হাজারের বেশি ছাপাখানা আর ছোটবড় কয়েকশ প্রকাশনা সংস্থা নিয়েও প্রকাশনা শিল্প বাংলাদেশে এখনো পূর্ণাঙ্গ শিল্পে পরিণত হতে পারেনি। বরং এটি রূপ নিয়েছে কিছুটা বিশৃঙ্খল ও এলোমেলো ব্যবসায়। একদিকে দেশে ১০০-এর বেশি দৈনিক পত্রিকা ও কয়েকশ সাপ্তাহিক, পাক্ষিক ও অন্যান্য সাময়িকী প্রকাশ করা হচ্ছে, অন্যদিকে প্রতি বছর কয়েক হাজার বই প্রকাশ হচ্ছে। এসব বইয়ের মধ্যে পাঠ্যপুস্তক ও সহায়ক পুস্তক বা গাইড বই যেমন আছে, তেমনি আছে সৃজনশীল, মননশীল, চিন্তাশীল, শিশুতোষ, ধর্মীয় ও অন্যান্য বই। তবে এসব প্রকাশনার সুবিন্যস্ত কোনো পরিসংখ্যান মেলে না। না সরকারি, না বেসরকারি পর্যায়ে প্রকাশনা জগতের বিস্তারিত খোঁজখবর মেলে। ফলে অসমাপ্ত ও খণ্ডিত তথ্য-উপাত্তের ওপর ভিত্তি করে প্রকাশনা শিল্পের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে ধারণা নিতে হয়।
আদি পর্বের টুকিটাকি
বাংলাদেশের প্রকাশনার আদি পর্বটি চিত্তাকর্ষকই বটে। ইংরেজদের উদ্যোগে ১৭৭৮ সালে হুগলির জন এন্ডকুজের মুদ্রাযন্ত্রে ও উইলকিন্সের তৈরি বাংলা হরফে মুদ্রিত হয় হলহেডের ব্যাকরণ ‘আ গ্রামার অব দ্য বেঙ্গল ল্যাঙ্গুয়েজ’। এটি বাংলার প্রথম ছাপাখানায় প্রথম বাংলা বই (প্রকৃতপক্ষে দ্বিভাষী)। তবে প্রথম বাংলা ছাপা বইয়ের কথা বলতে গেলে আরো পিছিয়ে যেতে হয় ১৭৪৩ সালে। সে বছর পর্তুগালের লিসবন শহরে ধর্মযাজক মানোএল দ্য আসুম্পসাঁও তিনটি বই ছেপেছিলেন বাংলা ও পর্তুগিজ ভাষায়। এগুলো হলো ব্রাহ্মণ-রোমন ক্যাথলিক সংবাদ, কৃপার শাস্ত্রের অর্থভেদ এবং বাংলা ব্যাকরণ ও বাংলা-পর্তুগিজ-বাংলা শব্দকোষ।
ব্রিটিশদের পৃষ্ঠপোষকতায় কলকাতা হয়ে ওঠে বাংলা ছাপাখানা ও প্রকাশনার কেন্দ্র। তবে অল্প সময়ের মধ্যে কলকাতার সীমানা ছাড়িয়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলের বড় শহরগুলোয় ছাপাখানা স্থাপন ও পত্রিকা বা সাময়িকী প্রকাশের একটা উত্সাহ দেখা দেয়। যেমন ১৮৪০ সালে মুর্শিদাবাদ থেকে প্রকাশ হয়েছিল ‘মুর্শিদাবাদ পত্রী’। আর ১৮৪৭ সালে রংপুরের কুণ্ডীর জমিদার কালীচন্দ্র রায়ের অর্থানুকূল্যে প্রকাশ হয় ‘রঙ্গপুর বার্ত্তাবাহ’ নামের সাপ্তাহিক পত্রিকা। এটি ১৮৫৭ সালের মহাবিদ্রোহের সময় বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে ১৮৪৭-৪৮ সালে রংপুরে প্রথম ছাপাখানা বার্তাবহ যন্ত্র স্থাপিত হয়। বাংলাপিডিয়া থেকে জানা যায়, সর্বপ্রথম একজন ইংরেজ আলেকজান্ডার ফারবেখ ঢাকায় ছাপাখানা স্থাপন করেন। ছাপাখানাটির নাম ছিল ‘ঢাকা প্রেস’। এতে অবশ্য বাংলা মুদ্রণের কোনো ব্যবস্থা ছিল না। এখান থেকে ঢাকা নিউজ নামে ইংরেজি সংবাদপত্র প্রকাশ হতো। ১৮৬০ সালে বাংলা প্রেস বা বাংলা যন্ত্র নামে ঢাকায় দ্বিতীয় ছাপাখানা চালু হয়, যেখানে প্রথম দিকে শুধু বাংলা মুদ্রণের কাজ হতো। ১৮৬৬ সালে ঢাকায় তিনটি ছাপাখানা ছিল। আরেকটি প্রাচীন ছাপাখানা ছিল ফরিদপুরে এবং সেখান থেকে বাংলা অমৃতবাজার পত্রিকা প্রকাশ হতো।
