গোটা দুনিয়াজুড়েই নগর গড়ে ওঠে নদীর আশীর্বাদে। বাংলাদেশও ব্যতিক্রম নয়; বরং এখানে নদীবর্তী জনপদের সংখ্যা বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় বেশিই। সব জেলা শহরই গড়ে উঠেছে কোনো না কোনো নদীর তীরে। আমরা দেখি, ৬৪ জেলার মধ্যে নয়টির নামের মধ্যেই রয়েছে ‘গঞ্জ’ শব্দটি। এর অর্থ ‘নদীতীরবর্তী ব্যবসাকেন্দ্র’। খোদ নদীর নামেও জেলা রয়েছে, যেমন ভোলা, ফেনী। আর নদীর নামে উপজেলার সংখ্যা তো অনেক। খোদ ঢাকার নামের সঙ্গে যদিও নদীযোগ নেই, ঢাকা মূলত নদীময় অঞ্চল। বৃহত্তর ঢাকার তিনটি জেলার নামের সঙ্গেই ‘গঞ্জ’ রয়েছে— মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

দুনিয়াজুড়েই আরেকটি বাস্তবতা হচ্ছে, নদীর আশীর্বাদে গড়ে ওঠা নগরগুলো ক্রমে নদীর ওপরই চাপ সৃষ্টি করে। অনেক ক্ষেত্রে মৃত্যুরও কারণ হয়ে দাঁড়ায়। এমন উদাহরণ আমরা সাম্প্রতিক কালে অনায়াসেই খুঁজে নিতে পারছি। রিভারাইন পিপল থেকে গত বছর নদী দিবসে আমরা একটি চকিত জরিপ করেছিলাম। তাতে দেখা গিয়েছিল, দেশে দখল ও দূষণের শিকার কমবেশি ৩০টি নদীই নগরসংশ্লিষ্ট। শহরের পাশ বা ভেতর দিয়ে প্রবাহিত নদীগুলোই কোনো না কোনোভাবে দখল বা দূষণের শিকার হচ্ছে। ঢাকা, চট্টগ্রাম, রাজশাহী, খুলনা, সিলেট, রংপুর, বরিশাল, ময়মনসিংহ যে অঞ্চলেই যাই না কেন, দেখা যাবে ‘নাগরিক’ নদীগুলো বহুমাত্রিক চাপের মুখে।

দুনিয়াজুড়েই আরেকটি রূঢ় বাস্তবতা হচ্ছে, নদী মরে গেলে বা মজে গেলে নগরও ক্রমে মরে যেতে থাকে। এ অঞ্চলে এমন উদাহরণ কম নেই। প্রাচীন ও সমৃদ্ধ নগরী পুণ্ড্রবর্ধন জৌলুশ হারাতে থাকে করতোয়া নদী সরে যেতে থাকলে। ষাটের দশকে প্রকাশিত ‘বাঙালী’ গ্রন্থে প্রবোধ চন্দ্র ঘোষ দেখিয়েছেন, প্রাচীনকালে গঙ্গা যখন মেদিনীপুর অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হতো, তখন তাম্রলিপি বা তমলুক হয়ে উঠেছিল পূর্ব ভারতের প্রধান বাণিজ্যনগরী ও বন্দর। গঙ্গা সরে গেলে তাম্রলিপির সমৃদ্ধিও মজে যেতে থাকে। তিনি লিখেছেন, ‘আজ ছ’শো বছর ধরে গঙ্গা নদী চলছে পূর্ব দিকে বয়ে— পুরনো বন্দর, শহর আর গ্রাম হয়েছে প্রাণহীন, এসেছে ধ্বংস আর পরিবর্তন।’ আমরা দেখি, সতেরো শতকের গোড়ায় কলকাতা শহর গড়ে উঠছে নাব্য ভাগীরথী বা হুগলির তীরে। নদীটিকে কেন্দ্র করেই হয়ে উঠছে ভারতবর্ষের সমৃদ্ধতম বন্দরনগরী, এমনকি ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী। কিন্তু বিশ শতকের মাঝামাঝি যখন গঙ্গা ও ভাগীরথীর সংযোগস্থল ক্রমে ভরাট হওয়ার কারণে কলকাতা বন্দরমুখী প্রবাহ কমে যাচ্ছিল, তখন ফারাক্কা ব্যারাজের তোড়জোড় শুরু হয় কলকাতা বন্দরকে টিকিয়ে রাখার জন্য। যদিও ফারাক্কা ব্যারাজের প্রয়োজনীয়তা, কার্যকারিতা ও বিরূপ প্রভাব নিয়ে অনেক কথা রয়েছে। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে এটাই প্রমাণ হয়, নদী মরে যেতে থাকলে নগরের জৌলুশ হারিয়ে যেতে থাকে।

