শাড়ি বাংলার রীতি ঐতিহ্যের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। ধারণা করা হয়, খ্রিস্টের জন্মের আগে থেকেই ভারতীয় উপমহাদেশে নারীদের অঙ্গভূষণ ছিল শাড়ি। অধিকাংশ পণ্ডিতের মতে, প্রাকৃত শব্দ ‘সাট্টিকা’ থেকে শাড়ি শব্দের উদ্ভব। প্রাচীন বৌদ্ধ সাহিত্যেও ‘সাট্টিকা’ শব্দ পাওয়া যায়। প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে আর প্রাচীন বাংলার ইতিহাসে যে সেলাইবিহীন দীর্ঘ সূক্ষ্ম বস্ত্রের উল্লেখ পাওয়া যায়, তা শাড়ি বলেই ধারণা জন্মায়। রামায়ণ-মহাভারতে তো শাড়ির আকছার ব্যবহার স্পষ্ট।
তবে এ কথা অনস্বীকার্য যে, এখনকার শাড়ি যে রূপে দেখা যায়, তা একদিনে বা প্রথম থেকেই গড়ে ওঠেনি। কালে কালে যোগ-বিয়োগ হয়েছে এতে অনেক কিছুই। বিশেষ করে আমাদের শাড়ির ইতিহাস যেমন প্রাচীন, তেমনি এটি আমাদের লোকশিল্পের অংশ বলেই এর রকম, ধরন আর বয়নে বিবর্তন এসেছে বারবার।
অবনীন্দ্রনাথের একটা চমত্কার কথা আছে, কায়া অতিক্রম করেছে মায়া দিয়ে আপনার বাঁধা রূপ। এ কথাটি আমাদের লোকশিল্পীদের জন্য বড্ড বেশি খাটে যেন। শিশুর আঁকা নকশা অভিজ্ঞদের চোখে যেমনই ঠেকুক, তা কিন্তু শিশুর মনে বাস্তব দৃশ্যটির প্রভাব বিস্তারকারী রূপ। কাজেই সে নকশাকে অবাস্তব বলে উড়িয়ে দেয়ার জো নেই। একজন শিল্পীও যেকোনো কিছুর বাস্তব কায়াকে নিজের মায়ায় ভিন্নরূপে দেখেন এবং রূপ দেন। যেমন শিল্পী সুলতানের আঁকা কৃষকের পেশিবহুল কায়া শিল্পীর মায়ায় সৃষ্টি। সাধারণের চোখে তা প্রায় অবাস্তব। আমাদের লোকশিল্পেও আমরা এ রকম অনেক নকশা পাই, যেগুলো শিল্পীর মায়ায় সৃষ্টি। এ লোকশিল্পে শাড়ি একটি বিশেষ শাখা।
আজকাল বাজারে যত নামের শাড়ি পাওয়া যায়, তা আসলে শাড়িগুলোর ‘ব্র্যান্ড নেম’ মাত্র। আমরা জামদানি, বেনারসি, কাতান ইত্যাদি নামেই ডাকি বা চিনি। অথচ আমাদের লোকসাহিত্যে পাওয়া হরেক শাড়ির বাহারি নাম প্রমাণ দেয় যে, আমাদের শাড়ি আমাদের প্রাচীন তাঁতশিল্পীদের মায়ায় তৈরি হতো। কবি জসীমউদ্দীন তার ‘পূর্ববঙ্গের নক্সীকাঁথা ও শাড়ী’ প্রবন্ধে তার সংগৃহীত কিছু শাড়ির নাম তুলে ধরেছেন— কালপিন, বাঙ্গনীগরদ, জলেভাসা, একপাছুন্না, কাচপাইড়, জামদানি, জামের শাড়ি, রাসমণ্ডল, সোনাঝুরি, কুসুমফুল, বাঁশিপাইড়, লক্ষ্মীবিলাস, কৃষ্ণনীলাম্বরী, মধুমালা, কুনারি, কলমিতলা... আরো কত মন দোলানো নামের শাড়ি ! একেক শাড়ির একেক রূপ।
