ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্পে ঢাকার উত্থান-পতন ছিল লক্ষণীয়। ঢাকার বাণিজ্যিক প্রসঙ্গ প্রাচীন নৌবাণিজ্য সূত্রে সারা বিশ্বে পরিচিত ছিল। রোমান ঐতিহাসিক প্লিনি (মৃত্যু ১১৩ খ্রিস্টপূর্ব) খ্রিস্টপূর্ব ’৭৩ সালে ঢাকার বস্ত্র শিল্পকে মেডিটেরিনিয়ান বাণিজ্যের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের নামে ‘জাহাঙ্গীরনগর’ নামকরণের বহুপূর্বেই ঢাকার বস্ত্র সুলতানি ও মোগল দরবারে সমাদৃত হয়। ঢাকার মসলিন ছাড়া অন্য কোনো উপঢৌকন জাহাঙ্গীরনগর থেকে দিল্লিতে সম্রাট ও অমাত্যদের পাঠানো হতো না। কতিপয় ঐতিহাসিকদের মতে, বাণিজ্যকেন্দ্র হিসেবে ঢাকা আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিকভাবে একই পরিচিত ছিল যে, ১৬০৮ বা ১৬১০ সাল থেকে ঢাকাকে নতুনভাবে নামকরণ করা হলেও এ নতুন নামে ঢাকা কখনই পরিচিতি পায়নি। যদিও এটা ছিল তখনকার ‘দাপ্তরিক’ নাম। উনিশ শতকের দ্বিতীয় দশকে ঢাকার মসলিন শিল্প বিলুপ্ত হওয়ার আগপর্যন্ত নৌ-বাণিজ্যের একটি পণ্য হিসেবে মসলিন ঢাকাকে বহির্বিশ্বে পরিচয় করে দিয়েছে। মসলিন তখন সারা বিশ্বে নেতৃত্ব দিত এবং রাজদরবারে সমাদৃত ছিল। তখন এটি সোনারগাঁও বা বিক্রমপুরের নামে নয়, ঢাকার পণ্য হিসেবেই পরিচিত ছিল। এর কারণ হলো, পূর্ব বাংলায় বিভিন্ন বস্ত্র উৎপাদন এলাকার উৎপাদিত পণ্য তখন ঢাকা থেকে বহির্বিশ্বে রফতানি হতো। ঢাকা ছিল মূলত পূর্ব বাংলার প্রবেশদ্বার। বর্তমান নিবন্ধে প্রাচীন আমল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত ঢাকার বাণিজ্য ইতিহাসের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ঢাকার কতিপয় বাণিজ্যসংশ্লিষ্ট বিষয়, যেমন— বস্ত্র শিল্প, মুদ্রা ব্যবস্থা, দেশীয় ব্যাংকিং, বাণিজ্যিক পণ্য, স্বদেশী শিল্প ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। একই সঙ্গে আলোচিত হয়েছে দীর্ঘ সময়কালে ব্যাপৃত ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্যের বিবর্তন ধারা, বাণিজ্য-সংগঠন ও অর্থনৈতিক কাঠামো।

প্রাক-ঔপনিবেশিক বাণিজ্যে ঢাকার স্থান

প্রাক-ঔপনিবেশিক আমলে বাংলার বাণিজ্যিক ইতিহাসের একমাত্র নিয়ামক ছিল বাংলার বস্ত্র শিল্প। বহির্বাণিজ্য ও অভ্যন্তরীণ বাণিজ্যের ক্ষেত্রে অংশগ্রহণকারী দেশগুলো এক বা একাধিক উৎপাদিত পণ্যের ব্যবসায় নিয়োজিত ছিল। উনিশ শতক কিংবা এরও আগে ইংল্যান্ডে যেমন উল, মিসরে কাপড়, চীনে সিল্ক, বাংলায় তেমনি বস্ত্র শিল্প ছিল উল্লেখযোগ্য। সারা বাংলার মধ্যে ঢাকা অঞ্চলই ছিল আবার বস্ত্র শিল্পের প্রাণকেন্দ্র। আগেই বলেছি, এমনকি দ্বিতীয় শতাব্দীর পূর্বেই ঢাকার বস্ত্র শিল্প আরব দেশ, সুদূর ইউরোপ এবং ভারতবর্ষের অন্যান্য এলাকাসহ বিশ্বের অনেক দেশে পৌঁছে গিয়েছিল।