পূর্ব বাংলা তথা আজকের বাংলাদেশেও আমরা আরো কিছু উদাহরণ দেখতে পাই। যেমন যশোর অঞ্চলে জৌলুশ কমতে শুরু করেছিল উনিশ শতকের শেষার্ধে ভৈরব, কপোতাক্ষ গঙ্গার সংযোগ হারিয়ে মজে যেতে থাকলে। গবেষক মাহবুব সিদ্দিকীর একটি বই রয়েছে ‘নারদ নদ’ (২০১৩)। সেখানে তিনি সরকারি নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখিয়েছেন, ১৭৮৬ সালে প্রথম যখন রাজশাহী জেলা ঘোষিত হয়, তখন তার সদর দপ্তর প্রতিষ্ঠা করা হয় নারদ নদের তীরে বর্তমান নাটোরের কানাইপুরে। কিন্তু ১৮২১ সালের এক বন্যায় গঙ্গার সঙ্গে নারদ নদের সংযোগস্থল ভরাট হয়ে গেলে প্রবাহটি মরে যেতে থাকে। বদ্ধ পানিতে দেখা দেয় নানা রোগ-জীবাণু। ফলে ১৮২৫ সালে রাজশাহী জেলার সদর দপ্তর রামপুর-বোয়ালিয়া এলাকায় স্থানান্তর করা হয়। সেখানেও এক দফা ভাঙনের পর ১৮৬৪ সালে কলেক্টরেট ভবন চলে আসে বর্তমান অবস্থানে। আর কে না জানে যে, রাজশাহী তার জৌলুশ হারাতে শুরু করেছে ফারাক্কা ব্যারাজের কারণে গঙ্গায় প্রবাহস্বল্পতার দরুন।

ঢাকা অঞ্চলের নদীগুলোও ছিল বিশেষ তাত্পর্যপূর্ণ। বলা হয়ে থাকে, মোগল শাসক ইসলাম খান চিশতি বুড়িগঙ্গা তীরবর্তী অঞ্চলটিকে সুবে বাংলার রাজধানী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন তিনটি কারণে। প্রথমত. এ নদীর জলস্তর জোয়ার ও ভাটার সময় একই থাকে; দ্বিতীয়ত. নদীতে বন্যা ও ভাঙন নেই; তৃতীয়ত. বুড়িগঙ্গা থেকে নদীপথে বাংলার যেকোনো অংশে দ্রুততম সময়ে পৌঁছা যায়। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার দিক থেকেও ঢাকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। চারদিকে নদ-নদীর ‘দুর্ভেদ্য দেয়াল’ অঞ্চলটিকে সুরক্ষিত রাখত বলেই দেখা যায়, বিক্রমপুরের বিক্রমাদিত্যরা দীর্ঘস্থায়ী রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছিল। বারভুঁইয়ার একজন সোনারগাঁওয়ের ছোট্ট রাজ্যের শাসক ঈসা খাঁ বৃহৎ মোগল বাহিনীর কাছে অজেয় থাকতে পেরেছিলেন নদী প্রতিরক্ষার জোরেই।

