গত শতাব্দীর ৭০ দশকের দ্বিতীয়ার্ধ পর্যন্ত রফতানি খাতে পোশাক শিল্পের নাম ছিল না। পাট ও পাটজাত দ্রব্য থেকেই মোট রফতানির ৮০ শতাংশ আসত। পাটনির্ভর রফতানি আয়ের আবার প্রায় অর্ধেকই ছিল কাঁচা পাট। পাটপণ্য বলতে পাটের সুতা, চট ও ব্যাগই রফতানি পণ্য নিয়ন্ত্রণ করত। পাট ব্যতীত অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ পণ্য না থাকায় জিডিপিতে সত্তরের দশকে রফতানি খাতের অবদান ৫-৬ শতাংশের বেশি ছিল না। ১৯৭৬ সালে রিয়াজ গার্মেন্ট ও জুয়েল গার্মেন্ট নামে দুটি কারখানা পোশাক রফতানিতে যোগ দেয়। রিয়াজ গার্মেন্ট ষাটের দশকেই পোশাক শিল্প কারখানা গড়ে তোলে। তবে তা ছিল স্থানীয় বাজারভিত্তিক। রিয়াজ গামেন্ট সর্বপ্রথম ১৯৭৭ সালে ফ্রান্সে পোশাক রফতানি করে। ১৯৭৮ সালে নুরুল কাদের, একজন মুক্তিযোদ্ধা ও সরকারি আমলা কোরিয়ার দাইয়ু কোম্পানির সহায়তায় পোশাক রফতানি শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৯ সালে আরো কয়েকটি কারখানা পোশাক রফতানিতে এগিয়ে এলে রফতানি কিছুটা গতি লাভ করে। তবে ১৯৮০-৮১ সালের আগ পর্যন্ত এ শিল্পের সংখ্যা ছিল হাতেগোনা।
১৯৭৭-৭৮ সালে ২২টি ফার্ম পোশাক রফতানি করে ৪০ হাজার ডলার আয় করে। এরপর ১৯৮২ সালে ১৯৭৩ সালে গৃহীত আমদানি প্রতিস্থাপন কৌশলের পরিবর্তে রফতানিমুখী কৌশল গ্রহণ করা হলে সরকারি প্রণোদনা ও বিদেশে সংরক্ষিত বাজার সুবিধার সুযোগে রফতানি খাতে আয় ও ফার্মের সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে।
১৯৭২-৭৮ সাল পর্যন্ত অর্থাৎ প্রায় গোটা সত্তরের দশকজুড়ে রফতানি খাতে নিরঙ্কুশ আধিপত্য ছিল পাট ও পাটজাত দ্রব্যের। তবে ক্রমেই পোশাক শিল্প পাটের স্থান দখল করে নেয়। ১৯৮৪-৮৫ সাল পর্যন্ত রফতানি খাতে পাট ও পাটজাত দ্রব্যের অংশ ছিল অর্ধেকের বেশি অর্থাৎ ৫৭ দশমিক ৮৬ শতাংশ। এর দুই বছর পর রফতানিতে এক নম্বরে উঠে আসে পোশাক এবং নব্বইয়ের দশকের শুরুতেই তা ৬০ শতাংশ এবং চলতি শতাব্দীর শুরুতে পোশাক শিল্পে দুই-তৃতীয়াংশ এবং পাট ও পাটজাত দ্রব্য ৫ শতাংশের নিচে নেমে যায়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রফতানিতে পোশাকের অবদান ৮২ শতাংশ আর পাট ও পাটজাত দ্রব্য একত্রে ৪ শতাংশের নিচে।
স্বাধীনতার পর থেকে আজ অবধি রফতানির চিত্র লক্ষ করলে একটি অদ্ভুত মিল খুঁজে পাওয়া যায়। তা হলো রফতানি আয় মূলত এক পণ্যনির্ভর। অর্থাৎ ১৯৭২ থেকে ১৯৮৪ পর্যন্ত রফতানির সিংহভাগ অর্থাৎ প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসত পাট থেকে, আর ১৯৮৫ থেকে আজ পর্যন্ত রফতানি আয় আসছে প্রধানত পোশাক থেকে। তবে পার্থক্য হলো, প্রথম দশকে পাট থেকে অর্জিত আয়ের অর্ধেক আসত কাঁচা পাট (শিল্পের কাঁচামাল) থেকে, আর পোশাকের পুরোটাই শিল্প পণ্য থেকে। তবে পোশাকের মূল্য সংযোজন ৩৫-৪০ শতাংশ (নিটিং শিল্পে ৬০ শতাংশের ওপর), আর পাটজাত দ্রব্যের ক্ষেত্রে এ হার ৮০ শতাংশের ওপর।
