১৬৬০ সালে বন্যার পানি নেমে যাওয়ার সুবিধার্থে সোনাপুর থেকে ডাকাতিয়া নদীর সঙ্গে সংযোগকারী নতুন খননকৃত খাল বা নয়া খাল থেকে নোয়াখালী জেলার নামকরণ। কিন্তু আমার মাঝে মাঝে মনে হয়, নামটা এসেছে ‘নাই’ আর ‘খালি’ থেকে। নেই পাহাড়, নেই সমুদ্র, নেই গ্যাস, নেই বন। নেই শিক্ষা বোর্ড, নেই মেডিকেল কলেজ (সম্প্রতি হয়েছে), নেই বিশ্ববিদ্যালয় (সম্প্রতি হয়েছে)। খালি নদীতীর, নেই বন্দর বা পর্যটন কেন্দ্র।
মেঘনার পাড়ে গড়ে ওঠা শহর সোনাপুর। অদূরে বঙ্গোপসাগর। বঙ্গোপসাগর, চট্টগ্রাম বা খুলনার জন্য, আশীর্বাদ-উপহার দিয়েছে সমুদ্রবন্দর। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, যশোর (অভয়নগর), ভৈরব ইত্যাদি শহর গড়ে উঠেছে নদীর পাড়ে, নদীকে আবর্তিত করে। আর প্রমত্তা মেঘনা নোয়াখালীর জন্য এসেছে অভিশাপ হিসেবে। সত্তরোর্ধ্বরা আবেগ নিয়ে স্মৃতিচারণ করেন সোনাপুর শহরের, যা মেঘনায় বিলীন হয়েছে। ঊনসত্তরে বঙ্গোপসাগর জলোচ্ছ্বাসে ছিনিয়ে নিয়েছে লক্ষাধিক জীবন। সময়ের ব্যবধানে সাগর আর মেঘনা সরে গেছে বহু দূরে। উগরে দিয়েছে গিলে খাওয়া জমিন। কিন্তু যে জনপদকে নিঃস্ব করেছে, বিনিময়ে তারা কী পেয়েছে? নৃতাত্ত্বিকরা ভালো বলতে পারবেন, তবে আমার মনে হয়, এ সংগ্রাম মানুষের আচরণে এনেছে ব্যাপক পরিবর্তন। রক্তে বুনে দিয়েছে ঘুরে দাঁড়ানোর শক্তি, লড়াইয়ের স্পৃহা।
নোয়াখালী জেলার আগের নাম ভুলুয়া। ১৮২২ সালের মার্চে ডাকাতিয়া নদীর পাশ্চিম পাশে গঠিত হয়। বর্তমান ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য থেকে সুধারাম, বেগমগঞ্জ, পারী, লক্ষ্মীপুর, মুনিয়া; চট্টগ্রাম থেকে হাতীয়া, সন্দ্বীপ, বামনী (বর্তমানে কোম্পানীগঞ্জ) ও বাকেরগঞ্জ (বর্তমান ভোলা) থেকে শাহবাজপুর নেয়া হয়েছে। ১৮২৩ সালে ত্রিপুরা (বর্তমান কুমিল্লা) থেকে তিনটি মহালসহ এলাহাবাদ পরগনা নতুন জেলায় সংযুক্ত করা হলো। ১৮৬৮ সালে নতুন নামকরণ হলো নোয়াখালী। ১৮৬৯ সালে শাহবাজপুর বাকেরগঞ্জকে ফেরত দেয়া হলো। ১৮৭৬ সালে ফেনী মহকুমা গঠিত হলো। চট্টগ্রাম থেকে মিরসরাই ও ত্রিপুরা থেকে ছাগলনাইয়া অন্তর্ভুক্ত করা হলো। ১৮৭৮ সালে মিরসরাই চট্টগ্রামে ফেরত দেয়া হলো। ১৮৮১ সালে ফেনী নদীকে নোয়াখালী ও চট্টগ্রামের সীমানা হিসেবে নির্ধারণ করা হলো এবং চার বর্গকিলোমিটার মাপের চারটি গ্রাম প্রথম থেকে দ্বিতীয় জেলায় হস্তান্তর করা হলো। ১৯৫৫ সালে সন্দ্বীপকে চট্টগ্রামের অন্তর্ভুক্ত করা হলো।