ঢাকার বস্ত্র শিল্প: উত্থান ও পতন

বাংলার বস্ত্র শিল্প ঢাকা ও মুর্শিদাবাদ নামক দুটি স্থানের নামের সাথে প্রতীকী হয়ে আছে। প্রাচীনকাল থেকে ঢাকা এবং ১৮ শতক থেকে মুর্শিদাবাদের সঙ্গে বস্ত্র শিল্প বা মসলিনের ইতিহাস একই সূত্রে গ্রথিত। এটা অনস্বীকার্য যে, ঢাকা থেকে মুর্শিদাবাদে রাজধানী স্থানান্তরের সঙ্গে ঢাকার বস্ত্র শিল্পের কারিগরি উত্কর্ষও স্থানান্তরিত হয়েছিল। ১৭০৪ সালে মুর্শিদকুলি খানের রাজধানী স্থানান্তরের সঙ্গে সঙ্গে বড় পুঁজির বস্ত্র ব্যবসায়ী, রফতানিকারক ও দেশীয় বড় বড় ব্যাংকার ঢাকা ছেড়ে মুর্শিদাবাদ যান। কেননা সেখান থেকে সপ্তগ্রাম, কলকাতার মাধ্যমে রফতানি ও স্থলপথে উত্তর ভারতে ব্যবসা পরিচালনা সহজ ছিল। এটা সহজেই বোধগম্য যে, ঢাকার মূলধারার তাঁতিদের একটা বড় অংশকে তখন মুর্শিদাবাদে নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু এতে ঢাকার বস্ত্র শিল্পে তেমন কোনো বিরূপ প্রভাব পড়েনি। কেননা সোনারগাঁও ও বিক্রমপুরে তৈরি কাপড়ের উঁচুমান ঢাকার বস্ত্র শিল্পকে কখনো ম্রিয়মাণ করেনি। মেঘনা ও শীতলক্ষ্যার স্বচ্ছ পানিতে ধৌত সুতা ও কাপড়ের গুণাগুণই ছিল আলাদা। ঐতিহ্যগতভাবে ঢাকার তন্তুবায় শ্রেণী একাধারে ছিল কৃষিজীবী ও তাঁতি। ফলে সব তাঁতিকে প্রলুব্ধ করে মুর্শিদাবাদে নিয়ে যাওয়া ছিল প্রায় অসম্ভব। তবে নবাবরা তাদের প্রয়োজনে দক্ষ কিছু তাঁতিকে দ্রুত ভাগ্য পরিবর্তনের প্রলোভন দিয়ে মুর্শিদাবাদে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিলেন বলেই মনে হয়। এতে মুর্শিদাবাদ তথা কাসিমবাজার নবাবি পৃষ্ঠপোষকতায় দ্রুত মসলিন উৎপাদন এলাকায় পরিণত হয় এবং ঢাকার প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।

সে যা-ই হোক, মসলিন নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বস্ত্র শিল্পের তিনটি বিশেষ স্তর নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন পড়ে। প্রথমত. শিল্প উত্কর্ষে নিপুণ তাঁতি, যারা মূলত রাজকীয় শ্রেণী, জগেশঠ পরিবারসহ ভারতবর্ষের অভিজাত শ্রেণীর জন্য মসলিন তৈরি করত, তাদের পরিণতি কী হয়েছিল? দ্বিতীয়ত. ইউরোপীয় শিল্প বিপ্লবের পরে তাদের উৎপাদিত পণ্য যখন রফতানিমুখী হলো, তখন এ দেশের মসলিন তাঁতি ও মসলিন ব্যবসায়ীদের ভাগ্যে কী ঘটেছিল? দ্বিতীয় স্তরের আলোচনার এটাই উপজীব্য। তৃতীয় স্তরের আলোচনায় উঠে আসবে সেই প্রশ্ন যে, ১৭৪০ সাল থেকে প্রায় তিন দশক ঢাকার বিকশিত ও তাঁত শিল্পের চরম উত্কর্ষের দিনে যারা বাণিজ্য করে প্রভূত ভাগ্য গড়েছিলেন, সেসব ঢাকাকেন্দ্রিক বেনিয়া গোষ্ঠীর পরিণতি কী হয়েছিল? অবশ্যম্ভাবীভাবেই এ প্রশ্নগুলোর সঙ্গে বস্ত্র শিল্পের উত্থান-পতন, উৎপাদন প্রক্রিয়া, পাইকার-দালাল নামক মধ্যশ্রেণী এবং কলকাতাকেন্দ্রিক রফতানি বাণিজ্যের আলেখ্য জড়িত।