পূর্ব বাংলায় সৃজনশীল বা মননশীল ধারার প্রথম প্রকাশিত বই কোনটি, তা নিয়ে কিছুটা মতভেদে আছে। ধরে নেয়া হয় যে, ১৮৮৭ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত দীনবন্ধু মিত্রের নীলদর্পণ এ ভূখণ্ডে প্রকাশিত প্রথম সৃজনশীল বা মননশীল বই।
লক্ষ করলে দেখা যায় যে, আদি পর্বে বাংলাদেশের প্রকাশনার কর্মকাণ্ড এ ভূখণ্ডের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিল। আর তাতে প্রাধান্য ছিল মূলত পত্রপত্রিকার। বাংলা বইয়ের প্রকাশনা ছিল কলকাতাকেন্দ্রিক।
ভিত গঠন
দেশ ভাগের মধ্য দিয়ে ভারত ও পাকিস্তান স্বাধীন দুটি রাষ্ট্র হিসেবে যাত্রা করে। ঢাকাকে রাজধানী করে পূর্ব বাংলা পাকিস্তানের একটি প্রদেশ হয়, যা পূর্ব পাকিস্তান নাম ধারণ করেছিল। তখন থেকে অর্থাৎ ১৯৪৭ সাল থেকেই এ অঞ্চলে প্রকাশনা শিল্প একটি স্বতন্ত্র ভিত গঠনের মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে বিকশিত হতে শুরু করে।
বলতে গেলে ঢাকায় প্রকাশনা কর্মকাণ্ডকে একেবারে গোড়া থেকে শুরু করতে হয়েছে। না ছিল ভালো ছাপাখানা, না ছিল ভালো ছাপার সরঞ্জাম। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ‘লালসালু’ ও আবু ইসহাকের ‘সূর্য দীঘল বাড়ী’ প্রথমে কলকাতা থেকে ছাপিয়ে আনা হয়েছিল। কলকাতার ওপর পুরোপুরি নির্ভরতা বজায় ছিল বেশ কয়েক বছর। তবে নতুন দেশে নিজেদের স্বকীয়তা গড়ে তোলার তাগিদে বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তা-প্রকাশক-মুদ্রক এগিয়ে আসেন। আর ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ও একুশে ফেব্রুয়ারি মানুষের মনে প্রবল এক অনুপ্রেরণার সঞ্চার করে, যা এ প্রকাশনা খাতকেও প্রভাবিত করে। ফলে এক দশকের মধ্যে ঢাকায়ই গোটা বিশেক প্রকাশনা সংস্থা ও দুই ডজন ছাপাখানা আত্মপ্রকাশ করে। ঢাকার বাইরেও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলা শহরে এমনকি মহকুমা শহরে ছাপাখানার বিস্তার ঘটতে থাকে।
পাকিস্তান আমলের প্রথম দশকে স্থাপিত প্রকাশনা সংস্থাগুলোর মধ্যে আশুতোষ লাইব্রেরি, প্রেসিডেন্সি লাইব্রেরি, নওরোজ কিতাবিস্তান, কোহিনূর লাইব্রেরি, বইঘর, শিশু সাহিত্য বিতান, আদিল ব্রাদার্স, খান ব্রাদার্স, স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্স, মল্লিক ব্রাদার্স, মাওলা ব্রাদার্স, আজাদ পাবলিশিং হাউজ, সাহিত্যিকাসহ আরো কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা কমবেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে।
১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে সামরিক শাসন জারি হলে শিল্প-সাহিত্য-সাংস্কৃতিক চর্চা বাধাপ্রাপ্ত হয়, রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষেধের বেড়াজালে আবদ্ধ হয়। ফলে মুদ্রণ ও প্রকাশনা কর্মকাণ্ড বড় ধরনের ধাক্কা খায়। অবশ্য এক যুগব্যাপী সামরিক শাসনের প্রথম দিকে যতটা কড়াকড়ি ছিল, ধীরে ধীরে তা শিথিল হতে থাকে, এমনকি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় সাহিত্যচর্চাকে উত্সাহিত করা হয় মূলত সরকারের অনুকূলে বুদ্ধিজীবীদের টানার জন্য। ষাটের দশকের গোড়ার দিকে জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। তার আগে ১৯৫৬ সালে