বাংলাদেশের রাজধানী মেগাসিটি ঢাকা বিশ্বের অন্যতম জনবহুল শহর। সময়ের সঙ্গে শহরটিতে দ্রুতগতিতে জনসংখ্যা ও আয়তন বেড়েছে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে এ শহরের উন্নতি হয়েছে যেখানে সেখানে ও অপরিকল্পিতভাবে। এ কারণে যথেচ্ছ ভূমি ব্যবহার করা হয়েছে, তৈরি হয়েছে পরিবহন দুর্বলতা। ঢাকা শহরের পরিবহন ব্যবস্থায় অন্যতম প্রধান সমস্যা হলো অদক্ষ ও অকার্যকর ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা। অপরিকল্পনা ও অসমন্বিত সড়ক নেটওয়ার্কের কারণে বিভিন্ন মোড ও সাব-মোড সমন্বিত সড়ক নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুযোগ খুবই সীমিত হয়ে পড়েছে।

আয়তন, কার্যক্রম ও চরিত্র অনুযায়ী শহুরে এলাকার ২০-৪০ শতাংশজুড়ে থাকে আধুনিক পারস্পরিক যুক্ত সড়ক নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা। অন্যদিকে রাজধানীতে ডিসিসির মোট আয়তনের মাত্র ৯ শতাংশ সড়ক, যেখানে মাত্র ৬ শতাংশ ফুটপাত। ডিসিসির ১ হাজার ২৮৬ কিলোমিটার রাস্তার ৬১ কিলোমিটার প্রাইমারি, ১০৮ কিলোমিটার সেকেন্ডারি, ২২১ কিলোমিটার কানেক্টর, ৫৭৩ কিলোমিটার লোকাল ও বাকিটা সংকীর্ণ সড়ক। পুরো শহরের মধ্যে শুধু ১০৭ কিলোমিটার সড়কের প্রশস্ততা ২৪ মিটারের বেশি। ফুটপাতের প্রশস্ততা, যেটি মাত্র ৪৫ কিলোমিটার, একটা পর্যায় পর্যন্ত সেবা দিতে উপযুক্ত ছিল। প্রকৃতপক্ষে ঢাকা সিটি করপোরেশনের মোট সড়কের মধ্যে ৮২১ দশমিক ৬১ কিলোমিটার (৬৪ শতাংশ) রাস্তার প্রশস্ততা ৪ দশমিক ৭৫ মিটার বা তার চেয়ে কিছুটা বেশি। ফুটপাতের প্রশস্ততা অনুযায়ী এটি মাত্র ৬১৮ দশমিক ১৪ কিলোমিটার (৪৮ শতাংশ)। অন্য ৪৬৪ কিলোমিটার (৩৬ শতাংশ) সড়কে জরুরি গাড়ি যেমন অ্যাম্বুলেন্স বা অগ্নিনির্বাপক গাড়ি প্রবেশ করতে পারে না।

প্রতি হাজার মানুষের জন্য অথবা প্রতি বর্গকিলোমিটার এলাকার কিলোমিটার হিসাবে প্রধান সড়কগুলোর প্রাপ্যতা উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশের তুলনায় খুবই কম। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, উন্নয়নশীল দেশের নয়টি শহর ও উন্নত দেশের ২৬টি শহরের জনপ্রতি গড় সড়ক যথাক্রমে দশমিক ৫ ও ৪ দশমিক ৫ মিটার। অথচ ঢাকা শহরে এটি দশমিক শূন্য ২১৩ মিটার। এটা ঢাকা শহরের অন্তর্নিহিত মৌলিক দুর্বলতা, যেটি তৈরি হয়েছে ভূমি ও পরিবহন নিয়ে অপরিকল্পনার কারণে। এমনকি নতুন স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (এসটিপি) বাস্তবায়ন করার পরও মোট সড়ক নেটওয়ার্ক হবে প্রায় ১ হাজার ৪১৩ দশমিক ৬৭ কিলোমিটার ও ফুটপাত এলাকা দাঁড়াবে যথাক্রমে ১৫ (১১ শতাংশ) ও ১১ (৮ শতাংশ) বর্গকিলোমিটার। অন্যদিকে নকশা ত্রুটির কারণে বিদ্যমান সড়কগুলো পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না।

