প্রায় ১০০ বছর আগে যতীন্দ্র মোহন রায় তার ঢাকার ইতিহাস গ্রন্থে সমকালীন ঢাকার ভৌগোলিক সীমা ও প্রাকৃতিক অবস্থানের একটি রূপরেখা দিয়েছিলেন। এর সঙ্গে বর্তমান সময়ের ভূগোল ও প্রাকৃতিক অবস্থাকে মিলিয়ে দেখা যেতে পারে। যতীন্দ্র মোহন রায় বাংলার একটি সুপ্রসিদ্ধ স্থান হিসেবে ঢাকাকে উপস্থাপন করেছেন। ঢাকা জেলা সে সময় অবিভক্ত থাকায় এ সীমাটিও তখন বিস্তৃত ছিল। সেই অর্থে বৃহত্তর ঢাকার সীমায় তেমন পরিবর্তন নেই। যেমন ঢাকা জেলার উত্তরে রয়েছে ময়মনসিংহ, পশ্চিম সীমায় ফরিদপুর ও পাবনা জেলা। পূর্ব দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে মেঘনা নদী।
১০০ বছর আগে বৃহত্তর ঢাকা জেলার আকৃতি ছিল অনেকটা বর্গাকার। মোট আয়তন ২ হাজার ৭৮২ বর্গমাইল। সে সময়ের আদমশুমারি অনুযায়ী বৃহত্তর ঢাকার লোকসংখ্যা ছিল ৩০ লাখ। বর্তমান সময়ে বৃহত্তর ঢাকা জেলা খণ্ডিত হয়েছে। জন্ম নিয়েছে নারায়ণগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নরসিংদী আর মানিকগঞ্জ জেলা।
১৫৫০ সালে পর্তুগিজ নাবিক জোয়াও দ্য ব্যরসের আঁকা মানচিত্রে দেড় বর্গকিলোমিটারের জনবসতিপূর্ণ একটি নগরী হিসেবে ঢাকা শহরের পরিচিতি তুলে ধরা হয়েছে। ঢাকা নগরীর দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ অর্থাৎ আজকের পুরান ঢাকাকে ঘিরে ঢাকা নগরীর যাত্রা হলেও ঢাকা নগরীর জনবসতির বিস্তার শহরতলিতে ছড়িয়ে গিয়েছিল মোগল-পূর্ব যুগেই। পনেরো শতকে মিরপুরে, বর্তমান মিরপুরের ১ নং সেকশনে শাহআলী বোগদাদির মাজারসংলগ্ন সুলতানি মসজিদ (অধুনা বিলুপ্ত) এর বড় প্রমাণ। নগর বিকাশ প্রক্রিয়া মোগল যুগে অব্যাহত ছিল। প্রত্নতাত্ত্বিক সূত্রে এ সিদ্ধান্তকে আরো প্রামাণ্য করা যায়। কারণ সূত্রাপুর থেকে হাজারীবাগ পর্যন্ত প্রধান শহর সীমায়িত থাকলেও দক্ষিণে পাগলা পুল, উত্তরে ধানমন্ডি ঈদগাহ ও মোহাম্মদপুরে সাতগম্বুজ মসজিদ এ নগর বিকাশকে নিশ্চিত করে।
১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের পর ঢাকা পূর্ববঙ্গ ও আসাম প্রদেশের রাজধানী হওয়ার সুবাদে ঢাকার নগরায়ণের ব্যাপ্তি ঘটতে থাকে। ১৯৪৭ সালে ঢাকা পূর্ব বাংলার রাজধানী হওয়ার পর ঢাকা শহরের বিস্তার প্রায় ৪০ বর্গকিলোমিটার দাঁড়ায়। ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের রাজধানী হওয়ার পর ঢাকা আরো বেশি মর্যাদাবান, বিস্তৃত ও ঘনবসতিপূর্ণ হতে থাকে।
তিনটি নদী ও একটি খাল ঘিরে রয়েছে ঢাকা শহরকে। এগুলো হচ্ছে— দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা, পশ্চিমে তুরাগ, পূর্বে বালু নদ ও উত্তরে টঙ্গী খাল। প্রাচীন সূত্রমতে, এককালে বালু নদের একটি শাখা ডেমরার কাছে পশ্চিমে প্রবেশ করে পশ্চিম-দক্ষিণে প্রবাহিত হয়ে ঢাকার বুক চিরে বুড়িগঙ্গায় পতিত হয়েছিল। এ নদীর নাম ছিল দোলাই। পরে কোনো এক যুগে নদীর পূর্ব অংশের অনেকটা ভরাট হয়ে যায়। তাই বুড়িগঙ্গা থেকে পুরান ঢাকার অনেকটা অংশ পর্যন্ত এ জলাধারকে মানুষ খাল মনে করে। এভাবে দোলাই নদী দোলাই খাল নামে সুপরিচিত হয়।
মোগল সুবাদার ইসলাম খান চিশতি ১৬১০ সালে ঢাকায় প্রশাসন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকা হয় মোগল সুবার রাজধানী। এর আগে সুলতানি শাসন যুগে ও বারোভূঁইয়াদের আমলে সোনারগাঁও ছিল শাসনকেন্দ্র। আকর সূত্রের মাধ্যমে ইতিহাসচর্চা না হওয়ায় মোগল-পূর্ব যুগের ঢাকার ইতিহাস অনেকটা ধোঁয়াচ্ছন্ন। এ কারণে ১৬১০-এর আগে ঢাকায় কোনো নাগরিক জীবন ছিল কিনা, এ বিষয়ে অনেক গবেষক স্পষ্ট বক্তব্য রাখতে পারেননি। সাম্প্রতিক গবেষণা নিশ্চিত করছে, ঢাকার জনবসতি অনেক প্রাচীন আর নাগরিক জীবনের অস্তিত্ব ছিল পনেরো শতকের মাঝপর্বেই। অর্থাৎ সুলতানি শাসন যুগে। হয়তো পরবর্তী গবেষণায় তা আরো পিছিয়ে যেতে পারে।
