রাজধানী শহর হিসেবে ঢাকা নগরী ২০১০ সালে ৪০০ বছর পার করেছে। তবে ঢাকার ইতিহাস আরো প্রাচীন। ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে ঢাকার খ্যাতি অনেক পুরনো। মোগলরা ১৬১০ সালে ঢাকাকে সুবা বাংলার রাজধানীর মর্যাদা দিলে এ নগরীতে মোগল ঐতিহ্য রীতিনীতি ও সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ শুরু হয়। আদি ঢাকাবাসীর জীবন ব্যবস্থার প্রতিটি ক্ষেত্রে মোগল সংস্কৃতির প্রভাব আজো বিদ্যমান। ১৭১৭ সালে ঢাকা থেকে রাজধানী মকসুদাবাদে (পরবর্তীতে মুর্শিদাবাদ) স্থানান্তর হলে এর বিকাশের গতি খানিকটা ব্যাহত হলেও ব্যবসা কেন্দ্র ঢাকা নগরীর গুরুত্ব টিকে ছিল। বঙ্গভঙ্গের মাধ্যমে ১৯০৫ সালে পূর্ব বাংলা ও আসাম প্রদেশ গঠিত হলে ঢাকা হয় নবগঠিত প্রদেশের রাজধানী। আবারো রাজধানীর মর্যাদা ফিরে পেয়ে ঢাকা নগরীর অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিকাশের সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। নগরীর অধিবাসীদের মধ্যে নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি হয়। অতঃপর ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদ হলে ঢাকা আবারো রাজধানীর মর্যাদা হারায়। বঙ্গভঙ্গ রদ এ অঞ্চলের আর্থসামাজিক ও রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করে। এভাবে নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে পৃথিবীর অন্যতম বৃহত্তম নগরী ঢাকা আজকের এ পর্যায়ে এসেছে। ঢাকা নগরীর বিবর্তনের ইতিহাসের সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশের ইতিহাস অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে।
ব্যবসা-বাণিজ্য বা প্রশাসনিক কারণে কালের আবর্তে যুগ যুগ ধরে ঢাকায় বহু দেশী-বিদেশী মানুষের সমাবেশ ঘটেছে। এদের অনেকেই স্থায়ীভাবে, আবার অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে ঢাকায় বসবাস করেন। ফলে স্থানীয় অধিবাসী ও বিদেশী নাগরিকদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার লক্ষ্য সামনে রেখে ঢাকায় বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। বিভিন্ন আমলে শিক্ষার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অভিন্ন ছিল না। ফলে আমলভেদে শিক্ষার বিষয়বস্তু ও মাধ্যমও পরিবর্তিত হয়েছে। এভাবে কালের পরিক্রমায় আজকের সর্বজনীন শিক্ষা ব্যবস্থা গৃহীত হয়েছে।
মোগল আমলে কোনো সুনির্দিষ্ট শিক্ষানীতি ছিল না। মোগল আমলে শিক্ষা ব্যবস্থা অনেকটা দান-অনুদানের ওপর নির্ভরশীল ছিল। তবে মোগল শাসকরা শিক্ষার পৃষ্ঠপোষক ছিল। অভিজাত ব্যক্তিরা তাদের সন্তানদের গৃহাভ্যন্তরেই শিক্ষার ব্যবস্থা করত। হিন্দু বাড়ির ছেলেমেয়েরা পাঠশালা ও টোলে, মুসলিমরা মসজিদসংলগ্ন মক্তবে পড়ত। তবে সে শিক্ষাও অনেকটা ধর্মীয় ও ভাষাশিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। ফার্সি তখন রাজভাষা হওয়ায় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে চাকরি পাওয়ার আশায় ফার্সি ভাষা রপ্ত করত। মুর্শিদ কুলী খানের শাসনামলে ঢাকা ও মুর্শিদাবাদে তার পৃষ্ঠপোষকতায় পারস্য থেকে বিভিন্ন শাস্ত্রে জ্ঞানলব্ধ পণ্ডিতরা এসে শিক্ষা-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অবদান রেখেছিলেন। মোগল অভিজাত ও প্রশাসনিক স্তরের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা নিজ নিজ এলাকায় শিক্ষাক্ষেত্রে পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করতেন।