ঢাকা শহরের সৌভাগ্য যে, এর চারপাশে চক্রাকার প্রাকৃতিক জলপথ (সার্কুলার ওয়াটারওয়ে) রয়েছে। শহরটিকে ঘিরে রয়েছে চারটি বড় নদ-নদী। সব মিলিয়ে ঢাকা শহরে চক্রাকার পানিপথে ১৯টি ঘাট রয়েছে এবং একটি মাত্র লঞ্চ দুই ঘাট সদরঘাট ও খোলামোড়ার মধ্যে চলাচল করে এবং এ রুট সিঙ্গেল ডেক লঞ্চে মাত্র দেড়-দুই হাজার যাত্রী বহন করে। সঠিক পরিকল্পনা নিলে এ চক্রাকার পানিপথ শহরের যাত্রীদের বড় অংশকে চলাচলের রেহাই দিতে পারত। কিন্তু নদী ও নদীর পাশে গড়ে ওঠা এলোমেলো উন্নয়ন কর্মকাণ্ড, সড়ক ও পরিবহনের অন্য উপায়ের মধ্যে ইন্টারচেঞ্জ সুবিধার অভাব এবং অসমন্বিত পরিবহন পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার কারণে বিপুল সুবিধা পাওয়ার সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও শহর ঘিরে চক্রাকার পানিপথ বাস্তবায়ন করা খুবই চ্যালেঞ্জিং কাজ।

ঢাকা শহরে, উত্তর-দক্ষিণমুখী একক রেলপথ করিডোর (শ্যামপুর থেকে আব্দুল্লাহপুর) শহরের মাঝখান দিয়ে চলে গেছে। যাত্রীরা তিনটি স্টেশন ব্যবহার করে— কমলাপুর (৬ শতাংশ), তেজগাঁও (১ শতাংশ) ও এয়ারপোর্ট (২ শতাংশ)। কমলাপুর রেলস্টেশনের অবস্থান শহরের পূর্বাংশের মাঝখানে। প্রতিদিন ২০-২৫ হাজার যাত্রী এতে যাওয়া-আসা করে। বাকি দুই রেলস্টেশন তেজগাঁও ও এয়ারপোর্ট ব্যবহার করে ১০-১৫ হাজার যাত্রী। বড় সম্ভাবনা থাকলেও পরিকল্পনা পর্যায়ে সড়ক ও রেলের মধ্যে একীভূত করার অভাবে এখন একে অন্যের চলাচলে বাধা তৈরি করছে।

ঢাকা শহরে আসা ও এখান থেকে যাওয়া যাত্রীদের অংশ বাস, ট্রেন ও লঞ্চে যথাক্রমে ৭৬, ৯ ও ১৫ শতাংশ। এ তিন মোডের মধ্যে ইন্টারচেঞ্জ সুবিধা খুব কম। মোট বাসযাত্রীদের সেবা দিচ্ছে পাঁচটি বাস টার্মিনাল (গাবতলী ২৩ শতাংশ), মহাখালী (৬ শতাংশ), গুলিস্তান (৭ শতাংশ), ফুলবাড়ী (১৫ শতাংশ) ও সায়েদাবাদ (২৫ শতাংশ)। এ পাঁচ টার্মিনালের মধ্যে সরাসরি কোনো যোগযোগ ব্যবস্থা নেই। গাবতলী থেকে গুলিস্তান ও গাবতলী থেকে সায়েদাবাদ পর্যন্ত ভিন্ন একক বাস সার্ভিস রয়েছে, কিন্তু এ সংযুক্ত রুটটি ঘোরপ্যাঁচযুক্ত, যার মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন সংযুক্ত সড়ক, বামে টার্ন, ডানে টার্ন ও স্থানীয় রাস্তা, শাখা রাস্তা ইত্যাদি এবং যেতে হয় বাণিজ্যিক, আবাসিক, শিক্ষা ও সিবিডি এরিয়ার মধ্য দিয়ে। এছাড়া সায়েদাবাদ, মহাখালী ও গাবতলী থেকে মহাখালী টার্মিনালের মধ্যে কোনো সংযুক্ত সেবা নেই।

