বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে অবস্থিত আমাদের প্রাণের শহর ঢাকা, একদিকে বাংলাদেশের এটি বৃহত্তম শহর, অন্যদিকে ইতিহাস আর ঐতিহ্যের প্রাণকেন্দ্র। বৈচিত্র্যপূর্ণ এ শহরের একসময় বিস্তৃতি আর জনসংখ্যা ছিল অনেক কম। উনিশ শতকের শেষ দশক থেকে ঢাকার বিস্তৃতি বাড়তে থাকে, যাতে গড়ে ওঠে প্রশাসনিক ভবন, দালানকোঠা আর বৃদ্ধি পায় জনসংখ্যা। রাজধানী হওয়ায় ব্যবসায়িক প্রাণকেন্দ্র, বিশেষ করে স্বাধীনতার পর এ পর্যন্ত দেড় কোটির বেশি মানুষের বসবাস। ঢাকার শুরুটা যেখান থেকে, সেটি পুরান ঢাকা আর পরবর্তীতে বিস্তৃতি লাভ করে নতুন ঢাকা নামে পরিচিতি পায়। ঐতিহ্যের ঢাকার সাংস্কৃতিক ইতিহাস জানতে গেলে ঢাকাবাসীর খাবার ও তাদের খাদ্যাভ্যাস জানা প্রয়োজন, যেটি পরবর্তীতে ঢাকার খাদ্যবিলাসে একটি স্বতন্ত্র ধারা সৃষ্টি করে আর যার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিশ্বের বহু স্থানে, স্থান পেয়েছে প্রিয় খাবারের তালিকায়।

আদি ঢাকার বাবুর্চিদের অনেক সৃজনশীলতা ছিল, তারা মোগলদের খাবার রন্ধনের কৌশল রপ্ত করে নিয়েছে তাদের সহযোগী হিসেবে। তাই দেখা যায়, পুরান ঢাকার শাহি খানাপিনার ধরন আর ঘ্রাণ যেকোনো বাঙালির চিরায়ত খাবারের চেয়ে ভিন্নতা রয়েছে।

ঐতিহাসিক ঢাকার বিখ্যাত খাবারদাবারের ধারাটি শুরু হয়েছিল মোগল শাসনের পূর্ববর্তী সুলতানি আমলে স্থানীয় ও আফগান অধ্যুষিত জনপদে। সেই খাদ্য সংস্কৃতি পরবর্তীতে মোগল আমলে পরিপূর্ণতা পায়। মোগল আর ব্রিটিশ শাসনামলে নবাবদের খাদ্য বিলাস, শখ সে সময়ের বাবুর্চিদের রান্নায় শ্রেষ্ঠতা লাভে ভূমিকা রাখে। ফলে তারা নতুন নতুন খাবার আর তার তৈরির কৌশল আয়ত্ত করেন। নবাবী খাবার তৈরিতে বাবুর্চিদের অসম্ভব রকমের উদ্ভাবনী ক্ষমতা ও হাতযশ ছিল, যা শুধু নবাব নয়, তাদের দরবারে আসা সম্মানিত অতিথিদের মুগ্ধ করত। ঢাকার স্থানীয় সংস্কৃতিতে এ খাদ্যাভ্যাস বিবর্তন আর যোগ-বিয়োগের মাধ্যমে সৃষ্টি করে নতুন ধারা। এতে ঢাকাই রীতিতে মোগল খাদ্য অভিলাষ ঢাকার স্থানীয় মানুষের জীবনে ব্যাপক প্রভাব রেখে গেছে। সেই লোভনীয় আর মুখরোচক ঢাকাই খাবারের ধারার একমাত্র ধারক ও বাহক পুরান ঢাকার আদিবাসীরা।

ঢাকার মানুষ বংশানুক্রমিকভাবে আর স্বভাবগতভাবে খেতে আর খাওয়াতে ভালোবাসে। খাবারের মান, স্বাদ, ঘ্রাণ আর রন্ধন প্রণালি খেয়াল রাখে যে প্রক্রিয়া, সেটিকেই বেছে নেয় পুরান ঢাকাবাসী। সাধারণত পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্যের রন্ধন কৌশল অনুসরণ করে আর ঢাকাই খাবার পেয়েছে তার স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য, যা ঢাকাই খাবার নামে খ্যাতি অর্জন করেছে।