মোগল যুগে অভ্যন্তরীণ চলাচলের জন্যও ঢাকার চেয়ে উপযুক্ত স্থান আর ছিল না। কারণ গোটা অঞ্চলে জালের মতো ছড়িয়ে ছিল নদ-নদী। গোটা বঙ্গই ‘নদীমাতৃক’ হলেও বৃহত্তর এর অনেকগুলোকেই ক্রমে খাল আখ্যা দিয়ে মেরে ফেলা হয়েছে। যেমন দোলাই নদীকে ‘ধোলাই খাল’ নামে বক্স কালর্ভাটের নিচে চাপা দেয়া হয়েছে। যেমন নড়াই নদীকে ধানমন্ডি লেক ও হাতিরঝিল হিসেবে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলা হয়েছে। যদিও একটি অংশ এখনো টিকে আছে ‘রামপুরা খাল’ নামে। এসব অতি সাম্প্রতিক উদাহরণ মাত্র। এক শতকে শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত আরো অনেক নদীই নিশ্চিহ্ন করে ফেলা হয়েছে। যেমন মিরপুরে যে ‘সোনাভান’ নামে একটি দারুণ নদী কয়েক দশক আগেও ছিল, এখন কাউকে বিশ্বাস করানো কঠিন। অথচ আমাদের পুথি সাহিত্যে সোনাভান চরিত্রটি অমর হয়ে আছে। এক শতাব্দীরও বেশি আগে প্রকাশিত ‘ঢাকার ইতিহাস’ (১৯১২) পড়ছিলাম কয়েক দিন আগে। লেখক যতীন্দ্রমোহন রায় দেখাচ্ছেন, ‘বহুসংখ্যক নদ-নদী এই জেলার বক্ষদেশ বিদীর্ণ করিয়া প্রবাহিত হইতেছে।’ তিনি যেসব ‘জীবন্ত’ নদ-নদীর বর্ণনা দিয়েছে, মাত্র এক শতকের মাথায় এর অনেকগুলোই অপরিচিত নাম। প্রবাহিত হওয়া দূরে থাক, নদীরেখা হিসেবে চিহ্নিত হওয়া দূরে থাক; নামই শোনা হয়নি। ভাবা যায়, খোদ ঢাকায় আরো দুটি ‘গঙ্গা’ নামের নদী প্রবাহিত হতো! রামগঙ্গা ও নারায়ণীগঙ্গা নামের নদী দুটি বইটি লেখার সময়ও ‘ঢাকা জেলার বক্ষদেশে উপবীতবৎ শোভা পাইতেছে।’ অবশ্য লবণদহ নামের ‘নদীটি’ এখনো গাজীপুর শহরের যে আক্ষরিক অর্থেই কয়েক ফুট প্রশস্ত পাকা ড্রেন হিসেবে ‘টিকে’ রয়েছে, কয়েক বছর আগে ডেইলি স্টারের পরিশ্রমী প্রতিবেদকের সৌজন্যে দেখতে পেয়েছিলাম।

নদীসমৃদ্ধ ঢাকা অঞ্চলের একদা সচ্ছল স্রোতস্বিনীগুলো হারিয়ে যেতে যেতে এখনো যে কয়েকটা টিকে রয়েছে, সেগুলোও নদীর স্বাভাবিক চরিত্র হারিয়ে ফেলেছে। একটি স্বাভাবিক নদীর চার ধরনের ব্যবহার থাকে। প্রথমত. মত্স্যসম্পদের উৎস; দ্বিতীয়ত, সুপেয় ও গার্হস্থ্য পানির উৎস; তৃতীয়ত. সেচের উৎস; চতুর্থত. নৌ-চলাচলের মাধ্যম। কিন্তু ঢাকার চারপাশে বেষ্টনকারী নদী চারটি— বুড়িগঙ্গা, তুরাগ, বালু, শীতলক্ষ্যা— এখন স্বাভাবিক চার উপযোগিতার তিনটিই হারিয়েছে। মারাত্মক দূষণের কারণে বুড়িগঙ্গা, তুরাগ ও বালু নদের পানি পানীয় জল হিসেবে, গৃহস্থালি ও সেচের কাজে ব্যবহারের প্রশ্নই ওঠে না। শীতলক্ষ্যার পানি তাও ব্যাপক শোধন করে খানিকটা ব্যবহার করা যায়; কিন্তু সেটাও কতদিন সম্ভব হবে, জানা নেই। বর্ষাকালে কয়েক মাস ছাড়া বছরের বাকি সময় নদীগুলোয় মত্স্যসম্পদের টিকে থাকা অসম্ভব।