নানা প্রতিকূলতা সত্ত্বেও পোশাক আজ দেশের প্রধান শিল্প হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। রফতানি বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জিডিপিতে অবদান, যেদিক দিয়েই দেখা হোক না কেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে পোশাক শিল্পের অবদান অপরিসীম। স্বাধীনতার সাত বছর পর প্রায় শূন্য থেকে শুরু করে মাত্র ১২ বছরের মধ্যেই রফতানিতে বিলিয়ন ডলারে পৌঁছা এবং ১০ লক্ষাধিক শ্রমিকের কর্মসংস্থান করা অনেকটা অকল্পনীয় ছিল। ১৯৮১-৮২ সালে পোশাক শিল্পে শ্রমিকের সংখ্যা ছিল মাত্র ১৫ হাজার। আজ এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০ লাখে এবং এর ৭০ শতাংশই নারী শ্রমিক। ১৯৯৫-৯৬ সালে সমগ্র শ্রমশক্তিতে নারী শ্রমিকের অংশ ছিল ৩৮ শতাংশ, এর মধ্যে ৭ শতাংশ ছিল ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে। পোশাক শিল্পের কারণেই ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে নারী শ্রমিকের সংখ্যা ৪০ শতাংশ।
পোশাক রফতানির অবদানেই বৈদেশিক বাণিজ্যের ঘাটতি হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে রফতানি খাত চাপের মুখে থাকলেও আমদানি ব্যয়ের অর্ধেকেরও বেশি মেটানো হয় পোশাকের আয় থেকে। বাণিজ্য ঘাটতি হ্রাস, বৈদেশিক মুদ্রা রিজার্ভ বৃদ্ধির পাশাপাশি পোশাক শিল্পকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে অনেক সহযোগী ও সংযোগ শিল্প। সামগ্রিকভাবে এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত ৪০ লাখ শ্রমিক এবং সহযোগী শিল্প ও সেবা খাতে শ্রমিকের কর্মসংস্থানের ফলে দুই-আড়াই কোটি মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে উপকৃত হয়েছে। তাছাড়া সত্তরের দশকে আর দশটি উন্নয়নশীল দেশের মতোই বাংলাদেশ কাঁচামাল রফতানিকারক দেশের তকমা ভেঙে ফেলতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে সমাজের অবহেলিত নারী শ্রমিকদের কর্মসংস্থান বিশেষভাবে তাত্পর্যপূর্ণ। কেননা এতদিন নারী শ্রমিক প্রধানত কৃষি, কুটির শিল্প ও গৃহকর্মী হিসেবেই নিয়োজিত ছিল। পুরুষ শ্রমিকের সমান ও বেশি শ্রম দিয়েও কম মজুরি, ক্ষেত্রবিশেষে বিনামজুরিতে কেবল খাবারের বিনিময়ে নারীদের দিনব্যাপী কাজ করতে হতো। এ অবহেলিত নারীদের সনাতনী নিম্ন উৎপাদনশীলতার স্তর থেকে তুলনামূলক উচ্চ উৎপাদনশীল পোশাক শিল্পে নিয়ে এসেছে। যদিও প্রাপ্ত মজুরি