আমাদের প্রথম স্তরের আলোচনায় রাজকীয় ব্যবস্থাপনা ও তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বিভিন্ন প্রকার মসলিন তৈরির কারখানাগুলোর ভাগ্য নিয়ে কিছুটা আলোকপাত করা যাক। মোগল পৃষ্ঠপোষকতায় একান্ত ও বিশেষায়িত একটি অভিজাত ভোক্তাশ্রেণীর সৃষ্টি হয়, যাদের জন্য দক্ষ তাঁতিরা উত্কৃষ্ট ধরনের মসলিন তৈরিতে সচেষ্ট থাকতেন। তাদের ফরমায়েশি বস্ত্রগুলো রাজকীয় তত্ত্বাবধানে ‘কারখানা’ নামক অপেক্ষাকৃত উন্নত মানের তাঁতে তৈরি করা হতো। বিভিন্ন পদবিধারী রাজকীয় তত্ত্বাবধায়করা কারখানার বয়ন ও সূচিকর্ম দেখাশোনা করতেন। ১৮ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত, যখন রাজকীয় অভিজাতশ্রেণী ও প্রাদেশিক নবাবরা গৌরবের শীর্ষে ছিলেন, তখন এসব কারখানায় উৎপাদিত বস্ত্রের সিংহভাগ তারা কিনতেন।

মোগল সাম্রাজ্য ও মোগল আভিজাত্যের অবসান ঘটলে স্বাভাবিকভাবেই রাজকীয় কারখানার বিলুপ্তি ঘটে। মোগল অমাত্য ও এদেশীয় জমিদার শ্রেণী কারখানায় তৈরি মসলিনের ব্যাপক সমঝদার ছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত প্রথা চালু হওয়ার পর ভূমিকেন্দ্রিক অভিজাত শ্রেণীর ভাগ্য বিপর্যয় ঘটে এবং তাদের আর্থিক ও সামাজিক মর্যাদা হ্রাস পায়। ফলে তাদের পক্ষে দামি মসলিন ক্রয় ও পৃষ্ঠপোষকতা জোগানো আর সম্ভব ছিল না। দেশের বস্ত্র শিল্পের ক্ষেত্রে এই পরিবর্তন ঢাকার মসলিন শিল্পকে বিনাশের পথে ঠেলে দেয়। কেননা এ শিল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কারিগর, তত্ত্বাবধায়ক, মধ্যশ্রেণী ও কাঁচামাল সরবরাহকারীরা কার্যত বেকার হয়ে পড়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।

আলোচনার দ্বিতীয় স্তরে ঢাকার বস্ত্র শিল্প নিয়ে বলতে গিয়ে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা উপস্থাপন করা যেতে পারে। এ স্তরে দেখা যাবে যে, ঢাকার তথা বাংলার বস্ত্র শিল্প কীভাবে নতুন  সুযোগের সন্ধান পেয়েছিল। ১৭৮৪ সালে প্যারিস শান্তিচুক্তির পরে আমেরিকান ও ইউরোপীয় ব্যবসায়ীরা বাংলার ব্যবসা ক্ষেত্রে ব্যাপকভাবে অনুপ্রবেশ করতে শুরু করেন। এসব ব্যবসায়ীর রফতানি পণ্যের তালিকায় বাংলার বস্ত্র ও তুলা উভয়ই স্থান করে নিয়েছিল। এ ব্যবসা নিরবচ্ছিন্নভাবে বৃদ্ধি পেতে থাকলে বাংলার বস্ত্র শিল্পের চাহিদাও পর্যায়ক্রমে বৃদ্ধি পেতে থাকে। ফলে বিপুলসংখ্যক লোক কৃষিকাজ ত্যাগ করে তাঁত শিল্পের দিকে ঝুঁকে পড়ে। সরকারি হিসাব মতে, ১৭৮৬ সালে প্রায় ৬০ লাখ তন্তুবায় কোম্পানির তাঁত শিল্পের সঙ্গে জড়িত ছিল। এ চিত্রটি মূলত সারা বাংলার। তা সত্ত্বেও তাঁত শিল্পে ৬০ লাখ লোকের সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি অবিশ্বাস্যই মনে হয়।

