সর্বকালে, সব সমাজে ও সব জনপদে উৎসব একটি আনন্দঘন বিষয়। উৎসবের রঙ-ঢঙ পরিবর্তিত হতে পারে, কিন্তু উৎসব আছে এবং উৎসব থাকবে। কেননা ‘ম্যান ক্যান নট লিভ অন ব্রেড অনলি।’ জীবনকে সুন্দর, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও গীতিময় করার জন্য উৎসবের আয়োজন। কবির আকুতি ‘সুখের লগিয়া এ ঘর বাঁধিনু’। জীবনে দুঃখ আছে, কষ্ট আছে, গ্লানি আছে। উৎসব সেসবকে অতিক্রম করে জীবনকে নতুন রঙে রাঙিয়ে তোলে। এটি সত্যি কথা যে, ‘কুসুমে কীট আছে, লতায় কণ্টক আছে, গন্ধে বিষ আছে’, তবুও ‘নিখিলের রূপ আছে, হাসি আছে, গান আছে’। সুজলা, সুফলা, শস্য শ্যামলা এ সোনার বাংলার মাঠে ঘাটে বাটে উৎসবের আমেজ আছে। এ দেশের ‘অবারিত মাঠ, গগন ললাট, ছায়া সুনিবিড় গ্রামগুলোতে’ বারো মাসে তেরো পার্বণ আছে। এ মানুষগুলো যখন ‘ইটের পাঁজরে, লোহার খাঁচায়’ বসবাস করে, তখনো তারা উৎসবের উত্তরাধিকার বহন করে। ইতিহাসের অনেক বাঁক অতিক্রম করে যারা নির্মাণ করেছে নগর, বসতি গড়েছে সুবে বাংলার রাজধানী ঢাকায়, তারাও তাদের ঐতিহ্য-উৎসবের প্রকাশ ঘটিয়েছে এ ক্রমবর্ধমান নগর জনপদে। সুতরাং ঢাকার উৎসবের ইতিহাস এ জনপদের মতোই পুরনো। সঙ্গতভাবেই এসব উৎসবে প্রতিফলিত হয়েছে ঢাকার মানুষের বিশ্বাস, মূল্যবোধ, ধর্ম, ভাষা, ইতিহাস, ঐতিহ্য ও গোষ্ঠীগত পরিচয়। ইতিহাসের গতিপথে অনেক বাঁক অতিক্রান্ত হয়েছে। সে বাঁকে বাঁকে পরিবর্তিত হয়েছে উৎসবের ধরন-ধারণ, আকার-প্রকার কিংবা গতিপ্রকৃতি। কিন্তু উৎসবগুলো টিকে আছে পরিবর্তন, পরিমার্জন ও পরিবর্ধন অবশেষে নিজ স্বকীয়তায়।
১৬০৮ খ্রিস্টাব্দে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সুবেদার ইসলাম খাঁ কর্তৃক আনুষ্ঠানিক প্রতিষ্ঠার আগেও এ জনপদে নিশ্চয়ই বসতি ছিল, মানুষ ছিল, ঢাকেশ্বরীর ঢাকের আওয়াজ ছিল। মোগল আমলের ঢাকা নিজ গুণে বিকশিত হয়েছে। ব্রিটিশ আমলে খনিকের জন্য বঙ্গ আসামের রাজধানী হয়েছে। দেশ ভাগের পর পাকিস্তানের পূর্বাঞ্চলের প্রশাসনিক কেন্দ্রবিন্দু হয়েছে এবং অবশেষে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে অলঙ্কৃত হয়েছে। ভৌতরাজনীতির এসব পরিবর্তনে উৎসব ঐতিহ্যে রাজনীতির প্রভাব প্রতিপত্তি প্রতিফলিত হয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা-সংস্কৃতি, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি ও শিল্প-অর্থনীতি হয়তো ‘কেড়ে নিয়েছে আবেগ, নগর জীবনে দিয়েছে বেগ।’ উৎসবে প্রভাবিত হয়েছে বিজ্ঞানের আশীর্বাদ ও অভিশাপ। ঢাকাইয়া উৎসবের বৈশিষ্ট্য হচ্ছে অতীতের ধারাবাহিকতা ও সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা। কৃষিভিত্তিক সমাজের প্রতিভূ হিসেবে গতানুগতিক নগর সভ্যতা থেকে ভিন্নতা। আবুল মনসুর আহমদের ভাষায়, ‘খামার বাংলা’। আরো বৈশিষ্ট্যের বিষয় হচ্ছে চান্দ্র মাসনির্ভরতা। অধিকাংশ উৎসব আনুষ্ঠানিকতা ধর্মকেন্দ্রিক হওয়া সত্ত্বেও তা ‘সম্প্রদায়’কে অতিক্রম করে সাধারণ গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করে। মুসলমানদের ধর্মকেন্দ্রিক যেসব উৎসব হাজার বছর ধরে ঢাকার জনজীবনে অনুসৃত হয়ে আসছে, সেগুলো হচ্ছে— ঈদুল ফিতর, ঈদুল আজহা, মহররম, শবে বরাত, শবে কদর, ঈদে মিলাদুন্নবী ইত্যাদি। অন্যদিকে হিন্দু সম্প্রদায়ের যেসব উৎসব প্রাচীনকাল থেকে ঢাকার মানুষকে আন্দোলিত করে আসছে, সেগুলো হলো— সর্বজনীন দুর্গা পূজা, রথযাত্রা, শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন বা জন্মাষ্টমী, সরস্বতী পূজা, লক্ষ্মী পূজা ইত্যাদি। এসব ধর্মীয় উৎসবের মনস্তাত্ত্বিক ও সামাজিক প্রভাব অপরিসীম। বাঙালি জাতিসত্তার ক্রমবিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বাংলা বছরকেন্দ্রিক উৎসব ‘পহেলা বৈশাখ’ ঢাকাবাসীর ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ উৎসবে পরিণত হয়েছে। এর প্রতি রাষ্ট্রিক স্বীকৃতিও রয়েছে। এছাড়া এ জনপদের নিজস্ব সংস্কৃতি উদ্ভূত অন্যান্য উৎসব হচ্ছে— সাকরাইন বা ঘুড়ি উৎসব, পৌষসংক্রান্তি, হালখাতা ইত্যাদি। সাম্প্রতিক কালে ঢাকায় হোলি উৎসবও উদযাপন হতে দেখা যাচ্ছে। সেই সঙ্গে কয়েকটি উৎসব পরিত্যাগ করা হয়েছে অথবা উৎসবের আমেজ হ্রাস পেয়েছে। উদাহরহণস্বরূপ ঢাকার রেসকোর্সে অনুষ্ঠিত ঘোড়দৌড় প্রতিযোগিতার কথা উল্লেখ করা যায়। স্বাধীনতা লাভের পরপর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে এক রকম প্রকাশ্য জুয়ার এ প্রতিযোগিতা বন্ধ হয়ে যায়। রেসকোর্স বা ঘোড়দৌড় মাঠের নাম এখন সোহরাওয়ার্দী উদ্যান। এ ধরনের পুরনো প্রতিযোগিতা যেমন বন্ধ হয়ে গেছে, ঠিক তেমনি নতুন নতুন উৎসব বা অনুষ্ঠানের আয়োজন লক্ষ করা যাচ্ছে। প্রতি বছরই ঢাকায় সাহিত্য-সাংস্কৃতিক উৎসব দেশজ ও আন্তর্জাতিক পরিসরে আয়োজিত হচ্ছে। এছাড়া গ্রামগঞ্জের হ্রাসমান বাউল, ভাটিয়ালি ও মরমি সংগীতকেন্দ্রিক ‘লোকসংগীত’ উৎসব গুরুত্বের সঙ্গেই অনুষ্ঠিত হচ্ছে। নাগরিক সচেতনতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে জাতীয় দিবসগুলোও ঢাকা মহানগরীর বড় ধরনের উৎসবে পরিণত হয়েছে। এশিয়াটিক সোসাইটির বাংলা পিডিয়ায় ঢাকা তথা দেশের রকমারি উৎসবের উজ্জ্বল বর্ণনা দিয়েছেন ইতিহাসবিদ মুনতাসির মামুন (বাংলা পিডিয়া, পঞ্চম খণ্ড, পৃ. ৪০১-৪০৭)।