ঐতিহ্যের বাকরখানি

জনশ্রুতি আছে, জমিদার আগা বাকের তথা আগা বাকির খাঁর নামে এ রুটির নামকরণ করা হয়েছে বাকরখানি। বাকরখানি রুটির নামের পেছনেও রয়েছে বাকের-খনি বেগমের প্রেমের ইতিহাস। জনশ্রুতি মেনে নিলে ধরে নিতে হয়, বাখরখানির সৃষ্টি আঠারো শতকের মাঝামাঝি সময়ে। এ বাকরখানি মূলত দুই ধরনের রুটি ছিল। একটা ছিল খাস্তা (নরম) আর আরেকটি ছিল নিমসুকা। নিমসুকা রুটিকে কেউ কেউ পাপড়ি বলত, যা ছিল পাতলা, হালকা ও মুচমুচে। ওই সময় সম্ভ্রান্ত পরিবারে বাদাম তেলের বদলে ঘি দিয়ে বাকরখানি তৈরি হতো। ওই সময় কোরবানির মাংস দিয়ে বানানো বাকরখানি ছিল জনপ্রিয় আর ছিল চারদিকে কান্নি কাটা পনির দেয়া বাকরখানি। এখনকার মতো চিনি দেয়া বাকরখানি তখন ছিল না একেবারেই আর এটির প্রচলন হয় অনেক পরে।

প্লেন বাকরখানি বানানোর মূল উপকরণ হচ্ছে ময়দা/আটা, তেল ও লবণ। এছাড়া এতে উপরিভাগে পনির দিয়ে পনির বাকরখানি ও চিনি দিয়ে মিষ্টি বাকরখানি বানানো হয়। বাকরখানি বানাতে ব্যবহার হয় কয়লার গোল মাটির চুল্লি, যেটির দেয়ালে হালকা পানি দিয়ে লাগিয়ে দেয়া হয় গোল নরম বাকরখানি। পুরান ঢাকার আদি বাসিন্দারা তাদের দৈনন্দিন খাবারের তালিকায় বাকরখানি রাখে আর এ প্রিয় বাকরখানি খাওয়া হয় অনেক পদের সঙ্গে। এর মধ্যে মিষ্টি, ঝাল মাংস, ফিরনি আর সর্বাধিক জনপ্রিয় দুধ চার সঙ্গে।

ঢাকার পোলাও ও বিরিয়ানি

একসময় পুরান ঢাকার মেহমানদারিতে মোরগ পোলাওয়ের জনপ্রিয়তা ছিল সর্বাধিক। পুরান ঢাকার সকালের নাশতায় যেমনটি ছিল তেহারি। পুরান ঢাকার আদি বাসিন্দারা তাদের অতিথি আপ্যায়নে বা জামাই এলে শাহি মোরগ পোলাওকে প্রাধান্য দিত সর্বাগ্রে। এর পাশাপাশি থাকত মোসাল্লাম, রেজালা, ঝাল গরুর মাংস, জালি কাবাব, নিম কালিয়া, শাহি টুকরা, পেস্তাবাদামের শরবত ইত্যাদি। পুরান ঢাকার পোলাও বিরিয়ানির মধ্যে বুন্দিয়া পোলাও, খাসির বিরিয়ানি, সাদা পোলাও দিয়ে ঝাল গরুর মাংস, ডিমের কোরমা, গরুর গ্লাসি, রোস্ট ইত্যাদি পছন্দ অনুযায়ী খাবার থাকত বিরিয়ানির পাশাপাশি। তখনকার সময়ে কাচ্চি বিরিয়ানির তেমন জনপ্রিয়তা ছিল না, যেটি ছিল মোরগ পোলাওয়ের। পারে মহল্লায় স্থানীয়দের পরিচালনায় পোলাও বিরিয়ানির দোকানগুলোই ছিল জনপ্রিয়।