এর অর্থ দাঁড়ায়, সে সময়ের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি লোক বস্ত্র উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত ছিল। সে সময়ের তাঁতি শ্রেণী আংশিক সময় কৃষিকাজ ও বাকি সময় পারিবারিক তাঁতে কাজ করত বিবেচনা করলে এটি খুব একটা অবাস্তব মনে করারও কারণ নেই। যাহোক, আমাদের বিশ্লেষণের যৌক্তিকতা এই যে, মসলিনের ক্ষেত্রে রাজকীয় ও অভিজাত শ্রেণীর পৃষ্ঠপোষকতার অবসান ঘটা সত্ত্বেও এ শিল্পটি ঢাকা অঞ্চল থেকে তখনো বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। বিদেশী চাহিদার বিপরীতে ভিনদেশী বণিকদের মাধ্যমে যে ক্ষতিপূরণ পাওয়া গিয়েছিল, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ ছিল তার চেয়ে ঢের বেশি। এ চাহিদা এত বৃদ্ধি পেয়েছিল যে, কেবল ১৭৯৫-৯৬ সময়কালে বাংলা থেকে ২২ লাখ ৮৭ হাজার ৪৭৯ খণ্ড সুতিবস্ত্র রফতানি করা হয়েছিল, যার সাকল্য মূল্য ছিল ২০ লাখ ৪১ হাজার ৫১৩ সিক্কা টাকা। অঞ্চল বিবেচনায় এর মধ্যে ঢাকা থেকে রফতানির পরিমাণই ছিল বেশি।

পূর্বের চেয়ে ইউরোপীয় ও এশীয় বণিকদের ব্যাপকভাবে অনুপ্রবেশ ঘটনায় উত্তর ভারতীয় ও রাজকীয় ব্যবসা হারালেও ঢাকার বস্ত্র শিল্পে এর কোনো প্রভাব পরিলক্ষিত হয়নি। কারিগররা বিদেশী বণিকদের কাছ থেকে নমুনা মোতাবেক চাহিদাপত্র ও অগ্রিম পেত। বিদেশী বণিক ক্রেতারা কেবল সূক্ষ্ম মসলিন নয়, অন্যান্য শ্রেণীর বস্ত্র যেমন— জামদানি, মলমল, তরুনদম, তানজিব, সরহদখানা, সরবতি, কাসিদা, বাফতা, কোষা, হাম্মম, ঘুড়ি, ডুরিয়া প্রভৃতি বিভিন্ন প্রকারের কাপড়ের অর্ডার দিত। এসব বস্ত্রের প্রস্তুতকারকরা ছিলেন কিছু চুক্তিভিত্তিক কারিগরআবার কিছু স্বাধীন বিক্রেতা। বিদেশী ক্রেতাদের স্থানীয় দালালরা ঢাকা অঞ্চলের বিভিন্ন হাটবাজার থেকে এসব কারিগর সংগ্রহ করত। তবে স্বাধীন তাঁতিরাই বেশি লাভবান হতো।

