বলা হয়, বাংলাদেশে কৃষি কী, তার পরিচয় ধান উত্পাদনের মধ্যে। কিন্তু কথাটা একাট্টা ধানের আবাদ যেমন নয়, তেমনি স্রেফ ধান চাষও নয়। কারণ ভুলে যাওয়া উচিত নয় যে সরকারি হিসাবেই বাংলাদেশে ধানের জাতের সংখ্যা ১৫ হাজারেরও বেশি ছিল। এগুলোর মৌসুম, চাষের সময় পানির পরিমাণ, ফটো পিরিয়ড বা দিনের আলো ব্যবহারের সময়কাল এক রকম ছিল না। প্রাণের বৈচিত্র্যের চর্চা হাজার হাজার জাতের ধান আবাদের মধ্যেই ধরা পড়ত।
স্রেফ ধান চাষ নয় কেন? কারণ জমিতে কখন কী ধান বুনছি, তার সঙ্গে জমির ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন জড়িত। ধান চাষকেন্দ্রিক একটি বাস্তুসংস্থান পদ্ধতি বা ইকোসিস্টেম গড়ে উঠেছিল। সেসবের কিছুই আধুনিক চাষাবাদের ফলে আর নেই। এখন দেশে কোন বছর কত ধান উত্পাদন হচ্ছে, তা দিয়ে কৃষির সার্বিক ভালো-মন্দ বিচার হয়। কিন্তু ধানের জাত কতটা হারিয়েছি, ধান চাষ করতে গিয়ে ডাল, তেলবীজ ও অন্যান্য ফসল কত হারিয়েছি, তার কোনো খবর নেই। গবাদিপশু, মাছ, জলজ প্রাণী কীটপতঙ্গ পাখপাখালি কী পরিমাণ ধ্বংস করা হয়েছে, তার কোনো পরিসংখ্যান সরকারি খাতায় নেই। সবাই জানেন কৃষি মানে শুধু ধান উত্পাদন নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শাকসবজি, ডাল, তেল, মসলা, মাছ, হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগল-ভেড়াসহ অনেক কিছু। সবকিছু ছাপিয়ে ধানের উত্পাদনেই মনোযোগ দেয়া হচ্ছে সরকারিভাবে এবং খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান মাপকাঠি হিসেবে দেখা হচ্ছে। বর্তমানে দেশের ৭৫ শতাংশ আবাদি জমি (এক কোটি হেক্টর জমি) এবং ৮০ শতাংশ সেচকৃত জমি ধান উত্পাদনেই ব্যবহার হচ্ছে। দেশে বছরে ৩ দশমিক ৫ কোটি টন আউশ, আমন ও বোরো ধান উত্পাদন হচ্ছে। এর মধ্যে বোরো ধান সবচেয়ে বেশি প্রায় দুই কোটি টন, আমন ১ দশমিক ৩ কোটি টন এবং আউশ মাত্র ২৩ লাখ টন।
ধান্য থেকে ধান এবং এখান থেকে ‘ধন’। এটা কৃষিজাত তৃণ হলেও আপনা-আপনি অযত্নে জন্মায় এমন তৃণকেই ধান্য নামে উল্লেখ করা হয়। এমনই আরেকটি তৃণ হচ্ছে দূর্বা ঘাস। সেদিক থেকে ধান একটি শস্যদায়িনী ঘাস। ধানের আরেক নাম শাইল বা শালি। বাংলাদেশ-আসাম অঞ্চল থেকে শুরু করে পাঞ্জাব পর্যন্ত শালি ধান বলতে হেমন্তের ধান বা আমন ধান বোঝায়। ইংরেজিতে ধানকে Paddy বা Rice বলা হয়। ধান গণের বৈজ্ঞানিক নাম হচ্ছে Oryza। তা থেকেই ফরাসি ভাষায় ‘রিজ’ এবং ইংরেজিতে রাইস হয়ে যায়। রাইজা থেকে অনেকগুলো উপজাতের সৃষ্টি হয়, এর মধ্যে রয়েছে ওরাইজা সেটাইভা এবং ওরাইজা গ্লাবেরিমা। এশিয়ায় ধানের যে উপজাত প্রধানত উত্পাদন হয়, তা ওরাইজা সেটাইভা এবং ওরাইজা গ্লাবেরিমা আফ্রিকা মহাদেশজুড়ে ছড়িয়ে আছে। এশিয়া দেশগুলোতেই প্রধানত ধান হয় এবং এই মহাদেশের কোটি কোটি মানুষের সকাল-দুপুর-রাতের প্রধান খাবার। যাকে বলে তিনবেলার খাবার। ভাত না হলে বাঙালির খাওয়া সম্পূর্ণ হয় না।