ঈদকেন্দ্রিক উৎসব: প্রথমেই অনেক ঢাকাইয়া উৎসবের মধ্যে প্রধান উৎসব ঈদুল ফিতরের উল্লেখ করা যায়। সেকালে রোজার মাসে পুরান ঢাকায় পরিবেশ-প্রতিবেশে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হতো। খাদ্যসামগ্রী আড়ালে আবডালে পরিবেশিত হতো। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কড়াকড়ি হ্রাস পেলেও আমেজটা এখনো টিকে আছে। তবে ইফতার সংস্কৃতি বহাল আছে সে রকমই। ইফতার নিয়ে ঢাকাইয়া সরস মন্তব্যটি এ রকম, ‘নামাজভি পড়ুম না, রোজাভি রাহুম না, ইফতার না কইরা কি দোজখে যামু।’ ইফতারকেন্দ্রিক হিড়িক পুরান ঢাকায় এখনো আছে। আর চকবাজারের ইফতারির ঐতিহ্য এখনো বজায় আছে। আধুনিক ঢাকার নামিদামি লোকেরা এখনো চকবাজার যান ইফতারির বৈচিত্র্যের স্বাদ নিতে। অতীতে সেহরি ও ইফতারি খাওয়ার জন্য মসজিদ থেকে সাইরেন বাজানো হতো। এখনো হয়তো আছে। এছাড়া পাড়ার ছেলেরা ভোর রাতের দিকে সুর করে গজল বা কাওয়ালি গেয়ে রোজাদারদের জাগিয়ে তুলত। রেওয়াজটি লুপ্তপ্রায়। তবে কোথাও কোথাও টিকে আছে। আদি ঢাকাইয়া সমাজে আরেকটি প্রথা আছে, ‘নতুন জামাই চাঁদ রাতে শ্বশুরবাড়ি এসে সালাম করে সালামি নিয়ে যেত।’ ঘরে ঘরে রকমারি ইফতারি বিনিময় হতো। প্রথাটি নতুন ও পুরান ঢাকায় পুরোদস্তুর বহাল আছে। চাঁদ রাতে অর্থাৎ রোজার পরিসমাপ্তিতে যুবকদের মধ্যে নেশা ও অপরাধের প্রাবল্য লক্ষ করা যেত। ঈদের দিন খাওয়াদাওয়ার আধিক্য এখন যেমন আছে, তেমনি ছিল। তবে পোশাকির বিলাসিতা এতটা উগ্র ছিল না। একজন পুরান ঢাকার স্মৃতি রোমন্থন করে বলেন, ‘কেনা সেমাইয়ের প্রচলন পুরান ঢাকায় খুব একটা ছিল না; হাতে ঘুরানো কলে ঈদের আগে বাড়িতে বাড়িতে সেমাই তৈরি হতো। রোদে শুকিয়ে হালকা আঁচে ভেজে সেসব তুলে রাখা হতো ঈদের অপেক্ষায়। ঈদের দিন ঘি-চিনি জর্দা রঙ দিয়ে রান্না করা হতো সেই সেমাই। সে সেমাই দিয়েই আগতদের আপ্যায়ন করা হতো। ঈদের দিন বিকালে ঘুড়ি ওড়ানোর প্রতিযোগিতা হতো বুড়িগঙ্গার পাড়ে ও পাকা ঘরের ছাদে... ঘুড়ি ওড়াতে আর ধরতে গিয়ে ছাদ থেকে পড়ে অনেক মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে।’ (মাযহারুল ইসলাম বাবলা, দৈনিক সংবাদ, ২২ এপ্রিল, ২০১৫)। ঢাকা নগরবাসীর দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ উৎসব হচ্ছে কোরবানির ঈদ। পুরান ঢাকার লোকেরা কোরবানির ঈদ আধুনিক ঢাকার চেয়ে বেশি মাত্রায় উপভোগ করে। কোরবানির মাংস তারা নিজস্ব কায়দায় সংরক্ষণ করে এবং সারা বছর ধরে খায়। তারা আধুনিক ঢাকার মতো ভাগে কোরবানি দেয়াটা পছন্দ করে না। কোরবানির দিনে আত্মীয়স্বজনের বাড়ি বাড়ি গরুর রান পাঠানোর বড়লোকি রেওয়াজ তখনো ছিল, এখনো আছে। কোরবানির গরু কেনা ও প্রদর্শনীর প্রতিযোগিতা এখন পুরান ঢাকার চেয়ে নতুন ঢাকায় বেশি হয় বলে একজন পর্যবেক্ষক জানালেন। কোরবানির ঈদ যেহেতু অর্থবিত্তকেন্দ্রিক, সেজন্য ঢাকা মহানগরীর গরিবগর্বা মানুষ এ উৎসবের কম অংশই ভোগ করে। বর্তমানে দেখা যাচ্ছে, ঈদ উদযাপনের সঙ্গে সঙ্গে দেশের অন্যান্য অংশে তো বটেই, খোদ ঢাকা মহানগরীতে বিভিন্ন ধরনের আনন্দমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ আনন্দমেলার মধ্যে নিরানন্দ ঘটনাও ঘটে। তথাকথিত ধনিক বণিকরা জাকাতের শাড়ি দেয়ার নাম করে সম্পদের প্রদর্শনী ঘটায়। আর সেখানে অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুবরণ করে মানুষ।