শিক্ষাক্ষেত্রে ভারতবর্ষে সুনির্দিষ্ট নীতি গৃহীত হয় ইংরেজ শাসনামলে। অবশ্য কোম্পানি সরকার এ দেশের ধর্ম, সমাজ ও শিক্ষার ব্যাপারে কোনো রকম হস্তক্ষেপ করতে চায়নি। সে কারণে দীর্ঘদিন তারা ফার্সিকেই অফিশিয়াল ভাষা হিসেবে চালু রেখেছিল। এ কারণে তারা ১৭৮১ সালে কলকাতা মাদ্রাসা ও ১৭৯২ সালে কাশীতে সংস্কৃত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিল। পরবর্তীতে সরকার সুনির্দিষ্ট শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে। কলকাতা ও তার আশপাশে ইউরোপীয় ব্যবসায়ীদের কলোনি গড়ে ওঠার সুবাদে কলকাতা থেকেই শিক্ষা-সংস্কৃতিসহ সামাজিক ক্ষেত্রে পশ্চিমা ভাবধারার প্রথম সূচনা হয়। তারপর তা ভারতবর্ষের অন্য অংশে ছড়িয়ে পড়ে। পূর্ব বাংলা অনেকটা কলকাতার শিল্প-কলকারখানার প্রাথমিক পণ্যের জোগানদাতা ছিল। এ দেশের বেশির ভাগ মানুষ ছিল কৃষিজীবী। ফলে পূর্ব বাংলা শিক্ষা-দীক্ষায় পশ্চাত্পদ ছিল। তথাপি কলকাতাকেন্দ্রিক আধুনিক শিক্ষা বিকাশের যে ধারা সূচিত হয়েছিল, তার প্রভাব থেকে ঢাকা বিচ্ছিন্ন ছিল না। বাংলায় পাশ্চাত্য শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনের জন্য প্রথম পদক্ষেপ গ্রহণ করে মিশনারি ও কোম্পানির ব্যবসায়ীরা। মিশনারিদের উদ্দেশ্য ছিল ধর্ম প্রচার ও কোম্পানির উদ্দেশ্য ছিল তাদের ছেলেমেয়েদের শিক্ষা দেয়ার ব্যবস্থা করা। তবে এক্ষেত্রে মিশনারিরাই প্রথম উদ্যোগ গ্রহণ করে। পর্তুগিজ খ্রিস্টান মিশনারিরা ১৫৫৭ সালে মিশনারিদের ধর্মগ্রন্থ ছাপার কাজে ব্যবহারের জন্য উপমহাদেশে প্রথম মুদ্রণযন্ত্র আমদানি করে। মুদ্রণযন্ত্র আমদানি আধুনিক শিক্ষা বিকাশের ক্ষেত্রে এক মাইলফলক হিসেবে কাজ করে। পরবর্তীতে কোম্পানি সরকারও শিক্ষা বিস্তারের জন্য নানা পদক্ষেপ প্রহণ করে। ১৮৩০ সালের দিকে সরকার যে শিক্ষানীতি গ্রহণ করে, তার মূল উদ্দেশ্য ছিল শিক্ষাক্ষেত্রে ইংরেজি মাধ্যমে পাশ্চাত্য ভাবধারার শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতি ও বিজ্ঞানের অনুপ্রবেশ ঘটানো। সরকার গৃহীত শিক্ষানীতিতে বেঙ্গল প্রেসিডেন্সির জনবহুল শহরে যতগুলো সম্ভব স্কুল খোলার প্রস্তাব করা হয়। এ সুপারিশের আলোকে ঢাকায়ই উপমহাদেশের প্রথম সরকারি ইংরেজি স্কুল খোলা হয়, যার নাম হয় ‘ঢাকা গভর্নমেন্ট স্কুল’। ১৮৩৫ সালের ১৫ জুলাই আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলটি খোলা হয়। ‘ঢাকা গভর্নমেন্ট স্কুলের’ জনপ্রিয়তার ফলে শিক্ষানুরাগীদের অনুরোধে ১৮৪১ সালে একে একটি কলেজ তথা উচ্চতর ইংরেজি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করা হয়। প্রতিষ্ঠানটির সিনিয়র ডিপার্টমেন্টটি কলেজ শাখায় পরিণত হয়। ১৯০৮ সালে স্কুলটিকে কলেজ থেকে পৃথক করা হয়। পরবর্তীকালে এটি কলিজিয়েট স্কুল বলে জনমুখে প্রচলিত হয় এবং এ নামেই স্কুলটি স্বীকৃতি পায়। ঢাকা কলিজিয়েট স্কুল বাংলাদেশে ইংরেজি ভাষা ও পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির বিস্তারে পথিকৃতের ভূমিকা পালন করে। ঢাকা কলেজ প্রতিষ্ঠা পূর্ব বাংলায় উচ্চশিক্ষা বিস্তারের প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে বলা যেতে পারে। ১৮৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঢাকা কলেজে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষা প্রবর্তন করা হয়। এভাবে পূর্ব বাংলায় ঢাকা কলেজের মাধ্যমে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা সম্প্রসারণ হয়। ১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হলে উচ্চশিক্ষার দায়িত্ব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গ্রহণ করে এবং কলেজটি ইন্টারমিডিয়েট পর্যায়ের শিক্ষা অব্যাহত রাখে।
ঢাকায় ব্যক্তিগত ও মিশনারিদের উদ্যোগে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছিল। আর্মেনীয় জমিদার ও ব্যবসায়ী এনপি পোগোজ ১৮৪৮ সালে পোগোজ স্কুল প্রতিষ্ঠা করেন। ঢাকাবাসীর কাছে এটি ‘অ্যাংলো ভার্নাকুলার’ স্কুল নামে পরিচিত ছিল। ১৮৭২ সালে এ স্কুলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ৫৯৬। খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের মানুষের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য ১৮৯২ সালে সেন্ট গ্রেগরি স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয়। তবে এ স্কুলে শতকরা ১৫ জন বাঙালি শিক্ষার্থী ভর্তি করা হতো। ১৯১২ সালে এ স্কুলে মেয়েদের জন্য একটি পৃথক শাখা খোলা হয়, যা পরবর্তীতে সেন্ট ফ্রান্সিস জেভিয়ার স্কুল নামে পরিচিত হয়। স্কুল দুটিতে খ্রিস্টান, হিন্দু, মুসলমান, ইহুদি প্রভৃতি ধর্মাবলম্বী ছাত্রছাত্রীদের সমাবেশ ঘটেছিল, যার মাধ্যমে তত্কালীন রক্ষণশীল সমাজেও শিক্ষাক্ষেত্রে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য নজির সৃষ্টি হয়েছিল। সেন্ট গ্রেগরি স্কুলে ১৯৪৯ সালে একটি কলেজ শাখা খোলা হয়। ঢাকার লক্ষ্মীবাজার থেকে ১৯৫৪ সালে কলেজটি মতিঝিলে স্থানান্তর করা হয়। এটি বর্তমানে নটর ডেম কলেজ নামে পরিচিত। এটি ঢাকার প্রথম ক্যাথলিক কলেজ। রোমান ক্যাথলিকদের দ্বারা পরিচালিত এ কলেজে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার দ্বার উন্মুক্ত করা হয়।
কলকাতার অনুরূপ ব্রাহ্ম সমাজের লোকেরা ঢাকায় আধুনিক শিক্ষা বিস্তার ও সমাজ সংস্কারে এগিয়ে আসে। ব্রাহ্ম সমাজের নেতারা তাদের ভাবধারায় একটি স্কুল প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন অনুভব করলেন। উদ্যোক্তাদের মধ্যে ব্রজসুন্দর মিত্র, অনাথবন্ধু, পার্বতীচরণ রায় ও দীননাথ সেন উল্লেখযোগ্য। ব্রজসুন্দর মিত্রের আরমানীটোলার বাড়িতে এ ব্রাহ্ম বিদ্যালয়টি ১৮৫৮ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। অর্থ সংকটে পড়ে স্কুলটি হুমকির মুখে পড়লে বালিয়াটির জমিদার কিশোরী লাল ১৮৭২ সালে স্কুলটি পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে এবং তার পিতা জগন্নাথ রায়ের নামে স্কুলটির নামকরণ করেন। কিশোরী লাল ১৮৮৪ সালে স্কুলের পাশাপাশি জগন্নাথ কলেজ চালু করেন। ১৮৮৭ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান দুটি একই কর্তৃপক্ষের দ্বারা পরিচালিত হয়। ১৮৮৭ সালে প্রতিষ্ঠান দুটি আলাদা হয়ে স্কুলটি জুবিলি স্কুল ও কলেজ শাখা জগন্নাথ কলেজ নামে পরিচিত হয়। ২০০৫ সালে জগন্নাথ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়।
