১৯৭১ সালে রক্তস্নাত হয়ে বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটলে ঢাকা শহর সর্বপ্রথম একটি স্বাধীন দেশের রাজধানীর মর্যাদা পায়। তবে এর আগে যেসব কারণে ঢাকা শহরের খ্যাতি ছড়িয়েছিল, তার একটি ছিল এ শহরের বেশ কয়েকটি স্থাপত্যকর্ম। আমরা জানি, প্রাচীন যুগে না হলেও মধ্যযুগে ঢাকা শহর হিসেবে গড়ে উঠতে শুরু করে এবং তখন থেকেই ঢাকা উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যের শহর হিসেবে চিহ্নিত হয়। এরপর ঔপনিবেশিক যুগের নানা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের পীঠস্থান হিসেবে এর শ্রীবৃদ্ধি হলে শহরটিতে আরো বিচিত্র ধরনের স্থাপত্য নির্মিত হয়। আর এ ধারা এখনো চলমান, যার ফল হিসেবে বিশ্বখ্যাত উল্লেখযোগ্যসংখ্যক স্থাপত্যের শহর হিসেবে আমরা ঢাকাকে দেখতে পাই।
বলা প্রয়োজন, ঢাকার প্রাথমিক কালের ইতিহাস অস্পষ্ট। কবে ও কীভাবে এ শহরের পত্তন ঘটে, তা সুনির্দিষ্টভাবে বলা সম্ভব নয়। প্রাচীন গুপ্ত, পাল, বর্মণ কিংবা সেন শাসনামলে ঢাকার পার্শ্ববর্তী সাভার, বিক্রমপুর, সুবর্ণগ্রাম প্রভৃতি অঞ্চলে বিভিন্ন সময়ে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র স্থাপিত হলেও ঢাকা ছিল অনেকটা হিসাবের বাইরে। অবশ্য প্রাচীন নথিপত্রে পাওয়া কিছু তথ্য থেকে অনুমিত হয়, একাদশ শতকের শেষের দিকে ঢাকাকেন্দ্রিক অঞ্চলে এক সুবৃহৎ জনপদ প্রতিষ্ঠিত ছিল এবং সে সময় ঢাকা ছিল বিশ্বের প্রধান জনবহুল শহরগুলোর একটি। তবে তা হলেও ওই সময়ের কোনো স্থাপত্যকর্ম ঢাকায় নিশ্চিত করে চিহ্নিত করা যায়নি। ধারণা করা যায়, মুসলিম যুগে, বিশেষ করে বাংলার স্বাধীন সুলতানদের শাসনামলে (১৩৩৮-১৫৩৮ খ্রিস্টাব্দ) রাজধানী সোনারগাঁর নিকটবর্তী স্থান হিসেবে ঢাকার গুরুত্ব বাড়তে থাকে। বিভিন্ন লেখ্য-দলিল ও প্রত্নতাত্ত্বিক সাক্ষ্য থেকে জানা যায়, ফখরুদ্দিন মোবারক শাহ ঢাকাকে একটি ইকলিম বা জেলা কিংবা পরগনার মর্যাদায় উন্নীত করেছিলেন। এ থেকে মনে করা যায় যে, ভৌত ও অবকাঠামোগত দিক থেকে তখন ঢাকা নগরের বৈশিষ্ট্য অর্জন করেছিল। এ বক্তব্য আরো জোরদার হয় ঢাকায় প্রাপ্ত সুলতান নাসির উদ্দিন মাহমুদ শাহের (১৪৩৬-৫৬ খ্রি.) দুটি শিলালিপি থেকে। লিপি দুটির ওপর ভিত্তি করে ধারণা করা যায়, বর্তমান ঢাকার একটি ছোট অংশে পনেরো শতকে মানুষের বসতি ছিল এবং প্রশাসনিক ও নানামুখী কর্মকাণ্ডে এখানে একটি নাগরিক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল। এবং এর অংশ হিসেবে শুরু হয়েছিল স্থাপত্য নির্মাণ প্রক্রিয়া। পরে মোগল আমলে সতেরো শতকের প্রারম্ভে ঢাকা সুবে বাংলার রাজধানীতে পরিণত হলে এ প্রক্রিয়া আরো জোরদার হয়। মোগল সুবাদার ইসলাম খাঁন ঢাকাকে রাজধানী করে এর নামকরণ করেন জাহাঙ্গীরনগর (১৬১০ খ্রি.)