সরকার ব্যবসায় নীতিমালা তৈরি ও নিয়ন্ত্রণ করে, উদ্যোক্তা এগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে উদ্যোগ ও বিনিয়োগের ঝুঁকি নিয়ে দেশজ সমৃদ্ধি অর্জনে সহায়তা করে। অর্থাৎ দেশজ সমৃদ্ধি অর্জনে সরকার ও বেসরকারি খাত উভয়য়েরই সমান দায়িত্ব রয়েছে। তাই নীতিমালাগুলো পরিপূর্ণভাবে ব্যবসায় ও বিনিয়োগ সহায়ক করার ক্ষেত্রে সরকার এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে অর্থবহ আলোচনা, তথ্য ও মতের আদান-প্রদান বিশেষ প্রয়োজন, যাতে নীতিমালাগুলোর সুবিধা বেসরকারি উদ্যোক্তা সঠিকভাবে গ্রহণ করতে পারে। অন্যদিকে বেসরকারি খাতের ইনপুট কতটা যুক্তিযুক্ত, বাস্তবভিত্তিক ও সফল গবেষণাপ্রসূত, তার ওপর বেসরকারি খাতের এসব ইনপুটের ক্ষেত্রে সরকারের আস্থা নির্ভর করে। এর মাধ্যমে পারস্পরিক বিশ্বস্ততা ও সুদৃঢ় বন্ধন তৈরি হয়। বাণিজ্য সংগঠন, পাবলিক-প্রাইভেট ডায়ালগ (পিপিডি) প্লাটফর্মসংশ্লিট, সরকারি ও বেসরকারি স্টেকহোল্ডারদের মতামত সংগ্রহ করার যোগসূত্র, গবেষণা, তথ্যসমৃদ্ধ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারকে বিশেষভাবে সহায়তা করতে পারে, যাতে নীতিমালা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের মধ্য পার্থক্য কমে আসে এবং নীতিমালার সুফল বেসরকারি খাত গ্রহণ করে প্রতিযোগী হতে পারে।
দেশের বিনিয়োগ পরিবেশকে ব্যবসায় সহায়ক করতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্য পরিপূর্ণ সহযোগিতা, মতের আদান-প্রদান বিশেষভাবে দরকার তা বলাই বাহুল্য। হচ্ছেও তাই, বিভিন্ন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশনগুলো সরকারের সঙ্গে দেনদরবারে সারা বছরই ব্যস্ত থাকে। বাজেটে সুপারিশ প্রেরণ অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ। চেম্বারগুলো সবাই তাদের সদস্যদের পক্ষ থেকে ফেডারেশনের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠায়। বাংলাদেশে প্রায় সব ডিভিশন ও জেলাগুলোয় একটি করে চেম্বার রয়েছে। এছাড়া রয়েছে বিভিন্ন খাতভিত্তিক অ্যাসোসিয়েশন, যারা প্রায় সবাই ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজ বা এপেক্স বডির সদস্য। এ রকম প্রায় ৬৫টি চেম্বার ও ৩০০-৪০০ অ্যাসোসিয়েশন এপেক্স চেম্বারের সদস্য। কিছু রয়েছে যারা এপেক্স চেম্বারের সদস্য নয়, কিন্তু তারা খাতের জন্য কাজ করছে। এখন বলা যেতে পারে, এত চেম্বার রয়েছে, সরকারের মতামত গ্রহণে অসুবিধা কোথায়। একবার এক আলোচনায় জেনেছিলাম, শুধু কাস্টমসসংক্রান্ত বাজেট প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে ১৭ হাজার, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের এগুলো যাচাই-বাছাইয়ের সময় আছে কিনা, বা তার জন্য কী রকম সময় দরকার। কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা গেল, বেসরকারি খাতের সুপারিশ অনেকটাই বাস্তবায়ন হলো না, কেন হলো না তাও জানা নেই। এতে আস্থার সংকট দেখা দিতে পারে।