ঈদে মিলাদুন্নবী: দুটো ঈদকেন্দ্রিক উৎসবের পর মুসলমানদের কাছে সবচেয়ে তাত্পর্যপূর্ণ ও যৌক্তিক উৎসব ঈদে মিলাদুন্নবী। এটি রাসূলে করীম সা.-এর জন্ম-মৃত্যু দিবস। এটি সরকারি ছুটির দিন। পুরান ঢাকায়, এমনকি নতুন ঢাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে এর আবেদন তেমন নয়। অথচ আরববিশ্বে এটি বহু আলোড়িত গণ-উৎসব। বাংলাদেশে প্রতিটি মসজিদে ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপিত হয়। পুরান ঢাকার প্রায় সব মসজিদে ঈদে মিলাদুন্নবীকে কেন্দ্র করে শিরনি খাওয়ার হিড়িক পড়ে। আগেকার দিনে রীতিমতো খাওয়াদাওয়ার উৎসব হতো এদিন। ‘পনেরো-বিশটি গরু আগের দিন বিকালে জবাই দিয়ে সারা রাত রান্না করে সকাল থেকে খাওয়ানো হতো। পোলাও বুটের ডালের সঙ্গে গরুর মাংসের ভোজ মসজিদে লাইন করে বসে মাটির সানকিতে সবাই খেত।’ এখন আর সেই ‘খানেওয়ালাও নেই, খিলানেওয়ালাও নেই। তবে সময়ের পরিবর্তনে ঈদে মিলাদুন্নবী উদযাপনেও পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। আজকাল ‘জসনে জলুস’ নামে মিলাদুন্নবী উপলক্ষে বিশাল মিছিল বা শোভাযাত্রা বের হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এ উপলক্ষে ওয়াজ মাহফিল ও তাফসিরুল কোরআন মাহফিলসহ বিবিধ ধর্মীয় অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।
মহররম: দেশের সর্বসাধারণ তথা মুসলিম জনগোষ্ঠী সম্ভবত মহররমের ঘটনায় সবচেয়ে আবেগাকুল হয়ে পড়ে। রাসূলে করীম সা.-এর দৌহিত্র ইমাম হোসেন মহররমের ১০ তারিখে কারবালা প্রান্তরে শাহাদাতবরণ করেন। এ মর্মান্তিক ঘটনা যথেষ্ট ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্যে পালিত হয় বাংলাদেশের সর্বত্র। বিশেষত শিয়া সম্প্রদায়ের কাছে দিনটি অত্যন্ত শোকাবহ। পুরান ঢাকার হোসেনি দালান থেকে প্রতি বছর মহররম উপলক্ষে তাজিয়া মিছিল বের হয়। তাজিয়া মিছিলে শিয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা ইমাম হোসেনের মাজারের প্রতিকৃতি বহন করে। তারা শোক প্রকাশক বিবিধ আচার-অনুষ্ঠান পালন করে। কারবালায় ইমাম হোসেনের ঘোড়া ‘দুলদুল’কে প্রতীকী অর্থে মিছিলে নিয়ে আসে তারা। এ সময় বুকে রক্তপাত ঘটায় এবং ‘হায় হাসান, হায় হোসেন’ বলে মাতম করে। এখন অবশ্য সরকারি আদেশে শরীর রক্তাক্তকরণে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ উপলক্ষে আজিমপুর ও ফরাসগঞ্জে মহররমের মেলা বসত। সাম্প্রতিক সময়ে এগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। নতুন ঢাকায় মহররমের তেমন আনুষ্ঠানিকতা দেখা যায় না। মহররমের এ শোকাবহ উৎসব বলতে গেলে হাজার বছর ধরে ঢাকায় প্রতিপালিত হয়ে আসছে। অতীতে মোগলরা সুন্নি হওয়া সত্ত্বেও মহররমকে গুরুত্বের সঙ্গে পালন করত। ব্রিটিশ ও পাকিস্তান যুগে ঢাকার নবাব পরিবার তথা ধনাঢ্য ব্যক্তিরা এর পৃষ্ঠপোষকতা করত। শিয়া সম্প্রদায়ের লোকজন প্রধানত পুরান ঢাকায় বসবাস করত। এদের মসজিদকে বলা হয় ইমামবারা। ঢাকার ফরাজগঞ্জের ‘বিবিকা রওজা মহল্লা’ শিয়াদের আরেকটি ইবাদতখানা। ১৮৬৯ সালে প্রণীত ঢাকার মানচিত্রে দেখা যায় যে, ফুলবাড়িয়ার কাছাকাছি স্থানে আরেকটি হোসেনি দালান রয়েছে। ঢাকার বিখ্যাত ছোট কাটরা ও মুকীম কাটরা মূলত শিয়া ইমামবারা। এসব কেন্দ্রে সে সময়ে ১০ মহররম উপলক্ষে মর্সিয়া, জারি ও লাঠি খেলা অনুষ্ঠিত হতো।
শবেকদর ও শবেবরাত: শবে কদরকে মনে করা হয় সবচেয়ে পুণ্যময় রজনী। আর শবে বরাতকে ভাগ্য নির্ধারণের রাত মনে করা হয়। দুটো রাতই মুসলমান সম্প্রদায় নানা ধরনের ইবাদত-বন্দেগির মাধ্যমে উদযাপন করে। পুরান ও নতুন ঢাকায় অনেকে রোজা রাখেন, রুটি বিতরণ করেন এবং মৃত আপনজনের কবর জিয়ারত করেন।
সাকরাইন উৎসব: পুরনো আমল থেকে পৌষকে বিদায় জানাতে মাঘ মাসের প্রথম দিন পুরান ঢাকার লোকেরা ঘুড়ি ওড়ায়। এটাকে তারা সাকরাইন উৎসব বলে। ভোরবেলা কুয়াশার আবছায়ায়ই শুরু হয় ঘুড়ি ওড়ানো উৎসব। ছোটবড় সবার অংশগ্রহণে মুখর হয়ে ওঠে প্রতিটি বাড়ির ছাদ। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ে উৎসবের জৌলুস। শীতের বিকালে ঘুড়ি কাটাকাটি খেলায় আনন্দ উত্তাপ ছড়িয়ে যায়। ছাদে ছাদে আগে মাইক ব্যবহার হতো। এখন চলছে সাউন্ড সিস্টেম। গেণ্ডারিয়া থেকে নবাবগঞ্জ ও ফুলবাড়িয়া থেকে সদরঘাট একই দৃশ্য। আকাশে উড়ছে ঘুড়ি। আর বাতাসে উড়ছে মন। ঘুড়ি কাটাকাটিতে হর্ষধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরান ঢাকার মানুষ।
দুর্গা পূজা: দুর্গা পূজা হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় উৎসব। দীর্ঘকাল ধরে ঢাকা মহানগরীর হিন্দু সম্প্রদায় অত্যন্ত জাঁকজমকের সঙ্গে উৎসবটি পালন করে আসছে। সাধারণত আশ্বিনের ষষ্ঠী তিথিতে দুর্গা পূজা শুরু হয়। হিন্দু ধর্ম বিশ্বাসমতে, এ সময় মা দুর্গা জাগ্রত হন। প্রতি বছর তিনি ধরাধামে তিনদিনের জন্য পিতৃগৃহে তার তিন সন্তানসহ ‘নায়র’ আসেন। সুতরাং তিনদিনের জন্য সপ্তমী, অষ্টমী ও নবমীতে এ পূজা অনুষ্ঠিত হয়। দশমীতে তিনি স্বর্গে প্রত্যাবর্তন করেন। সেজন্য ওইদিনই দুর্গামূর্তি বিসর্জন দেয়া হয়। ১৫ দিনব্যাপী আনন্দ উৎসব শেষে পরবর্তী পূর্ণিমায় লক্ষ্মীপূজা অনুষ্ঠিত হয়। কার্তিকের শেষ দিন কার্তিক পূজা অনুষ্ঠিত হয়। পরবর্তী