সুলতানি ও মোগল সম্রাটদের পৃষ্ঠপোষকতায় ধন্য হয়ে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী বস্ত্রশিল্প, বিশেষত মসলিন শিল্প ১৬ ও ১৭ শতকেই বিশ্বের অন্যতম বাণিজ্যিক পণ্য হিসেবে পরিচিতি পায়। রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে ১৭ শতকে নৌবাণিজ্যের পথসমূহ আবিষ্কৃত হওয়ার পর সমুদ্রপথে বাণিজ্যও বৃদ্ধি পেয়েছিল। এ সময় নৌবাণিজ্যে নিয়োজিত ইউরোপীয় বণিকদের প্রায় সবাই ঢাকাসহ বাংলার বিভিন্ন স্থানে তাদের বাণিজ্যঘাঁটি স্থাপন করেছিল। ১৬৬০ সালের মধ্যেই পর্তুগিজ, ডাচ, ফরাসি ও ইংরেজ বণিকরা ঢাকায় তাদের বাণিজ্য কুঠি বা ব্যবসাকেন্দ্র স্থাপন করে। ঢাকার বস্ত্র শিল্পের ক্রমচাহিদার পরিপ্রেক্ষিতে বস্ত্র উৎপাদনও বেড়েছিল প্রচুর। বাংলার তাঁতিরা ছিল মূলত কৃষির সম্পূরক পেশায় নিয়োজিত শ্রেণী। তাঁত ও কৃষিকাজ— উভয়ই ছিল একটি পরিবারের আয়ের উত্সস্থল। ফলে কৃষি থেকে বস্তশিল্পের দিকে ঝুঁকে পড়তে তাদের বড় ধরনের কোনো কসরত করতে হয়নি। ১৮ শতকের একজন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি কর্মচারী ও লেখক রবার্ট উর্মি বিষয়টি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করেছিলেন। তিনি লক্ষ করেন, বাংলা অঞ্চলে মূল সড়ক বা বড় শহর থেকে একটু দূরে গেলেই এমন একটি গ্রাম পাওয়া দুষ্কর, যেখানে ঘরে ঘরে প্রত্যেক পুরুষ-মহিলা, এমনকি শিশুরা বস্ত্র বয়নে লিপ্ত। প্রায় সব সমসাময়িক পর্যটকরা বাংলার, বিশেষত ঢাকার বয়ন শিল্প সম্পর্কে প্রায় অনুরূপ ধারণা দিয়েছেন।

সুলতানি ও মোগল আমলে ব্যাপক চাহিদার বিপরীতে বড় বিনিয়োগের ব্যবসা ছিল অত্যুত্কৃষ্ট মসলিন বাণিজ্য। মসলিনের মুখ্য ক্রেতা ছিলে এশিয়া ও ইউরোপের রাজপরিবার ও অভিজাত শ্রেণী। ভ্রমণকারীদের বৃত্তান্ত থেকে আরো জানা যায়, সে সময় মসলিন বলতে গেলে বিশ্বের সব রাজন্য ও রাজপরিবারে স্থান করে নিয়েছিল। মসলিন ছাড়া এসব রাজপরিবারের পোশাক-পরিচ্ছদই অসম্পূর্ণ থাকত। বিভিন্ন মানের মসলিন তখন ভারতবর্ষের অনেক জায়গায় তৈরি হতো কিন্তু রাজন্যবর্গের কাছে ‘ঢাকাই মসলিন’ই ছিল সবিশেষ সমাদৃত। পর্যটকরা ঢাকাই মসলিনকে ‘অতুলনীয়, অপ্রতিদ্বন্দ্বী ও শাশ্বতভাবে জনপ্রিয় বস্ত্র’ হিসেবে উল্লেখ করেছেন। বিশেষত ঢাকা ও সোনারগাঁওয়ে উত্পন্ন সূক্ষ্ম কার্পাস সুতার কথা সবিশেষে উল্লেখ করেছেন। এখানে ১৬৪০ সালে ঢাকা সফরকারী পর্যটক সেবাস্টিয়েন মানরিকের কথা উল্লেখ করা যায়। তিনি খোরাসানি (পার্সিয়ান) ব্যবসায়ীসহ বিপুলসংখ্যক বিদেশী বণিকের ব্যাপক বাণিজ্য তত্পরতা লক্ষ করেছিলেন। ওই সময়ে ঢাকা থেকে বিভিন্ন দেশে কী পরিমাণ মসলিন পণ্য রফতানি হয়েছিল, সে তথ্য আমাদের হাতে নেই। তবে ধারণা করা হয় যে, উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বস্ত্র তখন ঢাকা থেকে বিদেশে রফতানি হয়েছিল।

এটা এখন নিশ্চিত যে, দিল্লির শাহী দরবার, ঢাকার মোগল অমাত্য এবং উত্তর ভারতের রাজপরিবারের মসলিনের প্রায় সম্পূর্ণভাগই পূরণ করতেন ঢাকার তাঁতিরা। দেশীয় এ সীমিত বাজারের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশী বণিকদের মাধ্যমে কী পরিমাণ মসলিন বিদেশে রফতানি হতো, সমসাময়িককালের সে পরিসংখ্যান আর এখন পাওয়া যায় না। বাংলার সুবাদাররা সাংবাত্সরিকভাবে উপঢৌকন হিসেবে দিল্লির দরবারে অত্যুত্কৃষ্ট মসলিন পাঠাতেন। রাজকীয় তত্ত্বাবধানে এবং রাজকর্মচারীদের উপস্থিতিতে বাংলার মসলিন কারখানায় যেসব মসলিন বিশেষভাবে তৈরি হতো, তা আগেই উল্লেখ করেছি। এসব কারখানায় তৈরি বস্ত্র ‘দারোগা-ই-মলবস খাস’, ‘মলবস খাস’ প্রভৃতি নামে পরিচিত ছিল।