। প্রকৃতপক্ষে মোগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে ইসলাম খান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত জাহাঙ্গীরনগর থেকেই রাজধানী শহর ঢাকার নতুন যাত্রা হয় এবং ওই আমলের সুদীর্ঘ ১০০ বছর ঢাকা রাজধানীর মর্যাদায় আসীন থাকে। এ সময়ে বিস্তৃত মোগল সাম্রাজ্যের পূর্বাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র হিসেবে ঢাকা সামরিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে আঠারো শতকের প্রারম্ভে (১৭১৭ খ্রি.) রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তর হলেও ঢাকায় একজন নায়েব নাজিম বা ডেপুটি গভর্নর নিযুক্ত থাকেন। ফলে ঢাকা রাজধানীর মর্যাদা হারালেও নায়েব-নাজিমদের অবস্থিতির কারণে গুরুত্বপূর্ণ নগরী হিসেবে এর যাত্রা অব্যাহত থাকে। ১৮৪৩ খ্রিস্টাব্দে ঢাকার শেষ নায়েব নাজিম গাজী উদ্দীন হায়দারের নিঃসন্তান অবস্থায় মৃত্যুবরণ পর্যন্ত এই (নায়েব) নিজামত ব্যবস্থা চালু ছিল। বস্তুত এ কালপর্বেই ঢাকা একটি পূর্ণাঙ্গ নগর হিসেবে গড়ে ওঠার যাবতীয় শর্তাবলি পূরণ করতে শুরু করেছিল। প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকার ক্রমসমৃদ্ধি বহু বিদেশী বণিককে এখানে আসতে আকৃষ্ট করে। বিদেশীদের মধ্যে প্রথমে ঢাকায় আসে পর্তুগিজরা এবং এদের কেউ কেউ ধর্ম প্রচারের জন্য এখানে দীর্ঘদিন অবস্থান করে। তাদের উপস্থিতি ঢাকার নগর-সংস্কৃতিতে ইউরোপীয় ধাঁচের অনুপ্রবেশ ঘটায়। কালক্রমে বাংলায় ব্রিটিশদের প্রথমে বাণিজ্যিক ও পরে রাজনৈতিক আধিপত্য স্থাপনের প্রেক্ষাপটে ঢাকায় ইউরোপীয় প্রভাব আরো বৃদ্ধি পায়। ঔপনিবেশিক শাসনের এ পর্বে বাণিজ্যিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক কারণে ঢাকায় বসবাস করতে থাকে প্রচুরসংখ্যক ব্রিটিশ নাগরিক। তাদের সঙ্গে বিভিন্ন কারণে স্থানীয় অভিজাত শ্রেণীর মেলবন্ধন তৈরি হয়। এ মেলবন্ধনের মিথস্ক্রিয়ায় মূলত ঢাকায় আধুনিক নগর-সংস্কৃতির গোড়াপত্তন ঘটে। এ পর্যায়ে ইউরোপীয় প্রভাবে ঢাকায় নির্মিত হয় ভিন্ন ধারার স্থাপত্যকর্ম। পরিবর্তনের এমন প্রক্রিয়া থেমে থাকেনি। পাকিস্তান পর্বে উন্নয়নের ধীরগতি সত্ত্বেও নগর-সংস্কৃতিকে নানা ধরনের স্থাপত্যিক বিনির্মাণ সমৃদ্ধ করেছিল। পরে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে ঢাকা শহর স্বাধীন দেশের রাজধানী হিসেবে যাত্রা করলে এক্ষেত্রে উন্নতি দ্রুত দৃষ্টিগ্রাহ্য হয়ে ওঠে। শহরের বিভিন্ন স্থানে নির্মিত হতে থাকে সরকারি অথবা বেসরকারি উদ্যোগে অনেক বড় বড় স্থাপত্যিক নিদর্শন। এসব স্থাপত্যিক নিদর্শনগুলো বর্তমানে আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য ও জাতিগত পরিচয়ের স্মারক হয়ে উঠছে। ঢাকা শহরে বিভিন্ন সময়ে নির্মিত এরূপ কিছু স্থাপত্যকর্মের মধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি হলো—
ঢাকেশ্বরী মন্দির
