এই মূহূর্তে ২০১৭ সালের নভেম্বরে দৈনিক পত্রিকাগুলোর বিনোদন পাতা ও ফেসবুকের উঠানগুলো সব ‘ডুব’ চলচ্চিত্রের আলোচনায় মুখর হয়ে আছে। অদ্ভুত কাণ্ড এই যে, একই ছবি নিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত ভাষ্য পাওয়া যাচ্ছে। এক পক্ষ বলছে, ‘ডুব’ বুঝতে হলে দর্শককে ‘চলচ্চিত্রের দর্শক’ হয়ে উঠতে হবে (এমন যেন, এরা যারা পরিচালকের আগের ছবিগুলো দেখার সময় চলচ্চিত্রের দর্শক ছিলেন না!)। অন্য পক্ষ বলছে, সরয়ার ফারুকী ডুব-এ ফারুকীত্ব হারিয়েছেন। ছবির প্রচারণায় পৃথিবীর সব মহান চলচ্চিত্র নির্মাতার নাম কোট করে করে তিনি নিজেকে সেই কাতারে বিবেচনা করার দাবি তুলেছেন। ‘ডুব’ দেখতে গিয়ে সেই ‘তাদের’ পাননি দর্শক, ফারুকীকেও পাননি। ফলে ‘ডুব’ ডুবেছে।

দুই পক্ষই বেশ সরব। ফেসবুকের কল্যাণে ঘরে বসেই এ সরবতা টের পাওয়া যাচ্ছে। এ সরবতায় ‘ডুব’-এর টিকিট বিক্রি বাড়ছে। চলচ্চিত্র নিয়ে আলোচনায় মানুষ সরব হলে তো সমস্যা নেই। সমস্যা হলো, একই ছবি নিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত ভাষ্য দর্শক সমালোচকদের কাছ থেকে পাওয়া!

বাংলাদেশের চলচ্চিত্র এখন এ রকম। এ রকম যে, আপনি বা আমি যে-ই হই না কেন, আমাদের চলচ্চিত্র চিন্তায় কোনো ইউনিফরমিটি নেই। আমাদের চলচ্চিত্র রুচি যেমনই হোক না কেন, যখন যার জন্য যেমন বললে নিজের কোনো না কোনো লাভ হবে, তেমন করেই আমরা কথা বলি। এটা কেবল চলচ্চিত্র বিষয়ে কথা বলতে গিয়েই আমরা করি তা নয়।

চলচ্চিত্র শিক্ষা, চলচ্চিত্র নীতি, চলচ্চিত্র অনুদান, সেন্সর নীতি, সিনেমা হল সংস্কার অনুদান, চলচ্চিত্র আন্দোলন, চলচ্চিত্র পুরস্কার, বিকল্প চলচ্চিত্র আন্দোলন— প্রায় সবকিছুতে ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির ব্যাপারটাই হয় মুখ্য অনুঘটক। আর এইভাবে লাভের গুড়ের ভাগ নিতে গিয়ে আমাদের কাঙ্ক্ষিত চলচ্চিত্রকে আমরা দূরে, আরো বহুদূরে পাঠিয়ে দিচ্ছি!