গঠিত হয় বাংলা একাডেমি। এছাড়া ছিল কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড। এ তিনটি প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশের বই প্রকাশনা কর্মকাণ্ডকে গুরুত্বপূর্ণ সমর্থন দিয়েছে তাদের যাত্রা থেকেই। এ দশকেই বইমেলার বীজ রোপিত হয়েছিল। আলফ্রেড স্টেফারাড রচিত/সম্পাদিত ও ১৯৫৩ সালে প্রকাশিত ওয়ান্ডারফুল ওয়ার্ল্ড অব বুকস নামের একটি বই লন বাংলা একাডেমির তত্কালীন প্রকাশনা কর্মকর্তা ফজলে রাব্বির (যিনি পরবর্তীতে জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের পরিচালক হয়েছিলেন) হাতে আসে ১৯৬৩ সালে। তিনি বইটি পড়ে বুক ফেয়ার বা বইমেলার ধারণাটি যে জানতে পারেন, সেটি জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের পরিচালক সরদার জয়েনউদ্দীনকে জানান। এরপর সরদার জয়েনউদ্দীন নিজে বইটি পড়েন এবং বইমেলার বিষয়টি নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। যার ফলে ১৯৬৫ সালে তিনি ঢাকায় আয়োজন করেন শিশু গ্রন্থমেলা। অন্যদিকে ১৯৬৭ সালে যশোরে অধ্যাপক শরীফ হোসেন প্রথম বইমেলার সূত্রপাত ঘটান, যা অল্প সময়ের মধ্যেই বৃহত্তরে যশোরে ছড়িয়ে পড়েছিল।
আর ১৯৭০ সালে নারায়ণগঞ্জ ক্লাব প্রাঙ্গণে নারায়ণগঞ্জের সুধীজন পাঠাগার সপ্তাহব্যাপী গ্রন্থমেলার আয়োজন করে, যা ছিল বাংলাদেশের প্রথম বড় পরিসরের গ্রন্থমেলা। ফজলে রাব্বি ছিলেন সুধীজন পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা কর্মাধ্যক্ষ। এ বইমেলা আয়োজনেও সক্রিয় ভূমিকা রেখেছিলেন সরদার জয়েনউদ্দীন। কেন্দ্রীয় বাংলা উন্নয়ন বোর্ড ও জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের সহযোগিতায় সপ্তাহব্যাপী এ বইমেলা ছিল প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশের প্রথম বইমেলা। বইমেলার এ আয়োজন প্রকাশনা শিল্প বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক শক্তি হিসেবে বিবেচিত হয়।
তবে বাঙালিদের ওপর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর শোষণ-নির্যাতনের প্রতিবাদে স্বাধিকার থেকে স্বাধীনতার উত্তাল আন্দোলনে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি দ্রুত বদলে যেতে থাকে। এ সময় সাময়িক পত্রপত্রিকাগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। ১৯৭০-এর জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে পূর্ব পাকিস্তানে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় স্বাধীন দেশের দিকে যাত্রাকেই ত্বরান্বিত করে। নির্বাচনের ফলাফল না মেনে কালক্ষেপণ করে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক বাহিনী লেলিয়ে দিয়ে গণহত্যার সূচনা করে পাকিস্তান সরকার। আত্মরক্ষার্থে অস্ত্র ধরতে হয় বাঙালিদের। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের অবসানে ১৬ ডিসেম্বর স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।
বিকাশ
