নিহন নো সেকাত্সু: জাপানের সঙ্গে প্রথম পরিচয় শিশু শ্রেণীতে সূর্যোদয়ের দেশ হিসেবে। আস্তে আস্তে জানলাম, বাংলাদেশে প্রথম বা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধটা এখনো কোল্ড কন্ডিশন থেকে বের হতে পারেনি যে বিভীষিকাময় অভিজ্ঞতার স্মৃতি থেকে, সে আণবিক বোমা বিধ্বস্ত হিরোশিমার দেশ, সবচেয়ে বৈদেশিক সাহায্য প্রদানকারী ও বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগী দেশ হলো জাপান। ২০২১-এর এক শীতে জাপানের ছোট্ট শহর সাইজোয় আমার আসা। হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার অভিজ্ঞতা এবং এই ছোট্ট শহরে বাংলাদেশী কমিউনিটির সঙ্গে অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পর জাপানের যাপিত জীবন, যাকে জাপানের ভাষায় বলে নিহন নো সেকাত্সু লেখার প্রচেষ্টা। মূলত এই লেখা জাপান ও জাপানের মানুষকে নিয়ে, তাদের নাগরিক ও সামাজিক রূপ নিয়ে।

ভারত নাকি পাকিস্তান: ক্রিকেট খেলায় এ দুই দল লড়াই করলে বাংলাদেশের মানুষও এ দুই দেশের পক্ষে লড়াইতে নেমে যায়। এক দলের জনপ্রিয় যুক্তি হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানিদের নির্মম অত্যাচার, অন্য দলের স্বাধীন দেশে ভারতের সীমান্ত হত্যা, অর্থনৈতিক হস্তক্ষেপ ইত্যাদি। কাউন্টার যুক্তি আসে, খেলার সঙ্গে রাজনীতি মেশাবেন না। আমি যখন স্কুলে পড়তাম, তখনই বিষয়গুলো নিয়ে দুই দলের হাতাহাতি মারামারি লেগে যেত। এখন আমার সন্তান স্কুলে যায়, এখনো এসব যুক্তি আর কাউন্টার যুক্তিতে ফেসবুক থাকে সরগরম। ২০২২ সালের জাপানের অভিজ্ঞতায় এই যুক্তি ও কাউন্টার যুক্তির একটু অন্যমাত্রা আমার অভিজ্ঞতায় এল।

জাপানের সবচেয়ে বড় মিত্র আমেরিকা। শুধু রাজনীতি নয়, সাধারণ মানুষের কাছেও আমেরিকানরা বড় বন্ধু। যাদের এ কথায় ভারত-পাকিস্তানের দ্বন্দ্বের কথা সূত্র পড়বে না, তাদের জন্য বলি, জাপানে ১৯৪৫ সালে পারমাণবিক বোমা নিক্ষেপ করেছিল আমেরিকা। যাতে প্রায় সাড়ে তিন লাখ নারী, শিশু, বৃদ্ধ নির্বিশেষে অসহায় জাপানিজ মৃত্যুবরণ করেছিল। তার পরও জাপানিজদের এ আমেরিকাপ্রীতির কারণ কিন্তু নির্মোহ ও যৌক্তিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ। আবেগ তাদের কোনো সিদ্ধান্ত বা কথাকে প্রভাবিত করে না। আর অন্যের আবেগকে নিজের আবেগের জোরে দমন করতে চাওয়ার বাসনাও তাদের কখনো দেখিনি।