সতেরো শতকের প্রথম দশকে ঢাকা মোগল রাজধানীর মর্যাদা পায়। সেই থেকে গড়ে ও বেড়ে উঠতে থাকে ঢাকা নগরী। মোগলদের প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ প্রসঙ্গ আলোচনা করতে গিয়ে আইন-ই-আকবরী বৃহত্তর ঢাকা জেলার অবস্থান সম্পর্কে একটি ইঙ্গিত দিয়েছেন। তার মতে, সরকার বাজুহা ও সরকার সোনারগাঁওয়ের মধ্যবর্তী অঞ্চলে ঢাকার অবস্থান।
আলোচনার সুবিধার জন্য আলোচ্য ঢাকা নগরীকে দক্ষিণ-পশ্চিমে বুড়িগঙ্গা ও পূর্বে শীতলক্ষ্যা নদীর মধ্যবর্তী ভূখণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। সেন শাসন যুগে বিক্রমপুর যখন রাজধানীর মর্যাদা পেয়েছিল, তখন ঢাকার কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল সোনারগাঁও। সোনারগাঁও কেন্দ্রের অবস্থান শীতলক্ষ্যা নদীর আনুমানিক আট কিলোমিটার পূর্ব দিকে। বখতিয়ার খলজীর হাতে নদীয়া পতনের আগে সোনারগাঁও ছিল সেনদের অন্যতম শাসনকেন্দ্র। নদীয়া পতনের পর লক্ষ্মণ সেন পূর্ববঙ্গে চলে আসেন এবং বিক্রমপুরের শাসনভার গ্রহণ করেন। সোনারগাঁও তখন বিক্রমপুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর। তবকাত-ই-নাসিরির লেখক মিনহাজ-ই-সিরাজের বর্ণনা অনুযায়ী, ১২৬০ সালেও বঙ্গ লক্ষ্মণ সেনের উত্তরসূরিদের শাসনাধীনে ছিল। কিন্তু তবকাত-ই-নাসিরিতে সোনারগাঁওয়ের নাম উল্লিখিত হয়। মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার পর এক শতক পর্যন্ত সোনারগাঁও থেকে কোনো মুদ্রা জারির প্রমাণ নেই। মুহাম্মদ বিন তুঘলকের (১৩২৫-৫১ খ্রি.) রাজত্বকালেই সোনারগাঁও সর্বপ্রথম মুসলিম শাসনকেন্দ্রে পরিণত হয়। মধ্যযুগের শুরু থেকে সোনারগাঁও ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ শাসনকেন্দ্র। সুলতানি যুগে একটি শহরের অবস্থানকে নিশ্চিত করতে মুদ্রার সাক্ষ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ভারতের মুদ্রার ইতিহাসে বাংলার বিশেষ মর্যাদা এজন্য যে, মধ্যযুগে এখানে একটি জাতীয় মুদ্রা ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল। এ যুগে শুধু সরকার ব্যবস্থা পরিচালনার কেন্দ্রগুলো থেকেই মুদ্রা উত্কীর্ণ করা হতো না, ছোটখাটো শহরেও টাঁকশালের অস্তিত্ব ছিল বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এদিক থেকে বিচার করলে সোনারগাঁওয়ের পশ্চিমে বর্তমান ঢাকা ও ঢাকার কাছাকাছি কোনো অঞ্চলে টাঁকশালের অস্তিত্ব ছিল বলে জানা যায় না। সুলতানি যুগ অবসানের পর বারোভূঁইয়াদের অন্যতম শাসনকেন্দ্র ছিল সোনারগাঁও। ঈশা খাঁ ও তার পুত্র মুসা খাঁ শক্তি সঞ্চয় করেছিলেন শীতলক্ষ্যার পূর্ব তীরে। বারোভূঁইয়াদের দমন করার জন্যই ইসলাম খানকে ঢাকায় মোগল রাজধানী স্থাপন করতে হয়। শীতলক্ষ্যার পূর্বাঞ্চলে যে শক্তির উত্সভূমি, একে কাছে থেকে মোকাবেলা করার জন্য ইসলাম খান স্বাভাবিকভাবেই নদীর পশ্চিমাঞ্চলকে নিজ অবস্থান হিসেবে বেছে নেন। সে কারণেই বারোভূঁইয়াদের সঙ্গে ইসলাম খানের শেষ নৌযুদ্ধ হয়েছিল শীতলক্ষ্যা নদীতে।
বাংলায় মোগল ইতিহাসের অন্যতম আকর গ্রন্থ মির্জা নাথানের বাহারিস্তান-ই-গায়েবি। ইসলাম খানের সৈন্যবাহিনীর সদস্য নাথান উল্লেখ করেছেন, মোগলরা ঢাকায় আসার আগেই সাবেক কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় ‘ঢাকা দুর্গ’ নামে একটি দুর্গ অবস্থিত ছিল। এটি সংস্কার করে ইসলাম খানের বাসস্থান বানানো হয়। দুর্গটি সম্ভবত আফগান শাসন যুগে নির্মিত হয়েছিল। ঢাকা দুর্গের দক্ষিণে বুড়িগঙ্গার তীরের ঘাটটির নাম ছিল চণ্ডীঘাট। চণ্ডীঘাটটির পরবর্তী নাম হয় চকবাজার। ঢাকা দুর্গ থেকে চণ্ডীঘাট পর্যন্ত বাজারটির বিস্তার ছিল। সম্প্রতি এ পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারের ভেতর প্রত্নতাত্ত্বিক খনন চলছে। তাতে মাটির নিচে খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে দেয়ালের। হয়তো এই ঢাকা দুর্গের খোঁজ পাওয়ার অপেক্ষায় আছি আমরা।
ঢাকা নগরীর বিস্তারের যুগে ইসলাম খান (১৬০৮-১৩ খ্রি.) এখানে রাজধানী স্থাপন করেন এবং সম্রাটের নাম অনুসরণে এর নাম রাখেন জাহাঙ্গীরনগর (Abdul Karim, ‘Dhaka the Mughal Capital’, Dacca, Asiatic Society of Pakistan, p. 2)। এক শতকের চেয়ে সামান্য বেশি সময় ঢাকা প্রাদেশিক রাজধানীর মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত ছিল। এ সময় প্রশাসনিক বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে বিকাশ অব্যাহত থাকে।
সুলতানি যুগে বর্তমান ঢাকায় যখন প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে ওঠেনি, তখন সোনারগাঁও প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণেই ঢাকার প্রশাসন পরিচালিত হতো। পনেরো শতকের প্রথমার্ধে অবস্থার পরিবর্তন হয়। বাংলার স্বাধীন সুলতানি পর্বে দুটি প্রশাসনিক বিভাগ বা প্রদেশ করা হয়। ফার্সি লেখকরা যাকে ‘ইকলিম’ বলেছেন। একটি ইকলিম মোজ্জেমাবাদ আর অন্যটি ইকলিম মোবারকাবাদ। আজকের পুরান ঢাকা ছিল ইকলিম মোবারকাবাদের রাজধানী। সমকালীন শিলালিপি প্রমাণে ‘খাজা জাহান’ উপাধিধারী ইকলিম মোবারকাবাদের প্রশাসকের কথাও জানা যায়। লিপি প্রমাণে দেখা যায়, ঢাকাকে তখন ‘কসবা’ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে, যার অর্থ দুর্গ বা দেয়ালবিহীন শহর।
ঢাকা শহরের অতীত ও ঐতিহ্য
আজকের বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক জীবনের সোনাফলা উত্স খুঁজতে গেলে মধ্যযুগের ইতিহাসচর্চা জরুরি। কিন্তু আমাদের এ সময়ের ইতিহাস গবেষকদের অধিকাংশের গবেষণা অঞ্চল ঔপনিবেশিক যুগের ভেতরই আটকে গেছে। তাই ঐতিহ্য ভাবনা হয়ে পড়েছে অস্পষ্ট। এ কারণে মধ্যযুগ নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণার সঙ্গে যুক্ত হতে না পারায় পুরনো ধারণা থেকেই মনে করা হচ্ছে, সতেরো শতকের শুরুতে মোগলদের পূর্ব বাংলা দখল ও ঢাকায় রাজধানী স্থাপনের মধ্য দিয়েই ঢাকার নাগরিক জীবনের শুরু। আর এ খণ্ডিত ধারণা থেকে দেশবাসীকে ইতিহাস বিভ্রান্ত করে ঢাকা নগরীর ৪০০ বছর বা রাজধানী ঢাকার ৪০০ বছর বলে একটি অনৈতিহাসিক খণ্ডিত ধারণা ছড়িয়ে পড়েছিল।
প্রাক-সুলতানি যুগের ঢাকা
১৩৩৮ সালে ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ কর্তৃক সোনারগাঁওয়ে স্বাধীনতা ঘোষণার মধ্য দিয়ে শুরু হয়ে যায় ২০০ বছরব্যাপী বাংলার স্বাধীন সুলতানি রাষ্ট্রের যাত্রা। এ সময় থেকেই একটি ছোট্ট শহর হিসেবে ঢাকার অস্তিত্ব ইতিহাসের সূত্রে পাওয়া যায়।
সতেরো শতকের শুরুতে ঢাকায় মোগল অধিকার প্রতিষ্ঠার আগে এ যুগের আকর গ্রন্থ বাহারিস্তান-ই-গায়েবিতে মির্জা নাথান ঢাকার যে অবস্থার বর্ণনা করেছেন তা অনেকটা এমন— শহরটি বুড়িগঙ্গার পূর্ব তীরে প্রতিষ্ঠিত ছিল। বর্তমান বাবুবাজারের উত্তর-পূর্ব ও দক্ষিণ-পূর্বে কয়েক মাইল পর্যন্ত প্রলম্বিত ছিল।
বর্তমান পুরান ঢাকার অনেক স্থান-নাম হিন্দু নামে দীর্ঘকাল ধরে প্রতিষ্ঠিত হয়ে আছে। অনুমান করা হয়, এখানে প্রাচীনকাল থেকেই হিন্দু বসতি ও তাদের বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল। হাকিম হাবিবুর রহমান উর্দু ভাষায় লেখা তার ঢাকা পঁচাশ বরস পহেলে গ্রন্থে বলেছেন, বিক্রমপুর যখন সেন রাজাদের রাজধানী, তখন ঢাকার দক্ষিণাংশে হিন্দু বসতি গড়ে উঠেছিল। সে যুগের স্মৃতিবিজড়িত নামগুলো হচ্ছে লক্ষ্মীবাজার, বাংলাবাজার, সূত্রাপুর, জালুনগর, বানিয়ানগর, গোয়ালনগর, তাঁতীবাজার, সুতারনগর, কামারনগর, পাটুয়াটুলী, কুমারটুলী ইত্যাদি। এ নামগুলো মোগল-পূর্ব যুগে হিন্দু নিয়ন্ত্রিত নানা পেশাজীবীদের অবস্থানও নিশ্চিত করছে। রাজধানী সোনারগাঁওয়ের নিকটবর্তী হওয়ায় বাণিজ্য অঞ্চল বিস্তার করতে গিয়ে ঢাকার এ অঞ্চলে ক্রমে নাগরিক জীবনের বিস্তার ঘটে। সোনারগাঁও থেকে ঢাকার নগরায়ণের পথ প্রশস্ত হয় নদীপথের যোগাযোগ থাকায়। প্রাক-মোগল যুগে ঢাকার দক্ষিণ ও পূর্বসীমা নির্ধারণ করে যথাক্রমে বুড়িগঙ্গা ও দোলাই খাল। সুনির্দিষ্ট তথ্যের অভাবে প্রাক-মোগল ঢাকার পশ্চিম সীমানা নির্ধারণ করা কঠিন।
