ঢাকা বিশ্বের নবম জনবহুল শহর, মেগাসিটি, ২০৩০ সালের মধ্যে হবে ষষ্ঠ বৃহত্তম (জাতিসংঘ, ওয়ার্ল্ড আর্বানাইজেশন প্রসপেক্টস, ২০১৪)। ঢাকা বাংলাদেশের রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। শুধু জনসংখ্যার বিচারে যে ঢাকা বাংলাদেশের নগর ব্যবস্থায় প্রবল প্রাধান্য বিস্তার করে থাকে তা-ই নয়, বরং রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সব ক্ষেত্রেই ঢাকার প্রাধান্য প্রশ্নাতীত। ঢাকা বাংলাদেশের জিডিপি বা জাতীয় আয়ের প্রায় ৪০ ভাগ অবদান রাখে, এ তথ্য যেমন সত্য, একইভাবে সত্য হলো এই যে, বর্তমানে শহরটি বাসযোগ্যতার আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে একেবারে নিচের দিকে অবস্থান করে। এ কথাও বলা হয়ে থাকে যে, এমন অবস্থা দীর্ঘদিন চলতে পারে না। বাসযোগ্যতা এমন পর্যায়ে নেমে গেছে যে, এরপর এর অর্থনৈতিক শক্তি দুর্বল হতে বাধ্য। ঢাকায় বর্তমান নিম্নমান অবস্থানের জন্য নানাবিধ কারণ চিহ্নিত করা হলেও ঘুরেফিরে নগর ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনের (গভর্ন্যান্স) দুর্বলতাকেই সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা মনে করা হয়। বর্তমান নিবন্ধে রাজধানী শহর ঢাকার এ পরিচালন প্রসঙ্গটিই আলোচিত হবে।

১. রাজধানী ঢাকা বিশ্বের অন্যতম মেগাসিটি, যার অন্তর্ভুক্ত রয়েছে চারটি সিটি করপোরেশন (ঢাকা উত্তর, ঢাকা দক্ষিণ, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর), সাভারসহ কয়েকটি পৌরসভা ও অনেকগুলো ইউনিয়ন পরিষদের গ্রামীণ এলাকা। মেগাসিটির মোট জনসংখ্যা প্রায় পৌনে দুই কোটি (২০১৫)। কেন্দ্রীয় মহানগর ঢাকা  বা মেট্রোপলিটান ঢাকা বলতে সাধারণত ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ও এর আশপাশের সংলগ্ন কিছু এলাকা বোঝানো হয়। এলাকাটি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ এলাকার সমতুল্য এবং এর ভৌগোলিক আয়তন প্রায় ৩৬০ বর্গকিলোমিটার (অবশ্য ইদানীং ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সঙ্গে ১৬টি ইউনিয়ন সংযুক্ত করায় এলাকা সম্প্রসারিত হয়েছে)। বর্তমানে এর জনসংখ্যা এক কোটির ওপর। কেন্দ্রীয় মহানগর ঢাকা অথবা বৃহত্তর মেগাসিটি অঞ্চল রাজধানীর যে সত্তাই ভাবা হোক না কেন দেখা যায়, এর সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা বা পরিচালনে (Governance) বহুবিধ সমস্যা রয়েছে, যার মধ্যে সবচেয়ে বড় সমস্যা এ অঞ্চলের দায়িত্বপ্রাপ্ত ও কর্মরত বিভিন্ন উন্নয়ন ও প্রশাসন কর্তৃপক্ষ এবং সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাব। সম্প্রতি বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা ও বিতর্ক চলছে। বিতর্কের সূত্রপাত অনেক আগে থেকে হলেও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট সুপারিশ পাওয়া যায় ১৯৯৫ সালে প্রণীত রাজউকের ঢাকা মেট্রোপলিটন ডেভেলপমেন্ট প্ল্যান (Dhaka Metropolitan Development  Plan, DMDP, 1995-2015) প্রতিবেদনে এবং সর্বসাম্প্রতিক সুপারিশ দেখা যায় একই সংস্থা অর্থাৎ রাজউক কর্তৃক প্রণীত Dhaka Structure Plan 2016-2035 (ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান ২০১৬-৩৫) খসড়া প্রতিবেদনে  (সেপ্টেম্বর, ২০১৫)। রাজউকের পরিকল্পনা প্রতিবেদনের বাইরে বা পাশাপাশি একাধিক ফোরাম কিংবা বিশেষজ্ঞ ব্যক্তিত্বের পক্ষ থেকেও রাজধানীর বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় ও পরিচালন বিষয়ে মতামত পাওয়া যায়। এছাড়া আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ঢাকা মহানগরের সুশাসন ও উন্নয়ন সম্পর্কিত সমন্বয় ব্যবস্থা নিয়ে সরকারের অতীত কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের দৃষ্টান্ত।