এ কথা সত্য যে, প্রাচীন ইতিহাস বলে, বিশ্বজয়ী ঢাকার শাড়ি বলতে সর্বাগ্রে আসে মসলিনের নাম। কিন্তু মসলিনের খ্যাতি তার সূক্ষ্মতার মাঝে, মিহি বুনটের মাঝে। আর এই যে নকশাদার বস্ত্র, মসলিনের ওপর এই জ্যামিতিক বুটিদার কারুকাজ— সাধারণভাবে একে আমরা জামদানি বলি, যা আজ আমাদের সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ।
মূলত মসলিনের একটি ধরন হলো জামদানি। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে এটি শাড়িকে বোঝালেও প্রকৃতপক্ষে ঐতিহ্যবাহী নকশাসমৃদ্ধ ওড়না, কোর্তা, পাগড়ি, রুমাল, পর্দা সবই জামদানির আওতায় পড়ে। যদিও বর্তমানে জামদানি নানা স্থানে তৈরি করা হয়, কিন্তু ঢাকাই এর আদি জন্মস্থান বলে গণ্য করা হয়। জামদানির নামকরণ নিয়েও বিভিন্ন মতবাদ প্রচলিত আছে। এক মত অনুযায়ী, ফার্সি ‘জামা’ ও ‘দানা’ শব্দের মিলনে এসেছে জামদানি শব্দটি। ‘জামা’ অর্থ কাপড় আর ‘দানা’ অর্থ বুটি। কাজেই জামদানি অর্থ হলো বুটিদার কাপড়। আরেক মত বলছে, ফার্সিতে ‘জাম’ অর্থ এক ধরনের উত্কৃষ্ট মদ আর ‘দানি’ মানে পেয়ালা। সে অর্থে সুরা পরিবেশনকারী সাকির পরনের পোশাক থেকে এসেছে জামদানি শব্দটি। শব্দের উৎস যা-ই হোক, এ দুই সূত্রের মতে মুসলমানরাই এ উপমহাদেশে জামদানির প্রচলন ঘটায়। অন্যদিকে কৌটীল্য ‘অর্থশাস্ত্র’, প্লিনির রচনা, চর্যাপদসহ বিভিন্ন প্রাচীন বই দলিল বাংলার এ শিল্পের আরো প্রাচীনতার সাক্ষ্য বহন করছে। চতুর্দশ শতাব্দীতে বিখ্যাত পর্যটক ইবনে বতুতা বাংলাদেশ পরিভ্রমণ করেন এবং সোনারগাঁও এলাকার সুতি বস্ত্রের প্রশংসা করেন। ঐতিহাসিক আবুল ফজলও ঢাকার মসলিনের প্রশংসা করেছেন। ঢাকাই মসলিনের স্বর্ণযুগ ছিল মোগল আমল। আঠারো শতকের দলিল থেকে জানা যায়, ‘মলমল খাস’ ও ‘সরকার-ই-আলী’ নামের মসলিন সংগ্রহের জন্য ‘দারোগা-ই-মলমল’ নামে উচ্চপদবির রাজকর্মচারী নিযুক্ত ছিল। এদের প্রধান কাজ ছিল মসলিন ও জামদানি তৈরির বিভিন্ন পদক্ষেপ লক্ষ রাখা। সে সময় ঢাকা থেকে প্রায় এক লাখ টাকা মূল্যের মলমল খাস মোগল দরবারে রফতানি হয়। ১৭৪৭ সালের হিসাব অনুযায়ী দিল্লির বাদশাহ, বাংলার নবাব আর জগত শেঠের জন্য প্রায় সাড়ে ৫ লাখ টাকার জামদানি কেনা হয়। এ রকম বিভিন্ন সূত্র, শ্লোক, দলিল থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ঢাকাই মসলিন তথা জামদানি ছিল সুবিখ্যাত। গবেষক ফোরবস ওয়াটসন তার ‘টেক্সটাইল ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড কস্টিউমস অব দ্য পিপল অব ইন্ডিয়া’ নামের গবেষণা বইংে দেখিয়েছেন যে, জটিল ছাপচিত্রের কারণেই নকশাদার মসলিন তথা জামদানি ঢাকার বস্ত্রপণ্যের মধ্যে সবচেয়ে দামি ছিল।