‘দেরু কুই ওয়া উতারিরু’: এবার বলি, জাপানের বেশির ভাগ শহর-মানুষ কেন আমার কাছে একই রকম লাগে, সে কথা। বেশির ভাগ জাপানিজকে দেখি একই ধরনের পোশাক, অ্যাকসেসরিজ পরেন বা একই ধরনের বাড়িঘর তৈরি করেন। সবচেয়ে ভালো লাগে, ধনী-গরিবের বৈষম্য এতটা প্রকট নয়, আবাসন বা পরিচ্ছদ দেখে কে ধনী আর কে গরিব তা বোঝা যাবে না। আমার মতো ব্র্যান্ড অদূরদর্শীদের পক্ষে অন্তত তা বোঝা সহজ নয়। শুধু পোশাকে নয়, ম্যানার্স ও চিন্তাশীলতায় তাদের এ হোমোজেনিটি সম্ভবত তাদের দীর্ঘ সময়ের শাসনতান্ত্রিক কাঠিন্য ও কনফুসিয়াসের ধর্মীয় মতবাদ দিয়ে প্রভাবিত। কিছুটা আন্দাজ করা, যা জাপানের সবচেয়ে জনপ্রিয় একটি প্রবাদ থেকে—দেরু কুই ওয়া উতারিরু যার মানে হলো স্ট্যা’ন্ড আউট ফ্রম দ্য ক্রাউড, অ্যান্ড ইউ জাস্ট ইনভাইট ট্রাবল ফর ইওরসেলফ। যার কারণে দেখা যায়, জাপানের প্রায় সব নাগরিক তাদের দায়িত্ব পালনের বিষয়ে সচেষ্ট ও বেশ আইননিষ্ঠ। আইন মানাকে বলা যেতে পারে জাপানিজদের সামাজিক চরিত্র। সুপারমার্কেটগুলোয় আমাদের সুপারমার্কেটের মতো ব্যাগ রেখে ঢুকতে হয় না এবং ট্রাফিক পুলিশ না থাকলেও তারা সিগন্যাল মেনে চলে। আড্ডায় দেখা যাবে সবাই পান করছেন, কিন্তু যিনি গাড়ি চালাবেন, তিনি কিছুতেই পান করবেন না। খুব ইচ্ছে করলে জিরো অ্যালকোহলের বিয়ার খেতে দেখেছি, কিন্তু অ্যালকোহল এক চুমুকও নয়। কাজের বেলায় কেউ ফাঁকিবাজি করেন না, এটাও তাদের সামাজিক অভ্যাস। আরেকটি চমত্কার নাগরিক দায়িত্ব তারা পালন করেন, যেটা দেখে মুগ্ধ হই। সেটা হলো রিটায়ার ভলান্টারি সার্ভিস দিতে ইচ্ছুক নাগরিকরা সকালে স্কুলের শিশুদের রাস্তা পারাপারে সাহায্য করেন, রাস্তার ড্রেন পরিষ্কার করেন। বলে রাখা ভালো, ড্রেনে কিছুটা শ্যাওলা জমে, তবে আমাদের দেশের মতো ভয়ংকর অবস্থা নয়। এভাবেই তারা ফ্রি সার্ভিস দেন, যা দেখলে মনে হয় আহা আমাদেরও যদি এমন শিক্ষা ও অভ্যাস থাকত। ১৬ কোটি মানুষ যদি একটু করে হাত লাগাত, পরিবেশের চিন্তা করত, তাহলে আমাদের দেশটায় বিপ্লব হয়ে যেত।