বাংলাদেশ বাণিজ্য সংগঠনের ইতিহাস বেশ পুরনো। পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই এ ধরনের ব্যবসায়ীদের সংগঠন রয়েছে, বিশ্বে ক্রমাগত বেসরকারি খাতের প্রাধান্য, বাণিজ্য ব্যবস্থার উদারীকরণ, সর্বোপরি এমডিজি থেকে এসডিজিতে উত্তরণ বেসরকারি খাতের ওপর সরকারের নির্ভরতা বেড়েছে। বাণিজ্য সংগঠনগুলোর দায়িত্ব ও কর্তব্যও তাই ক্রমান্বয়ে বেড়েছে। বাংলাদেশে প্রথম চেম্বার সম্ভবত মেট্রোপলিটন চেম্বার, যা নারায়ণগঞ্জ চেম্বার হিসেবে পরিচিত ছিল। কারণ তখন পাটের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের একচ্ছত্র অবদান ও নারায়ণগঞ্জ ‘প্রাচ্যের ডান্ডি’ হিসেবে অনেক নাম কুড়িয়েছিল এবং বিশেষভাবে পরিচিত ছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশে কয়েক যুগ ধরে সংগঠন চেম্বার ও অ্যাসোসিয়েশানের প্রভাব ব্যবসায় অঙ্গনে প্রভাব বিস্তার করেছিল। তবে তথ্য, নীতিমালার ওপর গবেষণালব্ধ মতামত, তত্ত্ব-তথ্যের বিশ্লেষণ যাতে সরকার একটি ব্যালান্সড সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করতে পারে, সে ব্যাপারে চলনসই গবেষণা বিশেষভাবে দরকার। চেম্বারগুলোকে মূলত তাদের গতানুগতিক কার্যক্রম, সদস্যদের বিভিন্নমুখী সেবা, সেমিনার, প্রশিক্ষণ, বিদেশে ডেলিগেশন প্রেরণ ও গ্রহণ ইত্যাদি কাজে ব্যস্ত সময় দিতে হয়। এ কারণে প্রকৃত গবেষণার জন্য ও সরকারের সঙ্গে একটি নিউট্রাল মিডিয়েটর হিসেবে অ্যাডভোকেসি করার ক্ষেত্রে একটি পৃথক প্রতিষ্ঠানের দরকার হয়ে পড়ে।
পৃথিবীর বেসরকারি সংগঠনের ধারণা পেতে হলে দেখা যায়, প্রথম চেম্বার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১৫৯৯ সালে ফ্রান্সের মারসেলিতে, প্রায় ৬৫ বছর পর দ্বিতীয় চেম্বারটি প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল তদানীন্তন নেদারল্যান্ডসের স্প্যানিশ অংশে। তার মানে দেখা যাচ্ছে, আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও চেম্বার প্রতিষ্ঠার ইতিহাস বেশ পুরনো। সদস্যসংখ্যার দিক থেকে তা কয়েক ডজন থেকে শুরু করে কয়েক লাখ পর্যন্ত হতে পারে। যেমন ইউএস চেম্বারের সদস্য তিন মিলিয়নেরও বেশি, আবার সলোমন চেম্বারের সদস্যসংখা ২০০-এর মতো, কোনো কোনো দেশে এ সংখ্যা এর চেয়ে অনেক কমও রয়েছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চেম্বারগুলো নন-প্রফিট প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে। কোনো কোনো দেশে দুটোই, অর্থাৎ কিছুটা প্রফিট কিছুটা নন-প্রফিটও হতে দেখা যায়। কোনো কোনো দেশে চেম্বারগুলো স্থানীয় সরকার থেকে অর্থায়নও পেয়ে থাকে। চেম্বারের নেতাদের কাজকর্ম মূলত স্বেচ্ছামূলক। অবশ্য কোনো কোনো দেশে তা আইন দ্বারাও সমর্থিত হয়ে থাকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে চেম্বারগুলো উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি সাধারণ জনগণের জন্য সেবামূলক কাজও করে। কিছু চেম্বার স্টেট লেভেলে রয়েছে, কিছু আবার জাতীয় পর্যায়ে, যেমন ইউএস চেম্বার, ব্রিটিশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি ইত্যাদি। এসব চেম্বারের আন্তর্জাতিক চেম্বারের সঙ্গে সদস্যপদ স্বেচ্ছামূলক, ইন্টারন্যাশনাল চেম্বারের বর্তমানে ১৩ হাজারেরও বেশি রেজিস্টার্ড সদস্য রয়েছে। বাংলাদেশেও আইসিসিবি কাজ করছে অনেক দিন থেকে। কিছু যৌথ চেম্বারও রয়েছে যেমন চায়না-বাংলাদেশ, থাই-বাংলাদেশ চেম্বার ইত্যাদি।
আইনি দিক থেকে চেম্বার পরিচালনার ক্ষেত্রে নানা রকম পার্থক্য রয়েছে। কিছু চেম্বারের সদস্যপদ বাধ্যতামূলক, যারা পাবলিক ল’র আওতায় পরিচালিত, যেখানে উদ্যোগের প্রকারভেদে আকার ও খাত ভিত্তিতে তাদের চেম্বারের সদস্যপদ বাধ্যতামূলক হয়ে থাকে। ইইউর দেশগুলো যেমন ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি, স্পেন, অস্ট্রিয়া ও জাপানেও এ ধরনের চেম্বার রয়েছে। এছাড়া রয়েছে কন্টিনেন্টাল বা প্রাইভেট চেম্বার। এ দেশগুলোর মধ্য রয়েছে ইউএস, কানাডা, ইউকে, যেখানে কোম্পানির জন্য সদস্য হওয়া বাধ্যতামূলক নয়, তবে উদ্যোক্তা কোম্পানিগুলো সাধারণত নিজেদের প্রয়োজনেই সদস্যপদ নিয়ে থাকে।
এ ধরনের একটি বৈশ্বিক ধারণার পর বাংলাদেশের অবস্থান জানার বিষয়টির ওপর গুরুত্ব ও আগ্রহ থাকাটাই স্বাভাবিক। বাংলদেশেও চেম্বারের ভূমিকা অপরিসীম, কিছু প্রধান চেম্বারের প্রসঙ্গ এখানে না টানলেই নয়। ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি এর মধ্য অন্যতম।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (ডিসিসিআই), ১৯৫৮ সালে কোম্পানি আইন অনুযায়ী অন্তর্ভুক্ত হয়, যা বাংলাদেশের সবচেয়ে অন্যতম সক্রিয় চেম্বার। এটি পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের মধ্যে বেসরকারি খাতের ব্যবসায় ও শিল্পোন্নয়নের জন্য সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। তবে এর যাত্রা হয়েছিল অনেক আগেই পুরান ঢাকার একটি বাড়িতে। তারপর ধীরে ধীরে এ চেম্বারের ব্যাপ্তি, সদস্যসংখ্যা, সেবার পরিধি ক্রমানয়ে বেড়েছে এবং বাড়ছে। ডিসিসিআই ৩৮টিরও বেশিসংখ্যক ক্ষুদ্র, মাঝারি ও বৃহৎ উদ্যোক্তাদের প্রতিনিধিত্ব করে, যারা দেশের সম্পদ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য অবদান রাখছে।
তেমনি বন্দরনগরী চট্টগ্রামে ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত চিটাগং চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (সিসিসিআই) একটি অগ্রণী চেম্বার। অন্যান্য চেম্বারের মতো এটি ব্যবসায়, বাণিজ্য, শিল্প, কৃষি, উৎপাদন ইত্যাদিতে নিয়োজিত সংস্থা, কোম্পানি ও করপোরেট সংস্থাগুলো নিয়ে গঠিত। সিসিসিআই দেশের প্রধান বৃহত্তর শিল্পভিত্তিক ও সর্বোচ্চ ব্যবসায়িক এবং দেশটির প্রধান মেরিটাইম বন্দর শহরসহ রাজধানীর বাণিজ্যিক কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত। সিসিসিআইয়ের মৌলিক উদ্দেশ্য হলো সাধারণভাবে বাংলাদেশের বাণিজ্য ও শিল্পকে উন্নীত ও রক্ষা করা। এছাড়া সহায়তা, তথ্য ও উপদেশ প্রদানের মাধ্যমে সরকার ও অন্যান্য কর্তৃপক্ষকে এ কার্যক্রমগুলো সম্পাদন করতে সক্ষম করে তোলা।