জামদানির এ বিশেষ অলঙ্কৃত বয়ন কৌশল এখনো ধরে রেখেছেন ঢাকার অদূরে নারায়ণগঞ্জ জেলার, আরো বিশেষভাবে বলতে গেলে ডেমরা ও রূপগঞ্জের ঐতিহ্যবাহী তাঁতশিল্পীরা। এদের অন্যত্র নিয়ে এ শিল্পকে ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু সুফল আসেনি। কারণ শীতলক্ষ্যার পানি থেকে উত্থিত বাষ্প সুতা প্রস্তুতি ও কাপড় বোনার অনুকূল। এর দ্বারা এটিই প্রতীয়মান হয় যে, পরিবেশ আর প্রকৃতির প্রভাব অন্যতম প্রধান শর্ত এ শিল্পের জন্য। এটি সুবিদিত যে, কাপড়ে নকশা তোলার জন্য আধুনিক আবিষ্কার জালা, জ্যাকার্ড বা ডবি বয়নশিল্পকে আরো সহজ করে দিয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, জামদানির নকশা তৈরিতে এসব পদ্ধতির ভূমিকা নেই, বরং আদি পিটলুম বা গর্ততাঁতে কাপড় বোনার সময়ই বয়নশিল্পীরা এর নকশাগুলো ফুটিয়ে তোলেন। আর এ নিপুণতার পেছনে তাদের নেই কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা তাত্ত্বিক শিক্ষা, বরং পুরোটাই প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে বয়ে চলা শ্রুতি ও স্মৃতিনির্ভর এক আশ্চর্য অনুশীলন! আর এ স্বাতন্ত্র্যই এদের তাঁতি থেকে বয়নশিল্পীতে পরিণত করেছে। আর এ অতুলনীয় বয়ন পদ্ধতির কারণেই জামদানি ইউনেস্কো কর্তৃক ‘ইনট্যাঞ্জিবল কালচারাল হেরিটেজ’-এর স্বীকৃতি পেয়েছে।
মূলত বাঁশ আর সামান্য কাঠের দণ্ডের সাহায্যে গড়ে ওঠা এক ছোট্ট তাঁতেই রচিত হয় এ অপূর্ব সৃষ্টি। দুজন কারিগর বসে এ কাজ করেন, যাদের মধ্যে সাধারণত একজন হন অভিজ্ঞ বা ওস্তাদ আর অন্যজন সাগরেদ, যিনি তাকে সহযোগিতার মাধ্যমে ভবিষ্যতের জন্য হাতে-কলমে তৈরি হচ্ছেন। দুটো সুচের মতো বাঁশের কাঠিতে নকশার সুতা জড়ানো থাকে। সুচ দুটি দিয়ে অভ্যস্ত হাতের মাপের টানায় সুতার মধ্যে নির্দিষ্ট স্থানে রঙিন সুতা চালিয়ে দেয়া হয়। এরপর পাশের সুতার মাকু একজন তাঁতি পাশ থেকে অন্যজনের কাছে দিলে তা সেদিক থেকে বের করে দেয়া হয়। এভাবে ধীরে ধীরে তৈরি হয় জামদানি আর নকশা।
