৪০০ বছরের পুরনো শহর ঢাকা অনেক সমৃদ্ধ ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ধারক। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে বাংলার সুবেদার ইসলাম খান ১৬১০ সালে বাংলার রাজধানী বিহারের রাজমহল থেকে বাংলার ঢাকায় স্থানান্তর করেন। এরপর ক্রমেই মোগল শাসনামল, ব্রিটিশ উপনিবেশ, পূর্ব পাকিস্তানের প্রাদেশিক রাজধানীর যুগ পার হয়ে বর্তমানে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হওয়ার পথে সময়ের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় বেড়েছে শহরের পরিধি, এর আয়তন ও জনসংখ্যা। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে হয়েছে অপরিকল্পিত নগরায়ণ।
শহরের নগরায়ণের জন্য বিভিন্ন সময় নেয়া হছে অনেক উদ্যোগ। ১৯১৭ সালে স্যার প্যাট্রিক গ্যাডেস প্রথম ঢাকা শহরের জন্য একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা তৈরি করেন। এ পরিকল্পনায় তিনি শহরের মূল বৈশিষ্ট্য অক্ষুণ্ন রেখে শহরের বৃদ্ধির একটি দিকনির্দেশনা দেন। এখানে ঢাকা শহর কয়েকটি অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়। তিনি পুরনো ঢাকায় ঔপনিবেশিক অফিস ও শহরের কিছুটা বাইরের দিকে রমনা এলাকায় ঔপনিবেশিক শাসকদের আবাসের প্রস্তাব করেন। এ পরিকল্পনা কখনই আনুষ্ঠানিকভাবে গৃহীত হয়নি।
পরে ১৯৫৯ সালে প্রথমবারের মতো ঢাকার জন্য তৈরি হয় ঢাকা মাস্টারপ্ল্যান। এ পরিকল্পনায় শহরের উন্নয়নের জন্য দুটি প্রধান সমস্যা চিহ্নিত করা হয়। এগুলো হলো, স্থাপনা নির্মাণের জন্য নিয়মিত বন্যা প্লাবিত অঞ্চলের চেয়ে উঁচু জমির অভাব ও পুরান ঢাকার কেন্দ্রে স্থাপনার অধিক ঘনত্ব।
বাংলাদেশের জন্য প্রথম স্ট্র্যাটেজিক আরবান ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান Dhaka Metropolitan Area Integrated Urban Development Project (DMAIUDP) তৈরি হয় ১৯৮১ সালে। এ পরিকল্পনার প্রধানতম সমস্যা ছিল, এ পরিকল্পনা রাজউকের অন্যান্য পরিকল্পনা মতো সংবিধিবদ্ধ ছিল না। এ পরিকল্পনা তৈরি করে পরিকল্পনা কমিশন, যা নিয়মানুগভাবে প্রয়োগের এখতিয়ার তাদের ছিল না। এর প্রস্তাবনাগুলো পরবর্তীতে সরকারের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ ঢাকা উন্নয়ন নীতিমালায় প্রতিফলন ঘটায়নি। ফলে এ পরিকল্পনার সুফল আমরা পাইনি।
ঢাকা শহরের জন্য পরিকল্পনার সবচেয়ে বড় ও সংগঠিত উদ্যোগ দেখা যায় ডিএমডিপি স্ট্রাকচার প্ল্যান (১৯৯৫-২০১৫)। স্ট্রাকচার প্ল্যানও রাজউকের ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার এলাকার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে ঢাকা সিটি করপোরেশন, রাজউকের অভ্যন্তরে পাঁচটি পৌরসভা (গাজীপুর, টঙ্গী, সাভার, নারায়ণগঞ্জ, কদমরসুল), ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড ও ৭৭টি ইউনিয়ন কাউন্সিল। স্ট্রাকচার প্ল্যানের মূল কাজ ছিল দুটি। জাতীয় পর্যায়ের উন্নয়ন নীতিমালাগুলোর ব্যাখ্যা প্রদান ও ঢাকার দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য লক্ষ্য, নীতিমালা ও প্রস্তাবনা প্রণয়ন করা।
স্ট্রাকচার প্ল্যানে চারটি সেক্টর নির্দিষ্ট করা হয়: Spatial and Environmental Sector, Urban Area Policies, Socio-Economic Sector, Infrastructure Sector। এ চার সেক্টরের অধীনে ৩১টি পলিসি প্রস্তাব করা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র আটটি পলিসির অংশবিশেষ (সব পলিসির মাত্র ২৫ দশমিক ৮১ শতাংশ) বাস্তবায়ন করা হয়েছে।
ডিএমডিপি স্ট্রাকচার প্ল্যানের প্রস্তাবনা অনুযায়ী করা হয়েছে মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা (১০ বছরের জন্য)— আরবান এরিয়া প্ল্যান। পরিকল্পনাটির বাস্তবায়ন সম্পন্ন করার জন্য সম্পূর্ণ স্ট্রাকচার প্ল্যানকে মোট ২৬টি স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং জোনে ভাগ করা হয় এবং প্রতিটি স্ট্র্যাটেজিক প্ল্যানিং জোনের জন্য প্রস্তাবনা তৈরি করা হয়। কিন্তু সঠিক বাস্তবায়নের অভাবে এ পরিকল্পনা ঢাকা নগরীকে পরিকল্পিত নগরের রূপ দিতে পারেনি।