রেলপথ যাত্রীদের সেবার জন্য রয়েছে তিনটি রেলওয়ে স্টেশন, কমলাপুর (৬ শতাংশ), তেজগাও (১ শতাংশ) ও এয়ারপোর্ট (২ শতাংশ)। কমলাপুল রেলস্টেশনের অবস্থান শহরের পূর্ব দিকে ও এটি সিবিডি থেকে মাত্র দশমিক ৫ কিলোমিটার দূরে। সিবিডি থেকে যাওয়া-আসা করা লোকদের মধ্যে প্রায় ৯০ শতাংশ রিকশা ব্যবহার করে যথেষ্ট ফুটপাত বা বিকল্প ব্যবস্থার অভাবে। প্রতিদিন এ স্টেশনে আসা-যাওয়া করা ২০-২৫ হাজার যাত্রীকে সেবা দিতে রয়েছে তিনটি আন্তঃনগর ও একটি সেমি-আন্তঃনগর বাসসেবা, যেগুলো শহরের বিভিন্ন স্থানে যায়। তবে স্টেশন থেকে গাবতলী, মহাখালী ও সদরঘাট টার্মিনালের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কোনো সেবা নেই। বড় ধরনের সংযুক্ত ট্রানজিট নেটওয়ার্কের অভাবে প্রায় ৬০ শতাংশ যাত্রী রিকশা ব্যবহার করে, ১৬ শতাংশ ব্যবহার করে মিনিবাস ও ৯ শতাংশ অটোরিকশা। পুরান ঢাকার সঙ্গে কোনো সংযুক্ত বাসসেবা নেই। রিকশা ও অটোরিকশার জন্য পার্কিংয়ের জায়গা রয়েছে, কিন্তু বাসের জন্য কোনো লোডিং-আনলোডিং বা পার্কিংয়ের জায়গা নেই। অন্যদিকে স্টেশন চত্বর থেকে কোনো বাস রুটের শুরু বা শেষ নেই। ওই চার বাস রুটের মধ্যে পড়ে স্টেশন। এজন্য স্টেশনে যখন বাস পৌঁছে, তখন সেগুলো প্রায় পুরোটাই ভর্তি থাকে। এজন্য ট্রেনের যাত্রীরা বাসে যেতে চায় না, তারা রিকশা বা অটোরিকশা নিতে বাধ্য হয়। তিনটি বাস কাউন্টার রয়েছে এবং এগুলো ফুটপাতের ওপর বসে। টঙ্গী ও ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনের মাঝখানে এয়ারপোর্ট স্টেশন স্থাপন করা হয়েছে মেট্রো সিটির উত্তর দিকের যাত্রীদের সেবা দেয়ার জন্য। আন্তঃনগর ট্রেনের কার্যক্রম থাকায় এ স্টেশন জনপ্রিয়। এ জনপ্রিয়তার কারণগুলো হলো: ট্রানজিট সুবিধা, এনএমটিমুক্ত ভিআইপি সড়কের সঙ্গে ভালো যোগাযোগ এবং সবসময় ট্যাক্সি ও অন্যান্য সেবার সহজপ্রাপ্যতা, যা শহরের সব দিকেই যায়। অন্যদিকে এ ধরনের সেবা, বিশেষ করে সংযুক্ত সড়কের অভাবে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছে তেজগাঁও স্টেশন।