বাংলায় উত্পাদনের বিভিন্ন পর্বে ধানের নাম বদলায়। মাঠের ধান মাড়াই করে ঢেঁকি কিংবা ধানের মিলে ছাঁটাই করলেই চাল হয়ে যায়, আর তা রান্না করলেই ভাত। যারা ধান উত্পাদন করেন না, তাদের কাছে এর তেমন কোনো গুরুত্ব নেই। মাঠের ধান বন্যায় ভেসে গেলে আহাজারি করেন কৃষক, সে সময় শহরের মানুষ কোনো খোঁজ নেয় না, কৃষক ধানের দাম মনপ্রতি ৭০০ টাকা পাওয়ার কথা থাকলেও ৪৫০ টাকা না পেলেও কেউ সহানুভূতি জানাতে এগিয়ে আসে না। কিন্তু চালের দাম বাজারে প্রতি কেজি ৩৬ থেকে ৩৮ হলেই শহরের সব শ্রেণীর মানুষ চিত্কার শুরু করে, সরকারের সমালোচনা হয়। তাই সরকারও কৃষকের যখন ক্ষতি হয়, তখন তত বেশি দায়িত্ব নেয় না। তারা চেষ্টা করে শহরের মানুষের পাতে যেন ভাতটা ঠিকমতো থাকে, সে ব্যবস্থা করতে। তাই চালের দাম বাড়তে দেয়া হয় না। এভাবে শহরের মানুষদের রক্ষা করতে গিয়ে আমরা কৃষকদের মেরেছি। গ্রামের পর গ্রাম অভাবে বিরান হয়ে গিয়েছে।
বাংলাদেশ আয়তনে ছোট হলেও ধানের বৈচিত্র্য দেখলে অবাক হতে হয়। এই ছোট দেশেই কয়েক হাজার জাতের ধান উত্পাদন করা হয়। ১৯৩০ সালের অবিভক্ত বাংলায় ভৌগোলিক অঞ্চলভেদে ১৫ হাজার জাতের ধান চাষাবাদ করা হতো বলে বিভিন্ন জরিপে জানা যায়। কিন্তু দুঃখজনক হচ্ছে, আধুনিক কালে ধানের স্থানীয় জাতের ওপর গুরুত্ব না দিয়ে উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড প্রবর্তনের কারণে অনেক জাত অবহেলায় হারিয়ে গেছে। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) জিন ব্যাংকে কৃষকের কাছ থেকে সংগ্রহ করা স্থানীয় জাতের ধানের সংখ্যা হচ্ছে প্রায় পাঁচ হাজার। ব্রি বিভিন্ন গবেষণার মাধ্যমে ৭২টি উচ্চফলনশীল জাত বা আধুনিক জাত এবং চারটি হাইব্রিড ধান উদ্ভাবন করেছে। কিন্তু পুরনো জাতগুলো তাদের রক্ষা করার কথা। করেছেন কিনা, তারাই ভালো বলতে পারবেন।
আগে প্রধান দুটি ধানের মৌসুম ছিল— আউশ ও আমন, কিন্তু এখন সেটা হয়েছে আমন ও বোরো ধান। ক্রমে আউশের আবাদ কমে গেছে। ১৯৮৩-৮৪ সালে মোট আবাদি জমির ২৩ দশমিক ৬ শতাংশে আউশ ধান চাষ হতো, সেটা ২০০৮ সালে হয়েছে মাত্র ৮ দশমিক ৩৫ শতাংশ। আমন ধানও আগের তুলনায় কমছে, ১৯৮৩-৮৪ সালে ছিল ৩৬ দশমিক ৮ শতাংশ জমিতে, ২০০৮ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩০ দশমিক ৭৫ শতাংশে। অন্যদিকে ১৯৮৩-৮৪ সালে বোরো ধান ছিল মাত্র ৯ দশমিক ৬ শতাংশ জমিতে, ২০০৮ সালে হয়েছে ৩৩ দশমিক ১৪ শতাংশ জমিতে। বৈশাখ থেকে শ্রাবণে বৃষ্টিনির্ভর, উঁচু ও মাঝারি জমিতে আউশ ধানের চাষে সেচের দরকার হয় না। এক সময় ছিল যখন আউশ ধান কৃষকের বার্ষিক ফসল পরিকল্পনায় খুব গুরুত্ব পেত। কিন্তু বোরো ধানের প্রতি বেশি মনোযোগ দেয়ার কারণে এবং অন্যান্য ফসল, বিশেষ করে তামাক চাষের কারণে আউশ ধানের বপন করার সময় মাঠ খালি পাওয়া যায় না। কারণ এই সময়ে বোরো ধান মাঠে থাকে, তামাক পাতা তোলা হলেও গাছটি জমিতে থেকে যায়। আউশ ধানের অনেক