ফিরে দেখা

আমাদের পূর্বপুরুষ মানিকগঞ্জের ছেলে হীরালাল সেন (১৮৬৬-১৯১৭) ক্যামেরা হাতে তুলে নিয়েছিলেন মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের সেই জন্মলগ্নের কালে। উনিশ শতকের শেষ লগ্নে (১৮৯৬ সাল থেকে) প্যারিস, নিউইউর্ক, বোম্বে, কলকাতায় যখন চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রদর্শনের শুরু হয়েছিল, আমাদের হীরালাল সেনও সেই সময়েই চলচ্চিত্রের চর্চা আরম্ভ করেছিলেন। সেটা ব্রিটিশ ভারতের অবিভক্ত বাংলার প্রথম চলচ্চিত্রচর্চা। ইতিহাস বলে, ঢাকায় নবাব পরিবারের লোকেরা নির্মাণ করেন সুকুমারী (১৯২৭-২৮), দ্য লাস্ট কিস (১৯৩১)। জানা যায়, এ ছবি বাণিজ্যিকভাবে সিনেমা হলে মুক্তি পেয়েছিল। এরপর পাকিস্তান আমল। এ আমলের পূর্ব পাকিস্তানের প্রথম চলচ্চিত্র নাজীর আহমেদ পরিচালিত ইন আওয়ার মিডস্ট। এটি একটি প্রামাণ্যচিত্র। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর পূর্ব পাকিস্তান সফর ছিল এর বিষয়। পূর্ব বাংলার প্রথম কাহিনীচিত্র মুখ ও মুখোশ নির্মাণ করেন আব্দুল জব্বার খান। সবাক এ চলচ্চিত্র মুক্তি পায় ১৯৫৬ সালে। ১৯৫৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান আইন পরিষদে পাস হয় আইন। স্থাপিত হয় পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা। এখন এটি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা। এফডিসি এখনো সক্রিয় আছে। তবে তার এ মানের সক্রিয়তা আমাদের কাঙ্ক্ষিত ছিল কিনা, সে প্রশ্ন আমরা করতেই পারি। কারণ এটা জনগণের টাকায় পরিচালিত প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশে চলচ্চিত্রচর্চার ইতিহাসের ঝাঁপি খুলে বসার কারণ হলো একটু পেছন ফিরে দেখা। মাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্র যখন যাত্রা করেছিল, তখন কিন্তু আমরা ইউরোপ-আমেরিকার সমসাময়িক ছিলাম। তারপর ক্রমেই চলচ্চিত্রের বিষয় পরিকল্পনায়, নির্মাণ কুশলতায় তারা আমাদের ছাড়িয়ে গেছে। ছাড়িয়ে এমন জায়গায় গেছে, যেখানে তাদের মানে পৌঁছার কথা আমরা ভাবতেও পারি না। কথা হলো, ইউরোপ-আমেরিকা কেন আমাদের মাপকাঠি হবে? শতভাগ প্রযুক্তিনির্ভর এ শিল্পমাধ্যমের সব প্রযুক্তি পশ্চিম আবিষ্কার করেছে। আমরা এ প্রযুক্তির ভোক্তামাত্র। ভোক্তার একমাত্র অধিকার তার চলচ্চিত্রের বিষয় নির্ধারণে। কিন্তু আমাদের চলচ্চিত্র কি আমাদের হয়ে উঠেছে?

বিশ্বায়ন এবং অতঃপর

আসলে বিশ্বায়নের এ কালে ইন্টারনেট সারা পৃথিবীর মানুষকে এক জায়গায় এনে ফেলেছে। বাস্তবের হাজার হাজার মাইল দূরত্ব কম্পিউটারের কিবোর্ডের একটি টোকায় ঘুচতে সময় লাগছে মুহূর্ত মাত্র। ভার্চুয়ালি আমরা খুব কাছাকাছি। দূর দেশের যেকোনো খবর আমরা পেয়ে যাচ্ছি আমাদের প্রত্যন্ত কোনো গ্রামে বসেও। সরাসরি যন্ত্রের হাত ধরে দূর দেশের রুপালি পর্দার সোনালি খবরের চমক এসে বিষয় নির্বাচনে নিবিড় নিমগ্ন নিজস্ব চলচ্চিত্রের ধ্যান, প্রয়োজনীয় ধ্যান থেকে আমাদের সরিয়ে নিচ্ছে। ফলে আমরা আজ অস্কার, কাল কান, পরশু মস্কো-জার্মানি-মুম্বাই করতে গিয়ে নিজের ভেতরে ঢুকে নিজের চলচ্চিত্রকে পুষ্ট হতে দিতে পারছি না।

আর পৃথিবীজুড়েই চলচ্চিত্র নির্মাণ ও এর প্রদর্শন কৌশল বদলে যাচ্ছে। নিত্যনতুন প্রযুক্তির বদলে কোনো বিশেষ কৌশলে চলচ্চিত্র নির্মাণ ও এর প্রদর্শন ধরে রাখা যাচ্ছে না। পরিবর্তনটা এত দ্রুত হচ্ছে যে, আগের যন্ত্রগুলো বাতিল হয়ে যাচ্ছে। নতুন যন্ত্রে স্থিত হওয়া যাচ্ছে না। যান্ত্রিক কলাকৌশলনির্ভর এ শিল্পমাধ্যমটি প্রতিনিয়ত নিজেকে বদলে নিচ্ছে। কিন্তু আমাদের দেশের জাতীয় চলচ্চিত্র নীতিমালা এ পরিবর্তনশীলতাকে আত্মস্থ করা তো দূরের কথা, অনুধাবনও করে উঠতে পারছে না।