জীবিকার জন্য প্রয়োজনীয় ন্যূনতম চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়। ফলে আর্থিক দৈন্য কাটেনি। এখনো ন্যূনতম মজুরি, বোনাস ও অনেক ক্ষেত্রেই উন্নত কাজের পরিবেশ সৃষ্টির দাবি পূরণ হয়নি। কিন্তু পোশাক শিল্প বিপুলসংখ্যক মেয়েকে শুধু শ্রমিক হিসেবে স্বীকৃতিই দেয়নি, তাদের নিজস্ব অর্থনৈতিক পরিচয় দিয়েছে। আজ তারা দেখছে, তাদের নিপুণ হাতে তৈরি পোশাক বাংলাদেশকে বিশ্বে নতুনভাবে পরিচয় করে দিচ্ছে। শিল্পে অংশগ্রহণের কারণে সমাজে নারীর ক্ষমতায়নের কথা বহির্বিশ্বেও প্রচারিত হচ্ছে এবং এর জন্য পোশাক শিল্পের নারীদের অবদানই সবচেয়ে বেশি।
পোশাক শিল্পের হঠাৎ আবির্ভাব ও দ্রুত বৃদ্ধিতে আবেগতাড়িত হয়ে অনেকেই একে পোশাক শিল্পের বিপ্লব অথবা সমাজে বৈপ্লবিক পরিবর্তন হিসেবে অভিহিত করেন। অর্থনীতি তথা সমাজ জীবনে পোশাক শিল্পের আগমন ও প্রভাব বিস্তারে ব্যাপক ভূমিকা স্বীকার্য হলেও একে বিপ্লব বলা অতিরঞ্জিত বৈ কিছু না। ইউরোপে সংগঠিত মাত্র কয়েক দশকের শিল্প বিপ্লব হাজার বছরের কৃষিভিত্তিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন সামন্তবাদী সমাজকে উলটপালট করে শিক্ষার প্রসারের মাধ্যমে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর, আধুনিক সমাজে পরিণত করেছে। তেমন কিছু বাংলাদেশে ঘটেনি। যদিও ইংল্যান্ডে বস্ত্র শিল্প দিয়েই বিপ্লব শুরু হয়েছিল। জন কের ফ্লাইং শাটল, জেমস হারগ্রিবসের পিস্পনিং জেনি, রিচার্ড আকরাইটের ওয়াটার ফ্রেম, জেমস ওয়াটসনের স্টিম ইঞ্জিন, স্যামুয়েল ক্রম্পটনের পাওয়ার লুম— এসব যুগান্তকারী আবিষ্কার মানুষকে একদিকে যেমন দৈহিক শ্রম থেকে মুক্তি দিয়েছে, তেমনি মানুষের উদ্ভাবনী শক্তির বিকাশ ঘটিয়ে চেতনাকে নাড়া দিয়েছে, যা বাংলাদেশে বিরল। অন্যদিকে হংকং, তাইওয়ান ও কোরিয়াও বাংলাদেশের মতোই পোশাক শিল্পের কোটা সুবিধা ও নিশ্চিত বাজার সুবিধা পেয়ে শিল্পায়ন শুরু করে এবং তিন দশকেই উন্নত দেশের প্রযুক্তি আত্মস্থ করে দ্রুত শিল্পায়িত দেশে পরিণত হয়। এসব দেশের পরিবর্তনও অনেকটা বৈপ্লবিক পরিবর্তনের মতোই। তবে বাংলাদেশ রফতানিমুখী পোশাক শিল্প সাড়ে তিন দশক আগে যাত্রা করলেও এসব দেশের মতো বিপ্লব বা বৈপ্লবিক পরিবর্তন কোনোটারই ধারেকাছে যেতে পারেনি।
সত্তরের দশকে এ শিল্পের আগমন ছিল অনেকটা আকস্মিক। অভিজ্ঞ উদ্যোক্তা দ্বারা উন্নত প্রযুক্তি, দক্ষ শ্রমিক ও ব্যবস্থাপক, জোগান ও বাজারের ঝুঁকি নিয়ে পোশাক শিল্প শুরু হয়নি। দেশের বিপুল সহজলভ্য সস্তা উদ্বৃত্ত শ্রমের পাশাপাশি সরকারি সুবিধা যেমন— শুল্কমুক্ত আমদানি, নগদ সহায়তা, ব্যাক টু ব্যাক এলসি, বন্ডেড ওয়্যারহাউজ ফ্যাসিলিটি, সর্বোপরি সংরক্ষিত বাজারের আকর্ষণে অনেকেই পূর্বাভিজ্ঞতা ছাড়াই অনেকটা তড়িঘড়ি করে আবাসিক বাসাবাড়িতে কারখানা করে ব্যবসায় নেমে পড়ে। যদিও বাংলাদেশের আগেই শ্রীংলকায় এ পোশাক শিল্পের যাত্রা হয়। কিন্তু আশির দশকের শুরুতে গৃহযুদ্ধের কারণে সেখানকার ক্রেতারা বাংলাদেশকে উপযুক্ত স্থান হিসেবে বেছে নেয়।