সারি সারি মান্দারের মাঝে মাথা উঁচু করে থাকা সুপারি, নারকেল বৃক্ষে সমৃদ্ধ জমিন। ধানক্ষেতের মাঝে বিন্দুসদৃশ বাড়ি। বৃক্ষ ছাওয়া প্রত্যকে বাড়িই বনসদৃশ। আছে একাধিক পুকুর। জমিন নিচু, তাই বাড়ির ভিটা তৈরি করার জন্য মাটি কেটে পুকুর সৃষ্টি। রায় রমেশ চন্দ্র বাহাদুর লিখেছেন, আমরা একটি বদ্বীপ জেলা নিয়ে বলছি, যার একটি অংশ একটা উপসাগরের মুখের নদীর ক্রিয়ার ওপর নির্ভরশিল। যেখানে একটি গ্রাম, যা কয়েক বছর আগেও প্রাণচাঞ্চল্য কর্মকোলাহলে ভরপুর, তা এখন সমুদ্রের নৌ-চলাচলের যাত্রাপথে পরিণত হয়েছে অথবা ঠিক তার উল্টোটা। কয়েক বছর আগে যেখানে গভীর নৌপথ ছিল, সেটি এখন কাদামাখা তীরভূমি। মৃত্তিকার এমন দ্রুত পরিবর্তন খুব কম বদ্বীপে পরিলক্ষিত হয়। এ পরিবর্তন দৃশ্যমান। রেনেলের ১৭৭৩ সালের জরিপ থেকে হজ ও সিডনের ১৮৩৫ সালের জরিপ, হজ আর সিডনের সঙ্গে দিয়ারার ১৮৮২ সালের জরিপ এবং দিয়ারার সঙ্গে বর্তমান জরিপ— মোটাদাগে ৫০ বছর সময়কাল ভাগ করে মেলালে সমুদ্রতীরের পরিবর্তনগুলো চোখে পড়বে। রেনেলের ম্যাপে হাতিয়া মূল ভূমির সঙ্গে লাগানো— মাঝখানে কোনো সমুদ্রপথ নেই। সন্দ্বীপ তার খুব কাছে— চিত্কার দিলে শোনা যায়। দ্বীপের মতো মূল ভূমিতেও অনেক ভাঙাগড়া হয়েছে। রেনেলের সার্ভে অনুসারে, সমুদ্র, মূল ভূমি থেকে মাত্র আট কিলোমিটার উত্তরে। হজের ১৮৩৫ সালের জরিপের সময় এ অঞ্চলগুলো সমুদ্রে বিলুপ্ত। মেঘনা নদী ছিল যেখানে এখন ডাকাতিয়া।
১৮২২, ১৮২৫ ও ১৮৪৮ সালে বন্যায় অনেক ক্ষতি হয়েছে। ১৮৭৬ সালের অক্টোবরের সাইক্লোন সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। দুদিন ধরে টিপ টিপ বৃষ্টির পর ৩১ অক্টোবর সন্ধ্যায় বাতাস প্রবল বেগে বইতে শুরু করল। গতিপথে পড়া গাছপালা উপড়ে ফেলল, ডালপালা ভেঙে ফেলল, পাতাশূন্য করে ফেলল। নোয়াখালীর অধিকাংশ ঘর মাটির। তা ভূমির সঙ্গে মিশিয়ে দিল। শুধু ডিসির পাকা দালানটি দাঁড়িয়ে ছিল। সকালবেলা হাতিয়া আর সন্দ্বীপে দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ছয় ফুট উঁচু