পুরান ঢাকার মানুষের সর্বাধিক প্রিয় সকালের নাশতায় হচ্ছে গরুর তেহারি। এখনো বিখ্যাত হাজি বিরিয়ানিতে সেই শুরু থেকে এখন পর্যন্ত শুকনা কাঁঠাল পাতার তৈরি ঠোঙায় সকাল-বিকাল তেহারি পরিবেশন করা হয়, যে দৃশ্যটি আমাদের সেই হারানো দিনের কথাই মনে করিয়ে দেয়।

পুরান ঢাকাজুড়ে এখনো ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় কিছু পুরনো খাবারের প্রতিষ্ঠান টিকে আছে। যেমন কাজী আলাউদ্দিন রোডের হাজির বিরিয়ানি, নাসিরুদ্দিন সরদার লেনের মাখন পোলাও, ফরিদাবাদের বুদ্দু বিরিয়ানি, ফরিদাবাদের বুদ্দু বিরিয়ানি, নারিন্দার ঝুনু পোলাও, বেচারাম দেউড়ির নান্না বিরিয়ানি, চকবাজারের শাহসাহেবের পোলাও ইত্যাদি।

পুরান ঢাকার কাবাব

রাজধানী ঢাকায় সুস্বাদু কাবাবের আগমন মোগলদের হাত ধরেই। ঐতিহ্যের পুরান ঢাকার মানুষের কাছে কাবাব আদি থেকে সন্ধ্যাকালীন, বিশেষ করে রাতের খাবার হিসেবে পছন্দের। পুরান ঢাকায় জনপ্রিয় আদি হচ্ছে শিক কাবাব। জনপ্রিয় কাবাবের মধ্যে শিক কাবাব, বটি কাবাব, কাঠি কাবাব, সুতি কাবাব, রেশমি কাবাব, মুরগির কাবাব, পেষা মাংসের কাবাব, টুন্ডা কাবাব, টিক্কা কাবাব, টেংরি কাবাব, গরুর ছেঁচা মাংসের কাবাবসহ নানা ধরনের মাছের কাবাব ইত্যাদি।

পুরান ঢাকার ইফতার

ইফতার কথাটা এলেই প্রথমে আসে ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকার মজাদার সব নানা পদের ইফতারির কথা। ঢাকার অন্যান্য স্থানসহ বিভিন্ন স্থান থেকে পুরান ঢাকার এসব লোভনীয় খাবারের টানে ছুটে আসে ভোজনপ্রিয় মানুষ। পুরান ঢাকাজুড়ে রয়েছে সেরা ইফতারের ঠিকানা। এর মধ্যে চকবাজার শাাহ মসজিদসংলগ্ন ইফতার বাজার, নর্থ-সাউথ রোডের হোটেল আল রাজ্জাক, সুপার হোটেল, লালবাগের রয়েল হোটেল, আনন্দ কনফেকশনারি, ডিসেন্টসহ অসংখ্য দোকানগুলো।