মাঘের ১৬ তারিখের দিকে বর্ধিত চাঁদের পঞ্চমীতে বিদ্যাদেবী সরস্বতীর আরাধনা করা হয়। এভাবে প্রতিটি পূজাই যথেষ্ট ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে ঢাকা মহানগরীর হিন্দু সম্প্রদায় পালন করে। ষষ্ঠ শতাব্দীতে সম্রাট আকবরের সময় থেকে শুরু হয়ে এখন তা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান উৎসবে পরিণত হয়েছে। ১৮৩০ সালে লিখিত একটি আত্মজীবনীতে ধুমধামের সঙ্গে ঢাকায় দুর্গা পূজা অনুষ্ঠানের বিবরণী দেয়া হয়েছে। অতীতকাল থেকেই ঢাকেশ্বরী মন্দিরে মহানগরীর প্রধান পূজাটি অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। রামকৃষ্ণ মিশনের দুর্গা পুজা অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা আগে থেকেই ছিল। এখন নগরীর বিভিন্ন অংশে পৃথক পৃথকভাবে পূজা সম্পন্ন হয়। পূজা উদযাপনের জন্য একটি জাতীয় কমিটি রয়েছে।
জন্মাষ্টমী: হিন্দু সম্প্রদায়ের দ্বিতীয় বৃহত্তম উৎসব হচ্ছে জন্মাষ্টমী। ঢাকা মহানগরীতে জন্মাষ্টমী একটি ঐতিহ্যবাহী উৎসব হিসেবে প্রতিপালিত হয়ে আসছে। সেকালে গোটা বাংলাদেশের মধ্যে ঢাকার জন্মাষ্টমী পালনের ব্যতিক্রমী তাত্পর্য ছিল। রথযাত্রা জন্মাষ্টমী উৎসবের প্রধান অনুষ্ঠান। বিভিন্ন বিবরণীতে ঢাকায় বর্ণাঢ্য রথযাত্রার বিবরণী রয়েছে। রথযাত্রার সাথিরা সাধারণত হলুদ রঙের কাপড়চোপড় পরিধান করে। একজন সাধুসন্ত মিছিলের নেতৃত্ব দেন। নগরীর বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশ পরিভ্রমণ করে রথযাত্রাটি আবার আরম্ভ স্থানে ফিরে আসে। এ সময়ে অংশগ্রহণকারী লোকজন নেচেগেয়ে আনন্দ প্রকাশ করে। জন্মাষ্টমীর মানে হলো হিন্দু ধর্মের প্রধান দেবতা শ্রীকৃষ্ণের জন্মদিন। সনাতন ধর্মাবলম্বীরা বিশ্বাস করেন, ভাদ্রের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমীতে শ্রীকৃষ্ণ ধরাদামে মনুষ্যরূপে অবতীর্ণ হন।
বৌদ্ধদের ধর্মীয় উৎসব: বাংলাদেশে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের লোকের সংখ্যা খুব বেশি নয়। তা সত্ত্বেও তাদের উৎসবাদি স্বাতন্ত্র্যের কারণে জনসাধারণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ঢাকা মহানগরে কয়েকটি বৌদ্ধ বিহার রয়েছে। এর মধ্যে কমলাপুরে অবস্থিত বৌদ্ধ বিহারটি বেশ উল্লেখযোগ্য। বৌদ্ধদের প্রধান উৎসব বৈশাখী পূর্ণিমা। বৌদ্ধরা বিশ্বাস করেন, মহামতী বুদ্ধ এই দিনে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। বৌদ্ধদের আরো দুটো উৎসবও পূর্ণিমাকেন্দ্রিক।