পরবর্তীতে ডিএমডিপি প্রণয়নের দীর্ঘ সময় পর ২০০৪ সালে রাজউক ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানের (ড্যাপ) কাজ শুরু করে এবং তারও দীর্ঘ সময় পর ২০১০ সালে অর্থাৎ ডিএমডিপি প্রণয়নের ১৫ বছর পর ড্যাপের কাজ শেষ করে। কিন্তু এরই মধ্যে ঢাকা শহর অপরিকল্পিতভাবে বেড়ে ওঠে এবং নাগরিক ভোগান্তি চরম আকার ধারণ করে।
সর্বশেষ ১৯৯৫-২০১৫ স্ট্রাকচার প্ল্যান সংশোধন করে পরবর্তী ২০ বছরের (২০১৬-৩৫) পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য রিজিওনাল ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (আরডিপি) গ্রহণ করা হয়। আরডিপির পরিকল্পনা সীমানা হচ্ছে চারটি সিটি করপোরেশন (ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ) ও চারটি পৌরসভা (সাভার, টঙ্গী, কালীগঞ্জ, তারাবো, সোনারগাঁ) এবং ৭০টি ইউনিয়ন পরিষদসহ সম্পূর্ণ রাজউক এলাকা। যদিও এ পরিকল্পনা ২০১৬ থেকে কার্যকর হবার কথা, কিন্তু এখন পর্যন্ত এটি অনুমোদন হয়নি।
ঢাকার নগরায়ণের অবস্থা সম্পর্কে আলোচনায় যে বিষয়গুলো অধিক গুরুত্বের সঙ্গে উঠে আসবে, তা হলো আবাসন, নাগরিক পরিষেবা, পরিবহন ও যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং পরিবেশ।
নাগরিক পরিষেবার আওতায় পড়ে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সরবরাহ, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পানি নিষ্কাশন, টেলিযোগাযোগ ও ইন্টারনেট ইত্যাদি। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে এসব নাগরিক পরিসেবার মান ক্রমান্বয়ে নিম্নমুখী। বর্তমানে ঢাকা শহরের জলাবদ্ধতা ও বিশুদ্ধ পানির অপ্রতুলতা এসব নাগরিক পরিষেবার নিম্নমানের সাক্ষ্য দেয়।
ঢাকার আবাসনের বর্তমান অবস্থার দিকে তাকালে প্রধানত যেসব বৈশিষ্ট্য প্রতীয়মান হয় তা নিম্নরূপ:
নগরে মানসম্পন্ন আবাসনের সংখ্যা খুবই সীমিত
৬০ শতাংশের বেশি জনগোষ্ঠী ক্ষণস্থায়ী অথবা অস্থায়ী আবাসনে বসবাস করে। নগরবাসীর ৪০ শতাংশ জনগোষ্ঠী বস্তি এলাকায় বাস করে।
সরকারিভাবে অনুমোদিত বাসস্থান ও তার সরবরাহ মোট প্রয়োজনের ১ শতাংশের বেশি নয়।
বর্তমান ঢাকার জীবনযাত্রায় অন্যতম প্রধান সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা যায় গণপরিবহনে অব্যবস্থাপনা ও রাস্তায় যানবাহনের ধীরগতি। অতিরিক্ত জনসংখ্যার কারণে রাস্তায় ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে যানবাহন। রাস্তায় অতিরিক্ত গাড়ির সংখ্যার সঙ্গে বায়ুদূষণের সরাসরি সম্পর্ক উপস্থিত। বিভিন্ন গবেষণা থেকে দেখা যায়, ঢাকার বাতাসে ভারী কণার পরিমাণ আদর্শ মানের চেয়ে, এমনকি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংখ্যা নির্দেশিত মানের চেয়েও অনেক বেশি। বিশ্বব্যাংকের গবেষণায় দেখা যায়, বায়ুদূষণের কারণে অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৫০০ মিলিয়ন ইউএস ডলার, যা শহরের সামগ্রিক উৎপাদনের ১ দশমিক ৭ থেকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশ।
ঢাকা মহানগরীর গণপরিবহন খাতে এসব সমস্যা সমাধানের জন্য অতীতে বেশকিছু প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। ১৯৯২-৯৪ সালে ইউএনডিপির অর্থায়নে reater Dhaka Metropolitan Area Integrated Transport Studz (DITS) শীর্ষক গবেষণা সম্পন্ন করা হয়, যার ভিত্তিতে বিশ্বব্যাংক Dhaka Urban Transportation Project নামের প্রকল্প হাতে নেয়। পরে ২০০৫ সালে Dhaka Transportation Coordination Board (DTCB) বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় তৈরি করে Strategic Transportation Plan, যার মূল উদ্দেশ্য ছিল, বর্তমান ও ভবিষ্যতে পরিবহন খাতে টেকসই বিনিয়োগের জন্য একটি সুষ্ঠু কাঠামো নিশ্চিত করা। STP-এর মূল সুপারিশগুলো হচ্ছে:
পূর্ব-পশ্চিমে যোগাযোগ বৃদ্ধি ও শহরতলি এলাকায় যোগাযোগ স্থাপনের জন্য ৫০টি রোড প্রজেক্ট।
তিনটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে তৈরি।
তিনটি বিআরটি ও তিনটি এমআরটি সিস্টেম নির্মাণ।
বর্তমান সময়ে MRT-6 ও BRT-3 লাইনের অংশবিশেষের বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। আমরা আশাবাদী, এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে তা শহরের যানবাহনের গতি বৃদ্ধিতে কিছুটা হলেও সহায়তা করবে। গণপরিবহনের পাশাপাশি অন্য সাধারণ যানবাহন চলাচলের জন্য নতুন রাস্তা তৈরি করা প্রয়োজন। আমাদের ভূমির ব্যবহার ও যোগাযোগ ব্যবস্থার মাঝে সমন্বয় সাধন এবং বিদ্যমান সড়কের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার মাধ্যমে শহরের গণপরিবহন আরো উন্নত করার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। গণপরিবহনের ওপর চাপ কমিয়ে আনার জন্য শহরের পরিকল্পিত সম্প্রসারণ ও বিকেন্দ্রীকরণের উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
শহরের পরিবেশ উন্নয়নের মাধ্যমে বাসযোগ্য পরিবেশ তৈরি করার জন্য বর্তমানে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় Clean Air and Sustainable Environment প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, যার মূল উদ্দেশ্য ঢাকার বাতাসে দূষণের পরিমাণ কমিয়ে টেকসই পরিবেশের দিকে এগিয়ে যাওয়া। এসব প্রকল্প সম্পন্ন হলে ঢাকার বাতাসে কার্বন ও ভারী কণার পরিমাণ হ্রাস পাবে বলে আশা করা যায়।
এসব সমস্যা সমাধানে মূল শহরের ওপর চাপ কমানোর লক্ষ্যে মূল শহরের অদূরে উপশহর গড়ে তোলার কথা বিভিন্ন সময় আলোচিত হলেও তা কার্যকর রূপ কখনো নেয়নি। বিভিন্ন সময় উত্তরা, কেরানীগঞ্জে নতুন করে শহর তৈরির পরিকল্পনা করা হলেও কার্যত তা উপশহর হিসেবে গড়ে ওঠেনি, বরং মূল শহরের সঙ্গে মিশে গেছে।
ঢাকা শহরে ক্রমবর্ধমান উন্নয়ন ব্যয় সারা দেশের মানুষকে করেছে ঢাকামুখী। বাংলাদেশের নগরের মোট জনসংখ্যা প্রায় ৪২ মিলিয়ন, যার এক-তৃতীয়াংশ বাস করে শুধু ঢাকা মহানগরীতে। পাশাপাশি দেশের অর্থনীতিতেও এ শহরের অবদান অনস্বীকার্য। মোট জিডিপির ৪০ শতাংশ আসে এ শহর থেকে। এ সংখ্যা খুব দ্রুত হারে বেড়ে চলছে। এর পেছনে যেসব নিয়ামককে প্রধান হিসেবে চিহ্নিত করা যায়, তার মধ্যে রয়েছে:
জনসংখ্যার স্বাভাবিক বৃদ্ধি, যা মূলত জন্ম ও মৃত্যুহার দ্বারা নির্ধারিত হয়।
গ্রাম এলাকায় অপ্রতুল কাজের সুযোগের কারণে কাজের সন্ধানে বা অন্য কারণে রাজধানীতে স্থানান্তর হওয়া।
নগরের ভৌত আয়তন বৃদ্ধি, যার ফলে নতুন অন্তর্ভুক্ত এলাকার অধিবাসীকে শহরের অধিবাসী হিসেবে গণ্য করা।
ঢাকার ক্ষেত্রে আগের দুটি কারণের চেয়ে শেষের কারণটি জনসংখ্যার উচ্চবৃদ্ধি হারের জন্য বেশি অংশে দায়ী। পাশাপাশি গ্রাম থেকে অভিবাসনের কারণে শহরে জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ সব নাগরিক সুবিধার ওপর চাপ ফেলে, যা জীবনযাত্রায় দুর্ভোগ তৈরি করে। তাই শহরের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের জন্য জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সর্বাপেক্ষা জরুরি। পাশাপাশি গ্রাম থেকে শহরে স্থানান্তর কমিয়ে আনার জন্য গ্রামের উন্নয়ন, স্থানীয় শহরগুলোর মানোন্নয়নও ঢাকাকে বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। আর এসব উদ্যোগের জন্য প্রয়োজন সুশাসন, সামগ্রিক পরিকল্পনা এবং এর মধ্যে সমন্বয় ও সর্বাগ্রে উন্নয়নে দূরদর্শিতা।
লেখক: প্রকৌশলী-পরিকল্পনাবিদ
ব্যবস্থাপনা পরিচালক, শেলেটক্ (প্রা.) লি.