আমাদের দুর্ভাগ্য, ইতিহাস ও ঐতিহ্য গবেষণার দায়িত্বশীল কোনো প্রতিষ্ঠান অথবা ব্যক্তিগবেষক কেউ এতকাল ঢাকা নামের শহর বা এ জনপদের প্রাচীনত্ব অনুসন্ধানে এগিয়ে আসেনি। অথচ সাম্প্রতিককালে প্রত্নতাত্ত্বিক, ভূতাত্ত্বিক ও ভূগোল গবেষণা ঢাকায় হাজার বছরের প্রাচীন মানববসতি থাকার ইঙ্গিত দিচ্ছে। এর বড় কারণ, আমাদের ইতিহাসচর্চায় প্রাচীন ও মধ্যযুগ পর্ব অনেক বেশি উপেক্ষিত হয়ে আছে। সাম্প্রতিককালের প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণা যে প্রাথমিক ধারণা এনে দিচ্ছে, তাতে অনেকটা স্পষ্ট হচ্ছে, প্রত্নতাত্ত্বিক ও ভূতাত্ত্বিক ক্ষেত্রে বিজ্ঞানসম্মত গবেষণা হলে হয়তো সামগ্রিকভাবে বাংলার ইতিহাস নতুনভাবে লেখার প্রয়োজন হবে।
আজকের ঢাকা শহরকে বৃহত্তর সীমারেখায় রেখে সম্প্রতি ব্যক্তি উদ্যোগে কিছুটা অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। তাতে ঢাকার প্রাচীনত্ব সম্পর্কে নতুন সব তথ্য যুক্ত হচ্ছে। ক্রমে স্পষ্ট হচ্ছে আজকের এ ঢাকা শহরের সীমারেখায় মানববসতির যাত্রা হয়েছিল বহুকাল আগেই। ভূতাত্ত্বিক গবেষণার সনাতন ধারণায় কারো কাছে অবাক মনে হতে পারে এ ধারার মন্তব্য। কারণ সাধারণভাবে মনে করা হয়, ঢাকা শহরটি নিচু ভূমিরূপের ওপর গড়ে ওঠা। হয়তো একসময় সমুদ্র বা নদীর তলদেশে নিমজ্জিত ছিল। শুধু ঢাকা কেন, পুরো বাংলাদেশ সম্পর্কেই এমন ধারণা ছিল গবেষকদের মধ্যে। কিন্তু নতুন গবেষণা এ ধারণা অনেকটা পাল্টে দিচ্ছে। চার-পাঁচ হাজার বছর আগে বাংলার অনেকটাই ছিল সমুদ্র। তারপর ধীরে ধীরে পলিমাটি জমে গড়ে উঠেছে এ ভূমি। কিন্তু সাম্প্রতিক গবেষণা নিশ্চিত করছে, পুরো বাংলা না হলেও কয়েকটি বিচ্ছিন্ন অঞ্চলের ভূমি গড়ে উঠেছিল লাখ লাখ বছর আগে। ভূতত্ত্বের ভাষায় এ মাটি প্লাইস্টোসিন ভূমি। আজকের ঢাকা নগরীর বৃহত্তর সীমায় এ রকম পুরনো মাটির সন্ধান পাওয়া গেছে। শুধু মাটি নয়, মানববসতির স্বাক্ষর হিসেবে সেসব মাটি খননে প্রত্নবস্তুও পাওয়া গেছে। এ তথ্য ঢাকার প্রাচীনত্ব খোঁজার নতুন কৌতূহল তৈরি করেছে। গবেষণাসূত্রে দেখা গেছে, সাধারণভাবে ঢাকা নিচু এলাকা হলেও বিচ্ছিন্নভাবে এখানে কয়েকটি উঁচু অঞ্চল ছিল। ভূমি পরীক্ষায় দেখা গেছে, বর্তমান ঢাকার লালমাটিয়া, মিরপুর চিড়িয়াখানা এলাকা ও মিরপুরের সেনপাড়া পর্বতা এলাকা থেকে দক্ষিণ-পূর্বে কাঁঠালবাগান পর্যন্ত একটি সমতল প্লাইস্টোসিন উঁচু ভূমি ছিল। এছাড়া মধুপুরগড় থেকে একটি প্লাইস্টোসিন ভূমি পশ্চিমে সাভারের কিছু অঞ্চল অতিক্রম করেছে। এ সময়ের কয়েকটি বিচ্ছিন্ন ভূমিরূপ ছড়িয়ে আছে সাভারের বলিয়ারপুর এলাকার কোণ্ডা, ঢাকার মিরপুর, লালমাটিয়া ছাড়াও লালবাগ এলাকায়। বর্তমান উত্তরখান ও দক্ষিণখান এলাকার মাটিও প্লাইস্টোসিন যুগে গড়ে ওঠা।
দীর্ঘ কালপরিসরে ভূপ্রকৃতিতে নানা রূপান্তর ঘটে। আজকের ঢাকা শহরের পূর্ব দিকের মাতুয়াইল এলাকা অপেক্ষাকৃত নিচু অঞ্চল। ভূতাত্ত্বিক গবেষণার অংশ হিসেবে ১৯৯৩ সালে এখানে বোরিং পদ্ধতিতে খনন করা হয়েছিল। এ সময় বর্তমান সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাটির ৬০ সেন্টিমিটার গভীরে কয়েকটি প্রত্নমৃৎপাত্রের অংশ পাওয়া যায়। রেডিও কার্বন পদ্ধতিতে এ মৃৎপাত্রের বয়স নিরূপণ করা গেছে। পরীক্ষায় পাওয়া ফল থেকে অনেকটা নিশ্চিত হওয়া গেছে, ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী এলাকায় প্রায় আড়াই হাজার বছর আগেও মানববসতি ছিল।
