অনেকেই ১৬১০ সালকে ঢাকা শহরের ইতিহাসে গোড়াপত্তনের বছর ধরে এ শহরকে ৪০০ বছরের পুরনো বললেও তার আগে থেকেই ঢাকা ছিল একটি বর্ধিষ্ণু জনপদ। ১৬১০ সালে সম্রাট জাহাঙ্গীরের সুবাদার ইসলাম খাঁ ঢাকায় আসার পর সম্রাটের নামানুসারে এ জনপদের নাম ‘জাহাঙ্গীরনগর’ নাম দিয়ে রাজধানী স্থাপন করেন। ঢাকা নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক গবেষণা থেকে দেখা যায়, ১৭১৩-১৪ সালে বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর হওয়ার আগ পর্যন্ত বিগত ১০০ বছরে এখানে ব্যবসা, বাণিজ্য, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, শিল্প ইত্যাদি দ্রুত গড়ে ওঠে এবং জনসংখ্যাও বাড়তে থাকে। রাজধানী স্থানান্তর হওয়ার পর থেকে ঢাকা গুরুত্ব হারায়, শহরের জনসংখ্যা কমতে থাকে, ব্যবসা-বাণিজ্যও হ্রাস পেতে থাকে এবং শহর জঙ্গলময় হয়ে ওঠে। সে কারণে ব্রিটিশ আমলে সরকারি কর্মকর্তা চালর্স ড’য়লির আঁকা বিভিন্ন পেইন্টিংসে দেখা যায় ভগ্নদশার ক্ষয়িষ্ণু ঢাকাকে অথবা উইলিয়াম ফ্রেড্রিকের আঁকা ছবিতে অযত্নে পড়ে থাকা নিমতলীর দেউড়ি, বড় কাটরা ও অন্যান্য স্কেচে। ঢাকা আবার প্রাণ ফিরে পায় ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর, যখন ঢাকা দ্বিতীয়বারের মতো প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদা পায়। বঙ্গভঙ্গ রদের পর ঢাকা আবার রাজধানীর মর্যাদা হারায় এবং উন্নয়নের ধারা আবার বাধাগ্রস্ত হয়। সাতচল্লিশের দেশভাগের পর ঢাকা তৃতীয়বারের মতো পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী করা হলে শহরে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগে। তবে জনসংখ্যার পরিসংখ্যান দেখলে দেখা যাবে, ১৯৭১ সালে ঢাকা স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হওয়ার পর থেকে মূলত এখানে অত্যন্ত দ্রুত হারে নগরায়ণ ঘটতে থাকে। বর্তমানে ঢাকা শহর জনসংখ্যার বিচারে বিশ্বের অন্যতম জনবহুল মেগাসিটি। বর্তমানে দেশে মোট ৪ কোটি ২০ লাখ নগর জনসংখ্যার ৪২ ভাগই ঢাকায় বাস করে।
২. একটি ভালো শহরে কী কী থাকতে হয় আর ঢাকার কী কী নেই
বেশকিছু বছর ধরে বিশ্বের বিভিন্ন শহরের ওপর জরিপ থেকে দেখা যাচ্ছে যে, বসবাসযোগ্যতার সূচকে ঢাকার অবস্থান একেবারে তলানির দিকে। এসব জরিপের পদ্ধতি, উদ্দেশ্য, বিশ্লেষণের সূচক ও ফলাফলস্বরূপ শহরের অবস্থান নিয়ে তাত্ত্বিক আলোচনা হতে পারে। কিন্তু এ বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই যে, ঢাকা শহর বসবাসের দৃষ্টিতে তার নাগরিকদের কাছে সুখকর কোনো স্থান নয়। তার পরও জীবন ও জীবিকার কারণে অনেক অভিযোগ নিয়ে জীবন পার করে দেয় এ শহরে। একটি ভালো ও সার্থক শহর হতে গেলে যেসব নিয়ামক একটি শহরে থাকে, তার অনেক কিছুই অনুপস্থিত অথবা অপ্রতুল আছে আমাদের এ শহরে। তবে যে বিষয়গুলোর অভাব প্রকটভাবে সবার ওপর আসবে, তার মধ্যে আছে পরিবহন ব্যবস্থার দুরবস্থা, জল নিষ্কাশনের দুর্দশা, নিম্নবিত্ত ও নিম্নমধ্যবিত্তদের মানসম্মত আবাসনের অভাব, সবুজ ও উন্মুক্ত স্থানের অভাব, মানসম্পন্ন অবকাঠামোর অভাব, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবাসহ অপ্রতুল নাগরিক পরিষেবা ইত্যাদি।