আগেই বলেছি, ১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠিত মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি, ঢাকা (এমসিসিআই) হলো প্রাচীনতম ও বাংলাদেশের প্রাক্তন বাণিজ্য সংগঠন। এর সদস্যরা দেশের সার্বিক বাণিজ্যিক ও বৃহৎ শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে পাবলিক সেক্টর করপোরেশন এবং স্থানীয় ও বহুজাতিক সংস্থা। বর্তমানে মেট্রোপলিটন চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সদস্যরা উৎপাদন ও পরিষেবা খাতের প্রায় সব প্রধান উদ্যোগের মধ্যে রয়েছেন। এছাড়া চেম্বারের নীতিগত সুপারিশ এবং চলমান সংস্কার সম্পর্কিত তথ্যাদি সরকার ও নীতিনির্ধারকদের মধ্যে ব্যাপক স্বীকৃতি লাভ করেছে। পাশাপাশি চেম্বারটি বাংলাদেশ সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় কর্তৃক গঠিত কমিটির বিভিন্ন উপদেষ্টা পরিষদকে প্রতিনিধিত্ব করে। দেখা যায়, এ তিনটি বাণিজ্য সংগঠন তাদের নিজস্ব আদর্শ ও কমিটমেন্টের ভিত্তিতে বেসরকারি খাতকে সেবা দিয়ে যাচ্ছে।
পিপিডি প্লাটফর্মের উদাহরণ রয়েছে অনেক। যেমন ভিয়েতনামে ১৯৯৮ সালে স্থাপিত হয়েছে ‘ভিয়েতনাম বিজনেস ফোরাম’ সফলতার সঙ্গে পরিচালিত হচ্ছে। কেম্বোডিয়া ২০০২ সাল থেকে পরিচালনা করছে ‘প্রাইভেট সেক্টর ফোরাম’, যা বেসরকারি খাতকে অনেক সুবিধা দিচ্ছে। তুরস্কে ২০০১ সালে স্থাপিত হয়েছে ‘কো-অর্ডিনেশন কাউন্সিল ফর ইনভেস্টমেন্ট ক্লাইমেট’, বুলগেরিয়া ১৯৯৭ সালে ‘কোয়ালিশন ২০০০’ স্থাপন করে, ক্যামেরুন পরিচালনা করছে ‘কম্পিটেটিভ কমিটি’ । এ ধরনের আরো অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে পৃথিবীব্যাপী, যারা ব্যবসার খরচ কমিয়ে বেসরকারি খাতকে প্রতিযোগী করতে সহায়তা করছে।
বেসরকারি সংগঠনের ইতিহাস বেশ পুরনো হলেও গঠনমূলক পাবলিক-প্রাইভেট ডায়ালগ পরিচালনা, প্রতিটি সংস্কার কার্যক্রমের অনুসরণ এবং নীতিমালা পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণধর্মী গবেষণার বিশেষ দরকার। পিপিডি প্লাটফর্মগুলোর মাধ্যমে দেশগুলো একটি কাঠামোর মাধ্যমে সরকারি খাতের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা এবং একটি বিধিবদ্ধ আলোচনার পরিবেশ তৈরি করেছে।
যুগের পরিক্রমায় এবং প্রয়োজনের তাগিদে গবেষণাকে ব্যবসায় উন্নয়নে অপরিহার্য মনে করে তিনটি লিডিংবিশিষ্ট চেম্বারের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশে এই প্রথম পিপিডি প্লাটফর্ম ও বেসরকারি খাতের অন্যতম থিংকট্যাংক বিজনেস ইনিশিয়েটিভ লিডিং ডেভেলপমেন্ট বা বিল্ড যাত্রা করে অক্টোবর ২০১১ সালে।
