশিয়ায় কী জন্য কী উপকারে আসবে? দেশ থেকে আসার সময় লাগেজে করে রাজনীতি কেন আনতে হবে, মগজে করে দেশ থেকে রাজনীতি আমদানি করে কী লাভ? সবচেয়ে অপ্রীতিকর তখনই লাগে সামাজিকভাবে প্রসিদ্ধ কিছু মানুষকে ইচ্ছাকৃতভাবে হীনস্বার্থে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হয়।

কিছু কিছু নামে বেনামে ভুয়া আইডি থেকে এই অপপ্রচার চলছে, অস্থির করে রেখেছে সামাজিক বন্ধনকে।

যারা প্রবাসে আছেন, দেখবেন, কোনো দেশ এভাবে বিদেশে রাজনৈতিক শাখা খোলেনি। অনেকেই কাজের চেয়ে রাজনীতিকে উদ্দেশ্যে বানিয়েছে। বরং যারা বাংলাদেশী মালয়েশিয়ান আছেন, আপনারা মালয়েশিয়ার মূলধারার রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হোন, এতে বাংলাদেশ সবচেয়ে উপকৃত হবে। আসুন সবাই মিলে মালয়েশিয়ায় একটি উজ্জ্বল বাংলাদেশকে তুলে ধরি। এর মাঝেও দেশের প্রতি আস্থা, আন্তরিকতা, ভালোবাসায় নিয়মিত কিছু সংগঠনও খুবই ভালো ভূমিকা পালন করছে। শুধু তাই নয়, এমন অনেক বাংলাদেশী মালয়েশিয়ান আছেন, যারা দেশের মর্যাদাকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যাচ্ছেন।

দেশকে, দেশের পতাকাকেও সমুজ্জ্বল করছেন। নীরবে-নিভৃতে অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন, গবেষণায় সফল হয়েছেন, অনেকে মালয়েশিয়ার নামিদামি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করছেন। অনেক ইপিএসকর্মী কোম্পানি পরিচালনা করছেন, অনেক বাংলাদেশী মালয়েশিয়ায় প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি গড়ে তুলেছেন। কেউ সরকারি অফিসে চাকরি করছেন, কেউ এনজিওতে, কেউ মালয়েশিয়ার গুগল অফিসে চাকরি করছেন। মোট কথা, কিছুসংখ্যক মেধাবী মানুষ তাদের সর্বোচ্চ দিয়ে দেশের পতাকা, দেশের পাসপোর্টের সম্মান বৃদ্ধি করছেন। কাজ করে চলেছেন।

বাংলাদেশীদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ এর মধ্যে মালয়েশীয় মেয়ে বিয়ে করা সূত্রে সে দেশের মূলধারায় মেশার সুযোগ তৈরি করছেন। মালয়েশীয় আইনে দেশে বিদেশী বিয়ে নিষিদ্ধ। তাই বিয়েটা বাইরে চলে। নাজিব রাজাক প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন এক আলোচনায় রসিকতা করে বলেছিলেন, এখানকার বাংলাদেশী তরুণেরা তো শাহরুখ খান! শাহরুখ খানরা ভবিষ্যতে বাংলাদেশ-মালয়েশিয়া সম্পর্কের উত্তরোত্তর উন্নতি ঘটাবেন, সেটাই সবার প্রত্যাশা।

 

আহমাদুল কবির: মালয়েশিয়া-বাংলাদেশ ফোরাম অ্যাসোসিয়েশনের সহযোগী সদস্য