স্থানীয় জাত আছে, যা বিভিন্ন এলাকার কৃষকের কাছে খুব জনপ্রিয় এবং খেতে খুব স্বাদ। এর মধ্যে অনেক জাত চাষ না করার কারণে হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু কয়েকটি জাত কৃষকরা ধরে রেখেছেন এবং চাষ করছেন। এর মধ্যে রয়েছে কালাবকরী, ভাতুরী, শঙ্খপটি, কালামানিক, ষাইটা, ভয়রা ইত্যাদি। কৃষকের কাছে আউশ ধানের জাত সম্পর্কে জানতে চাইলে বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে তারা অন্তত ৮১ জাতের, বরেন্দ্র অঞ্চলে ৫৬, হাওড় অঞ্চলে ২৭ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ২৯ আউশ ধানের জাতের নাম বলতে পারেন। সরকার এখন আউশ ধান চাষে বিশেষ প্রণোদনা দিচ্ছেন, কারণ বোরো ধান সেচনির্ভর হওয়ায় এবং মাটির তলার পানি ক্রমে নিচে নেমে যাওয়ায় এ ধান চাষের ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। বরেন্দ্র অঞ্চলে ২০০৮ সালে মাটির তলার পানি ৬৪ ফুট নিচে ছিল, পাঁচ বছরে তা ৯৭ ফুট নিচে নেমে গেছে।
আমন ধান নিচু জমিতে চাষ করা হয় এবং প্রচুর পানির দরকার হয়। বর্ষাকালের পানি আমন ধানের জন্য খুব দরকার। এই ধান সারা বছরের ধান উত্পাদনের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ। বন্যা এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগে আমন ধানের ক্ষতি হলে কৃষক এবং দেশের ক্ষতি হয়। আমন ধানের মধ্যে অনেক জাত আছে, সাধারণ ভাতের ধান থেকে শুরু করে পোলাও, পায়েশের চিকন ও সুগন্ধি ধানও চাষ করা হয়। যেমন— কাটারিভোগ, কালিজিরা, চিনিগুঁড়া, বাঁশফুল ইত্যাদি। কৃষকের কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, বোনা আমন ধানের জাতের সংখ্যা বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে ১৬৪ এবং রোপা আমনের সংখ্যা ১২৮টি, বরেন্দ্র অঞ্চলে বোনা আমন ৫৪, রোপা আমন ১১২, হাওড় অঞ্চলে বোনা আমন ৪৬ ও রোপা আমন ৬৬ এবং উপকূলীয় অঞ্চলে ১০১টি।
বোরো ধান সব এলাকার ধান নয়। যেসব জমিতে সারা বছর পানি জমে থাকে এবং অন্য রবি ফসল যেমন সবজি, ডাল, সরিষা ইত্যাদি করা যায় না, সেসব জমিতেই বোরো ধান চাষ হতো। তাই বোরো ধানের এলাকা আগে কম ছিল, শুধু হাওড়-বাঁওড় এলাকা এবং নিচু অঞ্চলেই চাষ হতো, গভীর নলকূপ বসিয়ে সেচের মাধ্যমে চাষের প্রয়োজন ছিল না। বর্তমানে বোরো ধান সব এলাকায় করতে গিয়ে গভীর নলকূপ বসিয়ে সেচের মাধ্যমে চাষ করা হয়। সেচকৃত ধান চাষের জমির ৮৮ শতাংশ বোরো ধানের জন্য করা হয়। তার অর্থ হচ্ছে, বোরো ধান না করলে গভীর নলকূপের ব্যবহার এত বেশি হতো না। আমরা জানি মাটির তলার পানি তুলে সেচের এ ব্যবস্থায় পানিতে আর্সেনিকসহ ক্ষতিকর রাসায়নিক উপাদান আমাদের খাদ্যে প্রবেশ করে যা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। বোরো ধান শুকনা মৌসুম বা শীতকালে হয়। কাজেই এই ধানের চাষ বৃষ্টিনির্ভর হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই সেচের ব্যবস্থার