ঢাকেশ্বরী মন্দির ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ও মন্দির। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ হল থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ঢাকেশ্বরী রোডের উত্তর পাশে মন্দিরের অবস্থান। এ মন্দির প্রকৃতপক্ষে কখন কে নির্মাণ করেছেন, প্রয়োজনীয় তথ্যের অভাবে তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। জনশ্রুতি অনুযায়ী এ মন্দিরের নির্মাতা সেন বংশীয় রাজা বল্লাল সেন। সে হিসাবে এর নির্মণকাল হতে পারে আনুমানিক দ্বাদশ শতকের মাঝামাঝি। কিন্তু মন্দিরটির স্থাপত্য কৌশল ও উপকরণ এ মতকে সমর্থন করে না। এ সম্পর্কে আরো যেসব মত প্রচলিত, সেগুলোও বিনাতর্কে গ্রহণ করা যায় না। অনেকে এ মন্দিরকে মোগল আমলের বলেই মনে করেন। যা হোক, মন্দিরের প্রাচীনত্ব রহস্যাবৃত সন্দেহ নেই। তবে এর সৌন্দর্য ও নির্মণ কৌশলের শৈল্পিক দক্ষতা নিয়ে সন্দেহ নেই। এটি কতিপয় মন্দির ও মন্দিরসংলগ্ন সৌধমালার সমষ্টি।
বড় কাটরা
বড় কাটরা এক সুপ্রশস্ত মোগল ইমারতের নাম। বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে বর্তমান চকবাজারের দক্ষিণে এর অবস্থান। বাংলার সুবাদার সম্রাট শাহজাহানের পুত্র শাহ সুজার দেওয়ান মীর আবুল কাশিম ১৬৪৫ সালে এ স্থাপনা নির্মাণ করেন। এ বড় কাটরা নির্মিত হয়েছিল শাহ সুজার অফিস ও আবাসিক ভবন হিসেবে। পরে আগত বণিকদের অতিথিশালা হিসেবে এ ভবন ব্যবহার করতে দিলে তা কাটরা নামে পরিচিতি পায়।
লালবাগ দুর্গ
লালবাগ দুর্গ ঢাকা শহরের দক্ষিণ-পশ্চিমে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত। এ দুর্গ আওরঙ্গবাদ দুর্গ নামেও পরিচিত। মোগল সম্রাট আওরঙ্গজেবের সময়ে যুবরাজ মুহম্মদ আজম ১৬৭৮ সালে বাংলার সুবাদার হিসেবে এ দুর্গের নির্মাণকাজ শুরু করেছিলেন। সম্রাট তাকে দিল্লিতে ফিরিয়ে নিলে দুর্গের কাজ অসম্পূর্ণ থেকে যায়। পরে মোগল সুবাদার শায়েস্তা খান ১৬৮৮ সাল পর্যন্ত ঢাকায় থাকলেও তিনি দুর্গের কাজ শেষ করার চেষ্টা করেননি। যদিও তিনি দুর্গের অভ্যন্তরে নির্মাণ করেছিলেন তার কন্যা পরী বিবির সমাধি সৌধ। ধারণা করা যায়, এ সমাধি সৌধ ছাড়াও অনেক স্থাপনা তিনি দুর্গের অভ্যন্তরে নির্মাণ করেছিলেন। এজন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ দুর্গের অভ্যন্তরের খননকাজ পরিচালনা করে যেসব নিদর্শন আবিষ্কার করেছেন, তা থেকে মোটামুটি দুর্গের একটা সম্পূর্ণ চিত্র পাওয়া যায়।
তারা মসজিদ
তারা মসজিদ আঠারো শতকের এক উল্লেখযোগ্য স্থাপত্যকর্ম। পুরান ঢাকার আরমানীটোলায় এর অবস্থান। আঠারো শতকের শুরুতেই ধনাঢ্য জমিদার মির্জা গোলাম পীর এ মসজিদ নির্মাণ করেন। মোগল স্থপত্য রীতিতে তৈরি এ মসজিদের সাদা মার্বেলের গম্বুজগুলো নীল রঙের তারায় খচিত। মির্জা গোলাম পীরের মৃত্যুর পর এ মসজিদ প্রথমে ১৯২৬ সালে ও পরে ১৯৮৭ সালে বড় ধরনের সংস্কার করা হয়। ফলে মসজিদের আয়তন ও সৌন্দর্য দুটোই বৃদ্ধি পায়।
আহসান মঞ্জিল ও অন্যান্য