২. ১৯৯৫ থেকে ২০১৫ এই ২০ বছরে রাজধানীর পরিচালন বা গভর্ন্যান্স বিষয়ে অন্তত চারটি বিকল্প মডেলের কথা ভাবা হয়েছে। প্রথম মডেলটি মূলত রাজউকেরই একটি উন্নত সংস্করণ। এটিকে মেট্রোপলিটন প্ল্যানিং অথরিটি (MPA) বলা হয়েছে, যা কিনা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অধীনে পরিচালিত হবে। দ্বিতীয় মডেলটি একটি সুশাসন ও উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি হিসেবে উপস্থাপিত। তৃতীয় মডেলটি পরিকল্পনা ও উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি ও চতুর্থ মডেলটি বস্তুত নগর সরকার বা  Metropolitan Government চরিত্রবিশিষ্ট। বর্তমান প্রবন্ধে এ চারটি মডেল ও অন্যান্য মতামত পর্যালোচনার প্রয়াস থাকবে।

ক. রাজউকের ডিএমডিপি প্ল্যান (১৯৯৫-২০১৫) দলিলে প্ল্যান বাস্তবায়নের জন্য চারটি বিকল্প কর্তৃপক্ষ গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছিল। যথা—

ক. একটি সম্পূর্ণ নতুন মেট্রোপলিটন প্ল্যানিং অথরিটি: (Metropolitan Planning Authority, MPA)

খ. রাজউককে ভিত্তি করে একটি মেট্রোপলিটন প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি। (Metropolitan Planning and Development Authority, MPDA)

গ. একটি নতুন ঢাকা মেট্রোপলিটন প্ল্যানিং অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন সেল (Metropolitan Planning and Coordination Cell)

ঘ. মেট্রো গভর্নমেন্ট বা ঢাকা মেট্রোপলিটান প্ল্যানিং অ্যান্ড  ডেভেলপমেন্ট কাউন্সিল (Dhaka Metropolitan Planning Development  Council)। এটিকে খুবই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কর্তৃপক্ষ হিসেবে সুপারিশ করা হয়েছে। এর প্রধান হবেন প্রধানমন্ত্রী ও উপপ্রধান হবেন ডিসিসির মেয়র (তখন মেয়র ছিলেন একজন)। বাকি সদস্যদের মধ্যে থাকবেন সংসদ সদস্য ও বিভিন্ন বিভাগ বা সংস্থার সর্বোচ্চ ব্যক্তিরা।

শেষের দুটি প্রস্তাবিত মডেল ঢাকা মহানগরের সমস্যা মোকাবেলার জন্য অধিকতর গ্রহণযোগ্য মনে হতে পারে। আমরা দেখেছি, পরবর্তীকালে ঢাকা মেট্রোপলিটন প্ল্যানিং অ্যান্ড কো-অর্ডিনেশন সেলকেই একটি উন্নয়ন ও সুশাসন কমিটি হিসেবে কিছুটা বাস্তব কার্যকর করা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে একটু পরে আলোচনা করব। অন্যদিকে মেট্রো গভর্নমেন্ট বা নগর সরকার প্রত্যয়টি আদৌ বাস্তবতার দিকে এগোয়নি। এ প্রত্যয়ের মূল ধারণাটি ছিল একটি গ্রেটার ঢাকা মেট্রোপলিটন কাউন্সিল (Greater Dhaka Metropolitan Council) গঠন। স্থানীয় পর্যায় থেকে নির্বাচিত কাউন্সিলরদের পরোক্ষ ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত মেয়র একজন এই কাউন্সিল বা নগর সরকারের প্রধান হিসেবে নেতৃত্বে থাকবেন অথবা তিনি সরকার কর্তৃক সরাসরি নিযুক্ত হবেন।

খ. ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যান ২০১৬-৩৫ (Dhaka Structure Plan 2016-35)