জলোচ্ছ্বাস এল। কিছুক্ষণ পর দক্ষিণ-পশ্চিম দিক থেকে ছয় ফুট উঁচু আরেক জলোচ্ছ্বাস এসে সব ভাসিয়ে নিল। মান্দার গাছ ধরে কিছু লোক বেঁচে ছিল। ভোর ৪টার দিকে জলোচ্ছ্বাস আঘাত হানল মূল শহরে। সকাল ৭টায় শহরের প্রধান সড়কে সাড়ে তিন ফুট উঁচু পানি। প্রবল ঢেউয়ে ভেসে গেল সব। ঘরদোর দোকানপাটের ভগ্নাংশ। পানিতে ডুবে ৩৬ হাজার ৩২৪ জন মারা গেল। পুকুর খাল বিল নোনা পানি, মানুষ আর পশুর লাশে দূষিত। ছড়িয়ে পড়ল কলেরা, মহামারী আকারে। ২৩ নভেম্বর আবার এল ঝড়। মানুষ এটিকে নাম দিল জলোচ্ছ্বাসের ভূত। কলেরায় প্রায় ৪৯ হাজার অর্থাৎ সব মিলিয়ে লাখখানেক লোক মারা গেল। নোয়াখালীর জনসংখ্যা ১৮৭২ সালে ৭ লাখ ১৩ হাজার ৯৩৪।
নোয়াখালীর প্রধান ফসল সুপারি, মরিচ। কৃষিপ্রধান জীবিকা। ১৯০১ সালে ৭৯ শতাংশ লোক কৃষিকাজ করে জীবিকা নির্বাহ করত। অধিক জনসংখ্যার কারণে ফসলি জমি নগণ্য। খামারের আকার ক্ষুদ্র ও বিচ্ছিন্ন। এটি খাদ্য ঘাটতির জেলা। কৃষকদের আর্থিক অবস্থা ভালো নয়। জেলায় তেমন কলকারখানা গড়ে ওঠেনি। বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠান বলতে চৌমুহনীতে ডেল্টা জুট মিল আর ফেনীতে দোস্ত টেক্সটাইল মিল। ডেল্টা জুট মিলে ২২০০ শ্রমিক ও ২৫৪ জন কর্মকর্তা নিয়োজিত। দোস্ত মোহাম্মদ টেক্সটাইল মিলে ১৯৬৯-৭০ সালে ৫৪২ জন কর্মরত ছিল। ১৯৬২ সালে ৪৪৯টি ক্ষুদ্র শিল্প ও ১৪ হাজার ৪২১টি কুটির শিল্প ছিল। চালকল, তেলকল, তাঁত, ছাপাখানা, আসবাব, বেকারি, বাঁশ-বেতের কারখানা ইত্যাদি প্রণিধানযোগ্য। ৯৫ শতাংশ কুটির শিল্প মূলত পরিবারের লোকজন দিয়েই চালানো হতো। ১৯৬১ সালে ৩৬ হাজার ৩৮৩ জন শিল্পে নিয়োজিত ছিল, যা মোট জনসংখ্যার মাত্র ৪ শতাংশ। ১৯৫৫-৫৬ সালে বার্ষিক ভূমি রাজস্ব পরিচালনা প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘এ এলাকার অধিকাংশ লোকজন কৃষক। কিন্তু মাথাপিছু জমি খুবই নগণ্য। তাই জীবনধারণের চাহিদা মেটানো তাদের পক্ষে খুব কষ্টসাধ্য।’ ১৯৬১ সালে জেলার শ্রমিক সংখ্যা ৮ লাখ ৮৪ হাজার ৮৪৩।