আমরা বর্তমান আলোচনায় পাঠককে বিজ্ঞানভিত্তিক গবেষণার গভীরে নিয়ে যেতে চাই না। জটিলতা পরিহার করে সরলভাবে একটি চিন্তায় এসে দাঁড়ানো যায়। প্রাপ্ত তথ্যসূত্র নিশ্চিত করছে, আজকের এ ঢাকা নামের অঞ্চলে প্রায় হাজার বছর আগে নাগরিক জীবনের বিকাশ ঘটেছিল। এ সূত্রে সেন, সুলতানি আর মোগল পর্বে নাগরিক জীবনের পক্ষে প্রত্ন উপাদান পাওয়া গেলেও নতুন নতুন গবেষণা আর অনুসন্ধান আরো অতীতে গৌরবময় ঐতিহ্যের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অর্থাৎ হাজার হাজার বছর ধরে এ অঞ্চলে মানববসতি থাকার সম্ভাবনা সাংস্কৃতিক নিদর্শন দিয়ে এখন অনেকটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে। তাই একটি গর্বিত জাতি হিসেবে ঢাকার গৌরবের ঐতিহ্য উন্মোচনের জন্য এখন প্রয়োজন দীর্ঘ গবেষণা।
ইতিহাসের বিচারে ‘প্রাচীন বাংলা’ ধারণাটির অর্থ হচ্ছে কাল বিভাজনে প্রাচীন যুগ পর্বের বাংলা। সুদূর অতীত নয় বা প্রাগৈতিহাসিক যুগের বাংলা নয়। যখন থেকে নগরায়ণ হয়েছে, লিখিত তথ্য পাওয়া যাচ্ছে, তখন থেকে শুরু হচ্ছে প্রাচীন বাংলার কাল গণনা। এ পর্বে বাংলায় সুনির্দিষ্ট রাষ্ট্র কাঠামো গড়ে উঠতে থাকে। বড় দাগে বলা যায়, মুসলমান আগমন ও মুসলিম শাসন প্রতিষ্ঠার আগে বৌদ্ধ ও হিন্দু রাজাদের শাসনকাল প্রাচীন বাংলার কালপরিসরভুক্ত।
এ বৌদ্ধ ও হিন্দু যুগের শেষ পর্বে, বিশেষ করে আট থেকে তেরো শতক পর্যন্ত সময়ে ঢাকা নগরীর অবস্থান ও মর্যাদা কেমন ছিল, তা সুনিশ্চিত করে বলার মতো ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই। তবে সুপ্রাচীনকালে অর্থাৎ খ্রিস্টপূর্ব ৩০০ অব্দে ভারতীয় মৌর্য রাজাদের হাতে বাংলার একটি অংশ অধিকৃত হওয়ার অনেক আগেই আজকের ঢাকা নামের এ ভূখণ্ডের অস্তিত্ব নিশ্চিত করা যায়। এ পর্বে বাংলায় রাষ্ট্রীয় কাঠামোর যাত্রা হয়নি। বিচ্ছিন্নভাবে কোনো কোনো অঞ্চলে মানুষের বসবাস ছিল। এসব অঞ্চল পরিচিত ছিল জনপদ নামে। তেমনি একটি জনপদের নাম ‘বঙ্গ’। এখন অনেকটা নিশ্চিতভাবে বলা যায়, এ বঙ্গ জনপদের ভেতরেই আজকের ঢাকা ভূখণ্ডটির অবস্থান ছিল। ইতিহাসের নিয়ম মেনে বৌদ্ধ ও হিন্দু শাসন যুগের ঢাকাকে জানতে হলে এ সময়ের সীমাবদ্ধ ঢাকা শহর অঞ্চল নয়, বৃহত্তর আঙ্গিকে ঢাকার অবস্থান ব্যাখ্যা করতে হবে।
বঙ্গ একটি প্রাচীন জনপদ। খ্রিস্টপূর্ব যুগে আর্যদের লেখা গ্রন্থ ঐতেরেয় আরণ্যক-এ প্রথম ‘বঙ্গ’ অঞ্চলের কথা জানা যায়। হিন্দু পৌরাণিক গ্রন্থ রামায়ণে অযোধ্যার সঙ্গে মিত্রতা স্থাপনকারী দেশগুলোর একটি তালিকা রয়েছে। বঙ্গের উল্লেখ রয়েছে এ তালিকায়। মহাভারতেও বঙ্গের উল্লেখ পাওয়া যায়। মৌর্য শাসনের অবসানের পর বাংলার অনেকটা অঞ্চল ভারতীয় গুপ্ত সাম্রাজ্যের অধীনে চলে গিয়েছিল। এ গুপ্ত যুগের শিলালিপিতেও বঙ্গ নামটি উত্কীর্ণ হয়েছে।
সেন যুগে বঙ্গের দুটি ভাগ লক্ষ করা যায়। একটিকে বলা হতো বিক্রমপুর ভাগ, যার অবস্থান বিক্রমপুর পরগনা ও আজকের ঢাকার প্রাকৃতিক সীমা। আর অন্যটি নাব্যমণ্ডল। বর্তমান বরিশাল জেলা ও আরো পূর্ব দিকে সমুদ্র পর্যন্ত এর বিস্তার ছিল। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে এক অজানা নাবিকের লেখা পেরিপ্লাস অব দ্য ইরিত্রিয়ান সি গ্রন্থে পূর্ব ভারতের নানা অংশের বর্ণনা রয়েছে। এখানে একটি সমৃদ্ধ বন্দরের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন। এর নাম লিখেছেন ‘গঙ্গে বন্দর’। গঙ্গে বন্দরের অবস্থান নিয়ে গবেষকদের মধ্যে বিতর্ক রয়েছে। মেজর রেনেল প্রাচীন গৌড় নগরকে গঙ্গে বলেছেন।