কেবল রফতানি নয়, স্থানীয় কাপড়ের চাহিদাও মেটাতেন গ্রাম্য তাঁতিরা। সাধারণ তাঁতিরা বিদেশী ক্রেতাদের কাছে সাধারণত কাপড় বিক্রি করতেন না। কেবল চুক্তিবদ্ধ তাঁতিরা দাদন বা অগ্রিম গ্রহণ করে বিদেশী ক্রেতাদের সরবরাহ করতেন। সমসাময়িক ব্যবসায়ী সমাজে তারা পরিচিত ছিলেন যোগী হিসেবে। তারা বংশপরম্পরায় তাঁত বোনেন এবং শিক্ষানবিশ থেকে ক্রমেই দক্ষ কারিগরে পরিণত হন। ঢাকার বস্ত্র শিল্পে ব্যবহূত বিভিন্ন প্রকার বস্ত্রের নামগুলো মূলত ‘পার্সিয়ান’ উত্স থেকে গৃহীত। নামগুলো স্পষ্টত ইঙ্গিত দেয় যে, উৎপাদনকারী তাঁতিরা নন, ব্যবহারকারী ও ইরানি-তুরানি ক্রেতারা এ কাব্যিক নামগুলো দিয়ে থাকবেন। নামকরণের ক্ষেত্রে বুনন নৈপুণ্য, কাপড়ের রঙ, ডিজাইন এবং সুতার প্রকারভেদ সবিশেষ বিবেচনা পেয়েছে বলেই মনে হয়। সবচেয়ে অনুপম ও ব্যয়বহুল মসলিনদের নাম ‘মলমলখাস’। এই প্রকার মসলিন কেবল দিল্লির সম্রাটের জন্য বিশেষভাবে তৈরি হতো, যে জন্য এটি পরিচিত ছিল ‘খাস’ নামে। বাংলার নবাবরা আনুগত্য ও শ্রদ্ধার নিদর্শন হিসেবে মলমল খাস উপহার হিসেবে পাঠাতেন দিল্লির সম্রাটের কাছে। মলমল স্থানীয়ভাবে ‘জামদানি’ নামে পরিচিত ছিল। এটা ছিল গুটি তোলা ও রঙিন। মলমল ছাড়াও সিলভার রঙে বুটি তোলা সিল্ক কাপড়, প্লেন কাপড় ও সেরবন্দও পাঠানো হতো দিল্লিতে। এসব বস্ত্র ঢাকা, সোনারগাঁও, বাজিতপুর ও জঙ্গলবাড়ী প্রভৃতি আড়ং থেকে সংগ্রহ করা হতো। এটা স্বীকার্য যে, দিল্লির মোগল কোর্ট ঢাকার বস্ত্র শিল্প, বিশেষত সূক্ষ্ম মসলিনের প্রসারে প্রভূত পৃষ্ঠপোষকতা জুগিয়েছে। কেবল বস্ত্র নয়, ঢাকা থেকে আতর, অলঙ্কৃত সিল্ক, স্বর্ণসুতাখচিত লাঠি, রঞ্জিত পাঙ্খা, স্বর্ণ ও রৌপ্য তৈরি বাটি ইত্যাদি দ্রব্য দিল্লি দরবারে পাঠানো হতো। মসলিনের প্রচুর চাহিদা ছিল মধ্যপ্রাচ্য ও এশীয় অন্যান্য দেশে। ১৭ শতকের ইউরোপে পোশাক শিল্পে নিত্যনতুন ফ্যাশন যুক্ত হতে শুরু করে। ফলে বৃদ্ধি পায় মসলিনের চাহিদা। একসময় ইউরোপগামী প্রতিটি কার্গো জাহাজে মসলিন ছিল একটি অত্যাবশ্যকীয় পরিবাহিত পণ্য।