ঐতিহ্যের ঢাকার মিষ্টি

ইতিহাস বলে, ভারতবর্ষের সবচেয়ে প্রাচীন মিষ্টি হচ্ছে মতিচুর লাড্ডু, যা প্রায় দুই হাজার বছরের পুরনো। সে হিসাবে ঢাকার মিষ্টান্নের ইতিহাস খুব প্রাচীন নয়। আর আমাদের অতি প্রিয় আধুনিক সন্দেশ-রসগোল্লার বয়স মাত্র দুই-আড়াইশ বছর। মোগল আমলে এখানে আসা বিভিন্ন আমির আর শৌখিনদের অনেক মিষ্টি স্থানীয়দের মাঝেও খাওয়ার প্রচলন দেখা যায়, যা আরবীয়-পারস্য ঘরানায় প্রভাবিত। এর মধ্যে বরফি, শাহি টুকরা, জিলাপি, মোতানজান, ক্ষীর, দরবেশ ইত্যাদি ছাড়াও হালুয়া ছিল জনপ্রিয়। বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে ওঠা ঐতিহ্যবাহী পুরান ঢাকা দেশের প্রধান ব্যবসায়িক কেন্দ্র বলে এখানে আগে থেকেই রয়েছে নানা জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির ঠিকানা। এর মধ্যে আলাউদ্দিন সুইটমিট অন্যতম। পুরান ঢাকার ব্যবসার প্রাণকেন্দ্র চকবাজারে গেলেই শাহি মসজিদের পাশে চোখে পড়বে আলাউদ্দিন সুইটমিটের জনপ্রিয় দোকানটি, যা ১৮৯৪ সাল থেকে প্রিয় একটি নাম। পুরান ঢাকার বিয়ে-শাদি, সামাজিক যেকোনো অনুষ্ঠানে আলাউদ্দিন সুইটমিট ছিল একসময় একচেটিয়া নাম, যার মিষ্টি না হলে ঘরে ঘরে যেন শুভকাজ অসম্পূর্ণ থাকত। ভোজনরসিক পুরান ঢাকার আদি মানুষের কাছে ঐতিহ্যবাহী আলাউদ্দিন সুইটমিট একটি অতি পছন্দনীয় ও সেরা মিষ্টির ঠিকানা। মিষ্টির জগতে প্রতিষ্ঠানটি পথিকৃৎ বলা যায়। ১১৭ বছরের ঐতিহ্যবাহী আলাউদ্দিন সুইটমিট রসগোল্লা, গোলাপ বরফি, পান বরফি, কাজু বরফি, গুলাব জাবন, লালমোহন, মতিচুর লাড্ডু, রসকদম, বড় চমচম, হাফসি হালুয়া, দই, কালোজাম, মালাইকারি, দুদিয়া সন্দেশ, কাঁচা সন্দেশ, রসমালাই, জিলাপিসহ ইত্যাদি অনেক ধরসের মিষ্টি তৈরি করে। আলাউদ্দিনের নেশেস্তার হালুয়া, যাকে মাসকাট হালুয়াও বলা হয়ে থাকে, তা অত্যন্ত জনপ্রিয়।

পুরান ঢাকার আরেকটি জনপ্রিয় মিষ্টির ঠিকানা হচ্ছে শাহি দিল্লি। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সংলগ্ন পুরান ঢাকার ২৮/১, পাটুয়াটুলীতে শাহি দিল্লির অবস্থান। মজাদার শন-পাপড়ি, বরফি, গাজর বরফি, নারকেলি বরফি, বালুসাই, ছানা, হালুয়া, লাড্ডুসহ অনেক ধরনের মিষ্টান্নের জন্য প্রসিদ্ধ। সকাল-বিকাল লুচি, ডাল, ভাজি আর নানা ধরনের সেরা মিষ্টান্ন তৈরির জন্য যুগের পর যুগ ধরে বিখ্যাত, এমনকি শাহি দিল্লির চা অত্যন্ত জনপ্রিয়।

এছাড়া পুরান ঢাকার ৮৬/এ নারিন্দায় অবস্থিত তানয়ীম’স সুইটমিট অ্যান্ড বেকারি জনপ্রিয় একটি নাম। তানয়ীম’স সুইটমিট সাদা রসগোল্লা, কালোজাম, মতিলাড্ডু, মাওয়ার লাড্ডু, সরমালাই, আফলাতুন, লাবড়ি, চমচম, আঙ্গুরি চমচম, কাঁচা ছানা, লাচ্ছা সেমাইসহ সব ধরনের মিষ্টি তৈরি করে।

পুরান ঢাকার অন্যতম জনপ্রিয় দয়াল ভাণ্ডার, যা ৮৯ আবুল হাসনাত রোডে অবস্থিত। মিষ্টির জগতে প্রসিদ্ধ নাম। রসগোল্লা, রাজভোগ, ডিমভোগ, মতিচুর লাড্ডু, মৌচাক, সাদা চমচম, মালাইচপ, মাওয়া লাড্ডু, বালুসাই, রসমালাই, কাঁচাগোল্লা, লাবাড়ীি খিরসা, মোরব্বা, জিলাপি, ঘিসহ নানা ধরনের মিষ্টান্ন তৈরি করে।