চলচ্চিত্র অধ্যয়ন

সরকারি ব্যবস্থাপনায় ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট’ যাত্রা করে ২০১৪ সালে। বিকল্প চলচ্চিত্র আন্দোলনকর্মীদের সুদীর্ঘ দাবির ফল চলচ্চিত্র শিক্ষার এ প্রতিষ্ঠান। পাঠ্যসূচি, কারিগরি সুযোগ-সুবিধা, নিজস্ব ক্যাম্পাস, শিক্ষক— প্রাথমিকভাবে প্রয়োজনীয় অনেক কিছু ছাড়াই ইনস্টিটিউটটি চালু হয়। চলচ্চিত্রের মতো একটি বিশেষায়িত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গভর্নিং বডিতে এমন কিছু মানুষ আছেন, যাদের প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চলচ্চিত্র শিক্ষা বিষয়ে ধারণা নেই। শ্রদ্ধা রেখেও বলতে দ্বিধা নেই, তাদের অনেকের অভিজ্ঞতা নেই শিক্ষার নীতি নির্ধারণেরও। গভর্নিং বডির মতো নীতিনির্ধারণী প্লাটফর্ম প্রায় পুরোটাই কলমপেষা সরকারি কর্মকর্তাদের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এ প্রতিষ্ঠানকে ঘিরেও এমন সব সিদ্ধান্ত হয়, যাতে এ লেখার শুরুতে বলা সেই ‘ব্যক্তিগত লাভালাভের’ ব্যাপারটিই মুখ্য হয়ে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চলচ্চিত্র শিক্ষার উদ্দেশ্যকে অনেক পিছিয়ে দেয়।

সরকারি এ প্রতিষ্ঠানের বাইরে বেশ কয়েকটি সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়েও বিষয় হিসেবে চলচ্চিত্র পড়ানো হচ্ছে। সরকারি আমলাতন্ত্র না থাকলেও সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে যাওয়া সুবিধাতন্ত্র সেখানে আছে পুরোদমেই। আর চলচ্চিত্রকে শিল্প প্রকাশের একটি মাধ্যম হিসেবে বিবেচনার চেয়ে গণমাধ্যম হিসেবে বিবেচনার ফলে সাংবাদিকতার পাঠদান পাঠ্যসূচিতে প্রাধান্য পাচ্ছে। ফলে চলচ্চিত্রে আগ্রহী শিক্ষার্থীরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে চলচ্চিত্র অধ্যয়ন করতে পারছে না। গত পাঁচ-সাত বছরে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে চলচ্চিত্র পড়ানো হলেও এর সুফল সমাজে দৃশ্যমান নয়।

নেই দূরদৃষ্টি

মাস দুই-তিন আগে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউটের এক সেমিনারে গেলাম। ওখানকার এক ছাত্র বাংলাদেশের প্রেক্ষাগৃহ নিয়ে গবেষণা করেছে। তার এ গবেষণায় বৃত্তি দেয়া হয়েছে সরকার থেকে। অবাক হয়ে শুনলাম, নবীন এ গবেষকও তার তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করতে গিয়ে চলচ্চিত্রের পুরনো সেই প্রদর্শন ব্যবস্থার কথাই বলছেন! সেখানে উপস্থিত একাডেমিকস, প্রদর্শক নেতা, শিক্ষার্থী ও সরকারের কর্তাব্যক্তি— প্রায় সবাই চলচ্চিত্র প্রদর্শনীতে ডিজিটাল প্রযুক্তি সংযোজনের কথা বললেন। তার মানে, তারা এখনো হলনির্ভর সিনেমা প্রদর্শনের কথাই ভাবছেন! এখানেই অফ দ্য রেকর্ড শুনলাম, সিনেমা হল মালিকদের সরকার অনুদান দিচ্ছে। অনুদান দেয়া হচ্ছে যেন তারা তাদের হলগুলো ডিজিটাল চলচ্চিত্র প্রদর্শনের উপযোগী করে তোলেন। সিনেমা প্রদর্শন যার ব্যবসা, সে সরকারের টাকা ঋণ নয়, অনুদান পাচ্ছে! কিন্তু প্রশ্ন হলো, যেসব হল এরই মধ্যে ডিজিটালি কনভার্ট করা হয়েছে, সেখানেও কি আশানুরূপ দর্শক হচ্ছে? হচ্ছে না কিন্তু। হবেও না আর কোনোদিন। কারণ এখন সময়টা একুশ শতক। এখন মিলনায়তনই মানুষের সিনেমা দেখার একমাত্র জায়গা নয়। ভিডিও পাইরেসি, ডিভিডি পাইরেসির যুগ শেষে সিনেমার প্রদর্শনী এখন টেলিভিশন আর মুঠোফোনে এসে ঠেকেছে। নিজের সুবিধামতো সময়ে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের ছবি ঘরে বসেই দেখার সময় এখন। অথচ আমাদের সরকার বিপুল অংকের টাকা হল মালিকদের অনুদান দিচ্ছে! এমন সিদ্ধান্ত নেয়ার আগে এরই মধ্যে ডিজিটালি রূপান্তরিত হলগুলোয় দর্শকের উপস্থিতি বিষয়ে কোনো সমীক্ষা হয়েছে কি? জানামতে হয়নি। ফলে আমরা কী নিয়ে গবেষণা করব, কোন খাতে গবেষণা অনুদান দেব, কেন হল ব্যবসায়ীরা অনুদান পাবেন, এতে শেষ পর্যন্ত সিনেমার কী লাভ হবে, পাবলিক মানি খরচের আগে এদিকগুলো সমন্বিতভাবে কেউ ভাবছেন বলে মনে হয় না।