১৭৫৭ সাল থেকে বস্ত্র শিল্পের অবস্থান

১৭ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে সামান্য তথ্যই পাওয়া যায়। তখন থেকে বাংলায় বাণিজ্য পরিচালনাকারী বিভিন্ন পশ্চিমা কোম্পানির ঢাকায় বস্ত্র শিল্পের বাণিজ্য সম্পর্কে, বিশেষত বিনিয়োগ ও আমদানি সম্পর্কে কিছু কিছু তথ্য মেলে। এসব সূত্র নিশ্চিত করে যে, উৎপাদনকারী স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বিদেশী ব্যবসায়ীদের কাছে বাংলার বস্ত্র শিল্পই ছিল সবচেয়ে লাভজনক পণ্য। উল্লেখ্য, সে সময়ে তৈরি সুতিবস্ত্র ব্যবসায়ীজগতে ‘পিস গুডস’ নামে পরিচিত ছিল। ঢাকায় উৎপাদিত সুতিবস্ত্রের তখন তিনটি প্রধান বাজার। এক. স্থানীয় বাজার, দুই. ভারত মহাসাগরীয় বাজার ও তিন. ইউরোপ-আমেরিকান বাজার। স্থানীয় বাজারের প্রকৃতি সম্পর্কে তেমন কিছু জানা যায় না। কিন্তু স্বাভাবিকভাবেই ধারণা করা যায় যে, স্থানীয় কাপড়ের পুরো চাহিদা স্থানীয়ভাবে তৈরি কাপড় দিয়েই মেটানো হতো। প্রাপ্ত সূত্রগুলো এ পর্যন্ত এ ধারণাটা দিয়ে থাকে যে, স্থানীয়ভাবে বিভিন্ন ধরনের সুতিবস্ত্র দ্বারা এ দেশের মানুষ বস্ত্রের চাহিদা পূরণ করত। স্থানীয় পোশাক সংস্কৃতি ও জীবনযাত্রার ধরন জানান দেয়, মোটা কাপড় ছিল সাধারণ মানুষের পোশাক। 

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ও ইহার কর্মচারী ছাড়াও সুতিবস্ত্রের ব্যবসায় অন্যান্য ইউরোপীয় ও এশীয় ব্যবসায়ীরাও লিপ্ত ছিল। ১৮ শতকের শেষের দশকে প্রাইভেট ও কোম্পানি ট্রেড, উভয় ক্ষেত্রেই রফতানি সূচক ছিল নিম্নগামী। ১৭৮৭ সালে ঢাকার কালেক্টর ম্যাথিউ ডে ঢাকার ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে একটি জরিপ পরিচালনা করেন। তিনি এর আর্থিক মূল্য নির্ণয় করেন টাকায় প্রায় ১ কোটি রুপি। এর মধ্যে বস্ত্র খাতেই ছিল ৬০ থেকে ৭০ লাখ টাকার বেসাতি। ওই চার্টটি ঢাকার বস্ত্রশিল্পের একটি অস্বাভাবিক ক্রমাবনতির চিত্র তুলে ধরে। ১৮২০ সাল পর্যন্ত বস্ত্রশিল্পের ক্ষেত্রে এ নিম্নমুখী ধারা অব্যাহত ছিল। কিন্তু এরপর ঔপনিবেশিক শিল্পনীতির প্রবর্তন ঘটে, যেখানে দেশীয় বস্ত্রের রফতানি একেবারেই হ্রাস পায় এবং বিলেতে তৈরি বস্ত্র দেশীয় বস্ত্রের স্থলাভিষিক্ত হতে শুরু করে।