শিল্প-কারখানা স্থাপন মানেই ঝুঁকি গ্রহণ। কিন্তু বাংলাদেশে নিশ্চিত বাজার ও সরকারের প্রণোদনাসহ অন্যান্য সুবিধাপ্রাপ্তির কারণে ঝুঁকি গ্রহণের প্রয়োজন হয়নি। অর্থাৎ মূলধন সংগ্রহ, বাজার অন্বেষণ, উপকরণের জোগান অনেকটা সহজেই পাওয়ায় ব্যবসায় ন্যূনতম অভিজ্ঞতাহীন অনেকেই পোশাক শিল্পে প্রবেশ করে এবং সফলকাম হয়। পুঁজি, প্রযুক্তি, নিশ্চিত বাজার ও ন্যূনতম মাত্রায় মূল্য সংযোজনের কারণে অনেকেই দীর্ঘদিন এ পোশাক শিল্পকে বাণিজ্য সহযোগী শিল্প হিসেবে অভিহিত করেছে। অবশ্য নব্য শিল্পায়িত দেশের অনেকেই বাণিজ্য সহযোগী শিল্প দিয়ে শুরু করে আজকের অবস্থানে পৌঁছেছে।
তবে বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের আবির্ভাব ও উত্তরোত্তর প্রবৃদ্ধি এ শিল্পবহির্ভূত অন্যান্য শিল্প-কারখানা স্থাপন ও সম্প্রসারণে প্রভাবিত করতে পারেনি। অর্থাৎ শিল্প বহুমুখীকরণে কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই। ফলে রফতানি শিল্প আজো এক পণ্যনির্ভরতার ঝুঁকি নিয়ে টিকে আছে। ২০১৫ সাল পর্যন্ত পোশাক শিল্প দুই অংকের প্রবৃদ্ধি নিয়ে টিকে ছিল। ওই বছরই সরকারের পোশাক শিল্পের সংগঠন বিজিএমইএ ২০২১ সালে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী সামনে রেখে ৫০ বিলিয়ন ডলার রফতানি আয়ের লক্ষ্য নিয়ে ‘পথনকশা ২০২১’ ঘোষণা করে।
কিন্তু পরের বছর অর্থাৎ ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রফতানির প্রবৃদ্ধি হ্রাস পেয়ে দুই অংকের স্তর থেকে ১ দশমিক ৭২ শতাংশ নেমে আসে। তার মধ্যে পোশাকের প্রবৃদ্ধি ছিল ১ শতাংশের অর্ধেকেরও (দশমিক ৫-এর) কম। বর্তমানে মোট রফতানি আয় ৩৪ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন ডলারে শুধু পোশাক শিল্পের অবদান ২৮ বিলিয়ন ডলারের ওপর। ৫০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য অর্জন করতে হলে প্রবৃদ্ধি ১২ থেকে ১৪ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। বিগত দুই বছরের প্রবৃদ্ধির হার দেখে এ অর্জন অসম্ভব মনে হতে পারে। কিন্তু গত সাড়ে তিন দশকের অর্জিত প্রবৃদ্ধি সবসময় সরলরৈখিক ছিল না। ২০০৫ সালে কোটা উঠে গেলে নিশ্চিত বাজার হারিয়ে পোশাক শিল্প বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা অনেকেই করেছিলেন। কিন্তু কোটা উঠে