আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি মৌলিক গলদ হলো, এটি এক ধরনের অবচেতন পাশ্চাত্যমুখিতা তৈরি করে দেয়। পশ্চিমে যা হয়েছে এবং যা হচ্ছে, তাকে আত্মস্থ করতে পারা মানেই সামাজিক উন্নতি। ফলে ভবিষ্যৎ দেখাতে এবং তা পরিকল্পনায় আমরা অবচেতনভাবেই কিছু পশ্চিমা প্রতীককে ঘিরে বভিষ্যৎ বিনির্মাণ করি। এটাকে এডওয়ার্ড সাঈদ বলেছিলেন এক ধরনের ‘সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদ’, যার মাধ্যমে পশ্চিমা বিশ্ব পৃথিবীর অন্যান্য মানবগোষ্ঠীর মানসিক জগৎ নিয়ন্ত্রণ করেছে। ঊনবিংশ শতাব্দীর ঔপনিবেশিক শাসনামলে এ ধরনের সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যবাদের বিস্তৃতি ঘটেছিল। হেগেল থেকে কার্ল মার্ক্স, অনেক পশ্চিমা বোদ্ধাই মনে করতেন, পূর্ব আর দক্ষিণের মানবসমাজ নিজেদের মনোজগৎ নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা অর্জন করেনি। ফলে ঔপনিবেশিক শাসন সম্ভব হয়েছে।
এসবের সঙ্গে ঢাকার নগরায়ণের সম্পর্ক কী? সম্পর্ক আছে। ঢাকার নগর ভবিষ্যৎ ভাবার সময় আমরা পশ্চিমা অথবা এশিয়ার পশ্চিমা ধাঁচের শহরগুলোকে ঘিরে চিন্তা করি। হাতিরঝিলের রাত্রিকালীন আলোর খেলা দেখে আমরা আত্মতৃপ্তি নিয়ে বলি, সিঙ্গাপুরের মতো লাগছে; লাস ভেগাসের বেলার্জিওর ফোয়ারার মতো লাগছে।
আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার মানসিকতায় বেশ কয়েকটি প্রতিবন্ধকতা কাজ করে। প্রথমটি হচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ দেখা এবং পরিকল্পনা করার দীর্ঘ সামাজিক ইতিহাস নেই। আমাদের শাশ্বত গ্রামীণ সমাজের সময়ের ধারণা চক্রাকার ও অপরিবর্তনশীল। ঋতু চক্রাকারে ঘুরবে, ফসল বোনা হবে আর ফলবে। কৃষিভিত্তিক প্রাচীন মিসরীয় সমাজ বছরকে ভাগ করত তিন ভাগে— নীল নদের বন্যার সময় বা আখেত, বন্যা-পরবর্তী ফসল বোনার সময় বা পেরেত ও ফসল ফলার সময় বা সেমু। এ নিয়মেই চলত মিসরীয় বার্ষিক পঞ্জিকা। আলজেরীয় কৃষকদের নিয়ে গবেষণা করে সমাজবিজ্ঞানী পিয়ের বুর্দ্যো দাবি করেছিলেন যে, কৃষিভিত্তিক সমাজগুলোর সময়জ্ঞান নির্ভর করে প্রকৃতির অপরিবর্তনীয় ধারণার ওপর। সময়কে জয় করার সম্ভাবনা নেই। এ কারণেই কৃষিভিত্তিক সমাজে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তার বিস্তার ঘটেছে কদাচিৎ। শিল্প বিপ্লব ঘটেছে, এমন শহরেই উদ্ভাবনের হার বেশি।
১৯৭১ সালেও বাংলাদেশ ছিল মূলত একটি গ্রামীণ সমাজ। নগর জনসংখ্যা ছিল মাত্র শতকরা ৭ ভাগ। বাংলাদেশের শাশ্বত শিল্প-সাহিত্য গড়ে উঠেছে গ্রামীণ জীবনকে ঘিরে। ধ্রুপদী গল্প-উপন্যাসের নায়ক জেলে, কৃষক ও জোতদারবিরোধী গ্রামীণ যুবক। আর খলনায়ক হলো কুটিল গ্রাম্য মোড়ল।
আশির দশক থেকে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির কারণে দ্রুত নগরায়ণ হতে থাকে। ঢাকামুখী, শহরমুখী ছিন্নমূল গ্রামীণ মানুষের স্রোত বাড়তে থাকে। বাংলাদেশের মানুষ, প্রশাসন ও নীতিনির্ধারকরা কিছু বোঝার আগেই দ্রুত ও বিস্ফোরক নগরায়ণ বাংলাদেশের নতুন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়ায়। এ পরিস্থিতিতে নগরায়ণের পথে অপ্রস্তুত গ্রামীণ সমাজের যা হওয়ার ছিল, তা-ই হয়েছে। সবই প্রতিক্রিয়াধর্মী। ‘ভবিষ্যৎ-ধর্মী’ পরিকল্পনা হলে আজ নদী-নালা আর জলাভূমি ভরাট করে পূর্ব ঢাকার এ অবস্থা হতো না। যদি ভবিষ্যতের কথা ভাবা হতো, পরিবেশ সংরক্ষণের কথা ভাবা হতো, তাহলে তথাকথিত আবাসন প্রকল্প পূর্বাচল হতো না ছয় হাজার একরের বেশি জলাভূমি ভরাট করে। পূর্ব ঢাকা হতো এক ধরনের সংরক্ষিত জল-স্থলের প্রাকৃতিক প্রাচীর (গ্রিন বেল্ট)। আশির দশক থেকে যদি পরিবেশ সংবেদনশীল মহাপরিকল্পনা ও রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশের বাইরে থেকে এর বাস্তবায়নের ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হতো, তাহলে আজকে ঢাকায় জলাবদ্ধতা হতো না। নদী-নালা, খাল-বিল সংরক্ষণ হতো। বিকেন্দ্রীকরণ ও মাঝারি মানের শহর উন্নয়নের শহর, উন্নয়নের জাতীয় নীতিমালা হলে আজকে ঢাকার এ নারকীয়, দানবীয় নগরায়ণ হতো না। কলকাতার আন্ডারগ্রাউন্ড মেট্রোরেলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছিল ১৯৫০-এর দশকে, দেশভাগের পরপর। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী বিধান চন্দ্র রায় এর পেছনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন। এর নাম দূরদৃষ্টি। অথচ ৭০ বছর পরও ঢাকায় মেট্রোরেলের জন্য যুদ্ধ চলছে!