পুরান ঢাকার আরেকটি জনপ্রিয় প্রতিষ্ঠান হচ্ছে নবাবপুর ও ওয়ারীসংলগ্ন ৯ বিসিসি রোড ঐতিহ্যবাহী গ্রিন সুইটমিট। এটি পুরান ঢাকার অন্যতম জনপ্রিয় জিলাপি আর মিষ্টি প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান, যার সুনাম বহু বছর আগে থেকে। গ্রিন সুইটমিট মানেই মজার সব মিষ্টির সমারোহ ঐতিহ্যে আর স্বাদে। অপ্রতিদ্বন্দ্বী গ্রিন সুইটমিটের নানা পদের মিষ্টি সবারই প্রিয়। গাজর বরফি, সাদা গাজর বরফি, চালকুমড়া বরফি, ছানামণ্ডা, ছানা, হালুয়া, জিলাপি, মিষ্টি সিঙ্গাড়া, আমিত্তিসহ নানা ধরনের মিষ্টি প্রস্তুত করে থাকে। এছাড়া ১৯৫১ সালে প্রতিষ্ঠিত গেণ্ডারিয়ার সোনামিয়ার মিষ্টি-দই, মাজহার সুইটস, শ্রীলক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভাণ্ডার ইত্যাদি জনপ্রিয় দোকান রয়েছে।

ভোরের ছানা-মাঠা

ভোরে ছানা-মাঠা খাবারের অভ্যাস আনেকেরই আছে। মাঠা বিক্রেতারা মূলত মাঠা বিক্রিকেই প্রাধান্য দেন। পাশাপাশি ছানা, দুধের ননি, মালাই ও ঘি বিক্রি করে থাকেন। মূলত এ মাঠা বিক্রির সঙ্গে পুরান ঢাকার ইতিহাস জড়িয়ে আছে। আদি থেকে পুরান ঢাকায় গোয়ালরা দুধ বিক্রি করে। পাশাপাশি এ দুধের ব্যবসার সঙ্গে আরো কিছু পেশা যুক্ত হয়েছে শত শত বছর ধরে। এ গোয়ালের দুধের থেকেই ঢাকাই পনির, যাবতীয় দই-মিষ্টি ও মিষ্টিজাতীয় খাবার এবং ঘি প্রস্তুত করা হয়। পুরান ঢাকার পাটুয়াটুলীতে ঘি পট্টি নামে পাইকারি ঘি বিক্রির স্থান রয়েছে। কাজেই মাঠা ও ছানা তৈরির মূল উপাদান হচ্ছে দুধ আর তার উৎস পুরান ঢাকার দুধের আড়ত। পুরান ঢাকায় সকাল হলেই নাজিরাবাজার চৌরাস্তায় শ্যামলের মাঠা, গেণ্ডারিয়া ধূপখোলা বাজারের পাশে মাঠের গেট, নারিন্দা পুলিশ ফাঁড়ির বিপরীতে সৌরভের মাঠা, লালবাগের চৌরাস্তা, নবাবপুর মোড়, বংশাল, ইসলামপুর, বাংলাবাজার, কসাইটুলী, সূত্রাপুর-লোহারপুল, নাজিমুদ্দিন রোড, কলতাবাজার, রায়সাহেব বাজার, টিকাটুলী, ফরাশগঞ্জ, উর্দু রোড, শাঁখারী বাজারসহ অসংখ্য স্থানে ভোর থেকে বিক্রেতারা সুস্বাদু মাঠার দোকান নিয়ে বসেন নগরীর ব্যস্ততার শুরুর আগে।