যাওয়ার পরও দুই অংকের প্রবৃদ্ধি অর্জন করে এবং ২০০৮-০৯ সালে উন্নত বিশ্বে মন্দার সময়েও প্রবৃদ্ধি অব্যাহত ছিল। শুধু তা-ই নয়, মন্দা-পরবর্তী ২০০৯-১০ সালে রফতানি ৪১ শতাংশ বৃদ্ধি হয়েছিল, যা এ-যাবত্কালের সর্বোচ্চ। কিন্তু পোশাক শিল্পের প্রায় সাড়ে তিন দশকের অভিজ্ঞতা সত্ত্বেও নিজস্ব ব্র্যান্ড নিয়ে দাঁড়াতে ব্যর্থ হওয়ায় আজো ক্রেতাদের চাহিদানির্ভরতা কাটাতে পারেনি। তবে আগের তুলনায় হ্রাস পেয়েছে। কয়েক বছর আগে বিশ্বব্যাংকের প্রতিনিধিরা পোশাক শিল্পের মালিকদের বলেছিলেন, যেহেতু বাংলাদেশ তুলা উৎপাদন করে না, তাই পশ্চাৎ সংযোগ (ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ) শিল্পের প্রয়োজন নেই। এ উদ্ভট যুক্তি শোনামাত্রই শিল্পপতিরা তীব্র প্রতিবাদ করে বলেছিলেন, যেসব দেশে পোশাক শিল্প গড়ে উঠেছে, সেসব দেশের অধিকাংশই তুলা উৎপাদন করে না। এমনকি যেসব দেশে পোশাক শিল্প দিয়েই শিল্প বিপ্লব হয়েছে কিংবা দেশকে শিল্পায়িত করেছে, তারা কেউ তুলা উৎপাদনকারী দেশ নয়। পাকিস্তান ও ভারত তুলা রফতানিকারী দেশ, কিন্তু বাংলাদেশ এসব দেশ থেকে তুলা আমদানি করে তাদের চেয়ে বেশি পোশাক রফতানি করছে। পরে অবশ্য বিদেশী উপদেশ দানকারীরা তাদের বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন।
কিন্তু দীর্ঘ সাড়ে তিন দশকের অভিজ্ঞতায় দৃশ্যমান সাফল্য অর্জন করলেও এখনো বাংলাদেশ নিজস্ব ডিজাইন ও বৈচিত্র্যময় পণ্যের বাজার সৃষ্টিতে সক্ষম হয়নি। তবে আমাদের দেশেই যেমন বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় গ্রিন বা পরিবেশবান্ধব কারখানা আছে, আবার ক্রেতাদের চাপিয়ে দেয়া শর্ত পূরণে ব্যর্থ হওয়ায় শত শত কারখানাও বন্ধ হয়েছে। দু-একটি ক্ষেত্রে অনেক উদ্যোক্তা নিজস্ব উদ্যোগে ক্রেতাদের দ্বারস্থ হওয়া ছাড়াই বাজার দখলে সফল হয়েছেন। যেমন ডেনিম পোশাক ইউরোপের বাজারে শক্তিশালী চীনকে হঠিয়ে বাংলাদেশ প্রথম স্থান দখলে নিয়েছে। যদিও এ অর্জন মোট পোশাক রফতানির একটি খণ্ডিত অংশ মাত্র, তার পরও এ সাফল্যকে খাটো করে দেখার কারণ নেই। কেননা একটি সাফল্যই নিত্যনতুন সফল উদ্যোগের জন্ম দেয়। চার দশক আগে চীন বাংলাদেশের মতোই সস্তা শ্রমের সুবিধা কাজে লাগিয়ে পোশাক রফতানি শুরু করেছিল। আজ তারা নিত্যনতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনের মাধ্যমে বৈচিত্র্যময় উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরি করে উন্নত দেশের কাতারে। চীনের মতো দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ানও একইভাবে দেশকে শিল্পায়িত করেছে। কিন্তু আমরা এখনো সস্তা শ্রমের গুটিকয়েক পণ্য নিয়ে টিকে থাকার প্রতিযোগিতায় লিপ্ত। তাই পথনকশার লক্ষ্য অর্জনে আমাদেরও কৌশল পাল্টাতে হবে। উৎপানশীলতা বৃদ্ধি, পণ্যের গুণগত মান বৃদ্ধি ও পণ্য বহুমুখীকরণে নজর দেয়া প্রয়োজন।