পানিপথের প্রায় সব যাত্রীদের সেবা দেয় সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনাল। এর সবচেয়ে কাছের বাস টার্মিনাল প্রায় এক কিলোমিটার দূরে। টার্মিনালের একমাত্র চার লেনের অবিভাজিত প্রধান সড়কটিতে সবসময় প্রচণ্ড ভিড় থাকে। দুটি লেন তো সবসময় দখল করে রাখে হকার ও উভয় পাশের বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের মালপত্র। প্রকৃতপক্ষে এখানে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের ঘনত্ব এত বেশি যে, দেখাই যায় না, এখানে ফুটপাত রয়েছে। এছাড়া বহুতল ভবনের নির্মাণকাজ তো রয়েছেই। ভ্রমণের আগে-পরে প্রায় ৫৫ শতাংশ যাত্রী রিকশা ও সিএনজি ব্যবহার করে; রিকশা ৪০ শতাংশ ও সিএনজি ১৫ শতাংশ। মাত্র ১৬ শতাংশ লোক মিনিবাসসেবা ব্যবহার করে এবং ১৫ শতাংশ ব্যবহার করে টেম্পো ও হিউম্যান হলার, লঞ্চঘাট থেকে প্রায় এক কিলোমিটার হেঁটে ভিক্টোরিয়া পার্কে এসে তারপর এ সেবা নিতে হয়। পার্ক টার্মিনালে মাত্র তিনটি রুটের বাস রয়েছে। কমলাপুর স্টেশন চার কিলোমিটার দূরে হলেও ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা নেই। মহাখালী ও সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালের সঙ্গেও কোনো সংযুক্ত বাস রুট নেই।

প্রতিদিন ঢাকায় ১ কোটি ৮৭ লাখ আন্তঃশহর ট্রিপ হয়। কমিউটার ট্রেন ও লঞ্চ যথাক্রমে প্রতিদিন পাঁচ হাজার ও দুই হাজার আন্তঃশহর যাত্রী বহন করে। বাকি ট্রিপ রাস্তাভিত্তিক, হয় হেঁটে, নয় গাড়িতে মোটর ও মোটরবহির্ভূত গাড়ি। সড়ক, রেল ও পানিপথের মধ্যকার ইন্টারচেঞ্জ ব্যবস্থা খুবই খারাপ। প্রকৃতপক্ষে সড়ক-রেল ও সড়ক-পানিপথের মধ্যকার ইন্টারচেঞ্জ সুবিধা বা ইন্টারফেসের অভাব পরিবহন ব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা।

দুটি আন্তঃনগর কমিউটার ট্রেন চলে। একটি কমলাপুর থেকে তেজগাঁও হয়ে টঙ্গী ও অন্যটি কমলাপুর থেকে গেণ্ডারিয়া হয়ে নারায়ণগঞ্জ। প্রতিদিন মেইল ট্রেনের ২৬টি ট্রিপ (১৩টি ইনকামিং, ১৩টি আউটগোয়িং) কমলাপুর থেকে টঙ্গী রুটে চলাচল করে এবং যাত্রী যাওয়া-আসা করে প্রতিদিন দুই-আড়াই হাজার। ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে প্রতিদিন ২০টি ট্রিপ চলে (১০টি ইনকামিং, ১০টি আউটগোয়িং) ছুটির দিন ব্যতীত, (ছুটিতে চলে চারটি ইনকামিং, চারটি আউটগোয়িং) এবং যাত্রী গড়ে যাওয়া-আসা করে আড়াই-তিন হাজার। যাত্রীদের গড় ভাড়া বাসের চেয়ে কমপক্ষে ৫ গুণ কম। এর পরও এ রুটে বাসের তুলনায় ট্রেনে যাত্রী কম। ইন্টারচেঞ্জের সুবিধার ঘাটতি ও একই সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের অভাব স্টেশন থেকে গন্তব্যে কমিউটার ট্রেনসেবার চাহিদা কম থাকার প্রধান কারণ। এছাড়া কম জনপ্রিয় হওয়ার পেছনে ট্রেন ছাড়ার দেরি বা সময়সূচিতে অনাস্থাও অন্যতম প্রধান কারণ। এভাবে পরিচালনার পেছনে একটি কারণ বাস মালিক ও রেল কর্তৃপক্ষের মধ্যকার অবৈধ মধ্যস্থতা। অথচ একটি সরকারি, অন্যটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান।