ঢাকায় নারী শিক্ষা বিস্তারের ব্রাহ্ম সমাজের অন্য একটি উদ্যোগও বেশ উল্লেখযোগ্য। উনিশ শতকের সত্তরের দশকে অন্তঃপুর ‘শুভ সাধিনী সভা’ নামে স্ত্রী শিক্ষাসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। জেনানা শিক্ষা প্রসারের লক্ষ্যেই মূলত এটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বলে ১২৮১ বঙ্গাব্দের একটি রিপোর্ট থেকে জানা যায়। ব্রাহ্ম সমাজের নেতারা যথা: নবকান্ত চট্টোপাধ্যায়, ব্রজসুন্দর মিত্র, কালীপ্রসন্ন ঘোষ, দীননাথ সেন, সোমনাথ মুখোপাধ্যায়, অভয়চন্দ্র দাস, আনন্দমোহন দাস, পার্বতীচরণ রায় প্রমুখ এ উদ্যোগ গ্রহণ করলেও নবাব আব্দুল গনি, নবাব আহসান উল্লাহসহ বেশ কয়েকজন মুসলমানও সংস্থাটি পরিচালনার জন্য অর্থ সাহায্য করেন। প্রায় এক দশক এ সভা তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করে। ‘শুভ সাধিনী’ সভা ১৮৭৩ সালে লাজগঞ্জে একটি বাড়িতে ঘরোয়া পরিবেশে একটি গার্লস স্কুল প্রতিষ্ঠা করে। ১৮৭৮ সালে অন্য একটি স্কুলের সঙ্গে একীভূত করে এটিকে ‘ঢাকা ফিমেল স্কুলে’ রূপান্তর করা হয়। ১৮৮০ সালে এটি সরকারীকরণ করা হয়। তত্কালীন লে. গভর্নর স্যার অ্যাশলে ইডেনের নামে এর নামকরণ করা হয় ‘ইডেন গার্লস স্কুল’। তত্কালীন সময়ে এটি ছিল পূর্ব বাংলার প্রথম ও একমাত্র সরকারি গার্লস স্কুল। ১৯২৬ সালে এ স্কুল ইডেন গার্লস হাই স্কুল অ্যান্ড ইন্টারমিডিয়েট কলেজ নামে উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে উন্নীত হয়। দেশভাগের পর ১৯৪৭ সালে ইডেন স্কুল কামরুন্নেসা স্কুলের সঙ্গে একীভূত হয়ে যায়। অন্যদিকে ইডেন কলেজ ও কামরুন্নেসার উচ্চ মাধ্যমিক শাখা একীভূত হয়ে বর্তমান ইডেন কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়। নারী শিক্ষা ও সভ্যতার অগ্রগতির মূল স্রোতে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে ব্রাহ্ম সমাজের সে উদ্যোগের সুফল আজো নারী শিক্ষার দিশারি হিসেবে কাজ করছে।
১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা পূর্ব বাংলার শিক্ষা-সংস্কৃতির বিকাশে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ের সূচনা করে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই পূর্ব বাংলার পশ্চাত্পদ কৃষিজীবী জনজীবনে এক নবচেতনার জন্ম লাভ করে। বঙ্গভঙ্গ রদের ফলে ১৯১১ সালে ঢাকা আবার রাজধানীর মর্যাদা হারায়। পূর্ব বাংলার জনমনে ব্যাপক হতাশা নেমে আসে। মানুষের প্রতিক্রিয়া ও হতাশা ব্রিটিশ সরকারকে ভাবিয়ে তোলে। মুসলিম সমাজের পক্ষ থেকে নবাব স্যার সলিমুল্লাহ, নবাব সৈয়দ নওয়াব আলী, একেএম ফজলুল হক প্রমুখ নেতা ১৯১২ সালের ৩১ জানুয়ারি ব্রিটিশ সরকারের কাছে ঢাকায় একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জোর দাবি জানান। সরকার এ দাবি মেনে ১৯১২ সালের নাথান কমিশনের সুপারিশ ও ১৯১৯ সালের স্যাডলার কমিশনের রিপোর্টের আলোকে ১৯২০ সালে ভারতীয় আইনসভায় ‘দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট’ পাস করে। ১৯২১ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একাডেমিক কার্যক্রম শুরু করে। বিলুপ্ত রাজধানীর পরিত্যক্ত