১৯৬১ সালে জনসংখ্যা ২৩ লাখ ৮০ হাজার ১২৫, যা দেশে ১১তম। ১৮৮১ সালে জনসংখ্যা ছিল ৮ লাখ ২১ হাজার। অর্থাৎ ৮০ বছরে লোকসংখ্যা প্রায় তিন গুণ হয়ে গেছে। প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১ হাজার ২৮৫ জন; ঘনত্বের দিকে যেটা ছিল বাংলাদেশে তৃতীয় সর্বোচ্চ। নোয়াখালীর লোকদের তাই অন্য জেলায় অভিবাসন নিতে দেখা যায়। পাওয়া যায় প্রায় প্রতিটি স্থানে। অনেকে সাগরে নাবিকের চাকরি নিত। চট্টগ্রাম, সিলেটসহ নোয়াখালীর অধিবাসীরা নাবিক হিসেবে বিভিন্ন দেশে পাড়ি জমাত। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে (সৌদি আরব, লন্ডন) নোয়াখালীর লোকদের কলোনি দেখা যায়।
প্রকৃতির বিরূপ আচরণ, সম্পদহীনতা, উপায়হীনতা সত্ত্বেও নোয়াখালী থেকে অনেক উদ্যোক্তার আবির্ভাব যেমন— পারটেক্স গ্রুপের আবুল হাসেম, আবুল খায়ের গ্রুপের আবুল খায়ের, বেঙ্গল গ্রুপের মোর্শেদ আলম, মোহাম্মদী গ্রুপের আনিসুল হক, এনসিসি ব্যাংক, ন্যাশনাল লাইফ ইন্স্যুরেন্সের এম হায়দার চৌধুরী, মাল্টিমোড গ্রুপের আব্দুল আওয়াল মিন্টু, ম্যাক্স গ্রুপের ইঞ্জিনিয়ার মোহাম্মদ আলমগীর, ডিবিএল গ্রুপের আব্দুল ওয়াহেদ, আব্দুল জব্বার, আব্দুর রহিম ও আব্দুল কাদের, উইলস গ্রুপের সৈয়দ আল ফারুক, শান্তা গ্রুপের খোন্দকার মনির উদ্দিন, ইফাদ গ্রুপের ইফতেখার আহমেদ টিপু, সজীব গ্রুপের মোহাম্মদ আবুল হাশেম, ইস্ট ল্যান্ড গ্রুপের মাহবুবুর রহমান, মিউচুয়াল গ্রুপের আজিমুদ্দিন আহমেদ, আজিম গ্রুপের ফজলুল আজিম, গ্লোব গ্রুপের মামুনুর রশীদ কিরণ, ইন্ডেক্স গ্রুপের মাযহারুল কাদের, এসএ পরিবহনের সালাহ উদ্দিন আহমেদ, বেঙ্গল শিপিংয়ের মোহাম্মদ আব্দুল আওয়াল, সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকের সভাপতি মেজর (অব.) ডা. মো. রেজাউল হক, সানম্যান গ্রুপের মেজর (অব.) আব্দুল মান্নান, ইন্ট্রামেক্সের এটিএম এনায়েতুল্যা, অনন্ত গ্রুপের হুমায়ুন জহির, আল আমিন গ্রুপের আনোয়ার মির্জা, ইয়ন গ্রুপের মোমিন-উদ দৌলা ইত্যাদি। এত বাধা, অনটন সত্ত্বেও কী করে এত উদ্যোক্তার উদ্ভব? এদের অনেকেই অবশ্য দুর্ভোগ বা দুর্যোগ মোকাবেলা করেননি। তবে পরিবেশ অনেক সময় ডিএনএতে পরিবর্তন (একোয়ার্ড মিউটেশন) আনে (চাঁদপুরসহ বিভিন্ন নদীভাঙা অঞ্চলের মধ্যেও উদ্যোক্তা হওয়ার হার উল্লেখযোগ্য)। সমুদ্র ও প্রকৃতির সঙ্গে যুঝমান পূর্বপুরুষের সেই লড়াকু মনোবৃত্তি কি জিনে প্রবহমান, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে?