ঢাকার বিখ্যাত মসলিনের পতনের কারণ বহুবিধ। তবে এর অন্যতম কারণ হচ্ছে, ১৭৮০ সালের পর ইংল্যান্ডের বৃহৎ কলের মিহি সুতায় তৈরি নকল মসলিনের প্রাদুর্ভাব ও এ দেশে বাজার দখল। স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো ও পেইসলি ছিল এসব নকল মসলিন ও মিহি সুতার প্রধান উৎপাদন এলাকা। বিলেতে তৈরি মসলিন এত সস্তা ছিল যে, প্রত্যেক দোকানেই বিলেতি মসলিন পাওয়া যেত। দেখতে প্রায় ঢাকার মসলিনের অনুরূপ, এমনকি তার চেয়েও চাকচিক্যময়, অথচ চার ভাগের এক ভাগ কিংবা তিন ভাগের এক ভাগ কম দামে পাওয়া যায়। বিলেতি শিল্প রক্ষার জন্য ব্রিটিশ সরকার বাংলার মসলিনের ক্ষেত্রে উচ্চ শুল্ক আরোপ করে। ফলে বিলেতে তৈরি অপেক্ষাকৃত সস্তা ও নকল মসলিনের কাছে বাংলার ঐতিহ্যবাহী মসলিনের বাজার হারাতে হয়। ১৮২০ সালের মধ্যে পূর্ব বাংলার বৃহৎ মসলিন কেন্দ্রগুলো, যেমন: সোনারগাঁও, ধামরাই, নারায়ণপুর, চাঁদপুর, শ্রীরামপুর, জঙ্গলবাড়ী, বাজিতপুর, তিতাবদ্দী এবং অন্যান্য কেন্দ্র বন্ধ হয়ে যায়। যেসব লোক কার্পাস তুলা উৎপাদন, সুতা তৈরি, বয়ন ও বস্ত্র রঞ্জন এবং ধুবির কাজ করত, তারা বেকার হয়ে পড়ে ও অনন্যোপায় হয়ে বিকল্প হিসেবে কৃষি পেশায় ফিরে যায়। এ সময় মসলিন ব্যবসায়ী, গোমস্তা, দালাল-পাইকার, যাচনদার, রিফুগর শ্রেণীর লোকরাও পেশা হারায়। তখন এসব পেশাজীবীর সঙ্গে ঐতিহ্যগতভাবে কৃষিকর্মের পূর্ব সম্পৃক্ততা ছিল। যেসব তাঁতে স্থানীয়দের ব্যবহারের জন্য মোটা কাপড় তৈরি হতো, সেগুলো অবশ্য টিকে ছিল।

উনিশ শতকের শেষার্ধ ঢাকার অর্থনীতিতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রভাব

মোগল শাসন থেকে কোম্পানি শাসনে উত্তরণের পর্বটি শুরু হয়েছিল অনেক প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে। এর মধ্যে ছিল স্থানীয় উৎপাদন পদ্ধতি ও এ দেশের সনাতন কৃষি অর্থনীতি। ঢাকার জেলা কালেক্টররা ঢাকা শহর ও ঢাকা জেলার সাধারণ অর্থনীতি বিষয়ে মাঝে মাঝে সবিস্তারে প্রতিবেদন তৈরি করতেন। এখানে উল্লেখ্য, ১৭৮৭ সাল পর্যন্ত কোম্পানি নিযুক্ত একজন অফিসার প্রথমে  ‘চিফ’ এবং পরে ‘কালেক্টর’ নামে বৃহৎ জেলা ঢাকা, ফরিদপুর, বাখরগঞ্জ, খুলনা, যশোরের একাংশ, ময়মনসিংহ, কুমিল্লা এবং নোয়াখালী জেলা শাসন করতেন।

কোম্পানির বাণিজ্য ক্ষেত্রে জবরদস্তি ও দুর্নীতি ঢাকার অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। ১৭৬৯-৭০ সালের মহাদুর্ভিক্ষ পূর্ব বাংলায় তেমনটা না হলেও পশ্চিম বাংলা অঞ্চলকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। পর্যাপ্ত বৃষ্টির অভাবে ১৭৮৪ সালের আমন ফসল মার খেলে আবার দুর্ভিক্ষ দেখা দেয়। উপর্যুপরি বন্যা ও দুর্ভিক্ষ কঠিনভাবে আঘাত হানে বাংলার তাঁতি ও কার্পাস চাষীদের। কালেক্টরদের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিপুলসংখ্যক তাঁতি তাদের তাঁত ত্যাগ করে গ্রাম ছেড়ে যাচ্ছে। এ দুর্ভিক্ষ অবস্থা ১৭৯০ সাল পর্যন্ত বহাল ছিল। ১৭৮৪ সালের মহাপ্লাবন ক্ষেতের ফসল বিনষ্ট করে এবং দুর্ভিক্ষকে আসন্ন করে তোলে। ক্ষুধার্ত মানুষ খাদ্যগুদাম লুট করতে বাধ্য হয়। খাদ্যগোলাগুলো লুট হওয়ার মধ্য দিয়ে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। [ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি প্রকাশিত ঢাকার বাণিজ্যিক ইতিহাস বই থেকে নেয়া]

 

লেখক: ইতিহাসবিদ