চারটি নদীই অবশ্য এখনো নৌ-চলাচলের উপযোগী। কিন্তু তার মধ্যেও রয়েছে একটি নিদারুণ সত্য। কারণ নদী চারটির ‘প্রবাহ’ আসলে কতটুকু স্বাভাবিক পানি আর কতটুকু মহানগরবাসীর ‘তরল উদ্বৃত্ত’, তা নিয়ে গবেষণা হতে পারে। শীতলক্ষ্যার কথা যদি বলি, পুরাতন ব্রহ্মপুত্র থেকে উত্সারিত এ নদীর উজান এলাকা পানিস্বল্পতায় ভুগছে। কিন্তু ভাটির দিকে প্রবাহস্বল্পতা নেই। এর কারণ কি ঢাকা, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের গার্হস্থ্য তরল? নদী চারটি ও তাদের শাখা-প্রশাখা কীভাবে দখলের শিকার হয়েছে এবং হয়েই চলছে, বিষয়টি বহুল আলোচিত।

প্রশ্ন হচ্ছে, এটাই কি নাগরিক নদীর নিয়তি? নদীর আশীর্বাদে নগর গড়ে উঠবে, তারপর নগরের চাপে নদী মরে বা মজে যাবে? তারপর নদী যখন সরে যাবে, নগরও সমৃদ্ধি হারাবে? প্রশ্নের উত্তর আসলে নিয়তিতে নয়, বরং নীতিতে। পরিবেশ, প্রতিবেশ, সংস্কৃতি ছাড়াও নদীর কেবল অর্থনৈতিক অবদানই এর তীরে নগর প্রতিষ্ঠার শর্ত হাজির করেছে। নদীর অর্থনৈতিক সুবিধা ও সম্ভাবনাই আহ্বান জানিয়েছে নগরকে। কারণ সভ্যতার আদিকাল থেকে নদীই ছিল সুপেয় পানির বৃহত্তম ও সহজলভ্য উৎস। পানি দিয়ে জীবনধারণ ও গার্হস্থ্য প্রয়োজন মেটানোর পর কৃষিজ উৎপাদনেও যে পানির প্রয়োজন, নদী ছাড়া তা উপযুক্ত মাত্রা ও পরিমাণে কোথায় মিলবে? উর্বর পলল ভূমিই বা কোথায় মিলবে নদীবাহিত পলি ছাড়া? এমনকি পার্বত্য অঞ্চলেও দেখা যায় কৃষি উৎপাদনের উপযুক্ত ভূমি নদীতীরেই বা কাছাকাছি অংশে মিলছে। বিভিন্ন গবেষণায়ও দেখা গেছে, নদী ও এর প্লাবনভূমিই জীববৈচিত্র্যের জন্য সবচেয়ে আদর্শতম স্থল। কৃষি-পরবর্তীতে যখন শিল্প যুগ সূচিত হয়েছে, তখনো দেখা গেছে, শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বিপুল পানি নদী থেকেই মেলে।

বিশেষত বদ্বীপ অঞ্চলে নদীর যোগাযোগ উপযোগিতাও একটি বড় বিবেচনা। এ অঞ্চলে রেল আসার আগে নদীই ছিল সহজ, সুলভ ও স্বস্তিকর যোগাযোগ পথ। এ অঞ্চলে নদ-নদীর প্রথম নির্ভরযোগ্য মানচিত্রের জনক জেমস রেনেলের বরাতে ‘পূর্ব বাংলার রেলওয়ের ইতিহাস’ গ্রন্থে পড়েছিলাম, ঢাকার সঙ্গে বর্তমান বাংলাদেশের অন্যান্য শহর ও ঢাকা-কলকাতা তো বটেই, রংপুর থেকে কলকাতা যাতায়াতেরও অন্তত তিনটি ‘ব্যস্ত নদীপথ’ ছিল। নদীতীরে নগর গড়ে ওঠার আরেকটি কারণ বিনোদন বা স্বস্তি। মোগল ও ব্রিটিশ আমলে আমরা ঢাকার যে সুনাম শুনে থাকি, তার বড় কারণ এখানকার ‘নদী-হাওয়া’। চতষ্পার্শ্বে ও অভ্যন্তরের নদ-নদী ঢাকা আবহাওয়াকে স্নিগ্ধ ও পরিবেশকে পরিচ্ছন্ন রাখত।