অতীতে তাঁতি নিজেই ছিলেন বয়নশিল্পী আর নকশাবিদ। রঙ, প্যাটার্ন, সুতার ধরন সবই হয়েছে তার একক সিদ্ধান্তে। তাদের মনের মাধুরী আর শিল্পিত মানসে গড়ে ওঠা পুরনো জামদানিগুলো এখনো বিস্ময় আর গর্বের উদ্রেক করে। এখন বাজার আর ক্রেতার ধরন পাল্টেছে, পরিবর্তন এসেছে রুচিতেও। তাই হাল আমলের ফ্যাশনকেও বিবেচনায় নিয়ে কাজ করতে হয়, যাতে প্রভাব ও সিদ্ধান্ত থাকে পৃষ্ঠপোষকের, ক্রেতার। আর তাই বর্তমানে জামদানির পুরো নির্মাণকাজে বয়নশিল্পী বা তাঁতি ছাড়াও আরো দুটি দল কাজ করে— উপকরণের সঠিক প্রস্তুতি ও কাপড় বোনার সব প্রয়োজন গুছিয়ে দেয়ার জন্য একটি দক্ষ দল বা টিম থাকে, আবার তৈরি কাপড় বাজারজাতের জন্য থাকে আরেক দল। কখনো আবার একই দল এ ভাগ দুটোর দায়িত্ব পালন করে। তবে সবচেয়ে বড় কাজ ওই নকশা, যা জামদানির প্রাণ। এ নকশাগুলো আগে কোথাও খসড়া করা থাকে না বা এঁকে রাখাও হয় না। পুরোটাই থাকে তাঁতির মনে, মাথায় আর আঙুলের ডগায়। এ নকশার কিছু নামও আছে। যেমন— শাড়ির পাড়ে ময়ূর প্যাঁচ, কলমিলতা, কাটিহার, কলকা পাড়, কাঠ পাড়, পুইলতা ইত্যাদি; আবার জমিনে গোলাপ ফুল, জুই ফুল, পদ্ম ফুল, কলার ফানা, সাবু দানা ইত্যাদি। ছোট ছোট বিভিন্ন ফুলের কুঁড়ি তোলা জামদানি বুটিদার নামে পরিচিত। ছোট ছোট ফুল, ময়ূর বা লতাপাতার ডিজাইনগুলো যদি বাঁকা বা তেরছাভাবে সারিবদ্ধ থাকে, তবে তার নাম তেরছা জামদানি, আর এ ডিজাইন যদি হয় জালের মতো সমস্ত জমিনে, তবে তার নাম জালার নকশা। সারা জমিনে সারিবদ্ধ ফুলকাটা জামদানি হলো ফুলওয়ার আর ডোরাকাটা হলে ডুরিয়া। নাম বা নকশা যা-ই হোক, এগুলো ফুটিয়ে তোলার নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি নেই, শুধু আছে কিছু নির্দিষ্ট বুলি। যেমন— হইরে বাড়ে / গ্যাডে বাড়ে / গ্যাডের খেও বাধে গ্যাডে / গ্যাডের খেও বোধে প্যাচে / প্যাডে বাড়ে... ইত্যাদি। এগুলোতেই আছে কোথাও নকশার পদ্ধতি।
সুতা কাটার ওপর নির্ভর করে জামদানি মসলিনের সূক্ষ্মতা। সুতা কাটার উপযুক্ত পরিবেশ ভোরবেলা, যখন বাতাসের আর্দ্রতা বেশি থাকে। তাঁতিরা টাকু, বাঁশের ঝুড়ি, শঙ্খ ও পাথরের বাটি ব্যবহার করতেন। জামদানি তৈরির আগে তাঁতিরা সুতায় মাড় ও রঙ করে নিতেন। মাড় হিসেবে ব্যবহার হতো খই, ভাত বা বার্লি আর রঙ হিসেবে বনজ লতাপাতা ফুলের রঙ। বর্তমানে আধুনিক জিনিসপত্র আর কৃত্রিম রঙও ব্যবহার করা হয়। জামদানির প্রথম দিকে ধূসর জমিনে জাম নকশা করা হতো। পরে অন্য রঙের জমিনে নকশা তোলা হয়। ষাটের দশকে জমিনে লাল সুতার নকশা বেশ জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