গবেষক ভিএন ভিল বলেছেন, গঙ্গের অবস্থান রাজমহলে। হুগলিকে গঙ্গে বন্দর হিসেবে চিহ্নিত করতে চেয়েছেন উইল ফোর্ড। এ স্কেচ অব দ্য টপোগ্রাফি অ্যান্ড স্ট্যাটিস্টিকস অব ঢাকা গ্রন্থের লেখক জেমস টেইলর মনে করেছেন, মুন্সীগঞ্জের নিকটবর্তী ধলেশ্বরী নদীর তীরে গঙ্গে বন্দরের অবস্থান ছিল। তিনি আরো সুনির্দিষ্ট করে বলেছেন, ‘যেখানে বিখ্যাত বারুপী মেলা হয়, সেই জায়গাটিতে গঙ্গে বন্দরের অবস্থান ছিল।’ বারুপী মেলা সম্পর্কে টেইলরের বর্ণনাটি গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, হিন্দু যুগে, বিশেষ করে সেন শাসনকালে বারুপী মেলা অনুষ্ঠিত হতো। এর আগে স্থানটির নাম ছিল লক্ষ্মীবাজার বা লক্ষ বাজার। এ নামকরণের একটি কারণ ছিল। বলা হয়ে থাকে, বিক্রমপুরের রাজা আদেশ দিয়েছিলেন, যেসব বণিকের কমপক্ষে এক লাখ মুদ্রা পুঁজি আছে, তারা এখানে ব্যবসা করতে পারবেন। এ থেকে লক্ষবাজার নাম হয়েছে এবং পরে তা কিঞ্চিৎ বিকৃত হয়ে রূপান্তর হয়েছে লক্ষ্মীবাজার নামে। পরবর্তী সময়ে বর্তমান ঢাকার দক্ষিণাংশে ব্যবসা-বাণিজ্যের মাধ্যমে নাগরিক জীবনের বিস্তার ঘটলে লক্ষ্মীবাজারের ব্যবসায়ীরা এখানে নতুন বাণিজ্য কেন্দ্র স্থাপন করেন। বর্তমান পুরান ঢাকার লক্ষ্মীবাজার এ ইতিহাস বহন করছে।
এখানেই শেষ নয়। গঙ্গে বন্দরের অবস্থান বিচার করে প্রাচীন ঢাকার নাগরিক জীবন খোঁজার আরেকটু অবকাশ আছে। বাংলাদেশের প্রাচীন যুগে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক অঞ্চলে অনেক ক্ষেত্রে নিরাপত্তার কারণে মাটির বা ইটের দুর্গ নির্মাণ করা হতো। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে প্রতিষ্ঠিত ভারতীয় মৌর্য রাজাদের প্রদেশ পুণ্ড্রবর্ধনভুক্তির রাজধানী পুণ্ড্রনগর ছিল ইটের দেয়ালে ঘেরা নগরী। আজকের বগুড়ার মহাস্থানগড়ই ছিল সে যুগের পুণ্ড্রনগর। পুণ্ড্রনগরের সমসাময়িককালে বাণিজ্য নগরী প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল নরসিংদী জেলার উয়ারী-বটেশ্বরে। এ নগরীও একসময় মাটির দুর্গে ঘেরা ছিল। এসব বড় উদাহরণ ছাড়াও ছোট ছোট অঞ্চলে দুর্গ গড়ার কথা জানা যায়। দুর্গ ঘেরা কোনো স্থান বা অঞ্চল অনেক সময় কোট বা গড় নামে পরিচিত। সাধারণত নদীপথের ধারেই কোট বা গড়ের অবস্থান ছিল। কোটবাড়ী নাম এ ধারণার প্রমাণ বহন করে। এ কোট বা গড়গুলো সাধারণত দুর্গ ঘেরা হতো। এখানে থাকত সেনাছাউনি, খাজনা আদায়কারী কর্মকর্তার অফিস ও ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্র।
ঢাকা মহানগর এলাকায় প্রাচীনকালে এমন অন্তত তিনটি দুর্গ থাকার কথা জানা যায়। মিরপুর ও গাবতলীর মাঝামাঝি এমন একটি দুর্গের অস্তিত্ব ছিল বলে সাম্প্রতিক গবেষণায় অনুমান করা হচ্ছে। এ এলাকার ভেতরে তিনটি স্থানের নাম পাওয়া যায়। এগুলো হচ্ছে কোটবাড়ী, দিয়াবাড়ী ও দরিয়াঘাট। এ নামগুলো সুলতানি যুগের আগের সময়ের বলে মনে করা হয়। কারণ সুলতানি যুগ পর্ব থেকে পরবর্তী সময়ে এখানে কোটবাড়ী ধরনের গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কাঠামো থাকার মাতো ঐতিহাসিক প্রমাণ আমাদের হাতে নেই। কোটবাড়ী জায়গাটি বর্তমানে গাবতলীর পর্বতা সিনেমা হলের পেছনের দিকে তুরাগ নদীর তীরে অবস্থিত। প্রাচীন বাংলায় তুরাগ নদী অনেক প্রশস্ত ছিল। নদীর উত্তর সীমায় ছিল সাভারের বিরুলিয়া আর দক্ষিণে ছিল মিরপুরের উঁচু ভূমি। দরিয়াঘাট নামকরণে নদীর বিশালতার একটি ভূমিকা থাকতে পারে। কোটবাড়ী নামের ব্যবহার মুসলিম-পূর্ব যুগ অর্থাৎ প্রাচীন বাংলায় পাওয়া যায়। এ যুক্তিতে অনুমান করা যায়, কৌশলগত কারণে তুরাগ নদীর এ তীরাঞ্চলে দুর্গ সুরক্ষিত শুল্ক আদায়ের একটি প্রশাসনিক ইউনিট স্থাপিত হতে পারে। আগেই বলা হয়েছে, প্রাচীনকালে কোটগুলো নদীর তীরে প্রতিষ্ঠিত হতো। নদীর দিকটি খোলা রেখে বাকি তিন দিকে দেয়া হতো মাটির উঁচু বেষ্টনী বা দেয়াল।