ইতিহাসসচেতন ও ভবিষ্যৎ-মুখী নগর পরিকল্পনার সংস্কৃতি তৈরি হলে আরো একটি মানসিক রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যেত। সেটা হলো জাতিগত হীনম্মন্যতা। আত্মবিশ্বাসী হয়ে আত্মানুসন্ধানের সত্সাহস তৈরি হতো, যদি আমরা সমান্তরালভাবে অতীত ও ভবিষ্যেক বোঝার চেষ্টা করতাম। অনুকরণ করার হীনম্মন্যতা কমে আসত। তখনই সম্ভব হতো ঢাকাকে ঢাকার মতো করে গড়ে তোলা।
বিশ্বব্যাংক যখন ‘ঢাকা ২০৩৫’ পরিকল্পনা নিয়ে পূর্ব ঢাকাকে পুডং/সাংহাই বানানোর বিলাসী প্রকল্প তৈরি করল, আমরা পুডং স্বপ্নে বিভোর হলাম। কেন ঢাকাকে পুডং হতে হবে? ঢাকা ঢাকার মতোই হবে। ঢাকার স্বকীয় সংস্কৃতি, ভৌত চরিত্র নিয়ে ঢাকার ভবিষ্যৎ চিন্তা করতে অসুবিধা কোথায়?
ঢাকার ভবিষ্যৎ কী— এ প্রশ্নের চেয়ে অনেক বেশি জরুরি আমরা ঢাকার জন্য কী ধরনের ভবিষ্যৎ চাই। কৃষিভিত্তিক সমাজের সময়জ্ঞানের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। ভবিষ্যেক বিনির্মাণ করার মানসিক চর্চাটাই আসল।
ভবিষ্যতের ঢাকার পরিকল্পনা করতে নব্য উদার অর্থনীতির স্থূল বাজার দর্শন থেকে সরে গিয়ে মানবিক নগরায়ণের উদ্দেশ্য নিয়ে দাঁড়াতে হবে। উড়াল সড়ক হয়তো কখনো কখনো যানজট সমস্যা নিরসনে সাহায্য করবে। কিন্তু সেটা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। উড়াল সড়কনির্ভর নগরায়ণ মুষ্টিমেয় জনগোষ্ঠীর নাগরিক সুবিধা দেয়। আর সংখ্যাগুরু নগরবাসী রাস্তা থেকে শুধু কংক্রিটের একটি উড়ন্ত অজগরকেই দেখে যায়।
মানবিক ও বাসযোগ্য নগরায়ণ করতে হলে নগর গবেষণার বিকল্প নেই। গবেষণার অভাবে আমরা অনুমানধর্মী, খণ্ড খণ্ড, অ্যাডহক নগর পরিকল্পনার বেড়াজালে আটকে আছি। ঘটনাটা এ রকমই। এখানে জলাবদ্ধতা হচ্ছে, ভূগর্ভস্থ নালার ব্যাসার্ধ বাড়ানো হোক। ওখানে যানজট হচ্ছে, উড়াল সড়ক তৈরি করা হোক। এ ধরনের প্রতিক্রিয়াধর্মী নগর পরিকল্পনার সীমাবদ্ধতা ও সাময়িকতা কখনই কাটানো যাবে না।
ভবিষ্যেক দেখার ও বোঝার গবেষণানির্ভর মানসিক চর্চাকে যতদিন আমরা কর্মপ্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে না দেখব, ততদিন আমাদের নগর চিন্তাভাবনা হবে অপরিণত, অপর্যাপ্ত ও দর্শনীয়ভাবে ব্যর্থ।
লেখক: অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, স্থাপত্য বিভাগ
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়