সাইজোর ভিআইপি: এখানে আমি বাইসাইকেল চালাই। বিশাল বিশাল ঝাঁ চকচকে মার্সিডিজ, লেক্সাস, মাজদা আমার মতো বাইসাইকেল আরোহী বা হাঁটা পথিকদের দেখে গাড়ি থামিয়ে দেয়। কারণ তাদের ট্রাফিক রুলস হচ্ছে, পেডেস্ট্রিয়ান ফার্স্ট। নিজেকে ভিআইপি মনে হয়, আর নিশ্চিন্ত। অন্যভাবে বলতে গেলে জাপানে বসবাসের অভিজ্ঞতায় দেখেছি, তারা দুর্বল দরিদ্রকে প্রায়োরিটি দেয়। এমন একটা সামাজিক প্রশাসনিক কাঠামোই তারা গড়ে তুলেছে। এ কথা বলা যায় নির্দ্বিধায় কারণ যার ট্যাক্স মওকুফ (মানে যে দরিদ্র), তাকে সোশ্যাল সেফটিনেটের আওতায় রাখা হয়। আমি এখানে পড়তে এসেছি, স্কলারশিপ বাদে আমার আর আয় নেই, তাই আমার ট্যাক্স মওকুফ। মাঝে মাঝেই লেটারবক্সে আপত্কালীন অর্থ সহায়তা দেয়ার চিঠি আসে। আমাকে আবেদনও করতে হয় না। আমার সন্তানের স্কুলের বেতন আমি আর মিউনিসিপ্যালিটি ভাগাভাগি করে দিই। সিংহভাগ দেয় মিউনিসিপ্যালিটি। হেলথ ইন্স্যুরেন্স প্রতিটা নাগরিকের জন্য বাধ্যতামূলক। কিন্তু যাদের আয় বেশি, তাদের জন্য এ নিয়ম নয়। তাদের ট্যাক্স, পেনশন, স্কুলের বেতন সবই বেশি। আবার শপিং মল, স্টেশন, পাবলিক ট্রান্সপোর্ট সবকিছুতেই হুইল চেয়ার ফ্রেন্ডলি। কোনো সাহায্যকারী ছাড়াই হাসিমুখে ঘুরে বেড়ান ফিজিক্যালি হ্যান্ডিক্যাপড সুখী মানুষ। দেখে খুব ভালো লাগে। তখন ভাবি, আমাদের দেশে তো সবই উল্টো। যে হাঁটে, যে সাইকেল চালায়, গাড়িওয়ালারা তাকে গুনবেই না। যার হাত নেই, পা নেই, তিনি তো পুরো সমাজ সংসারের বোঝা। যিনি দরিদ্র, তার তো বড় লোকের খুশির ওপর বাঁচা-মরা নির্ভর। রাষ্ট্র বা সমাজ তার কি দায় নেয়? যদি কেউ সহযোগিতা করে, তো সেটা অনুগ্রহ হিসেবে, সম্মানের সঙ্গে নয়। এ প্রসঙ্গে একটা বিষয় খেয়াল করলাম, আমরা তেলা মাথায় তেল দিয়ে অভ্যস্ত বলে যখন কোনো বিত্তবান আত্মীয় বন্ধু বাসায় আসে বা আমরা তাদের কাছে বেড়াতে যাই, তখন অনেক আয়োজন করি বা অনেক উপঢৌকন নিয়ে যাই। যে যত দরিদ্র, তার বেলায় আয়োজন তত কম, গিফটের মূল্যও কম। কিন্তু ঘটনা হচ্ছে, বিত্তবান তো নিয়মিত সুখাদ্য খেতে পারেন, কিন্তু দরিদ্রের সামর্থ্যে কুলায় না, তিনি হয়তো সারা বছরও সেসব চোখে দেখেননি, কিন্তু আমরা কার প্রয়োজন, সেটা নিয়ে মাথা ঘামাই না। সোশ্যাল স্ট্যাটাস বিবেচনায় তার কদর করি। হয়তো সোশ্যাল স্ট্যাটাস নয়, মানুষকে মানুষের সম্মান দেয়ার শিক্ষা একসময় আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় চলে আসবে। সুদিন ফিরবে নিশ্চয়ই।

কাজই আনন্দ: জাপানের সরকারি দপ্তরের সার্ভিস পাওয়া দিয়ে তাদের কাজ প্রীতির নমুনা চাক্ষুষ করছি অহরহ। প্রিফেকচার হলো একটা অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ইউনিট, যা অনেকটা আমাদের দেশের বিভাগের মতো—জাপানে এ রকম ৪৭টি প্রিফেকচার আছে। প্রিফেকচার চালান লোকাল গভমেন্ট। কেন্দ্রীয় সরকারের আওতাধীন কারেন্সি, ডিফেন্স এ ধরনের কিছু বিষয় ছাড়া ট্যাক্সসহ বাকি সব লোকাল গভমেন্টই নিয়ন্ত্রণ করে। মিউনিসিপ্যালিটি অফিস বা সিটি অফিসে আমরা যাই, দেখি অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে ও আন্তরিকতার সঙ্গে তারা কাজটি করে দেয়। বলে রাখা ভালো, লাঞ্চ আওয়ার বলে এখানে এখনো কিছু দেখিনি বা হয়তো আছে চোখে পড়েনি। ফটোকপি আনা হয়নি, এর কাছে যাও, ওর কাছে যাও, এমন সব হাঙ্গামা কখনো পোহাতে হয়নি। এই সুখে বার বার সিটি অফিস যেতে মন চায়। একদিন নিয়ে গেলাম আমার সাড়ে তিন বছরের ছেলেকে। সে করিডোরে দৌড়াচ্ছে, একজন এসে কাগজ আর রঙ পেনসিল দিয়ে গেলেন। জাপানে পা দেয়ার তৃতীয় দিনে আমার পুত্র সিটি অফিসে গিয়ে সেবা নেয়ার বিনিময়ে তাদের বিরক্ত না করার কৃতিত্বে একটি অক্ষয় চিত্রকর্ম অঙ্কন করলেন। ফেরার সময় কাগজ ও রঙ পেনসিল ফেরত দিতে গেলে তারা আমাদের ধন্যবাদের সঙ্গে সেই চিত্রকর্মটি উপহার দিলেন। আমি নিজে সরকারি কর্মকর্তা, তাই সরকারি অফিসের হালচাল সম্পর্কে ওয়াকিবহাল। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অন্য কোনো জাপানিজ শব্দ আমার শব্দভাণ্ডারে না থাকায় একবারের জায়গায় পাঁচবার ‘আরিগাতো গুজাইমাস’ বলে ধন্যবাদ দিয়ে আসলাম।