নির্মাণ সহায়তা

প্রতি বছর শিল্পমানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য সরকার অনুদান দেয়। কাহিনীচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র দুই রকম চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্যই অনুদান দেয়া হয়। অনুদান দেয়া ছবির সংখ্যা বাড়ানো হয়েছে। সহজেই অনুমেয়, নানা কানেকশন ছাড়া অনুদান প্রাপ্তি দূর অস্ত। আর অনুদান বাছাই কমিটিতে যারা থাকেন, তাদের কতজন প্রস্তাবনাটির কারিগরি ও শিল্পমান বাছাই করার যোগ্যতা রাখেন? যারা অনুদান পান, তাদের সবার প্রস্তাবনাও কি চলচ্চিত্র নির্মাণের যোগ্য? আর অনুদান পাওয়ার পর ঠিকঠাক নির্মাণ হয় কি ছবিগুলো? নির্মাণের পর সেগুলো কজন দর্শক দেখার সুযোগ পান? নাকি সরকারি অনুদানের সঙ্গে নির্মাতাকে আরো কিছু অর্থ সহায়তা দিয়ে ছবিটির প্রদর্শন স্বত্ব তৃতীয় কোনো পক্ষের কুক্ষিগত হয়ে যায়? চলচ্চিত্রকে কাঙ্ক্ষিত জায়গায় দেখতে হলে প্রশ্নগুলোর নির্মোহ উত্তর জানা দরকার আমাদের সবারই।

শেষ করার আগে

এসব কথা হতাশারই কথা। সবকিছু ভেঙে পড়ার এ কালে চলচ্চিত্র না ভেঙে থাকবে, তেমন তো নয়। সবকিছু নষ্টদের অধিকারে থাকার এ যুগে চলচ্চিত্র তাদের আওতার বাইরে থাকবে, তাও হওয়ার নয়। কিন্তু হতাশাই কি শেষ কথা হবে? না, হবে না।

প্রযুক্তি এখন এমন এক জায়গায় এসেছে, যখন বিশাল অর্থলগ্নি না করেও চলচ্চিত্র বানানো সম্ভব। সম্ভব দেশের সীমানা ছাড়িয়ে দূর দেশ থেকে অর্থ জোগাড় করা। নতুনভাবে সিনেমাকে মুক্তি দেয়াও সম্ভব। নতুন যন্ত্র, নতুন চিন্তা, নতুন স্বপ্ন ও এসবের সমন্বিত শত উদ্যোগের মধ্য দিয়ে বিশ্বায়নের এ যুগে নিজের ভূমিতে দাঁড়িয়ে সিনেমার ভাষা তৈরি করতে পারলে আমরা আমাদের কাঙ্ক্ষিত সিনেমা নিয়েই গর্ব করতে পারব।

 

লেখক: স্বাধীন চলচ্চিত্র নির্মাতা