উনিশ শতকের আগে প্রধানত ঢাকার স্থাপত্য নির্মাণ রীতি বা কৌশলে মোগল কিংবা ইন্দো-ইসলামিক প্রভাব লক্ষ করা যায়। কিন্তু উনিশ শতকে এক্ষেত্রে ইন্দো-ব্রিটিশ প্রভাব স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর এ প্রভাবে এ পর্যায়ে নির্মিত হয় অনেকগুলো জাঁকজমকপূর্ণ স্থাপত্যকর্ম। আহসান মঞ্জিল, মিটফোর্ড হাসপাতাল, রূপলাল হাউজ, রোজ গার্ডেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হল ইত্যাদি হলো এ ধারার স্থাপত্য নিদর্শন। আহসান মঞ্জিল বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে কুমারটুলী এলাকায় ঢাকার নবাবদের আবাসিক প্রাসাদ ও জমিদারির সদর কাছারি হিসেবে গড়ে উঠেছিল উনিশ শতকে। তবে ধারণা করা হয়, রঙমহল হিসেবে মোগল আমলে প্রথম এ স্থাপনা তৈরি করেছিলেন জামালপুর পরগনার জমিদার শেখ এনায়েত উল্লাহ। তার পুত্র শেখ মতিউল্লাহ রঙমহলটি ফরাসিদের কাছে বিক্রি করে দিয়েছিলেন। ফরাসিরা রঙমহলটি বাণিজ্য কুঠি হিসেবে ব্যবহার করত। ১৮৩০ সালে খাজা আলীমুল্লাহ ফরাসিদের কাছ থেকে কুঠিবাড়ি কিনে নিয়ে প্রয়োজনীয় সংস্কার করে নিজের বাসভবনে পরিণত করেন। পরে তার পুত্র খাজা আবদুল গণি একটি ইউরোপীয় নির্মাণ ও প্রকৌশলী প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে নতুন করে নকশা করে এ বাসভবন পুনর্নির্মাণ করেন এবং তার পুত্র খাজা আহসান উল্লাহর নামে ভবনের নামকরণ করেন আহসান মঞ্জিল। ১৮৫৯ সালে নতুন মাস্টার প্ল্যানের কাজ শুরু হয়েছিল এবং শেষ হয়েছিল ১৮৭২ সালে। এরপর আরো কয়েকবার সংস্কারের পর ভবনটি বর্তমান রূপে আত্মপ্রকাশ করে। ভবনটির স্থাপত্য রীতি কিংবা নান্দনিক সৌন্দর্যের জন্য কেবল বিখ্যাত নয়; বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক উল্লেখযোগ্য অধ্যায় এ ভবনটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে। এজন্য এর স্থাপত্যিক ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনা করে বাংলাদেশ সরকার বর্তমানে ভবনটিকে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নিয়ন্ত্রণে ন্যস্ত করেছে। যা হোক, আহসান মঞ্জিলের পর, বিশেষ করে বিশ শতকে যেসব স্থাপত্য ঢাকায় নির্মিত হয়, সেসব স্থাপত্যে নির্মাণ রীতি ও কৌশলে বাইরের প্রভাব, বিশেষ করে ইউরোপীয় ও আমেরিকান প্রভাব লক্ষ করা যায়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র ও কেন্দ্রীয় পাবলিক লাইব্রেরি হলো এ ধরনের স্থাপত্যিক বিনির্মাণের নিদর্শন।
বায়তুল মোকাররম মসজিদ
পাকিস্তান পর্বের শেষ দশকে ঢাকায় নির্মিত হয় দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যশৈলীর বায়তুল মোকাররম মসজিদ। স্থাপনাটি নির্মিত হয় নতুন ও পুরান ঢাকার মিলনস্থলে। ১৯৬০ সালে নির্মাণকাজ শুরু করে ১৯৬৮ সালে মসজিদটি চালু করা হয়েছিল। ইসলামিক স্থাপত্য রীতিতে কিছুটা কাবাঘরের মতো করে তৈরি করা হয়েছে এ স্থাপনা। এর স্থপতি ছিলেন আবদুল হুসেন থারিয়ানি। বর্তমানে বায়তুল মোকাররম মসজিদ বাংলাদেশের জাতীয় মসজিদ।
জাতীয় সংসদ ভবন