সোয়ারীঘাট থেকে খোলামোড়া রুটে একটি আন্তঃনগর নৌযান রয়েছে, যেটি প্রতিদিন দেড়-দুই হাজার যাত্রী বহন করে। মালবাহী পরিবহনের জন্য চক্রাকার পানিপথ ছাড়াও বেশকিছু অন্য রুট রয়েছে। এর সঙ্গে চক্রাকার পানিপথের উভয় পাশে প্রায় ৩০টি ক্রসিং স্টেশন রয়েছে এবং প্রতিদিন এসব স্টেশন ব্যবহার করে হাজারো যাত্রী নদী পার হয়। প্রায় ৬০ শতাংশ স্টেশনের কোনো কার্যকরী সড়ক যোগাযোগ নেই। সড়ক যোগাযোগের ঘাটতি অথবা ইন্টারচেঞ্জের সুবিধার অভাব, মানুষকে বাধ্য হয়ে গন্তব্যে যেতে রিকশা নিতে হয় অথবা হেঁটে যেতে হয়। ঢাকা শহরে চক্রাকার পানিপথে সব মিলিয়ে ১৯টি ল্যান্ডিং স্টেশন রয়েছে, ফেজ-১ (আশুলিয়া থেকে সোয়ারীঘাট) ১০টি স্টেশন ও ফেজ-২ (টঙ্গী থেকে কাঁচপুর) নয়টি স্টেশন, কিন্তু মাত্র আটটি স্টেশনের সঙ্গে শহরের ভালো যোগাযোগ রয়েছে। ১৩টি ক্রসিং স্টেশন বা ঘাট নদী পারাপারে ব্যবহার করে নৌকা। সদরঘাট থেকে রায়ের বাজার পর্যন্ত সব মিলিয়ে ১৭টি স্টেশনে রয়েছে, যার মধ্যে তিনটি চক্রাকার পানিপথ ল্যান্ডিং স্টেশন এবং প্রতি বছর প্রায় দুই কোটি যাত্রী এসব স্টেশন ব্যবহার করে, কিন্তু বাঁধ রাস্তা ব্যতীত অন্য কোনো ভালো সংযুক্ত ইন্টারচেঞ্জিং রুট নেই। দুই লেন রোড দখল থাকে মালবাহী বা পার্কিং গাড়ি কিংবা ব্যবসায়ীদের মালপত্র। সংযোগ রোডের অভাবে যাত্রীরা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে যেতে পারে না। সংযুক্ত সড়কের অভাবে ল্যান্ডিং স্টেশন থেকে প্রায় ৮০ শতাংশ যাত্রী হেঁটে বা রিকশায় নিজেদের গন্তব্যে যেতে বাধ্য হয়। দ্বিতীয় ফেজে নয়টি ল্যান্ডিং স্টেশন পয়েন্ট রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র তিনটি কর্নার পয়েন্ট রয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে জাতীয় ও আঞ্চলিক হাইওয়ে রুটের সঙ্গে বেশ ভালোভাবে যুক্ত টঙ্গী, কাঁচপুর ও ডেমরা। অন্য ছয় স্টেশনের মধ্যে তিনটির সঙ্গে স্থানীয় সড়ক যুক্ত রয়েছে ঢাকা শহরের সঙ্গে এবং অন্যগুলোর কোনো সংযোগ নেই। রামপুর খাল সংযোগের জন্য একটি ভালো সংযোজক হতে পারে। প্রথম ফেজে আরো কিছু সংযোজক খাল ছিল, যেমন ধোলাইখাল (সিবিডিকে যুক্ত করবে), রায়ের বাজার খাল (মোহাম্মদপুর ও শ্যামলীকে যুক্ত করবে), কিন্তু এগুলো এখন ইতিহাস। বক্স কালর্ভাট আর ভূমি ভরাটের কারণে এগুলো হারিয়ে গেছে। এ খালগুলো চক্রাকার পানিপথ তৈরিতে বড় ভূমিকা রাখতে পারত। দূরদৃষ্টি, পরিকল্পনা ও নিয়ন্ত্রণের অভাবে এ সম্ভাবনা হারিয়ে গেছে।