একটি ভালো শহর হতে হলে যেকোনো শহরের একটি ভিশন থাকে এবং সেই ভিশন অর্জনে দীর্ঘমেয়াদি ভূমি ব্যবহার ও অবকাঠামো পরিকল্পনা থাকে। ঢাকা শহরের জন্য ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা থাকলেও সে অনুযায়ী তার বাস্তবায়ন অত্যন্ত কম। একটি সুশৃঙ্খল উন্নত মানের গণপরিবহন ব্যবস্থা ছাড়া এত বড় মেগাসিটিকে কোনোভাবেই ভালো পরিবহনসেবা দেয়া সম্ভব নয়। এখানে ভালো একটি জল নিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে বছরের মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বারবার সমগ্র শহর জলজটে আক্রান্ত হতে হয়। এ শহরে খোলা ময়দান, খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান ও সবুজের অভাব মানুষের বিনোদন, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে ভীষণভাবে ব্যাহত করেছে, যার কারণে শহর তার আকর্ষণ হারিয়েছে। পাড়ামহল্লায় প্লটের পর প্লট শুধু উঁচু উঁচু দালানই দেখা যায়, যা একদিকে যেমন এলাকার জনসংখ্যা আর ঘনত্বকে বাড়িয়েছে, তেমনি আবাসিক এলাকাগুলোকে নিরানন্দময় করেছে।
৩. ঢাকার মূল সমস্যা
সমগ্র দেশের পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানী ঢাকাকে ঘিরে অব্যাহতভাবে কেন্দ্রমুখী উন্নয়ন দর্শন একটি বিরাট সমস্যা। স্বাধীনতার পর থেকে ধারাবাহিকভাবে এখন পর্যন্ত অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড, কর্মসংস্থান, দক্ষ শ্রমিক, শিক্ষা, চিকিত্সা, নাগরিক সুবিধা, সাংস্কৃতি ও সর্বোপরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠেছে। ঢাকামুখী মানুষের গ্রোথ দিন দিন বেড়েছে। ফলে ঢাকা শহরের পারিসরিক বৃদ্ধি যেমন ঘটেছে, তেমনি শহরে জনসংখ্যার ঘনত্ব বেড়েছে অসহনীয়ভাবে। প্রতি বছর ঢাকা শহরের জনসংখ্যার সঙ্গে আরো নতুন পাঁচ লাখ মানুষ যোগ হয়। এত অধিকসংখ্যক মানুষের জন্য এ শহরের পরিকল্পনা, উন্নয়ন অথবা সেবাদানকারী কোনো প্রতিষ্ঠান কখনো প্রস্তুত ছিল না, আজো নয়। ফলে ঢাকা শহর কখনই সমস্যার আবর্ত থেকে বের হতে পারে না। ইউএন হ্যাবিট্যাটের ২০১৭ সালের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় প্রতি বর্গকিলোমিটারে সাড়ে ৪৪ হাজার মানুষ বাস করে। পৃথিবীর সব মেগাসিটির মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ ঘনত্বের শহর। এখানে অল্প জায়গায় অনেক মানুষ বাস করে। দ্বিতীয় অবস্থানে আছে ভারতের মুম্বাই, যার ঘনত্ব প্রতি বর্গকিলোমিটারে ৩১ হাজার ৭০০ জন। এছাড়া জনসংখ্যার বিবেচনায় পৃথিবীর আরো বেশকিছু শহর আছে, যেগুলোর সংখ্যা ঢাকার চেয়ে বেশি কিন্তু ঘনত্ব অনেক অনেক কম।