মাধ্যমেই বোরো ধান চাষের ব্যাপকতা বাড়ানো হয়েছে। বলা বাহুল্য, আধুনিক বা উচ্চফলনশীল জাতের বোরো ধান চাষেই সেচের প্রয়োজন হয়। ১৯৮২-৮৩ সালে সেচের জন্যে মাটির তলার পানির ব্যবহার ছিল ৪১ শতাংশ, কিন্তু ২০০১-০২ সালে এসে তা হয়েছে ৭৫ শতাংশ, শুধু বোরো ধান চাষের বৃদ্ধির কারণে। বাজারে বেশি চলছে এমন উচ্চফলনশীল বোরো ধান হচ্ছে বিআর ১, বিআর ৩, বিআর ১৪, বিআর ২৮, বিআর ২৯। অথচ বোরো ধানের স্থানীয় জাতও আছে, যা এখনো খুব জনপ্রিয়। যেমন— খৈয়াবোরো, টেপাবোরো, বোয়ালীবোরো, মুখকালালী। বোরো ধান বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে ৩৪, বরেন্দ্র অঞ্চলে ২৪ ও হাওড় অঞ্চলে ২৩ জাতের নাম কৃষকের কাছ থেকে পাওয়া গেছে।
আধুনিক কৃষি বা সবুজ বিপ্লব নামে রাসায়নিক সার, কীটনাশক, সেচসহ যান্ত্রিক কৃষির মাধ্যমে অধিক খাদ্য ফলানোর যে ফর্মুলা দেয়া হয়েছিল, তা এসেছিল ধানেরই মাধ্যমে। এই সময় প্রথম উচ্চফলনশীল ধানের প্রবর্তন করা হয়। আমাদের দেশে হাজার জাতের ধানের বৈচিত্র্য থাকা সত্ত্বেও নতুন ‘প্রবর্তিত’ ধান এসেছিল আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে ফোর্ড এবং রকেফেলার ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায়, নাম ছিল আই আর-৮। বামুন জাতের এই ধানকে মিরাকল রাইসও বলা হতো, আলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন। বেশি ফলনের কৌশল ছিল খড়ের অংশ কমিয়ে দিয়ে শুধু শস্য বা দানা উত্পাদন বাড়াতে হবে। অথচ ধানের খড়ও খাদ্যেরই অংশ। গো-খাদ্য হিসেবে খড় খুব গুরুত্বপূর্ণ। গরু না থাকলে দুধ ও মাংস মিলবে না, সেদিক বিবেচনা করা হয়নি। ফলে পরবর্তীকালে কৃষকের বাড়িতে গরুর সংখ্যা কমে গেল এবং গরু পালার জন্য বাইরে থেকে খাবার কিনতে হলো। দেশীয় গরুও শেষ হয়ে গেল। খাদ্য হিসেবে মাংস ও দুধ সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরে চলে গেল। আধুনিক কৃষির প্রবর্তনের জন্য দেশে কয়েকটি জিন ব্যাংক তৈরি করা হয়েছিল। বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট বা ব্রি প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭০ সালে এবং উচ্চফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ধানের জাত তৈরি করে কৃষকের মাধ্যমে চাষ করানো হচ্ছে। ব্রির আধুনিক জাতের ধান বর্তমানে ধান চাষের ৮০ শতাংশ জমিতে হচ্ছে, মোট ধানের ৯১ শতাংশ উত্পাদন করছে। কিন্তু এই আধুনিক জাতের ধান উত্পাদনে ব্যাপক পরিমাণ রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করার কারণে ধানের ক্ষেতে যে মাছ পাওয়া যেত, সেসব দেশীয় কৈ, শিং, মাগুরসহ অসংখ্য মাছ হারিয়ে যাচ্ছে।