রাজউকের প্রস্তাবিত ঢাকা স্ট্রাকচার প্ল্যানে রাজউক এলাকার (১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার) উন্নয়ন ও সুশাসন কার্যক্রমে সাতটি প্রধান বিষয় বা শর্ত চিহ্নিত করা হয়েছে, যেখানে সমন্বয়কে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হয়েছে এবং পরিকল্পনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সমন্বয়ের জন্য ১৬টি সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থা সরাসরি সম্পৃক্ত। তাছাড়া আরো ৩০টি সংস্থা পরোক্ষ বা আংশিকভাবে জড়িত। পরিকল্পনা প্রতিবেদনে সমন্বয় সাধনের জন্য স্পষ্ট কোনো ধারণা দেয়া হয়নি। তবে রাজউককে আরো শক্তিশালী ও কার্যকর করার সুপারিশ করা হয়েছে। পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য Metropolitan Development Authority (MDA) ও City Government এ দুই মডেলের কথা বলা হয়েছে। কিন্তু দুইয়ের মধ্যে সম্পর্ক খুব সহজবোধ্য করা হয়নি। স্ট্রাকচার প্ল্যানে দীর্ঘমেয়াদে রাজউককে একটি ব্যাপক দায়িত্বভিত্তিক গণতান্ত্রিক সংস্থায় উন্নীত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যার চরিত্র হবে একটি ‘মেট্রোপলিটান গভর্নমেন্ট’ বা নগর সরকারের, (পৃ. ২৬৬)। এতে রাজউকের সঙ্গে স্থানীয় পৌর সরকারগুলোর দায়িত্ব ভাগাভাগির কথা বলা হয়েছে।

৩. নগর উন্নয়ন ও সুশাসন সমন্বয়ের অভিজ্ঞতা (১৯৯৪-২০০৬)

রাজধানী ঢাকার উন্নয়ন ও সুশাসন সমন্বয় সমস্যাটি বিশেষভাবে ভাবিত করেছিল ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র মোহাম্মদ হানিফকে। ১৯৯৪ সালের মার্চে প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত হয়ে তিনি সমস্যাটি অনুধাবন করেন এবং একটি নগর সরকারের দাবি উত্থাপন করতে থাকেন। কিন্তু যেহেতু তিনি ছিলেন বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নেতা, তাই তত্কালীন কেন্দ্রীয় বিএনপি সরকার তার প্রস্তাব বিবেচনাযোগ্য মনে করেনি। ১৯৯৬ সালের জুনে মেয়র হানিফের দল আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করলে পরিবর্তিত রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে নগর সরকার ও কেন্দ্রীয় সরকারের মধ্যকার সম্পর্ক ভালো হবে বলে আশা করা হয়েছিল। তখন মেয়র পুনরায় নগর সরকারের দাবি তুলে ধরেন। ওই সময় ঢাকার যানজট ও জলাবদ্ধতার সমস্যাগুলো অত্যন্ত প্রকট আকার ধারণ করেছিল। মেয়র মহোদয়ের ‘নগর সরকার’ দাবি প্রধানমন্ত্রী পুরোপুরি গ্রহণ করতে পারেননি। তবে পরিবর্তে অ্যাডহক ভিত্তিতে একটি কো-অর্ডিনেশন কমিটি বা সমন্বয় কমিটি গঠন করলেন। এর আহ্বায়ক করলেন তত্কালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রীকে (মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান, পরবর্তী সময়ে রাষ্ট্রপতি) ও সহ-আহ্বায়ক মেয়র মোহাম্মদ হানিফকে। কমিটির সদস্য ছিলেন সব প্রাসঙ্গিক সেবা প্রদানকারী সংস্থা ও স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর প্রধানরা। কমিটির সদস্য সংখ্যা ছিল ১৬। মেয়র মোহাম্মদ হানিফ এ ব্যবস্থায় সন্তুষ্ট হতে পারেননি। কেননা এতে ক্ষমতা প্রকৃত অর্থে নগর পিতার কাছে  হস্তান্তরিত হয়নি। তবে ১৫ অক্টোবর ১৯৯৬ থেকে শুরু করে পরবর্তী ছয় মাস এ কমিটির ছয়টি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল, যার মূল আলোচ্য বিষয় ছিল বর্জ্য অপসারণ, জলাবদ্ধতা ও পানি নিষ্কাশন, যানজট, মশক নিধন, অবৈধ নির্মাণ, রাস্তার ওপর নির্মাণসামগ্রী ফেলে রাখা ও রাস্তা খনন ও সংস্কার। কমিটি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আংশিক সফলতা অর্জন করলেও সামগ্রিকভাবে খুব কার্যকর ভূমিকা রাখতে পেরেছে বলে মনে করা হতো না। এর অন্যতম কারণ মেয়র হানিফের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত কমিটির সভায় সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রধানদের অংশগ্রহণে অনীহা। বস্তুত মোহাম্মদ হানিফ একটি অর্থবহ নগর সরকার প্রতিষ্ঠায় কাঙ্ক্ষিত সমর্থন না পেয়ে অনেকটাই হতাশ ছিলেন।