নীতি যদি ঠিক থাকে, তাহলে নদ-নদীর উপযোগিতা নগরকে সমৃদ্ধই করতে থাকে। উন্নয়ন যদি টেকসই হয়, তাহলে নদী ও নগর কারোরই ক্ষতি হয় না। নদী চাপে পড়ে না, নগরকেও জৌলুশ হারানোর ঝুঁকিতে পড়তে হয় না। নীতি মানে কেবল আইন ও বিধিবিধান নয়। সাধারণ নাগরিকদের সাংস্কৃতিক প্রবণতাও এর অন্তর্ভুক্ত। একটা সামান্য কিন্তু তাত্পর্যপূর্ণ উদাহরণ হচ্ছে বুড়িগঙ্গা তীরের আহসান মঞ্জিল। এটি নদীর দিকে মুখ করে নির্মিত। অথচ পরবর্তীতে আশাপাশে যে বাড়িগুলো তৈরি হয়েছে, তার সবগুলোরই মুখ নদী থেকে ফেরানো। স্বভাবতই মুখ যখন ফেরানো হয়, বর্জ্য ফেলার প্রবণতা তৈরি হয় পেছনের দিকে। যেসব নগরে নীতিগত ও সাংস্কৃতিক ভারসাম্য রয়েছে, সেখানে দেখা যায়, নগর নদীর দিকেই মুখ করে সম্প্রসারণ হচ্ছে। আর সম্মুখভাগ পরিচ্ছন্ন রাখার স্বাভাবিক প্রবণতা থেকেই নদীও প্রতিবন্ধকতামুক্ত থাকে। আমরা হাঁটছি উল্টো পথে। এক নদীবিমুখ নগর ব্যবস্থা ক্রমেই গড়ে তোলা হয়েছে।

নগরবিদরা বলে থাকেন, যে নগরের এক দিকে নদী প্রবাহিত থাকে, তা ‘সৌভাগ্যবতী’। অথচ ঢাকা নগরের চারদিকেই নদী প্রবাহিত। সে হিসেবে নগরটির চতুর্গুণ সৌভাগ্যবতী হওয়ার কথা ছিল। দুর্ভাগ্যবশত প্রত্যেকটা নদীই যেন হয়ে উঠছে এ নগরের জন্য একেকটি দুর্ভোগের উৎস। আরো দুর্ভাগ্যের কথা, ঢাকা মহানগর যত সম্প্রসারণ হয়েছে, নদী দখল, দূষণ ও হত্যার আয়োজনও তত সম্প্রসারণ হয়েছে। ঢাকার ট্যানারি শিল্প বুড়িগঙ্গা দূষণ করত। অনেক আন্দোলন, আদালত করার পর তা সাভারে সরানো গেছে। কিন্তু সেখানে গিয়ে দূষণ করছে ধলেশ্বরী। একসময় নগরের উপকণ্ঠ ঢাকার মধ্যেই সীমিত থাকলেও এখন ঢাকার উপকণ্ঠ সম্প্রসারণ হয়েছে টাঙ্গাইল, মানিকগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী অবধি। দখল ও দূষণের ‘ঢাকাই সংস্কৃতি’ সেখানেও পৌঁছে যাচ্ছে সগৌরবে।

কথা হচ্ছে, স্বাভাবিক প্রবণতা থেকেই নদীর তীরে তীরে নগর গড়ে উঠেছে। এখন নগরের চাপে যদি নদী দূরে সরে যায়, যদি মরে যায়; তাহলে এ নগরগুলো যে টিকবে না, তার অনেক উদাহরণ রয়েছে। আবার নীতিগত ভারসাম্য রক্ষা করে নদী ও নগর উভয়কেই সচল ও সচ্ছল রাখার উদাহরণও বিশ্বে কম নেই। নদীর আশীর্বাদে নগর গড়ে ওঠার পর নগরের প্রয়োজনেই নদীরও উপযোগিতা বেড়েছে। পছন্দ আমাদের হাতে। যেমন নীতিনির্ধারকদের, তেমনি নাগরিকদেরও। নিয়তি সবসময় অলঙ্ঘনীয় নয়, নিয়তি বদলানোও যায়।

 

লেখক: মহাসচিব, রিভারাইন পিপল