জাপানের চ্যালেঞ্জ: এবার তাহলে শেয়ার করা যাক দীর্ঘদিন জাপানে আছেন, এমন কিছু মানুষের অভিজ্ঞতা। জাপান শিশুদের স্বর্গ আবার জাপানেই ৯-১৩ বছরের শিশুদের আত্মহত্যার হার ভীষণ বেশি। স্কুলে বুলিং খুবই কমন। যদিও স্কুলে শিক্ষকরা চরম সতর্কতা অবলম্বন ও বিশেষ যত্ন নিয়ে থাকেন, তবু তা এড়ানো যায় না। জাপানের আরেকটি চ্যালেঞ্জ তাদের ভাষা। আমি প্রথম দিন ভুল বাসে উঠে পড়েছিলাম, কিন্তু সমস্যা হলো ইউনিভার্সিটি শব্দটিও কাউকে বোঝাতে পারছিলাম না। যেসব ইংরেজি শব্দ আমাদের দেশের রিকশাওয়ালাও হরহামেশাই বলেন, সেসব শব্দ এখানকার শিক্ষিত জাপানিরাও ধরতে পারেন না। আবার বিদেশীদের পক্ষে অল্প সময়ে জাপানি ভাষা শেখাও কঠিন। আরেকবার ট্যাক্সিতে এ রকম ঝামেলায় জড়িয়েছিলাম। ট্যাক্সির ড্রাইভার অতি সজ্জন ব্যক্তি। আমি ততদিনে অল্প দুয়েকটি জাপানিজ শব্দ শিখেছি। ডান-বামের সাহায্যে যখন বাসায় পৌঁছালাম ড্রাইভার বললেন, উনার কাছে ইংরেজি মুজুকাসি আর আমার কাছে জাপানি ভাষা মুজুকাসি। মুজুকাসি মানে কঠিন। তার এমন কথায় আমরা সবাই হাসলাম। অনেক সময় আন্তরিকতা দিয়ে ভাষার দূরত্ব মেটানো যায়। তবে যারা জাপানে আসবেন, তাদের প্রতি পরামর্শ থাকবে, কিছুটা হলেও জাপানের ভাষা আয়ত্ত করার চেষ্টা করা।

এখানে বসবাসকারী বাংলাদেশীদের আরেকটি সমস্যা আছে। মূলত আশির দশকে কিছু বাংলাদেশী জাপানে আসেন। তবে আমেরিকা বা ইউরোপের মতো জাপানে কিছু ব্যতিক্রম থাকলেও শক্ত বাংলাদেশী কমিউনিটি এখনো গড়ে ওঠেনি। আবার জাপানিজরা বেশ রিজার্ভ, সব মিলিয়ে কিছুটা আউটসাইডার ফিল থেকেই যায়, বছরের পর বছর বাস করার পরও। নেই পর্যাপ্ত হালাল সার্টিফাইড খাবার বা মুসলিম জীবনাচরণের যথেষ্ট সুযোগ। খুব কমই তৃতীয় প্রজন্মের জাপানিজ বাংলাদেশী আছেন এখানে। দ্বিতীয় প্রজন্মের যেসব বাংলাদেশী এখানে আছেন, তারা জাপানি ভাষা পারেন, জাপানিজ স্কুল কলেজে পড়েন, জাপানে তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা তৈরি হচ্ছে। কিন্তু একই সঙ্গে তারা নিজস্ব কৃষ্টি-কালচার থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন, যা হয়তো অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু বাংলাদেশী পিতামাতার জন্য নিজ সন্তানের এমন পরিবর্তন মেনে নেয়া কিছুটা বেদনাদায়কই বটে। এ এক ডিলেমা।