বিশেষ করে উৎপাদনশীলতা ও গুণগত মান বৃদ্ধির ক্ষমতাকে বলা হয় শিল্পায়নের ইঞ্জিন। এ ইঞ্জিন কাজ করে উন্নত প্রযুক্তি ও দক্ষ শ্রমশক্তি— এ দুয়ের সমন্বয়ে। আমাদের নিজস্ব প্রযুক্তি নেই, প্রযুক্তি আমদানিনির্ভর। তবে প্রযুক্তি আমদানি করলেই উৎপাদনশীলতা বাড়বে না। প্রযুক্তির কার্যকরিতা নির্ভর করে তার প্রয়োগিক সাফল্যের ওপর। প্রযুক্তি আমদানি করে আত্মস্থ বা আত্তীকরণ এবং সফল প্রয়োগের উদ্যোগ গ্রহণের জন্য প্রয়োজন দক্ষ প্রকৌশলী, প্রযুক্তিবিদ, টেকনিশিয়ান ও দক্ষ শ্রমিক এবং প্রয়োজন আরঅ্যান্ডডিতে ব্যাপক বিনিয়োগ। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের ঘাটতি আছে।
পোশাক শিল্প দেশের শিল্পায়নে নতুন মাত্রা যোগ করেছে। ৪০ লাখ শ্রমিককে উৎপাদনশীল কাজে অন্তর্ভুক্ত করে দারিদ্র্য বিমোচনে অবদান রেখেছে। এ শিল্পের সম্ভাবনা ব্যাপক। পোশাকের চাহিদা কোনোদিনই কমবে না। তবে প্রতিযোগীর সংখ্যাও বাড়ছে। বর্তমানে বিশ্বে এ পণ্যের বাজার ৪৫০ বিলিয়ন ডলারের। চীন একাই ৩৫ দশমিক ৩৬ শতাংশ নিয়ন্ত্রণ করছে। সে তুলনায় বাংলাদেশের অংশ ৬ শতাংশ। প্রথমদিকে যেনতেনভাবে কারখানা গড়ে উঠেছে। শ্রমিকের মজুরি, নিরাপত্তা, পৃথক গার্মেন্ট ভিলেজ ও প্রযুক্তি উন্নয়নের বিষয়গুলো গুরুত্ব পায়নি। এতদিন ক্রেতাদের চাহিদামতো পণ্য তৈরি হয়েছে। স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ গুরুত্ব পায়নি। উপেক্ষিত হয়েছে পণ্য বৈচিত্র্যকরণ, দক্ষতা ও গবেষণা। ফলে আজো কেবল টিকে থাকার চেষ্টাই চলছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্যই ৫০ বিলিয়ন ডলারের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। লক্ষ্য ছাড়া কর্মপরিকল্পনা অর্থহীন, অনেকটা মাঝিবিহীন নৌকার মতোই। তাই পোশাক শিল্প মালিকদের পথনকশা ২০২১ ঘোষণা একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। তবে পথনকশা ঘোষণাই যথেষ্ট নয়। বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা সেটাই আসল। প্রত্যাশা থাকবে, অতীতের অনেক পরিকল্পনামতো শুধু ঘোষণায় সীমাবদ্ধ না রেখে পথনকশা ২০২১ বাস্তবায়নের মাধ্যমে মালিক, শ্রমিক, শুভাকাঙ্ক্ষী, সর্বোপরি জনগণকে সঙ্গে নিয়ে স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী পালন করবে।
লেখক: অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ
পরিচালক, অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
আলোকচিত্রী: সোহেল আহমেদ