বায়তুল মোকাররম মসজিদের কাছাকাছি সময়ে নির্মাণকাজের সূত্রপাত হয়েছিল আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনার, যা বর্তমানে বাংলাদেশের অহঙ্কার। বাংলাদেশে শুধু নয়, পৃথিবীর অন্যতম দৃষ্টিনন্দন এ শৈল্পিক স্থাপত্য কীর্তি হলো বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন। পাশ্চাত্য স্থাপত্য রীতির বহুল প্রভাব এতে থাকলেও বাংলাদেশের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি, এতদঞ্চলের মানুষের জীবন-সংগ্রামের নানা দিক ফুটিয়ে তোলার প্রয়াস এ স্থাপনার শৈলীগত বৈশিষ্ট্য। প্রখ্যাত মার্কিন স্থপতি লুই কান ছিলেন এ স্থাপনার নকশাকার বা মূল স্থপতি। সহকারী ছিলেন এম চৌধুরী। ১৯৬১ সালে এর নির্মাণকাজ শুরু হয়েছিল, আর শেষ হয়েছিল ১৯৮২ সালে। বলা যায়, জগদ্বিখ্যাত তাজমহল নির্মাণের প্রায় সমান সময় লেগেছিল ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য নিদর্শন বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ ভবন বিনির্মাণে। আর এর বিশালত্বের স্থাপত্যিক বৈশিষ্ট্যকেও অনেকটা তাজমহলের তথা মোগল স্থপত্য রীতির সঙ্গে তুলনীয় করা যায়। অবশ্য মার্বেল পাথর সংযুক্ত কংক্রিটের দেয়াল, দেয়ালের মাঝে মাঝে নিখুঁত জ্যামিতিক আকৃতির প্রবেশদ্বার, বৃত্তাকার ও আয়তাকার কংক্রিটের নকশা এ ভবনটিকে এমন এক বিশেষ স্থাপত্যিক সৌকর্য দান করেছে, যা অতুলনীয়। এমনভাবে ভবনসংলগ্ন করে লেক তৈরি করা হয়েছে, যাতে মনে হয়, ভবনটি ভাসছে পানির ওপর। বাংলাদেশের প্রকৃতি, পানি, বৃষ্টি, বাতাস, রোদের আলো ইত্যাদি বিবেচনায় নিয়ে ভবনটির নকশা প্রণয়ন করা হয়েছে। গতানুগতিক দরজা-জানালা স্থাপনের বিষয়কে অনেকটা এড়িয়ে বৃষ্টি প্রতিরোধ, আলো ও বাতাস প্রবেশের ব্যবস্থাকেও করা হয়েছে বিজ্ঞানসম্মত ও সৌকর্যময়। তাই বলা যায়, শুধু ঢাকা নয়, বাংলাদেশের আধুনিক স্থাপত্যরীতির সবচেয়ে সেরা নিদর্শন জাতীয় সংসদ ভবন। প্রকৃতপক্ষে এ নির্মাণের মধ্য দিয়ে ঢাকা প্রবেশ করেছে উত্তর-আধুনিক স্থাপত্য রীতির যুগে।
শেষ কথা
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর অতিক্রান্ত হয়েছে অনেক বছর। স্বাধীনতা-উত্তর নানামুখী সংকট অতিক্রম করে এবং একুশ শতকের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে বর্তমানে বাংলাদেশ সামনে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ক্রমোন্নতশীল স্থাপত্য বিনির্মাণ কৌশল ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার চ্যালেঞ্জকেও দেশটি যথার্থভাবেই মোকাবেলা করতে পারছে। এজন্যই স্থাপত্যের উপকরণ, কৌশল ও নির্মাণে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার তথা কোনো ক্ষেত্রেই আমাদের স্থপতি, প্রকৌশলী ও নির্মাতারা পিছিয়ে নেই। আর এর ফল হিসেবে বর্তমানে ঢাকায় সরকারি-বেসরকারি প্রয়াসে নির্মিত হচ্ছে বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্র, বঙ্গবন্ধু নভো থিয়েটার, বসুন্ধরা সিটি, যমুনা ফিউচার পার্ক, হোটেল ওয়েস্টিন, সিটি সেন্টার বাংলাদেশ প্রভৃতির মতো অসংখ্য নজরকাড়া দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা। আশা করা যায়, এ ধারা অব্যাহত থাকলে কোনো একদিন ঢাকা হতে পারে পৃথিবীর অন্যতম সেরা দৃষ্টিনন্দন স্থাপত্যের শহর।
লেখক: অধ্যাপক, ইতিহাস বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
আলোকচিত্রী: পলাশ শিকদার