মেয়র হানিফের পরে ২০০২ সালে বিএনপির মহানগর নেতা সাদেক হোসেন খোকা মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হন এবং দায়িত্ব গ্রহণ করেন। কার্যভার গ্রহণের কিছুদিনের মধ্যে তিনিও তার পূর্বসূরির অনুসরণে নগর সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি জানাতে থাকেন এবং তখন কেন্দ্রীয় সরকারের দায়িত্বে ছিল তারই দল বিএনপি। তা সত্ত্বেও মেয়র হানিফের ক্ষেত্রে যেমন, সাদেক হোসেন খোকার বেলায়ও নগর সরকার নয়, বরং মেয়রের নেতৃত্বে ‘ঢাকা শহরে সুশাসন ও উন্নয়ন’ সম্পর্কিত সমন্বয় কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি পরিচালনার কার্যকারিতায় (মূলত ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাঙ্ক্ষিত অংশগ্রহণের অভাব) হতাশ হয়ে মেয়র খোকা এ কমিটির দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে স্থানান্তর করার অনুরোধ জানান এবং শেষ পর্যন্ত সে ব্যবস্থাই নেয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব (ড. কামাল উদ্দিন সিদ্দিকী) মেয়র মহোদয়ের পক্ষে এ কমিটির সব সভায় সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। কমিটিতে প্রায় ১১টি প্রাসঙ্গিক মন্ত্রণালয়ের সচিবসহ অন্য ২০-২২টি সরকারি সংস্থার প্রধানসহ প্রায় ৩৮ জন সদস্য ছিলেন। একপর্যায়ে কমিটিতে নগর বিশেষজ্ঞ হিসেবে বর্তমান নিবন্ধকারকে কো-অপ্ট করা হয়। পরবর্তীকালে তার পরামর্শে সিভিল সোসাইটির প্রতিনিধি হিসেবে আরো চারজনকে সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয় (BELA, CUP, NUK ও REHAB-এর প্রধানরা, যার দুজন ছিলেন নারী)। এ কমিটির একাধিক সভায় বিশেষ আমন্ত্রণে তিন বাহিনীর প্রধানদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। বিভিন্ন সভায় আলোচ্য বিষয়ভিত্তিক প্রাসঙ্গিক অসদস্য কর্তৃপক্ষ বা ব্যক্তিকে আমন্ত্রণ জানানো হতো। তবে এতে কোনো সংসদ সদস্যকে (সম্ভবত প্রটোকলের কারণেই) কখনো আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। মেয়র মহোদয়েরও উপস্থিত থাকার সুযোগ ছিল না। বরং তার পক্ষে মুখ্য সচিব সভাপতিত্ব করেন।

যা হোক, তত্কালীন সরকারের মেয়াদকালে (২০০২-০৬ পর্যন্ত) সম্ভবত কমিটির ২৪টির মতো সভা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এসব সভায় মহানগরের নানাবিধ সমস্যা নিয়ে পর্যালোচনা ও সমস্যা সমাধানের সিদ্ধান্ত গৃহীত হতো। এতে নগর সমস্যার সমাধানে বেশকিছু সফলতা অর্জন সম্ভব হয়েছিল বলে মনে করা যায়। এ কমিটির গঠন কাঠামো, কর্মপরিধি ও সাফল্য-ব্যর্থতা বিশ্লেষণ করলে ভবিষ্যতে এ-জাতীয় কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া সহজ হতে পারে।