আধুনিক কৃষিতে উচ্চফলনশীলের জাত প্রবর্তন করা হয়েছে এই বলে যে, দেশের জনসংখ্যা বেশি, তাদের খাওয়াতে হলে বেশি করে চাল লাগবে। এই যুক্তির সঙ্গে মেলানো হলো দেশীয় জাতের ধানের ফলন বেশি নয়, তাই উচ্চফলনশীল (উফশী) এবং হাইব্রিড জাত লাগবে। কিন্তু এই কথা মোটেও ঠিক নয়। দেশীয় জাতের মধ্যে বেশি ফলনের জাত অনেক আছে, যা উফশীর চেয়ে কম নয়। এবং এই ধানের সঙ্গে খড়ের পরিমাণও অনেক বেশি, যা গো-খাদ্য হিমেবে কৃষক ব্যবহার করতে পারেন। কয়েকটি উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। আমন ধানের মধ্যে কালোভোগ ধানের ফলন প্রতি হেক্টরে ৭ দশমিক ৬ টন এবং খড় ১৩ টন। অন্যদিকে আশাইল্লেম্বুরু ছয় টন হলেও খড় ১৮ টন। কৃষক শুধু মানুষের খাদ্যের হিসাব করেন না, তারা তাদের বাড়িতে পালিত পশুপাখির খাদ্যের হিসাবও করেন। অন্যদিকে, আধুনিক জাতের ধানগুলো, যেগুলো নম্বর দিয়ে চেনানো হয় (বিআর ২৮, বিআর ২৯ ইত্যাদি) রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও সেচনির্ভর হওয়ায় এর খরচ অনেক বেশি। আধুনিক জাতকে তাই শুধু উচ্চফলনশীল (High Yielding variety) না বলে উচ্চ উপকরণশীল (High Input Variety) বললে ভুল বলা হবে না। ধানের উত্পাদনে অতিমাত্রায় রাসায়নিক সার, কীটনাশক ও গভীর নলকূপের পানি ব্যবহারের ক্ষতিগুলো এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে এবং নিত্যনতুন রোগের প্রাদুর্ভাব বিশেষ করে অসংক্রামক রোগ (হূদরোগ, ডায়াবেটিস, ক্যান্সার, উচ্চরক্তচাপ, কিডনি বিকল হওয়া ইত্যাদি) বেড়ে যাওয়া জনমনে উত্কণ্ঠা বাড়িয়ে তুলছে। খাদ্য ঘাটতি মেটাতে গিয়ে মানুষের শরীরে বিষ ঢুকিয়ে দেয়া হচ্ছে। এখন আবার জেনেটিক্যালি মডিফায়েড ধান (জিএম) প্রবর্তনের চিন্তাভাবনা চলছে, ব্রিতে বহুজাতিক কোম্পানির সঙ্গে গবেষণাও হচ্ছে। উফশী ও হাইব্রিডের ক্ষতির পরে আরো পরনির্ভরশীল প্রযুক্তির দিকে ছুটছে। বর্তমানে জিএম ধানের মধ্যে গোল্ডেন রাইস (ভিটামিন এ ধান) প্রবর্তনের প্রক্রিয়া চলছে। বিআর ২৯ ধানের মধ্যে ভুট্টার জিন ঢুকিয়ে হলুদ ধান করে ভিটামিন এ’সমৃদ্ধ ধান হবে বলে কোম্পানি দাবি করছে। এই ধান দীর্ঘদিন ফিলিপাইন ও অন্যান্য দেশে খুব সফল হতে পারেনি এবং পরিবেশবাদীরা এর বিরূপ প্রভাব নিয়ে সতর্ক করছেন। তবুও এই ধান বাংলাদেশে প্রবর্তনের অপেক্ষায় আছে। অথচ ভিটামিন এ’সমৃদ্ধ শাকসবজি, ফল আমাদের প্রচুর রয়েছে। সেসব ব্যবহার না করে বহুজাতিক কোম্পানি সিনজেন্টার পেটেন্ট করা ধানের প্রবর্তন করে আমরা কী করতে চাইছি?
ধান আমাদের অনেক বড় সম্পদ, কিন্তু ধানের প্রতি নীতিনির্ধারকরা প্রচুর অবহেলা এবং অবজ্ঞা করেছেন। আধুনিক ল্যাবরেটরিতে তৈরি ধানের প্রতি মনোযোগ দিয়েছেন, স্থানীয় জাতকে ফেলে রেখেছেন এক পাশে। সরকারের আউশের প্রণোদনাকে স্বাগত জানাই, একই সঙ্গে আমাদের দেশের স্থানীয় জাতের ধান রক্ষা করা এবং বহুজাতিক কোম্পানির ওপর নির্ভরশীল না হওয়ার আহ্বান জানাই। আমাদের বিজ্ঞানীরা নিজ দেশের প্রয়োজন বিবেচনা করে আমাদের দেশের ভৌগোলিক ও পরিবেশ অনুযায়ী স্থানীয় জাতের ধানের গবেষণা ও চাষ বাড়ানোর উদ্যোগ নেবেন, এই আশা করছি।
১২ এপ্রিল ২০১৭। শ্যামলী