মাটি কাটার কারণে মিরপুরের কোটবাড়ীর তিন পাশেই ছিল গভীর পরিখা। কিছুকাল আগেও এ নিচু ভূমির অস্তিত্ব দৃশ্যমান ছিল। কয়েকটি স্থানের নাম আমাদের ধারণাকে আরেকটু স্বচ্ছ করে। কোটবাড়ীর কয়েক কিলোমিটার পূর্ব দিকে প্রথমে পাইকপাড়া ও আরো পূর্ব দিকে সেনপাড়া পর্বতা বলে একটি স্থান রয়েছে। হিন্দু শাসন যুগে লাঠিয়াল যোদ্ধাদের পাইক বলা হতো। চৌদ্দ শতকের মাঝামাঝি বাংলার স্বাধীন সুলতান শামসউদ্দিন ইলিয়াস শাহর সৈন্যবাহিনীর প্রধান শক্তি ছিল হিন্দু পাইক বাহিনী। পাইকপাড়া সম্ভবত সৈন্যবাহিনীর ব্যারাকের স্মৃতিচিহ্ন বহন করছে। তবে এ নাম মুসলিম যুগ, না হিন্দু যুগের স্মৃতি বহন করছে, তা বলা মুশকিল। তবে সুলতানি বা মোগল যুগে ঢাকার এ অংশে মুসলিম প্রশাসন বিস্তৃত হয়েছিল, তেমন প্রমাণ পাওয়া যায় না। অবশ্য মুসলিম প্রশাসন না থাকলেও মুসলিম বসতিহীন ছিল না। কারণ পনেরো শতকে এখানে সুফি শাহ আলী বোগদাদী খানকাহ স্থাপন করে ইসলাম প্রচার করেছিলেন। শিলালিপি প্রমাণে তা নিশ্চিত করা যায়। মিরপুর ১ নং সেকশনে সুফির সমাধি রয়েছে। এ হিসাবে পাইকপাড়ায় যদি সেন বংশের শাসনকালে সেনাছাউনি গড়ে ওঠে, তবে বেসামরিক সেন বংশীয়দের বসতি অঞ্চল হিসেবে দু-আড়াই মাইল দূরে লাল মাটির উঁচু ভূমির নাম সেনপাড়া পর্বতা থাকাটা অযৌক্তিক নয় বলে ইতিহাসের যুক্তিতে বলা যেতে পারে। অবশ্য আরো গবেষণার পথ ধরেই নিশ্চিত হতে হবে। এজন্যই শেষ মন্তব্য করার মতো সময় এখনো আসেনি বলে আমরা মনে করি। তবুও কোটবাড়ী, পাইকপাড়া, সেনপাড়া নামের কারণে ও প্রাকৃতিক অবস্থানগত দিক পর্যবেক্ষণে অনুমান করা যায়, সেন শাসনকালে অর্থাৎ এগারো শতকের শেষার্ধ বা বারো শতকে আজকের ঢাকার এ শহরতলিতে একটি প্রশাসনিক কেন্দ্র গড়ে উঠেছিল।
সুলতানি যুগে ঢাকা
ঢাকার প্রশাসনিক গুরুত্বের প্রাচীনত্ব অনুসন্ধান করতে হলে সোনারগাঁওয়ের দিকেই ফিরে তাকাতে হয়। সেন শাসন যুগে বিক্রমপুর যখন রাজধানী, তখন ঢাকার কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল সোনারগাঁও। নদীয়া থেকে বিতাড়িত লক্ষ্মণ সেন বিক্রমপুরে চলে আসার পরও সোনারগাঁও গুরুত্বপূর্ণ শহর হিসেবে পরিচিত ছিল। মধ্যযুগের শুরু থেকেই সোনারগাঁও ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ শাসন কেন্দ্র।
সেন শাসন যুগে বিক্রমপুর যখন রাজধানীর মর্যাদা পেয়েছিল, তখন ঢাকার কাছাকাছি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল ছিল সোনারগাঁও। সোনারগাঁও কেন্দ্রের অবস্থান শীতলক্ষ্যা নদীর আনুমানিক আট কিলোমিটার পূর্ব দিকে। বখতিয়ার খলজীর হাতে নদীয়া পতনের আগে সোনারগাঁও ছিল সেনদের অন্যতম শাসন কেন্দ্র। পুরো বাংলা মুসলমানদের অধিকারে না এলেও এ পর্যায়ে দিল্লির সুলতানদের অধীনে বাংলায় তিনটি শাসন কেন্দ্র বা প্রদেশ অর্থাৎ ইকলিম প্রতিষ্ঠিত হয়। এর একটি ছিল উত্তর বাংলায়, যা ইকলিম লক্ষৌতি নামে পরিচিত। দ্বিতীয়টি ইকলিম সাতগাঁও। এর অবস্থান ছিল পশ্চিম বাংলায়। আর পূর্ব বাংলায় প্রতিষ্ঠিত ইকলিমের নাম ছিল ইকলিম সোনারগাঁও।
১৩৩৮ সালে দিল্লির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা ঘোষণা করে সোনারগাঁওয়ের সিংহাসন দখল করেন ফখরউদ্দিন মুবারক শাহ। স্বাধীনতা ঘোষণার পর সোনারগাঁও আর দিল্লির প্রদেশ বা ইকলিম রইল না। সোনারগাঁও নিজেই স্বাধীন রাজ্য হয়ে গেল। তাই সম্ভাবনা তৈরি হলো এ রাজ্যের অন্তর্গত এক বা একাধিক ইকলিম থাকার। বাংলায় স্বাধীন সুলতানি যুগের সূচনাকারী ফখরুদ্দিন মুবারক শাহর সময় থেকেই তার নামানুসারে ইকলিম মোবারকাবাদ নামটি ব্যবহার হতে থাকে। মোবারকাবাদের অবস্থান সম্পর্কে এইচই স্টাপলটন যে ধারণা দিয়েছেন, তার উদ্ধৃতি পাওয়া যায় বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ড. আহমদ হাসান দানীর