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে ১৯২৭ সালে চিত্তরঞ্জন সাহার জন্ম। ১৯৪৩ সালে ম্যাট্রিক, ১৯৪৬ সালে ইন্টারমিডিয়েট ও ১৯৪৮ সালে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। বাবার কাপড়ের ব্যবসায়ী। পারিবারিক ব্যবসায় না গিয়ে প্রকাশনা ব্যবসা শুরু করেন ১৯৫১ সালে। নোয়াখালীর প্রাচীন পাইকারি ব্যবসা কেন্দ্র চৌমুহনীতে বইয়ের দোকান দেন। কয় বছর পর দুর্ঘটনায় সে দোকান পুড়ে যায়। কিন্তু তিনি মনোবল হারাননি। নতুন করে আবার দোকান শুরু করেন। চৌমুহনীতে প্রকাশনা সংস্থা, পুঁথিঘর স্থাপন করেন, যেখান থেকে নোট বই ও ম্যাট্রিকের টেস্ট পেপার প্রকাশ হতো। মান ভালো হওয়ায় তার বইয়ের প্রচুর চাহিদা। তিনি ছাপাখানা স্থাপন করলেন। ব্যবসা বাড়ল। ১৯৫৬ সালে ঢাকায় ব্যবসা স্থানান্তর করেন। প্রথমে পাটুয়াটুলীতে, পরে বাংলাবাজারে। ১৯৬৭ সালে পুঁথিঘর প্রাইভেট লিমিটেড নামে কোম্পানি স্থাপন করে বাড়তি পুঁজি বিনিয়োগ করেন। ১৯৭১ সালে তিনি মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে ভূমিকা রেখেছেন। পাকিস্তান বাহিনী ঢাকার ফরাসগঞ্জে পুঁথিঘরের অফিশ, শোরুম ও গুদামঘর পুড়িয়ে দিল। তিনি আগরতলায় আশ্রয় নিলেন। সেখান থেকে কলকাতা গেলেন। বাংলাদেশী সব লেখককে কলকাতায় জড়ো করে বাংলাদেশে কী ঘটছে, তা প্রকাশের ব্যবস্থা নেন। এ উদ্যোগের ফসল অধ্যাপক আনিসুজ্জামানের সম্পাদনায় ‘রক্তাক্ত বাংলা’ বই। জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী, আনিসুজ্জামান, জহির রায়হান, আহমদ সফা, শওকত ওসমান, সৈয়দ আলী আহ্সান, আব্দুল গাফ্ফার চৌধুরীসহ অনেকে লিখেছেন সেই বইয়ে। এ বই প্রকাশের মাধ্যমে উম্মেষ ঘটে তার সৃজনশীল প্রকাশনা সংস্থা মুক্তধারার। শরণার্থী লেখকদের লেখা দিয়ে তিনি ৩২টি বই প্রকাশ করেন।
আজ বইমেলা আমাদের জাতীয় জীবনের একটা অবিচ্ছেদ্য অংশ। ফেব্রুয়ারি এলে ঘরে ঘরে সাজ সাজ রব পড়ে ‘বইমেলায় যাব’। এ মেলার পরিকল্পনা, উদ্যোগ ও ব্যবস্থাপনা চিত্তরঞ্জন সাহার। কর্তৃপক্ষকে বোঝানো ও বাস্তবায়নে নেতৃত্ব তিনি দেন। ১৯৭২ সালে বায়ান্নর ভাষা শহীদদের স্মরণে, বাংলা একাডেমির আমতলায় শতরঞ্জি বিছিয়ে, নিজের প্রকাশনার বই দিয়ে শুরু করেন সপ্তাহব্যাপী বইমেলা। দুই বছর পর একই জায়গায় আবার মেলা বসান। আরো কিছু প্রকাশনা সংস্থা, যেমন— নওরোজ কিতাবিস্তান, খান ব্রাদার্স, চট্টগ্রামের বইঘর যোগ দেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে বাংলা একাডেমির কোনো ভূমিকা ছিল না। পরবর্তীতে জনগণের মধ্যে বিপুল উত্সাহ লক্ষ করে ১৯৭৮ সালে পুস্তক প্রকাশনা সংস্থার সঙ্গে সম্মিলিতভাবে বাংলা একাডেমি বইমেলা চালু করে।