সচিবালয়, ঢাকা কলেজের ভবনগুলো (বর্তমান কার্জন হল এলাকা) গভর্নমেন্ট হাউজ ও প্রায় ১০০ বাংলো নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করে হতাশ জনগোষ্ঠীর অন্তঃকরণে জ্বলে ওঠে নতুন আশার আলো। রমনার সবুজ প্রান্তরে প্রায় ৬০০ একর জমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়। ছাত্রছাত্রীদের উপস্থিতিতে মুখর হয় রমনার সবুজ চত্বর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ জাতির বাতিঘরের ভূমিকা পালন করে। পরিত্যক্ত রাজধানীর ধ্বংসস্তূপের ওপর জন্ম নেয়া এ বিশ্ববিদ্যালয় পশ্চাত্পদ জনগোষ্ঠীর মনে জাগায় জন্মের উন্মাদনা। এ বিশ্ববিদ্যালয় পূর্ব বাংলার জনমনে নতুন আশার সঞ্চার করে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের নেতৃত্বে জাতীয়তাবাদী চেতনা বিকশিত হতে থাকে। শিক্ষা, সংস্কৃতি, সমাজ, অর্থনীতিসহ এ জাতির সর্বক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে কেন্দ্র করেই মূলত ঢাকা নগরীসহ সারা দেশের শিক্ষাক্ষেত্রে পূর্ণতা পেয়েছে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচালনাধীনে ঢাকাসহ সারা দেশে গড়ে ওঠে নতুন নতুন বিভিন্ন ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।
ঢাকার প্রথম কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আহসান উল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুল। ঢাকার নলগোলায় ১৮৭৬ সালে সার্ভে স্কুল হিসেবে এর যাত্রা। ১৯০১ সালে ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে উন্নীত করার জন্য নবাব আহসান উল্লাহ উদ্যোগ গ্রহণ করেন। তিনি মারা গেলে তার পুত্র নবাব স্যার সলিমুল্লাহ ১৯০২ সালে তার পিতার নামানুসারে এটিকে ইঞ্জিনিয়ারিং স্কুলে উন্নীত করেন। লে. গভর্নর উডবার্ন ১৯০২ সালের ২২ জুলাই এর ভিত্তি স্থাপন করেন। ১৯০৫ সালে চার বছর মেয়াদি কোর্স চালুর মধ্য দিয়ে এটি পূর্ণাঙ্গ স্কুলের মর্যাদা লাভ করে। ১৯০৬ সালে এটি বর্তমান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে স্থানান্তর হয়। ১৯৪৮ সালে ডিপ্লোমা ও ডিগ্রি পর্যায়ে উন্নীত করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত করা হয়। ১৯৬২ সালে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত হয়। এটি দেশের প্রকৌশল শিক্ষার পথপ্রদর্শক হিসেবে আজো গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা রেখে চলেছে।
অন্যান্য শিক্ষার পাশাপাশি পূর্ব বাংলায় কৃষিশিক্ষার বিকাশও শুরু হয় ঢাকা নগরী থেকে। অবিভক্ত বাংলার তত্কালীন মুখ্যমন্ত্রী এ কে ফজলুল হক ১৯৩৮ সালে ঢাকায় বেঙ্গল এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করেন। এটি দেশ বিভাগের পর ইস্ট পাকিস্তান এগ্রিকালচারাল ইনস্টিটিউট নামে পরিচিতি পায়। ২০০১ সালে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর হয়।