বক্তব্যে। পূর্ব বাংলার একটি বড় পরগনা ছিল মোবারকাবাদ। সুলতানি বাংলার শিলালিপিতে দুটো ইকলিমের নাম পাওয়া যায়। একটি ইকলিম মুয়াজ্জমাবাদ, যা বর্তমান সোনারগাঁওয়ের পূর্ব সীমা থেকে ময়মনসিংহ হয়ে সিলেট অঞ্চল প্রর্যন্ত প্রসারিত ছিল। অন্যটি ইকলিম মোবারকাবাদ। মোগল যুগের সরকার বাজুহার ভৌগোলিক অবস্থানের সঙ্গে ইকলিম মোবারকাবাদ অভিন্ন বলে মনে করা হয়। স্টাপলটনের বক্তব্য অনুযায়ী ঢাকা, ফরিদপুর, ধলেশ্বরীর দক্ষিণ— এক কথায় বৃহত্তর বিক্রমপুর ইকলিম মোবারকাবাদের অঙ্গীভূত ছিল। আর সুলতানি যুগের শুরু থেকেই ইকলিম মোবারকাবাদের সীমান্ত অঞ্চল ও ড. দানীর ভাষায় প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে বর্তমান ঢাকার একাংশে নাগরিক জীবনের বিকাশ ঘটে।
নগরী হিসেবে ঢাকা ও এখানে রাজধানী গড়ে ওঠার আদি নিদর্শন শনাক্ত করতে দুটো শিলালিপির উদাহরণ উপস্থাপন করা যায়। বাংলার স্বাধীন সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহের (১৪৩৬-৫৬ খ্রি.) সময় খোদিত এ শিলালিপি দুটোর একটি থেকে স্পষ্টতই ধারণা করা যায়, ঢাকা তখন ইকলিম মোবারকাবাদের অন্তর্গত ছিল। প্রথম শিলালিপিটি ঢাকার নারিন্দায় একটি মসজিদের গায়ে সাঁটা রয়েছে। ফারসি ভাষায় লেখা এ শিলালিপির ভাষ্যে জানা যায়, মোসাম্মাৎ বখত বিনত নামের এক নারী মসজিদটি নির্মাণ করেছেন। দ্বিতীয়টি পাওয়া গেছে বর্তমান কেন্দ্রীয় কারাগারের কিছুটা পশ্চিমে গিরিদিকিল্লা নামের মহল্লায় নাসওয়ালাগলি মসজিদের সম্মুখে একটি তোরণের গায়ে। মসজিদ বা তোরণের অস্তিত্ব এখন আর নেই। ১৮৯৭ সালের ভূমিকম্পে ও বিশ শতকের শুরুর দিকে বজ্রপাতে মসজিদটি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। শিলালিপিটি প্রথমে ঢাকা কালেক্টরেটে ছিল। বর্তমানে তা জাতীয় জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। নারিন্দা শিলালিপি সূত্রে জানা যায়, মসজিদটি ৮৬১ হিজরি অর্থাৎ ১৪৫৬-৫৭ সালে নির্মিত হয়েছিল। নাসওয়ালাগলি শিলালিপি উত্কীর্ণের সময় জুন ১৪৫৯ সাল। সময়ের হিসাবে দুটো শিলালিপিই সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহর সময়ে উত্কীর্ণ। প্রথম শিলালিপির বক্তব্য বিষয় খুবই সীমিত। লিপি বিন্যাসে বোঝা যায়, ব্যক্তিগত উদ্যোগে মসজিদটি নির্মিত হয়েছিল। দ্বিতীয়টিতে মসজিদের সম্মুখে তোরণ নির্মাণের সাক্ষ্য রয়েছে। এটি সরকারি উদ্যোগে নির্মিত হওয়ায় সমকালীন সুলতান নাসিরউদ্দিন মাহমুদ শাহর নাম উত্কীর্ণ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা হিসেবে খাজা জাহানের নাম লেখা হয়েছে আর নির্মাণ অঞ্চল যে প্রদেশের বা ইকলিমের অন্তর্ভুক্ত, তার নাম লেখা হয়েছে ‘মোবারকাবাদ’। ভৌগোলিক অবস্থান অনুসারে মসজিদ দুটো ইকলিম মোবারকাবাদের অধিভুক্ত অঞ্চলের ভেতর ছিল।
তুঘলক যুগে দিল্লিতে প্রধান কর্মকর্তা বা উজিরকে খাজা জাহান উপাধি দেয়া হতো। সাধারণভাবে সুলতানি যুগে প্রাদেশিক শাসনকর্তাদের উপাধি ছিল খাজা জাহান। ধারণা করা হয়, ইকলিম মোবারকাবাদের শাসনকর্তা ছিলেন এ খাজা জাহান। এ থেকে গবেষকরা অনেকটা নিশ্চিত হয়েছেন, স্বাধীন সুলতানি বাংলার অন্তর্ভুক্ত মোবারকাবাদ প্রদেশের রাজধানী কেন্দ্র ছিল সে যুগে ঢাকার এ অংশে। খাজা জাহান নিজ তত্ত্বাবধানে এখানে মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। এতে সিদ্ধান্ত নেয়া সহজ হয়, মোগল অধিকারের অনেক আগে অন্তত পনেরো শতকের মাঝপর্বে ঢাকা ইকলিম মোবারকাবাদের রাজধানীর মর্যাদা পেয়েছিল। মোগল যুগে হয়তো এর বিস্তার ঘটে। সুবা বাংলার রাজধানী হিসেবে আরেকবার ঢাকা বিশেষ নাগরিক মর্যাদা লাভ করে।
লেখক: অধ্যাপক, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
ছবি: আর্কিটেকচারাল ভিউ অব ঢাকা