শবেবরাতে পুরান ঢাকা

পুরান ঢাকার রাস্তায় রাস্তায় অস্থায়ীভাবে সামিয়ানা টাঙিয়ে নানা পদের বাহারি সাইজের শিরমাল রুটি বিক্রি হয়, যা শবেবরাতের প্রধান আকর্ষণ। বছরের একমাত্র এই দিনেই মজাদার বিশাল আকারের রুটি তৈরি হয়, যাতে থাকে নানা সাইজের ছোট আয়না বসানো গোল রুটি, রঙিন পুঁতি দেয়া রুটি, কুমির, মাছসহ নানা আকৃতির নানা সাইজের বাহারি রুটি।এর মধ্যে সেরা হচ্ছে আনন্দ কনফেকশনারির রুটি। ঘরে ঘরে তৈরি হয় নানা পদের হালুয়া। এর মধ্যে সর্বাধিক জনপ্রিয় বুটের ডাল আর সুজির হালুয়া। তবে পরবর্তীতে অনেক ধরনের হালুয়া চোখে পড়ে দোকানগুলোয়। এই রাতে পুরান ঢাকায় অধিকাংশ ঘরেই হালুয়া-রুটির পাশাপাশি পোলাও-বিরিয়ানি রান্না করা হয়।

ঢাকার পিঠা

পুরান ঢাকায় সকালের নাশতা থেকে শুরু করে অতিথি আপ্যায়ন, বিয়ে-শাদি, বিভিন্ন উৎসবে সর্বধর্ম নির্বিশেষে পিঠার ব্যবহার ছিল সর্বাগ্রে। পুরান ঢাকার অলিগলিতে পিঠাওয়ালীদের তৈরি পিঠা ছিল আদি ঢাকার মানুষের সকালের নাশতার অংশ। ঢাকার মানুষের মধ্যে অনেক পিঠাই প্রচলিত ও জনপ্রিয় ছিল যেমন— ক্ষিরসা, দুধপুলি, ডিমপোয়া, খেজুর পিঠা, চুই পিঠা, পুলি, ছিটা পিঠা, পাটিসাপটা, তালের পিঠা ইত্যাদি আর অনেক ধরনের পিঠা এখনো প্রচলিত আছে। বর্তমানে সর্বাধিক জনপ্রিয় ভাপা পিঠা মোগল আমলে তৈরি হতো আরো ভিন্নতরভাবে, যাতে সুগন্ধি গুঁড়া, মালাই, জাফরান, পেস্তা-কিশমিশসহ নানা উপকরণসহযোগে। তবে আমাদের সময়ে ভাপা পিঠা প্রস্তুতে চালের গুঁড়ার পরই প্রধান উপকরণ হচ্ছে গুড় আর নারকেল।

ভাপা পিঠার পরই দোকানে পাওয়া যায় এমন জনপ্রিয় পিঠা হচ্ছে পাটিসাপটা। আদি ঢাকার মানুষের পছন্দের পিঠা এটি। ঢাকার মানুষের নানা পারিবারিক অনুষ্ঠানে পাটিসাপটা ছিল পছন্দের তালিকায় এগিয়ে। সব শ্রেণীর মানুষের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয় পিঠা।

চিতই সারা বছর সর্বত্র পাওয়া যায়, এমন একটি পিঠা। এটি জনপ্রিয়তার কারণ এটি সবভাবে আর সবকিছুর সঙ্গে খাওয়া যায়, সেটি ঝাল কিংবা মিষ্টি। অনেকেই ইলিশ মাছের টুকরা পিঠার মাঝে দিয়ে তৈরি করেন। পুরান ঢাকায় ডিম চিতই বেশ জনপ্রিয়। কলিজা ভুনা, ঝাল মাংস, বুটের ডালের সঙ্গে চিতই পিঠার জুড়ি নেই। আদি ঢাকায় দুধে খেজুরের গুড় সহযোগে ভেজানো দুধ চিতই খুব জনপ্রিয় ছিল আর এখনো অনেকেই তৈরি করেন।

ঐতিহ্যের পুরান ঢাকার বিখ্যাত আর জনপ্রিয় খাবারের তালিকা বেশ দীর্ঘ, যা অল্প কথায় সম্ভব নয়। আদি ঢাকার মানুষের নানা উৎসবে আর সামাজিক অনুষ্ঠানাদিতে আয়োজন করা হয় বাহারি আর শাহি খানার, যাতে পরিবর্তিত হয়ে যাওয়া অতীতের সঙ্গে মিল না থাকলেও স্বাতন্ত্র্য বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান।

 

লেখক: ক্রিয়েটর ফেসবুক পেজ: PURAN DHAKAR KHABAR

অ্যাডমিন: আপনার রান্নাঘর