একটি বিশেষ কারণ বড় হয়ে দেখা দেয়, তা হলো বেসরকারি খাতের সমন্বিত মতামত, যা সরকারকে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সহায়তা করে। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে পিপিডি প্লাটফর্মগুলো অনেক কঠিন সমস্যার সমাধান দিয়েছে। ব্যবসার ধরন পরিবর্তন হওয়ায় এবং পরিবর্তিত বাণিজ্য ধারার কারণে বিভিন্ন ধরনের নতুন নতুন নীতিমালার প্রয়োজন বিশেষ জরুরি হয়ে দেখা দেয়। কোন আইনটি কোন জায়গায় জরুরিভাবে পরিবর্তন দরকার, তা নির্ধারণের জন্য সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্য সুসংগঠিত সংলাপ বিশেষ প্রয়োজন। সংলাপগুলো থেকে ভালো, বাস্তবভিত্তিক তথ্য বের করে আনা ও গবেষণা দ্বারা সমর্থিত হওয়া দরকার এবং সে কারণেই এমন একটি পৃথক প্রতিষ্ঠান দরকার যে, পৃথিবীর অন্যান্য প্রান্তের উদাহরণগুলো এবং দেশের সামগ্রিক অবস্থান বিবেচনায় এমন একটি সুসংগঠিত প্রস্তাব প্রণয়ন ও উপস্থাপন করবে, যা ব্যবসায়, বাণিজ্য, বিনিয়োগের পরিবেশকে উন্নত করবে এবং সঠিক দিকে নিয়ে যাবে।
ডায়ালগ হলো সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যে পার্টনারশিপ প্রতিষ্ঠার প্রথম ধাপ, যা উন্নয়নের বিভিন্ন ধাপে পৌঁছার প্রথম চাবিকাঠি বা সিঁড়ি। এটা উন্নয়নের ধারাকে টেকসই করতেও সহায়ক। এটি একই দিকে বেসরকারি খাত থেকে সরকারের সঙ্গে অ্যাডভোকেসির গুণ-মান বৃদ্ধি করে, তেমনি একই সঙ্গে সরকারি ও করপোরেট গভর্ন্যান্স বৃদ্ধিতে অবদান রাখতে পারে।
পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে এ ধরনের পিপিডি প্লাটফর্ম নানা ধরনের জটিল সমস্যা নিরসনে কাজ করে যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এগুলো সম্পূর্ণ বেসরকারি খাত দ্বারা পরিচালিত, কোথাও বা দাতাপ্রতিষ্ঠানের দ্বারা সমর্থিত, ক্ষেত্রবিশেষে সরকার নিজেই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতাক্রমে এগুলো পরিচালনা করছে। যেমন নেপাল এ বিষয়ে অগ্রণী, যেখানে মন্ত্রণালয়ের মধ্যেই এ ধরনের প্রতিষ্ঠান, যা নেপাল বিজনেস ফোরাম নামে কার্যক্রম চালাচ্ছে। বেশকিছু আফ্রিকান দেশও এগিয়ে রয়েছে, এ ধরনের পিপিডি প্লাটফর্ম থেকে নানা ধরনের সমস্যা নিরসন করেছে; কেনিয়ার উদাহরণ দেয়া যেতে পারে, যেখানে তারা পাবলিক সাস্থ্যসেবা প্রদানে নানা রকমের সংস্কার নিয়ে আসতে সক্ষম হয়েছে। তারা একটি একক ইন্সপেকশন ব্যবস্থা প্রবর্তন করেছে, যা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে সরকারি ও বেসরকারি পদ্ধতির সমন্বয় করে সাধারণের সেবা গ্রহণের বিষয়টির জটিলতাকে সহজ করেছে। এতে সেবার মান ও অ্যাকাউন্টেবিলিটি বেড়েছে।
লাইবেরিয়া বেটার বিজনেস ফোরাম (এলবিবিএফ) এ ধরনের আরেকটি প্রতিষ্ঠান ২০০৭ সালে যাত্রা করে। তারা উদ্যোক্তাদের জন্য কর, বিনিয়োগ ও বাণিজ্য নীতিমালায় সংস্কার নিয়ে আসে এবং ব্যাপক পরিবর্তন নিয়ে আসে। এসব সংস্কারের ফলে খরচা বেচেছে প্রায় ৪ দশমিক ৭ মিলিয়ন ডলার, প্রায় ২০ শতাংশ ব্যবসায় রেজিস্ট্রেশন বেড়েছে। এছাড়া প্রায় ২০ হাজার ৪০০ নতুন কর্মসংস্থান এবং প্রায় ১৩ মিলিয়ন টাকা বেসরকারি বিনিয়োগ বেড়েছে। এসব উদাহরণ বেসরকারি খাতকে বিশেষভাবে উদ্বুদ্ধ করছে।