পুস্তক প্রকাশকদের মধ্যে লেখককে রয়্যালটি না দেয়ার একটা প্রবণতা আছে। অধিকাংশ প্রকাশকই এ অন্যায়ে অভ্যস্ত। চিত্তরঞ্জন সাহা প্রত্যেক লেখকের পাওনা কড়ায়-গণ্ডায় হিসাব করে শোধ করতেন। সাহিত্যাঙ্গনে তার ভূমিকার জন্য ২০০৫ সালে তিনি একুশে পদকে ভূষিত হন।
ফেনীর আলিয়াপুরে ১৯৪৯ সালে আব্দুল আওয়াল মিন্টুর জন্ম। তিনি মেরিন একাডেমি থেকে পাস করে জাহাজে মার্চেন্ট মেরিন হিসেবে যোগ দেন। ১৯৭৩ সালে নিউইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে নৌ-পরিবিহন ব্যবস্থাপনায় স্নাতক ডিগ্রি নেন। ১৯৮১ সালে দেশে ফিরে তিনি ব্যবসা শুরু করেন। বর্তমানে তিনি ব্যাংক, বস্ত্র, তথ্যপ্রযুক্তি, বীজ, সিমেন্ট, ব্যাটারি, নৌ-পরিবহন, বীমাসহ বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার। ব্যক্তিখাতে ব্যাংক ব্যবসা আরম্ভের তিনি অগ্রপথিক। ওয়েস্টার্ন ইউনিয়নের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণ ব্যবসা চালু করেন বাংলাদেশে। বীজ ব্যবসার মাধ্যমে তিনি কৃষিক্ষেত্রে বিরাট পরিবর্তন এনেছেন।
আনিসুল হকের বাড়ি সুধারাম থানায়। বাবা চাকরিজীবী ছিলেন। তৈরি পোশাক শিল্পে চাকরি দিয়ে জীবিকা শুরু আনিসুল হকের। পরে নিজেই ব্যবসায় নামেন। বাবার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা ধার নিয়ে ব্যবসা শুরু। দেখলেন, পাটকলগুলো এক ট্রাক পাট কেনে প্রায় ১৮ হাজার টাকায়; কৃষক থেকে যা মাত্র ৫ হাজার টাকায় কেনা যায়। ১ হাজার টাকা ট্রাক ভাড়া দিয়েও প্রায় ১০-১১ হাজার টাকা লাভ থাকে। পাট সস্তা কোথায় তালাশ করেন। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট থেকে দুই ট্রাক পাট কিনে রওনা হলেন ঢাকার পথে। নিজেও বসলেন ড্রাইভারের সঙ্গে। টাঙ্গাইল আসতে আসতে রাত। নির্জন রাস্তায় ট্রাক থামিয়ে ড্রাইভার মারধর করে ভাগিয়ে দিয়ে ট্রাক নিয়ে পালিয়ে গেল। পুরো সর্বস্বান্ত। তবু থামলেন না। উঠে দাঁড়ালেন। পোশাক খাতের ব্যবসায় সফল হলেন। পরবর্তীতে জ্বালানি, আবাসন, মিডিয়াসহ আরো অনেক ব্যবসায় পদার্পণ। মোহাম্মদী গ্রুপের চেয়ারম্যান, যার অধীনে বহু শিল্পপ্রতিষ্ঠান, যেখানে প্রায় ১২ হাজার কর্মী নিয়োজিত। টেকনো ভিস্টা নামের তথ্যপ্রযুক্তি কোম্পানির চেয়ারম্যান। তিনি বিজিএমইএর সফল সভাপতি। এফবিসিসিআই, সার্ক চেম্বারের সভাপতি ছিলেন। বর্তমানে ঢাকা উত্তরের মেয়র।