জামদানির একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো, জমিনের সুতার ঘনত্ব ও সূক্ষ্মতার চেয়ে নকশায় ব্যবহূত সুতার আনুপাতিকভাবে ঘনত্ব বেশি আর সূক্ষ্মতা কম। আবার কাপড়ের মানের ওপর নির্ভর করে নকশার সুতা জমিনের সুতার চেয়ে চার গুণ বেশিও হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে শাড়ির জমিনে অলঙ্করণের মোটিফগুলো খুবই জোরালো আর অলঙ্করণে ব্যবহূত সুতার উপস্থিতি খুবই স্পষ্ট হয়ে থাকে। এসব নকশা আর মোটিফের উপস্থিতি আর বৈশিষ্ট্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা জামদানিকে ভৌগোলিক বিশেষত্বে চিহ্নিত করে দেয়া হয়। বেনারসি, টাঙ্গাইল, রাজশাহীর গরদ, পাবনার শাড়ি, সাউথ কটন, মুর্শিদাবাদী সিল্ক ইত্যাদি স্থানের নামে আর গাদোয়াল, জামদানি, চুন্দ্রি, মহেশ্বরী ইত্যাদি বয়নশিল্পীদের দেয়া নামেই প্রচলিত। অতীতে জামদানি তৈরিতে একটা বিষয় খুব গুরুত্ব পেত, তা হলো জমিনের স্বচ্ছতা আর নকশা বা অলঙ্করণের ঘনত্ব। সে সময়ের মসলিন জামদানি কাপড়ের নিচে যদি হাতের তালু প্রসারিত করে রাখা হয়, দেখা যাবে, নকশার নিচের অংশটুকু ছাড়া বাকি জমিনের অংশের নিচের হাতের তালু প্রায় দৃশ্যমান।
জামদানি তৈরিতে সুতা একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। অতীতে কার্পাস তুলা থেকে হাতে কাটা সুতা ব্যবহার করা হতো। ১৮-১৯ শতকে উচ্চমানসম্পন্ন তুলা থেকে হাতে কাটা সুতার প্রচলন ঘটে। বর্তমানে মিলের সুতার সহজলভ্যতার কারণে হাতে কাটা সুতার প্রচলন নেই বলা যায়। আগে যেখানে ভালো জামদানি তৈরির জন্য ২০০-২৫০ কাউন্টের সুতা ব্যবহার হতো, সেখানে এখন তাঁতিরা বাজার থেকে নির্ধারিত কাউন্টের সুতা কিনে ব্যবহার করেন। জামদানি বয়নকালে প্রথমে বয়ন করা হতো আঁচল, যা চওড়ায় ছিল ৬ থেকে ১২ ইঞ্চি, তারপর জমিনের বিস্তৃত অংশ। শেষে বোনা হতো ভেতরের দিক। বর্তমানে প্রথমে বোনা হয় গুড়ি বা শুরুর দিক, এরপর পাড়, আঁচল, পাট্টা, ছিলাই। আগে শাড়ির মাপ হতো সাড়ে ১০ হাত পর্যন্ত। তখন ব্লাউজ পিসের প্রচলন ছিল না। ব্লাউজ পিসের সংযুক্তি ঘটেছে ৩০-৪০ বছর আগে মাত্র। বর্তমানে এ দৈর্ঘ্য প্রায় ১২ হাত হয়ে থাকে।
ধরনে, আকারে ও বিপণনে যতই পরিবর্তন বা বিবর্তন আসুক, জামদানি শুরু থেকেই ছিল অভিজাত ঘরানার এবং এখনো তাই। বহু বাধা অতিক্রম করে এ শিল্প এখনো টিকে আছে। তবে কতদিন সংগ্রাম করে টিকে থাকবে, তা বলা মুশকিল। এর মূলে আছে প্রধানত সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উৎপাদনশীলতার প্রশ্নটা। কারণ একটা শাড়ি তৈরিতে যে দেড়-দুই মাস সময় লাগে, সে সময়ের উপযুক্ত মূল্য বা মজুরি তাঁতিরা পান না। আবার এ সময়ের মধ্যে আধুনিক কারখানায় আরো অনেক সস্তা শাড়ি