খ্রিস্টানদের উৎসব: ব্রিটিশ আমলে ঢাকার পুরনো অংশে বেশকিছু খ্রিস্টানের বসবাস ছিল। সে কারণে এসব এলাকায় উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গির্জা স্থাপিত হয়। এর মধ্যে মিটফোর্ডে অবস্থিত আর্মেনিয়ান চার্চ ও সদরঘাটে অবস্থিত ক্যাথলিক গির্জাটি উল্লেখযোগ্য। ২৫ ডিসেম্বরকে খ্রিস্টানরা বড়দিন বলে। এই দিনে যিশু খ্রিস্ট জন্মগ্রহণ করেন। খ্রিস্টান সম্প্রদায় যদিও সংখ্যায় অল্প, তবুও বড়দিন খুব আড়ম্বরের সঙ্গেই পালন করে। এ উৎসবে খ্রিস্টানরা প্রার্থনা, উপহার বিনিময় ও ভালো খাওয়াদাওয়ার আয়োজন করে। পাশ্চাত্যের সংযোগের কারণে বাংলাদেশে অবস্থিত দূতাবাসগুলোয় বড়দিন পালিত হয়। ইস্টার স্যাটারডে খ্রিস্টানদের আরেকটি উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় দিন।
বৈশাখী উৎসব: বাঙালি জাতিসত্তার বাংলা সনের যোগাযোগ খুবই ঘনিষ্ঠ। পহেলা বৈশাখ বাঙালি নববর্ষের প্রথম দিন হওয়ার কারণে হাজার বছর ধরে দিনটি উদযাপন হয়ে আসছে। ধর্মীয় উৎসবের বাইরে পহেলা বৈশাখ সবার গ্রহণযোগ্য উৎসবে পরিণত হয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউট থেকে পহেলা বৈশাখে বর্ণাঢ্য মিছিল বের করা হচ্ছে। মিছিলটি স্বকীয় ধারায় ঢাকা নগরবাসীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। এটি সামাজিক সর্বজনীন উৎসব হিসেবে স্বীকৃতি অর্জন করেছে। পহেলা বৈশাখের বাড়তি আকর্ষণ হচ্ছে রমনার বটমূলে ছায়ানটের সংগীতানুষ্ঠান। ষাটের দশক থেকে ছায়ানট এ আয়োজন করে আসছে। পহেলা বৈশাখের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রয়েছে হালখাতা অনুষ্ঠান। ব্যবসায়ীরা প্রতি বছর হিসাব-নিকাশ পরিপূর্ণ করে নতুন খাতার মাধ্যমে নববর্ষের সূচনা করেন। আধুনিক ঢাকা নগরীতে হালখাতার প্রচলন খুব জনপ্রিয় না হলেও পুরান ঢাকায়, বিশেষত সংখ্যালঘু এলাকায় হালখাতার প্রচলন যথেষ্ট রয়েছে।
প্রতিটি সমাজ ও রাষ্ট্র যেমন উৎসবের আমেজে ধন্য, ঠিক তেমনি ঢাকা মহানগরীর লাখ লাখ মানুষ জাগতিক কষ্টের মধ্যেও উৎসবে আনন্দ উদ্বেল। ‘ইটের পাঁজরে ইট, তার ওপারে মানুষ কীট’গুলো কৃত্রিমতা ছাড়িয়ে ক্ষণিকের জন্য হলেও অন্তরে অন্তরে হেসে ওঠে। প্রকৃতির স্বার্থপরতা, পাশবিকতা, শত্রুতা, হিংস্রতা, মায়াহীন, ভালোবাসাহীন এ মহানগরীর মানুষ যেমন রমজানের শেষে খুশির ঈদ দিয়ে জীবন ভরিয়ে দেয়, তেমনি ঢাকা মহানগরীর প্রতিটি উৎসব নতুন করে তাদের আনন্দের মাঝে বাঁচতে শেখায়। কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ অতিক্রম করে প্রার্থনায় প্রার্থনায় ধর্মের অভিন্ন বাণীতে তারা দীক্ষিত হয়। দোস্ত-দুশমন ভুলে গিয়ে তারা হাতে হাত মেলায়, কাঁধে কাঁধ মেলায় নিত্যদিনের জীবন সংগ্রামে। পৃথিবীজুড়ে যখন মানবতার আর্তনাদ, দেশ যখন ডুবে গেছে হিংসার প্রতিচ্ছায়ায়, তখন ঢাকার উৎসবে উৎসবে আমাদের প্রার্থনা— প্রেম দিয়ে, ভালোবাসা দিয়ে ঢাকা মহানগরীর মানুষ জয় করুক পৃথিবী।
লেখক: অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়