চাটখিলের মোহাম্মদ জব্বার আমেরিকায় কম্পিউটার বিজ্ঞানে পড়া শেষ করে ফেরত এলেন দেশে কিছু করার উদ্দেশে। ১৯৯১ সালে দুলাল ব্রাদার্স লিমিটেড (ডিবিএল) যাত্রা সামান্য কিছু পুঁজি দিয়ে। পোশাক শিল্পে বাংলাদেশ তখন ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে। কিন্তু অধিকাংশ কারখানাই শার্ট, প্যান্ট (ওভেন পোশাক) বানাচ্ছে। ডিবিএল ভাবল, ব্যতিক্রমী কিছু করবে। নিটিং তখনো ততটা প্রচলিত নয়। ৩৭টি মেশিন আর শখানেক শ্রমিক দিয়ে ঢাকায় নিটিং কারখানা শুরু করলেন। ঢাকায় দক্ষ নিটিং শ্রমিক নেই। কেউ চলে গেলে নতুন শ্রমিক পাওয়া যায় না। মেশিন অলস থাকে। নারায়ণগঞ্জ থেকে শ্রমিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা নিলেন। নিজেরাও শিখলেন। এক সমস্যা মেটে তো আরেক সমস্যা আসে। আর্থিক সংকট প্রকট হয়ে দেখা দিল। ব্যাংকের কাছে গেলেন ঋণের জন্য। কেউ মুখ তুলে তাকাল না। অবশেষে এক ব্যাংক সম্মত হলো। অর্ধকোটি টাকার সম্পত্তি বন্ধক রেখে ৩ লাখ টাকার ঋণ দিল। ফলে পারিবারিক অন্যান্য ব্যবসা বন্ধ করে দিতে হলো। তদুপরি পরিচালকদের কাছ থেকে অঙ্গীকারনামা নিলেন, তারা ব্যাক টু ব্যাক এলসি চাইবেন না। রিব নিট ফ্যাব্রিক তখন আমদানি হতো। তাতে অনেক সময় লাগত। ডিবিএল বাংলাদেশে রিব ফ্যাব্রিক উৎপাদনের নতুন পন্থা উদ্ভাবন করল। রফতানির জন্য লিড টাইম কমে গেল। বিদেশী ক্রেতার কাছে ডিবিএল দারুণ সমাদর পেল। চার বছর কঠোর সংগ্রামের পর সুদিন এল। তারপর আর ফিরে তাকাতে হয়মি। ২৬ বছরে ডিবিএল আজ দেশ ছাড়িয়ে বিদেশের মাটিতে ব্যবসা সম্প্রসারণ করেছে। পোশাক থেকে ওষুধ, সিরামিক, তথ্যপ্রযুক্তি, ড্রেজিংসহ বিভিন্ন ব্যবসায় পদার্পণ করেছে। বর্তমানে ২৫ হাজারের অধিক কর্মী কাজ করে।
রূপগঞ্জের জামদানি, চাঁপাইয়ের আম, যশোরের ফুল, কুমিল্লার সবজি, ময়মনসিংহের মাছ বিখ্যাত। নোয়াখালীর তেমন কোনো ফসল বা পণ্য জগদ্বিখ্যাত নয়। আছে মানুষ। তাদের নাম আর বদনাম। অনেকে উদ্যমী আবার অনেকে শঠ। প্রতিকূল পরিস্থিতি, অনিশ্চয়তা, দারিদ্র্য, সুযোগের অভাব মানুষকে এসব দোষ বা গুণে গুণান্বিত করেছে, টিকে থাকার জন্য। নোয়াখালীতে তেমন শিল্পপ্রতিষ্ঠান না থাকলেও দেশজুড়ে গড়ে উঠছে বৃহত্তর নোয়াখালীবাসীর প্রতিষ্ঠিত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শিল্প ও কলকারখানা।