উৎপাদন করা যায় অনেক গুণ বেশি পরিমাণে। ফলে ক্রেতাদের শৌখিনতা ছাড়া জামদানির প্রতি আকর্ষণ বা চাহিদা কম। বর্তমানে ঢাকার অদূরে রূপগঞ্জের তারাবো ইউনিয়নের ১৪টি গ্রাম আর সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়নের একটি গ্রামে জামদানি শিল্প কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে। এর বাইরে আরো কোথাও কোথাও বিচ্ছিন্নভাবে এর উৎপাদন হলেও তার ব্যাপকতা কম। তবে বোয়ালমারী উপজেলার কথা আলাদাভাবে বলতেই হয়। সেখানে উন্নত মানের জামদানি তৈরি হচ্ছে। মোগল আমলে যে পরিমাণ পৃষ্ঠপোষকতা এ শিল্প পেয়েছে, তার সঙ্গে তুলনা না করেও এটুকু বলা যায় যে, এ শিল্পের জন্য সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে আনুকূল্য প্রয়োজন। ১৯৮২ সাল থেকে এ শিল্পকে আরো উন্নত ও লাভজনক করার জন্য বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প (বিসিক) নানামুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। পরে ১৯৯২ সালে বাংলাদেশ সরকার তাঁতি তথা কারুশিল্পীদের প্রয়োজনীয় সহায়তা প্রদানের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে, যার মধ্যে রয়েছে কারুশিল্পীদের অন্য পেশায় চলে যাওয়া রোধ, নতুন প্রজন্মের কারুশিল্পীদের উত্সাহ প্রদান, বাজারের চাহিদা অনুযায়ী নকশা ও নমুনা সরবরাহ, জামদানি উদ্যোক্তাদের পুনর্বাসন, অবকাঠামোগত সুবিধাদি প্রদান ইত্যাদি। এ লক্ষ্য সামনে রেখে বিসিককে দায়িত্ব দেয়া হয় এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে বিসিক ১৯৯৩-এর জুলাই থেকে ১৯৯৯-এর জুন মেয়াদে নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ উপজেলার তারাবো ইউনিয়নের নোয়াপাড়া গ্রামে জামদানি শিল্পনগরী ও গবেষণা কেন্দ্র স্থাপন করে। এ শিল্পনগরীর বর্তমান আয়তন প্রায় ২০ একর। এসবই আশার সঞ্চার করে সত্য, কিন্তু এ কথা অনস্বীকার্য যে, জামদানির তথা এ পেশায় নিয়োজিত শিল্পীদের আগেকার সুদিন বা নিশ্চিন্ত সময় এখনো আসেনি। এজন্য শুধু সরকারি উদ্যোগ যথেষ্ট নয়, বরং দরকার ব্যক্তি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, এমনকি ক্রেতাপর্যায়ে পৃষ্ঠপোষকতা ও উন্নত মানসিকতা। আর তবেই এ শিল্প আবার বিশ্বের বুকে নিজের ও দেশের পরিচিতি উজ্জ্বল করে তুলবে।
লেখক: অনুবাদক
ঋণপঞ্জি: শাড়ি— হোসনে আরা শাহেদ/ বাংলা একাডেমি
পূর্ববঙ্গের নক্সীকাঁথা ও শাড়ী— কবি জসীমউদ্দীন
বাংলাপিডিয়া, উইকিপিডিয়া