৪. নগর সরকার: পেশাজীবী, বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের সুপারিশ

গত ২৫ বছরে ঢাকা মহানগর তথা অন্যান্য মহানগরের জন্য নানা ফোরামে নগর সরকার প্রতিষ্ঠার দাবির পাশাপাশি বিশেষজ্ঞদের পক্ষ থেকে পরামর্শ দেয়া হয়েছে। সর্বসাম্প্রতিক (জুন, ২০১৫) নগর পরিকল্পনাবিদ অধ্যাপক ড. আকতার মাহমুদ ও প্রবীণ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর নগর সরকারবিষয়ক একটি লিখিত প্রস্তাব উপস্থাপন করেছেন (মাহমুদ ও জাহাঙ্গীর, ২০১৫)। তারা বলেছেন, ‘নগর সরকার হবে একটি পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো, মেয়র নগর সরকারের প্রধান হবেন।’ সরাসরি ভোটে নির্বাচিত কাউন্সিলরদের দ্বারা মেয়র নির্বাচিত হবেন। নগর সরকারের একটি ‘নগর সংসদ’ ও একটি ‘নগর প্রশাসন ব্যবস্থা’ থাকবে। কাউন্সিলররা নগর সংসদের সদস্য। তাদের লিখিত প্রবন্ধে নগর সরকারের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা রয়েছে। বর্তমান ঢাকা মহানগরীর জন্য বাস্তব সমস্যা হলো এই যে, শহরটি এখন দুই ভাগে বিভক্ত এবং মেয়রও দুজন। কিন্তু দুই শহরের অনেক সমস্যাই অবিভাজ্য। দুই সিটি করপোরেশনের দুই নগর সরকারের মধ্যে সমন্বয়টি কীভাবে হবে, সেটি একটি প্রশ্ন থাকবে। রাজউক অঞ্চলের মধ্যে অবস্থিত অন্য দুটি সিটি করপোরেশন, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর, অথবা বৃহৎ পৌরসভা সাভার ও অন্যান্য পৌরসভার নগর সরকার প্রবর্তন কিছুটা সহজ হতে পারে। তবে সেগুলোর কার্যকারিতা সম্বন্ধে প্রশ্ন থাকতেই পারে। আকতার মাহমুদ ও মুহাম্মদ জাহাঙ্গীরের লিখিত প্রস্তাবটি নেহাতই একটি সূচনা বক্তব্য মনে করা যায়, যা নিয়ে ভবিষ্যতে গভীর আলোচনা করা যেতে পারে। তাদের আগেও অনেক ফোরামে ঢাকার ব্যবস্থাপনা বা পরিচালন নিয়ে আলোচনা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ ১৯৯৫ সালের ৫ জুন ‘Save Dhaka’ শীর্ষক রাজধানীতে অনুষ্ঠিত একটি পলিসি ডায়ালগের কথা মনে করা যায়। ডায়ালগের সুপারিশ ছিল যে, রাজধানীতে দায়িত্বপূর্ণ সব সংস্থাকে একই ছাতার অধীনে আনা উচিত ও সমন্বিত কার্যক্রমের ব্যবস্থা করা উচিত (Daily Star, 9 June ১৯৯৫)। এ বছর মেয়র নির্বাচনের প্রাক্কালে ‘সুজন’-এর উদ্যোগে নগর সরকার নিয়ে প্রেস ক্লাবে গোলটেবিল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়নি।