শ্যামপুর হাইস্কুল থেকে আব্দুল্লাহপুর পর্যন্ত ৫১টি রেলওয়ে লেভেল ক্রসিং রয়েছে; ৩৭টি অনুমোদিত ও ১৪টি অননুমোদিত। এ ৫২টির মধ্যে ১৩টি কমলাপুর-নারায়ণগঞ্জ করিডোর ও অন্য ৩৮টি কমলাপুর-টঙ্গী করিডোরে। এ ৫১টি লেভেল ক্রসিংয়ের মধ্যে ১২টি প্রধান বাস পরিচালনা রুটে, পাঁচটি কমলাপুর-নারায়ণগঞ্জ করিডোর ও অন্য আটটি কমলাপুর-টঙ্গী করিডোরে। প্রতিদিন ৯৮টি আউটগোয়িং ও ইনকামিং ট্রেন এ লেভেল ক্রসিংগুলো দিয়ে যাতায়াত করে। এর মধ্যে ৭৮টি ট্রেন যায় কমলাপুর-টঙ্গী করিডোর দিয়ে এবং ২০টি যায় কমলাপুর-নারায়ণগঞ্জ করিডোর দিয়ে। কমলাপুর-টঙ্গী করিডোর দিয়ে যাওয়া ৭৮টি ট্রেনের মধ্যে ৫৪টি (৬৭ শতাংশ) পরিচালিত হয় সকাল সাড়ে ৮টা থেকে সাড়ে ১০টার মধ্যে। অনুমান অনুযায়ী ট্রেনের কারণে প্রতিদিন প্রতিটি লেভেল ক্রসিংয়ে সময় নষ্ট হয় ৫-৬ ঘণ্টা। এ বিঘ্নের কারণে প্রতিদিন দেড় লাখ কর্মঘণ্টা ও ৩০০ লিটার জ্বালানি নষ্ট হয়। কর্মঘণ্টা ও জ্বালানি নষ্টের অর্থনৈতিক ক্ষতি আনুমানিক দিনপ্রতি ৫০ হাজার টাকা। অন্যদিকে ২৩৮ জন কর্মচারী অনুমোদিত লেভেল ক্রসিংয়ে নিয়ন্ত্রণের কাজ করছেন এবং বাকি সব বাদ দিয়ে শুধু তাদের বেতন বাবদই প্রতি মাসে দিতে হচ্ছে প্রায় সাড়ে ৭ লাখ টাকা।

অন্যদিকে কমলাপুর আইসিডিতে মালপত্র লোডিং-আনলোডিং করার জন্য প্রতিদিন গড়ে ২১২টি ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যান লাগে। এর মধ্যে ১৫০টি ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যান শহর ও শহরের বাইরে যায় আমদানিকৃত পণ্য নিয়ে এবং প্রায় ৬০টি ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যান রফতানি পণ্য নিয়ে আইসিডিতে প্রবেশ করে। আইসিডি প্রতিদিন ঢাকা রোডে চার শতাধিক ট্রাক বা কাভার্ড ভ্যানের ট্রিপ তৈরি করে। এ ট্রিপগুলো উত্পত্তি ও গন্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এগুলোর প্রায় ৭০ শতাংশের গন্তব্য বা উত্পত্তি ঢাকার বাইরে (সাভার বা ডিইপিজেড ৩০ শতাংশ, গাজীপুর ২৭ ও টঙ্গী ১০ শতাংশ)। শুধু ৩০ শতাংশ ট্রিপ চলাচল করে ঢাকা শহরের মধ্যে। এজন্য শহরের ট্রাফিক সিস্টেমে আইসিডির এ বিপুলসংখ্যক ট্রাক ট্রিপের বিরূপ প্রভাব পড়ছে। অন্যদিকে সাধারণ যাত্রীবাহী ট্রেনের তুলনায় লেভেল ক্রসিংয়ের ওপর মালবাহী ট্রেনের প্রভাব বেশি পড়ে এর বড় আকৃতি ও অপেক্ষাকৃত কম গতির কারণে। তাই দুভাবে শহরের পরিবহন ব্যবস্থা নাকাল হচ্ছে। পরামর্শ হলো, কমলাপুর আইসিডির উচিত টঙ্গী বা গাজীপুরে সরিয়ে নেয়া কিংবা ওই এলাকায় নতুন আইসিডি প্রতিষ্ঠা করা। দেখা যাচ্ছে, সড়ক ও রেল সাহায্য তো করছেই না, বরং একে অন্যের পথে বাধা তৈরি করছে।