আলবেনিয়ার ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিল আরেকটি অন্যতম উদাহরণ, যা ২০০৬ থেকে কার্যক্রম পরিচালনা করছে এবং তাদের রিপাবলিক অব আলবেনিয়া পার্লামেন্ট একটি আইন দ্বারা এ পিপিডি প্লাটফর্মকে যুক্তিযুক্ত করেছে এবং প্রধানমন্ত্রীসহ বিভিন্ন বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সহায়তাকারী মন্ত্রণালয়, আলবেনিয়ার সেন্ট্রাল ব্যাংক, সর্ববৃহৎ করদাতা, ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও ডায়ালগ পরিচালনার জন্য প্রয়োজন, এমন সবাই মিলে ‘ন্যাশনাল ইকোনমিক কাউন্সিল’ পরিচালনা করছে, যাতে যেকোনো আইন প্রণয়নের আগে সংশ্লিষ্ট সবার মতামত নেয়া যায়, আইনের ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট করা যায়, সর্বোপরি সব ধরনের অসঙ্গতি নিরসন করা যায়। কোনো কোনো দেশ আবার বুল্ডজার পদ্ধতিতে দীর্ঘদিনের পুরনো আইনকে বাদ দিয়ে নতুন করে শুরু করেছে।
সম্প্রতি বিল্ড ও আইএফসি পরিচালিত একটি রেগুলেটরি আনপ্রেডিক্টেবিলিটি সার্ভেতে দেখা যায়, প্রায় সব উত্তরদাতা মনে করে যে, প্রায়ই দেখা যায়, রুলস রেগুলেশন ইম্প্যাক্ট অ্যাসেসমেন্ট, অগ্রিম কনসালটেশন, নোটিস ছাড়াই গৃহীত হয়। বেশির ভাগ উত্তরদাতা মনে করেছে, এতে তাদের ব্যবসার খরচ বেড়েছে। এছাড়া বিভিন্ন লিডিং ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান, চেম্বার মনে করে, তাদের কাছে মতামত চাওয়া হলেও তা তেমনভাবে আমলে নেয়া হয় না এবং তার জন্য গৃহীত না হলে কোনো যুক্তিযুক্ত কারণ তুলে ধরা হয় না। এছাড়া বিভিন্ন রেগুলেটরি অসঙ্গতি রয়েছে, বিশেষ করে কাস্টমসবিষয়ক ইস্যুতে এটি বিশেষভাবে প্রযোজ্য।
এরই মধ্য বাংলাদেশ অন্যতম পিপিডি প্লাটফর্মে বেশকিছু সফলতা অর্জন করেছে এবং এক্ষেত্রে প্রধান মন্ত্রীর কার্যালয়ে স্থাপিত পিসডিপিসিসি ব্যাপক ভূমিকা রাখছে। এটি একটি হাই প্রফাইল কমিটি, যেখানে ১৩ জন সচিব ও সংশ্লিষ্ট বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা বিভিন্ন নীতিমালা সংস্কারের ব্যাপারে খোলামেলা আলোচনা করে তাত্ক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতে এবং তা বাস্তবায়ন করতে পারছেন। এ প্রতিষ্ঠানের উত্তরোত্তর সমৃদ্ধির লক্ষ্যে সরকার ও বেসরকারি খাতের সহযোগিতা আরো জোরদার করা দরকার। তবে এটি সত্য যে, যে বিষয়টি লক্ষ্য, তা অর্জনে ডায়ালগের সঠিক ডিজাইন, নিরপেক্ষ স্টেকহোল্ডার, পলিসিপ্রণেতা নির্বাচন ও পলিসি ডায়ালগের লাইফ সাইকেলের ধারাবাহিকতা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, গবেষণা ও নিয়মিত সভা বিশেষভাবে দরকার, যাতে আলোচনার পরিবেশ সব মহলের মধ্যে আস্থার সম্পর্কটি মজবুত ও টেকসই হয়।
লেখক: সিইও, বিল্ড