৫. উপসংহার

আমরা প্রবন্ধটি আপাতত আর দীর্ঘ করতে চাইছি না। শুধু এ রকম একটি প্রশ্ন রাখা যায় যে, রাজধানী ঢাকা (এর ভৌগোলিক অর্থ যা-ই হোক না কেন) পরিচালন ব্যবস্থাটি কী হওয়া উচিত ও কী হতে পারে। এটি কি একাধিক নগর সরকারের সমন্বয় হবে, নাকি একটি অত্যন্ত শক্তিশালী উন্নয়ন ও সুশাসন সমন্বয় কমিটি হবে? যদি উত্তরটি সমন্বয় কমিটি হয়, তাহলে তা হতে হবে একজন জ্যেষ্ঠ, দক্ষ ও ধীমান মন্ত্রীর নেতৃত্বে। কমিটিতে রাজধানী অঞ্চলের সব সংসদ সদস্য, সব মেয়র, মন্ত্রণালয়ের সচিব ও সরকারি সংস্থার প্রধান, বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি অন্তর্ভুক্ত হবেন। এ কমিটি অবশ্যই সংসদে অনুমোদিত আইনের মাধ্যমে গঠিত হতে হবে। এ কমিটি প্রধানমন্ত্রীর আশীর্বাদপুষ্ট হবে। তিনি এর উপদেষ্টা থাকতে পারেন। কমিটির সভা প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে অনুষ্ঠিত হলে এর এক ধরনের প্রতীকী উচ্চমর্যাদা থাকবে। মাঝে মধ্যে তিনি কমিটির সভায় উপস্থিত থাকবেন। বাস্তব ক্ষেত্রে আমরা দেখতে পাই যে, রাজধানীর উন্নয়নবিষয়ক যেকোনো বড় সিদ্ধান্তে প্রধানমন্ত্রীর মতামত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বলা বাহুল্য, কমিটিসংক্রান্ত আমার প্রস্তাবটি আরেকটি সূচনা প্রস্তাব। অন্যান্য প্রস্তাবও কাঙ্ক্ষিত ও অভিনন্দনযোগ্য। শেষ কথা হলো, রাজধানীর নগর পরিচালন (Governance) নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার আবশ্যকতা রয়েছে। প্রসঙ্গত, আমার নিজের লেখা একটি নিবন্ধের কথা স্মরণ করতে পারি। এটি লিখিত হয়েছিল মোহাম্মদ হানিফের মেয়র থাকাকালে। নগর সরকার গঠনের দাবির উত্তরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্যোগে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী জিল্লুর রহমানকে আহ্বায়ক ও মেয়র মোহাম্মদ হানিফকে যুগ্ম আহ্বায়ক করে সমন্বয় কমিটি গঠনকে তখন আমার তেমন অর্থবহ মনে হয়নি। আমি ১৯৯৭ সালে লিখেছিলাম ‘এ সমন্বয় কমিটি আরো কার্যকর হওয়া উচিত। আমার ধারণা, মেয়রকে আরো ক্ষমতা দিয়ে তাকে এ কমিটির আহ্বায়ক করা উচিত। তবে বৃহত্তর ঢাকার জন্য ডিসিসির মেয়রের অথরিটি নেই। সে কারণে রাজধানীর ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সম্ভবত এমন একটি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কমিটি করতে হবে, যার নেতৃত্বে থাকবেন প্রধানমন্ত্রী নিজে। তাছাড়া বর্তমান কমিটিতে সদস্য হিসেবে রয়েছে শুধু সরকারি সংস্থাগুলো, তাও সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা নয়। কমিটি আরো ব্যাপক হতে পারে। এ কমিটিতে বেসরকারি, ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব থাকতে পারে।’ (ইসলাম, ১৯৯৭) একাধিক টিভি টকে আমি একজন জ্যেষ্ঠ মন্ত্রী অথবা উপপ্রধানমন্ত্রী নিয়োগ করে রাজধানীর সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য সুপারিশ করেছি। রাজউকের প্রধান প্রকৌশলী মো. এমদাদুল ইসলাম আমার এ পরামর্শ অনুসরণ করে (কিন্তু কোনো স্বীকৃতি না দিয়ে) এ রকম পরামর্শই দিয়েছেন রাজউক পরিকল্পনাধীন ১ হাজার ৫৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকা সমন্বয়ের জন্য (ইসলাম,  এ. মো., ২০১৫)।

বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক ড. সারোয়ার জাহান ও বিভিন্ন ফোরামে ‘নগর সরকার’ গঠনের পক্ষে তার অভিমত ব্যক্ত করেছেন। অবশ্য দ্বিখণ্ডিত ঢাকার নতুন বাস্তবতায় ঢাকার নগর সরকার একাধিক হতে হবে।