মুক্তিসংগ্রামে প্রকাশনা খাত একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছিল। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তাই প্রকাশনা জগৎ নতুনভাবে নতুন প্রত্যাশায় বিকশিত হওয়ার স্বপ্ন দেখতে থাকে। স্বাধীনতার আগেই চৌমুহনীতে প্রতিষ্ঠিত পুঁথিঘর পাঠ্যপুস্তকের নোট বইয়ের প্রকাশনা শুরু করেছিল। এর প্রতিষ্ঠাতা চিত্তরঞ্জন সাহা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে কলকাতায়ই মুক্তধারা প্রতিষ্ঠা করেন স্বাধীনতার পর ঢাকার ফরাসগঞ্জে, যা পাকাপোক্তভাবে যাত্রা করে। মুক্তধারা বাংলাদেশের সৃজনশীল ও মননশীল বই প্রকাশে অন্যতম অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। স্বাধীনতার পর একুশে ফেব্রুয়ারির প্রাক্কালে বাংলা একাডেমির সামনে চট বিছিয়ে বই বিক্রি শুরু করেছিলেন চিত্ত বাবু ও স্ট্যান্ডার্ড পাবলিশার্সের রুহুল আমীন নিজামী। অনেকে তাই তাদের বা শুধু চিত্ত বাবুকে একুশে গ্রন্থমেলার পথিকৃত বলতে চান, যা সঠিক নয়। বইমেলার গোড়াপত্তন স্বাধীনতার আগেই হয়েছিল। তবে তা সুসংগঠিত হতে দেড় দশকের বেশি সময় লেগেছে। আর এটি হয়েছে মূলত বাংলা একাডেমির মাধ্যমে, যেখানে দেশীয় প্রকাশকরা সহায়ক ভূমিকা পালন করেছেন।
পাকিস্তান আমলে যেসব প্রকাশনা সংস্থা আত্মপ্রকাশ করেছিল, তার অনেকগুলোই স্বাধীনতার পর নতুনভাবে ব্যবসা শুরু করে। পাশাপাশি নতুন নতুন প্রকাশনা সংস্থা বাজারে বই আনতে থাকে। ঢাকার বাংলাবাজার এলাকা প্রকাশনা শিল্পের প্রাণকেন্দ্র হয়ে ওঠে।
দেশের প্রকাশকদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতি অনেক দিন ধরে চেষ্টা করছে প্রকাশনা জগতের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে অর্থবহ রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপ নিশ্চিত করার। এ সমিতির যারা সদস্য, তারা বাংলাদেশের মূলধারার প্রকাশক। এর মধ্যে অনন্যা, অন্য প্রকাশ, অনুপম, আগামী, অবসর, আহমদ পাবলিশিং হাউজ, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স, সাহিত্য প্রকাশ, কাকলী, বিউটি বুক হাউজ, সুবর্ণ, কথা প্রকাশ, শিখা প্রকাশ, অনিন্দ্য, সময়, মাওলা ব্রাদার্স, বিদ্যা প্রকাশ, খান ব্রাদার্স, পার্ল, জ্ঞানকোষ, দিব্য প্রকাশ, ঐতিহ্য, তাম্রলিপি, ঝিনুক, বিঙেফুল, সালাউদ্দিন বইঘর ইত্যাদির নাম করা যেতে পারে। এরা প্রায় সবাই বাংলাবাজারকেন্দ্রিক।
নব্বইয়ের দশকে রাজধানীর শাহবাগে আজিজ সুপার মার্কেটকে কেন্দ্র করে কয়েকজন তরুণ প্রকাশক সক্রিয় হয়ে ওঠেন। এর মধ্যে পাঠক সমাবেশ, পড়ুয়া, শ্রাবণ, জাগৃতি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। আর চলতি দশকের গোড়ার দিকে কাঁটাবনকেন্দ্রিক শুদ্ধস্বর, চর্চা, নান্দনিক, সংঘের মতো কয়েকটি প্রকাশনা সংস্থা আত্মপ্রকাশ করে।
বাংলাদেশের প্রকাশনা জগেক এককভাবে যদি কোনো লেখক উজ্জীবিত করে থাকেন, তবে তিনি হুমায়ূন আহমেদ। হাজার হাজার কপি বই বিক্রি হয়েছে তার হু হু করে। প্রতি বইমেলায় তার বইই থাকত সর্বোচ্চ বিক্রির তালিকায়। তার মৃত্যুর পরও চাহিদা কমেনি বইগুলোর।
বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতে একটি বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে সেবা প্রকাশনী। এর প্রতিষ্ঠাতা রহস্য সাহিত্যিক কাজী আনোয়ার হোসেন একদিকে যেমন বাংলা পেপারব্যাকের প্রবর্তন করেছেন, অন্যদিকে তিনি সৃষ্টি করেছেন প্রথম বাঙালি গুপ্তচর মাসুদ রানাকে। মাসুদ রানা সিরিজের বই বাংলাদেশের পাঠক সমাজকে একেবারে ভিন্ন জগতে নিয়ে গেছে। সেবা প্রকাশনী নিউজপ্রিন্টে পেপারব্যাক বই প্রকাশ করে যে ব্যবসায়িক সাফল্য পেয়েছে, তা অবশ্য আর কোনো প্রকাশক পাননি। আশি ও নব্বইয়ের দশকে কয়েকটি পেপারব্যাক প্রকাশনী আত্মপ্রকাশ করলেও বেশি দিন টিকতে পারেনি।
অপূর্ণাঙ্গতা
প্রকাশকদের একটি বড় অভিযোগ হলো, বাংলাদেশের মানুষ বই কেনে না, বই পড়ে না। ফলে বই প্রকাশ সবসময় লাভজনক হয় না। অভিযোগটি পুরোপুরি সত্য নয়। বইয়ের ক্রেতা ও পাঠক এ দেশে সবসময়ই ছিল ও আছে। তবে তারা সংখ্যায় অনেক কম। তার পরও প্রকৃত ও সম্ভাব্য ক্রেতারা অনেক সময়ই বইয়ের খোঁজখবর ঠিকমতো পায় না। বই বিপণনে দুর্বলতা ক্রেতা-বিক্রেতার মধ্যে দূরত্ব বজায় রাখছে।
আবার বাংলাদেশের প্রকাশকরা বহুলাংশে সরকারি অনুদানে বই কেনা কর্মসূচির ওপর নির্ভরশীল। জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন গণগ্রন্থাগারকে বই কেনার জন্য যে অনুদান দেয়া হয়, তার ভাগ পেতে ছোটবড় সব প্রকাশকই মরিয়া থাকেন। এছাড়া সরকারি আরো কিছু দপ্তরে বই কেনা হয়। এই সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পাওয়ার জন্যও অনেক প্রকাশনা সংস্থা গড়ে উঠেছে, যারা স্বাভাবিকভাবে লাভের মুখ দেখতে পায় না। এভাবে ভালোভাবে না বুঝে অনেকেই প্রকাশনা ব্যবসায় নেমে পড়েছে। কিন্তু সরকারি অনুদান ও ক্রয় কোনোভাবেই প্রকাশনা ব্যবসাকে অর্থবহ পৃষ্ঠপোষকতা দিতে পারে না। এছাড়া ৯০ শতাংশ প্রকাশক একুশে গ্রন্থমেলানির্ভর হওয়ায় সমস্যা বেড়েছে বৈ কমেনি। আসলে যে কেউ প্রকাশক হতে চাইলে অনিবার্যভাবে মৌসুমি ও শৌখিন প্রকাশকের সংখ্যা বাড়ে। মুশকিল হলো, এ রকম প্রকাশকরা অনেকেই বুঝতে ও মানতে চান না যে, তারা পেশাদার প্রকাশক হতে পারবেন না। ভর্তুকির প্রত্যাশায় ও লেখকের টাকায় বই প্রকাশ করে তা হওয়াও যায় না। মাঝখান থেকে অনেকে লোকসান গুনে হতাশ হয়ে পড়েন।
আবার পেশাদার প্রকাশনা সংস্থা হিসেবে গড়ে না ওঠার অন্যতম কারণ হলো প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই ও সম্পাদনা ব্যবস্থা না থাকা এবং লেখককে যথাযথ সম্মানী প্রদান না করা। প্রথম আলোর অঙ্গপ্রতিষ্ঠান প্রথমা প্রকাশনসহ গুটিকয়েক প্রকাশনা সংস্থা এসব বিষয়ে মনোযোগী থাকলেও বাকিদের তা নেই।
প্রকাশনা শিল্পের সব উপাদানই এ দেশে ভালোভাবে রয়েছে। তার পরও এটি বিকশিত হয়েছে অনেকটা এলোমেলোভাবে। কলকাতার প্রকাশনা যেভাবে একটি শক্তিশালী শিল্প খাতে রূপ নিয়েছে, ঢাকার প্রকাশনায় তার দেখা মেলে না। আর তা না মেলার বড় কারণ হলো বই বিপণনে ব্যর্থতা। বই প্রকাশের পাশাপাশি এর প্রচার ও প্রসারে যে পরিকল্পিত বিপণন কাঠামো গড়ে ওঠার প্রয়োজন ছিল, তা পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি।
লেখক: অর্থনৈতিক সাংবাদিক
আলোকচিত্রী: রিচার্ড রোজারিও