এ অঞ্চলের মানুষ প্রাচীন আয়ুর্বেদ ও দেশীয় নানা ধরনের কবিরাজি ঝাড়ফুঁক তুকতাক চিকিত্সা ব্যবস্থায় স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণ করত। ঢাকায় আধুনিক চিকিত্সা শিক্ষার বিকাশ উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ঢাকার কালেক্টর ও ঢাকা প্রাদেশিক আদালত বিচারক রবার্ট মিডফোর্ডের অনুদানের অর্থে ১৮৫৮ সালে মিডফোর্ড হাসপাতাল প্রতিষ্ঠিত হয়। এর আগে ১৮০৩ সালে দেশীয়দের চিকিত্সার জন্য Native Hospital স্থাপিত হয়, যা ঢাকাবাসীর চিকিত্সায় যথেষ্ট ছিল না। ১৮৭৫ সালেল ১ জুন মিডফোর্ড হাসপাতালের সঙ্গে সংযুক্ত ঢাকা মেডিকেল স্কুল স্থাপন করা হয়। এখান থেকে পাস করা ডাক্তররা LMF বা Licentiate of the State Medical Faculty ডিগ্রি পেতেন। ঢাকার জনগণের একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ প্রতিষ্ঠার দাবি ছিল দীর্ঘদিন থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পর এ দাবি জোরালো হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কারণে এ দাবি বাস্তবায়ন বিলম্বিত হয়। তবে ১৯৪৬ সালের ১ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ঢাকা মেডিকেল কলেজের যাত্রা হয়। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর পূর্ব বাংলায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ চিকিত্সা শাস্ত্র অধ্যয়নের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করে।
ঢাকা পূর্ব বাংলার প্রাচীন ও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নগরী। ঢাকার সন্নিকটে সোনারগাঁও সুলতানি আমলেও গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত ছিল। নগরায়ণের সঙ্গে সঙ্গে ঢাকায়ও শিক্ষার বিকাশ ঘটে। মূলত ব্যবসা কেন্দ্র হিসেবে ঢাকার খ্যাতি দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়ে। ঢাকাকে কেন্দ্র করে এর আশপাশে নানা বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো। বাংলার রাজধানী হিসেবে এটির অনেক উত্থান-পতন হয়েছে। তবে এর বিকাশ মাঝে মধ্যে ব্যাহত হলেও থেমে যায়নি। মুসলিমপ্রধান পূর্ববঙ্গের প্রধান নগরী হলেও এখানে নানা জাতি-ধর্ম-বর্ণ ও সম্প্রদায়ের মানুষের সম্মিলন ঘটেছে। ঢাকায় অসম্প্রদায়িক ও বহুত্ববাদী সমাজ গড়ে ওঠার পেছনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কোনো নির্দিষ্ট সম্প্রদায়ের মানুষের উদ্যোগে গড়ে উঠলেও সবার জন্য এর দ্বার উন্মুক্ত হয়েছিল। নানা সীমাবদ্ধতা থাকা সত্ত্বেও নারী শিক্ষার ক্ষেত্রেও ঢাকাবাসীর উদার দৃষ্টিভঙ্গি ছিল লক্ষণীয়। ঢাকার শিক্ষা ব্যবস্থার আরো একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো ধর্মীয় শিক্ষা থেকে শুরু করে আর্য়ুবেদ, কারিগরি, চিকিত্সা, কৃষি, নন্দনতত্ত্ব, কলা, মানববিদ্যা, প্রকৌশলসহ শিক্ষার সব শাখার সমন্বয়ে পরিপূর্ণ শিক্ষা ব্যবস্থার বিকাশ ঘটেছে এখানে। নেটিভদের শিক্ষা পদ্ধতি বিষয়ে রিপোর্ট প্রণয়নকালে লর্ড মেকলে ধারণা করেছিলেন, ডাউন ওয়ার্ড ফিলট্রেসন পদ্ধতিতে শিক্ষার মাধ্যমে এ দেশের মানুষ জন্মসূত্র ও চেহারায় ভারতীয় থাকবে; কিন্তু তাদের রুচি, মতবাদ নীতিজ্ঞান, বুদ্ধিসুদ্ধিতে ইংরেজদের মতো হবে। কিন্তু দেখা গেল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ এতদঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থীরা ইংরেজ না হয়ে আরো বেশি করে বাঙালি হয়ে উঠল, তাদের জাতিসত্তাকে চিনতে শিখল, পরিশেষে একটি স্বাধীন সার্বভৌম জাতির জন্ম দিল।
লেখক: সহযোগী অধ্যাপক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়