জাপান কেন পুবের সবচেয়ে উন্নত দেশ: বেশির ভাগ উন্নত দেশই পশ্চিমের। জি৮-এর একমাত্র এশিয়ান দেশ জাপান। পুবের দেশগুলোর মধ্যে সবার আগে অর্থনৈতিক মুক্তি ও প্রযুক্তিগত বিপ্লব ঘটিয়েছে জাপান। এই দেশের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অনেক ইউরোপীয় দেশ বা আমেরিকার চাইতে কম নয় বরং বেশি। কারণ হিসেবে তারা তাদের জনসাধারণের ডেভেলপমেন্টের কথা বলে। যার প্রমাণ শিক্ষার প্রতি তাদের কদর। আমি লক্ষ করে দেখলাম, জাপানে ১ ইয়েনের কয়েন থেকে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ইয়েনের নোট পাওয়া যায়। যদিও জাপানে বিশ্বাস করা হয়, তাদের সম্রাট সূর্যের বংশধর। ৬৬০ খ্রিস্টাব্দের সম্রাট জিম্মু থেকে বর্তমান সম্রাট নারুহিতো পর্যন্ত সবাই একই ব্লাডলাইন। সম্রাটই জাপানের ঐক্যের প্রতীক। কিন্তু কোনো কয়েন বা ব্যাংক নোটে সম্রাটের কোনো ছবি নেই। কয়েনে শুধু জাতীয় প্রতীক। নোটের ক্ষেত্রে ১ হাজার ইয়েনে ১৮ শতকের ব্যাকটেরিওলজিস্ট নুগুচির পোর্ট্রেট, ৫ হাজার ইয়েনের নোটে ১৮ শতকের মেইজি পিরিয়ডের কবি ও ছোট গল্পের লেখিকা নাতসুকো হিগুচির এবং ১০ হাজার ইয়েনের নোটে কেইউ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা, শিক্ষাবিদ ও উদ্যোক্তা ফুকুজাওয়া ইউকুচির পোর্ট্রেট। আমি ফুকুজাওয়ার চিন্তাভাবনা থেকে আমার বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি অতি জরুরি উক্তি উল্লেখ করতে চাই। ১০০ বছর আগেও তিনি খুব দারুণভাবে সমাজকে পড়তে পেরেছিলেন। কথাটি এমন ‘দ্য ফান্ডামেন্টাল ডিফারেন্স বিটুইন পিপলস অব ওয়েস্ট অ্যান্ড দোজ অব জাপান অ্যান্ড এশিয়া এক্সটেন্ড টু হুইচ পিপল অ্যাক্ট অ্যাজ ফ্রি অ্যান্ড রেসপন্সিবল ইনডিভিজুয়ালস’। কথাটি ১০০ বছর আগের হলেও ২০২২ সালেও আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে কত প্রাসঙ্গিক। কবে আমরা প্রত্যেকে এক একজন স্বাধীন আর দায়িত্ত্বশীল মানুষ হব কে জানে। শেষ করব আরেকটি জাপানিজ প্রবাদ দিয়ে। ইংরেজিতে প্রবাদটা দাঁড়ায় এমন—‘the prosperity of a country, the growth of cities-everything depends on people. Build school and develop people’s ability.’ প্রবাদের পেছনের গল্পটা হচ্ছে ১৮৬৮-৬৯-এ জাপানে গৃহযুদ্ধ বাধে। ইতিহাসে এ যুদ্ধের নাম বসিন ওয়ার। যুদ্ধের ফলে চারদিকে নানা অভাব দেখা দেয়। বিশেষ করে নাগাওকা নামের এক অঞ্চলে। তো রিলিফ হিসেবে ১০০ বস্তা চাল পাঠানো হয় খাদ্য সংকট মোকাবেলা করার জন্য। কিন্তু নাগাওকা এই ১০০ বস্তা চাল বিক্রি করে দেয়। সেই টাকায় তারা স্কুল বানায়। যেন ভবিষ্যতে তারা খাদ্য সংকট নিজেরাই মোকাবেলা করতে পারে। এই প্রবাদকে বলে ‘স্পিরিট অব ওয়ান হান্ড্রেড স্যাকস অব রাইস’। আমার ‘নিহন নো সেকাত্সু’-এর সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞান তাই এই স্পিরিট অব ওয়ান হান্ড্রেড স্যাকস রাইস।

পুনশ্চ: এই লেখার জন্য ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা শুনিয়ে সহায়তা করেছেন জাপান প্রবাসী প্রকৌশলী এস. এম. হায়দার ও তার স্ত্রী

 

মমতাজ বেগম: অতিরিক্ত কৃষি কর্মকর্তা (এলআর), ডিএই; মাস্টার্স শিক্ষার্থী (জেডিএস ফেলো), হিরোশিমা ইউনিভার্সিটি, জাপান