পরিবহন ব্যবস্থায় যাত্রীদের চাহিদা মেটাতে ও বিদ্যমান সমস্যা সমাধানে সামগ্রিকভাব পদক্ষেপ নিতে হবে। পরিবহনের বিভিন্ন মোড ও সাব-মোডের মধ্যে ইন্টারচেঞ্জ সুবিধা বৃদ্ধির মাধ্যমে একটি সমন্বিত মাল্টিমোডাল পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দিতে হবে। পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতির জন্য কিছু পরামর্শ আমলে নেয়া যেতে পারে। যেমন— টেকসই ও দক্ষ পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য ভূমি ব্যবহার ও পরিবহন নিয়ে পরিকল্পনায় বিভিন্ন সংস্থাকে যুক্ত ও সমন্বয় করতে হবে; কানেক্টিং বাস সার্ভিস, বাস টার্মিনাল, বাস সার্কুলেটিং সুবিধা বৃদ্ধি, সিটি সেন্টার ও ল্যান্ডিং স্টেশনের সঙ্গে সংযোগ সড়ক নির্মাণ; সব পরিবহন অবকাঠামো ও সুবিধার সঠিক এবং সম্পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বিশেষ করে সড়ক, রেল ও নদীপথের বেদখল হওয়া জমিগুলো, যা অন্য কাজে ব্যবহার হচ্ছে, উদ্ধার করতে হবে; প্রবেশপথ, বিশেষ করে নদী টার্মিনালের পথ প্রশস্ত করতে হবে; রাস্তার পাশের জমিনে বাছবিচারহীন ঘনত্ব বাড়তে দেয়া যাবে না; পরিবহন ব্যবস্থা একটি একক প্রতিষ্ঠান, যেমন শহর কর্তৃপক্ষের হাতে ন্যস্ত করা যেতে পারে, যার অধীনে এ-সংক্রান্ত সব কাজ হবে; ব্যক্তিখাতে না রেখে একটি কোম্পানির অধীনে রাজধানীর বাসসেবা পরিচালনা করা যেতে পারে; গাড়ি মেরামত বা রাখার জন্য সরকার আলাদা জায়গা করে দিতে পারে; গাড়ি আমদানি ও নিবন্ধন, রাস্তার খরচ ইত্যাদির মাধ্যমে পরিবহন নিয়ন্ত্রণ পাবলিক পরিবহন ব্যবস্থায় উন্নতি আনতে পারে; দেশের অন্যান্য জায়গার সঙ্গে রাজধানীর সংযোগ পথ বাড়ানো যেতে পারে; যেখানে সেখানে জলাভূমি ভরাট রোধে কঠোর হতে হবে, এ-সংক্রান্ত নতুন নীতি গ্রহণ করা যেতে পারে। সর্বশেষ ভূমিস্বল্পতা ও দ্রুত নগরায়ণের বিষয়টি মাথায় রেখে সরকারকে পরিবহন ব্যবস্থা নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা হাতে নেয়া উচিত।

 

লেখক: পরিবহন বিশেষজ্ঞ

অধ্যাপক, সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, বুয়েট