একটি সুশৃঙ্খল গণপরিবহনের অনুপস্থিতি, ধারণক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি যানবাহন ও পরিকল্পিত পরিবহন অবকাঠামোর অভাব ঢাকার মানুষের গতিবেগ ঘণ্টায় সাত কিলোমিটারে নেমে গেছে, যা হাঁটার গতিবেগের চেয়ে একটু বেশি। আমাদের পরিকল্পনাগুলো পদচারী ও গণপরিবহন ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দিয়ে প্রণীত হলেও বাস্তবে ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থা গণমুখী হয়ে গড়ে ওঠেনি। ঢাকা শহরের অনেক বহুমাত্রীয় সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়ে পরিবহন ব্যবস্থা চলছে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো অল্প পরিমাণ রাস্তা, অপরিকল্পিত রাস্তা নির্মাণ ও তার স্তর বিন্যাস, সুশৃঙ্খল গণপরিবহন ব্যবস্থার অনুপস্থিতি, প্রধান সড়কের বেশির ভাগ স্থান ব্যক্তিগত গাড়ির দখলে থাকা, শহরের মোট সড়কের মাত্র পাঁচ-ছয় ভাগ রাস্তা প্রধান সড়ক, যা গণপরিবহন চলার উপযোগী ইত্যাদি। ঢাকা শহরের জন্য সংশোধিত পরিবহন কৌশল পরিকল্পনা (২০১৬-৩৫) প্রণীত হয়েছে। তার আলোকে গণপরিবহন ব্যবস্থাকে অত্যন্ত জরুরি ও অত্যাবশ্যক জ্ঞান করে দ্রুত বাস্তবায়নের পদক্ষেপ নিতে হবে। মানুষ যত বেশি গণপরিবহন ব্যবহার করবে, তত বেশি ভালো গণপরিবহন ব্যবস্থা গড়ে উঠবে। আধুনিক নগর পরিকল্পনার ধারণাকে সমুন্নত রেখে গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটাতে হবে এবং ব্যক্তিগত গাড়ির নির্ভরশীলতা কমাতে হবে। একটি কার্যকর, বিশ্বস্ত ও আরামদায়ক গণপরিবহন ব্যবস্থাই পারে ব্যক্তিগত গাড়ির ওপর নির্ভরশীলতা কমাতে।
বর্তমানে ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। এ শহরের জন্য নানা সময় ড্রেনেজ স্টাডি ও মহাপরিকল্পনা তৈরি হলেও বাসবায়ন হয়েছে অল্প। এছাড়া রাজউকের ঢাকা মহানগর উন্নয়ন পরিকল্পনা ও ড্যাপ অনুযায়ী শহরের ভূমি ব্যবহার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে না পারার কারণে ঢাকা শহরের আশপাশের জলাভূমি, নিম্নভূমি, নদী-খাল বেদখল হয়েছে এবং বর্ষা মৌসুমে পানি ধারণের স্থান কমে গেছে। ফলে জলাবদ্ধতার প্রকোপ বেড়েছে।
এ শহরের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ মানুষের মানসম্পন্ন আবাসন নেই। তারা শহরের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলেও তাদের ভূমি ব্যবস্থাপনা ও আবাসনে উপেক্ষিত হয়। নগর নীতিমালা কিংবা আবাসন নীতিমালায় কিছু দিকনির্দেশনা থাকলেও তার বাস্তবায়ন খুব সামান্যই দেখা যায়। সামাজিক আবাসন বা সাশ্রয়ী আবাসনের উদ্যোগ নেয়ার কথা থাকলেও এখন পর্যন্ত তার সফল বাস্তবায়ন দেখা যায়নি।
নগরের অর্ধেক জনসংখ্যা নারী হলেও নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়নে নারীর চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষার বিষয়টি সক্রিয়ভাবে বিবেচনায় আসে না। নগর উন্নয়নে সিদ্ধান্ত গ্রহণ, পরিকল্পনা প্রণয়ন, প্রকল্প ডিজাইন, বাস্তবায়ন ইত্যাদি বেশির ভাগ কাজে নারীর সংখ্যা কম থাকায় নারী ব্যবহারবান্ধব নগর কাঠামো তৈরি হয় না। ফলে রাস্তাঘাট, ফুটপাত, মার্কেট, শপিংমল, পরিবহন ব্যবস্থা, পাবলিক টয়লেট, পার্ক, উন্মুক্ত স্থানসহ সব গণপরিসর নারীদের ব্যবহার উপযোগিতা সীমিত ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে থাকে। গণপরিসর ও নাগরিক সুবিধাগুলো ডিজাইন ও প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নারীদের চাহিদা ও আকাঙ্ক্ষাকে বিবেচনা করা হলে সেটা নারী-পুরুষ, ছেলে-বুড়ো সবার জন্য ভালো শহর হতে পারে।