প্রথমেই নির্ধারণ করতে হবে, এ সমন্বয় কমিটির ভৌগোলিক, প্রশাসনিক আওতা কী হবে, কেন্দ্রীয় মেট্রোপলিটন এলাকার ৩৬০ বর্গকিলোমিটার নাকি রাজউক অঞ্চলের ১ হাজার ৫২৮ বর্গকিলোমিটার)। দুই অঞ্চলের সমস্যাগুলো এক নয়। স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. তোফায়েল আহমেদ ও তার সহলেখক বিধান চন্দ্র পাল তাদের রচিত নগরায়ণ ও নগর সরকার: বাংলাদেশের সিটি করপোরেশন গ্রন্থের (ঢাকা, প্রথমা, ২০১২) ‘কেমন নগর চাই’ উপসংহার অধ্যায়ে লিখেছেন, ‘আমাদের ব্যক্তিগত অভিমত, নগর সরকারের ধারণা ও কাঠামোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ভবিষ্যতে পশ্চিমবঙ্গব্যাপী পরিচালিত পুরাকাঠামো ও কলকাতা সিটি করপোরেশন ব্যবস্থাটি পর্যালোচনা করে দেখতে পারে। তাছাড়া রাজধানী শহর ঢাকার ক্ষেত্রে একাধিক কাজকর্ম সমন্বয়ের জন্য পুরো রাজউক এলাকা নিয়ে লন্ডন শহরের মতো একটি বিশেষ ধরনের নির্বাচিত কর্তৃপক্ষ সৃষ্টি হতে পারে।’

উল্লেখ্য, কলকাতা সিটি করপোরেশনে ‘মেয়র ইন কাউন্সিল’ পদ্ধতি প্রচলিত রয়েছে। সেখানে বিভিন্ন ওয়ার্ডের নির্বাচিত কাউন্সিলরদের মধ্যে একজন মেয়র নির্বাচিত হন। তাছাড়া একজন ডেপুটি মেয়র ও অনধিক ১০ জন সদস্য কাউন্সিল (বা কেবিনেট) গঠন করেন। মেয়র হলেন করপোরেশনের মুখ্য রাজনৈতিক পরিচালক।

ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আনিসুল হক, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৫ একটি অনুষ্ঠানে জানালেন, তিনি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র মোহম্মদ সাঈদ খোকন প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে রাজধানী ঢাকার উন্নয়ন ও সুশাসন (বিশেষত জলাবদ্ধতা ও যানজট সমস্যা) সমন্বয় করার জন্য একটি  টাস্কফোর্স গঠনের কথা বলেছেন এবং এ টাস্কফোর্সের দায়িত্ব নিতে প্রধানমন্ত্রীকেই অনুরোধ জানিয়েছেন (দ্রষ্টব্য: প্রথম আলো, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৫)। এ প্রস্তাব আমার ১৯৯৭ সালের প্রস্তাবের কাছাকাছি। তবে আমি বর্তমানে মনে করি, প্রধানমন্ত্রী এ রকম একটি টাস্কফোর্স বা সমন্বয় কমিটির সরাসরি নেতৃত্বে না নিয়ে বরং তিনি সমন্বয় কমিটির আশীর্বাদক হতে পারেন। সমন্বয় কমিটি কলেবরে বড় হয়ে গেলে এর এক-চতুর্থাংশ সদস্য নিয়ে একটি কার্যকরী কমিটি গঠন করা যেতে পারে, যেখানে নির্বাচিত মেয়ররা মুখ্য ভূমিকা পালন করবেন।

সব শেষে বলা যায়, রাজধানী ঢাকার পরিচালন বা গভর্ন্যান্স ব্যবস্থা নিয়ে আরো বিস্তারিত চিন্তাভাবনা দরকার এবং তা এক্ষুনি শুরু করা উচিত। বর্তমানে ঢাকার যে নানামুখী ত্রাহি পরিস্থিতি, এখান থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে এবং শহরটিকে দীর্ঘমেয়াদে টিকিয়ে রাখতে হলে ও বাসযোগ্য করতে হলে কালবিলম্বের আদৌ সুযোগ আমাদের নেই। আমেরিকার প্রত্যাগত স্থপতি অধ্যাপক আদনান মোর্শেদ যেমন তার দিব্য চোখে ২০৪৪ সালে ঢাকা শহরকে পাঁচ হাজার বছর আগের মহেঞ্জোদারোর মতো একটি মৃত ও পরিত্যক্ত শহর দেখেছেন, (Morshed, 2017) তা-ই দেখতে হবে। আমরা অবশ্য ঢাকার তেমন ভবিষ্যৎ ভাবতে চাই না।

 

লেখক: নগরবিদ

চেয়ারম্যান, নগর গবেষণা কেন্দ্র, ঢাকা

 আলোকচিত্রী: সোহেল আহমেদ