৪. ঢাকার ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশ বর্তমানে মধ্যম আয়ের দেশের দিকে এগোচ্ছে। রাজধানী ঢাকাকে বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক পর্যায়ে একটি প্রতিযোগী নগরী হিসেবে গড়ে তুলতে না পারলে সে স্বপ্ন পূরণে সমস্যা তৈরি হবে। যানজট আর জলজটের শহরের ইমেজ থেকে বের হয়ে আসতেই হবে। সেক্ষেত্রে ঢাকার সমস্যা সমাধান যেমন জরুরি, তেমনি ঢাকা ছাড়া অন্যান্য বিভাগীয় শহর, জেলা শহর, উপজেলা শহরকে স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে উন্নয়ন জরুরি। এসব নগরে বিশেষত কর্মক্ষেত্র সুযোগ সৃষ্টি, মানসম্পন্ন শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা দেয়া গেলে ঢাকার ওপর চাপ কমে আসবে।
ঢাকার সমস্যা সমাধানে যেসব উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে, তা যথেষ্ট নয়। শুধু জনপ্রিয় প্রকল্পের কথা বিবেচনায় না এনে বরং প্রণীত পরিকল্পনার অগ্রাধিকারের তালিকানুযায়ী জনবান্ধব প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলে এ শহর উপকৃত হবে।
ভবিষ্যৎ ঢাকার সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করবে এ শহরের সহজ যোগাযোগের দূরত্বে থাকা নগর কেন্দ্রগুলোর সঙ্গে কতটা সফল যোগাযোগ মাধ্যম সৃষ্টি করা যায়। টঙ্গী, গাজীপুর, শ্রীপুর, কাপাসিয়া, মাধবদী, নরসিংদী, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নওয়াবগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, সিঙ্গাইর, ধামরাই, সাভার ইত্যাদি অত্যন্ত সম্ভাবনাময় নগর কেন্দ্র। সমন্বিত আঞ্চলিক পরিকল্পনা করে এসব নগর কেন্দ্রের সঙ্গে ঢাকাকে সংযুক্ত করা যেতে পারে। সড়ক ও রেলের মাধ্যমে ট্রানজিট ওরিয়েন্টেড ডেভেলপমেন্ট (টিওডি) এক্ষেত্রে বিবেচনায় আসতে পারে। এতে নগরগুলো পরস্পরের কাছ থেকে উপকৃত হবে এবং মাঝের প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা যাবে।
মূল্যায়ন: ঢাকার জন্য প্রণীত ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা, পরিবহন পরিকল্পনা, ড্রেনেজ পরিকল্পনাসহ অন্যান্য পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা খুব জরুরি। সময়মতো পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা না গেলে আমাদের সমস্যার আবর্তেই ঘুরপাক খেতে হবে। যেকোনো উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সামাজিক সাম্য, সামাজিক ন্যায়বিচার, আর্থসামাজিক অবস্থা, পরিবেশ, আর্থিক সামর্থ্য ইত্যাদি বিবেচনায় এনে সঠিকভাবে শহরের অন্তর্ভুক্তিমূলক জনবান্ধব পরিকল্পনা তৈরি হবে। তবে সবকিছুর উপরে আছে ভালো নগর শাসন। সুশাসন নিশ্চিত না করে ভালো শহর গড়ে তোলা সম্ভব নয়।
লেখক: অধ্যাপক, নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়





