স্থাপত্য ভৌত ও মনস্তাত্ত্বিক জগতের মধ্যে প্রতিনিয়ত স্পন্দনরত। কাজেই জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে এ বিষয়ে পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা কার্যকারণতার কোনো মাধ্যমে নেতিবাচকতা অবশ্যই আমাদের স্থাপনাকে আমাদের সত্তাকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে।

স্থানের ব্যবহার, তার নির্মাণ, উপলব্ধি থেকে শুরু করে তার আর্থসামাজিক অবদান-স্থাপত্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত। একদিকে যেমন প্রযুক্তি, বিজ্ঞান এ বিষয়গুলো স্থাপত্যকে নতুন মাত্রা দিয়েছে, তেমনি শুধু প্রযুক্তির প্রগতি ভালো স্থাপত্যের প্রযোজ্যতা নয় (স্থাপত্য একসময় শুধু কাগুজেও থেকেছে)। ক্ষমতা, মতাদর্শ, দক্ষতা দ্বারা স্থাপত্য প্রভাবিত হয়। পক্ষান্তরে স্থাপত্য তার প্রভাবকারীকেও উল্টো প্রভাবিত করতে পারে— এ ব্যতিহার স্থাপত্যের এক অনন্য বৈশিষ্ট্য।

উন্নয়ন ও নগরায়ণের প্রাথমিক ধাপে শহর ও জনপদ যে ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হয়, আমরা তার ব্যতিক্রম নই।

কালের বিবর্তনে যেমন একসময়ের ব্যস্ত প্রাণকেন্দ্র হয়েছে প্রায় পরিত্যক্ত বা অপ্রবেশযোগ্য, তেমনি পশ্চাদভূমি হয়েছে প্রাণবন্ত ব্যবসাকেন্দ্র। ব্যক্তিগত উদ্যোগ থেকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রচেষ্টা সর্বস্তরের সম্মিলিত ও সমন্বিত উদ্যোগ গঠনমূলক পরিবর্তনের নিশ্চয়তা দিতে পারে। ‘ব্যক্তির’ ঊর্ধ্বে ‘ব্যক্তিকে’ এক ধাপ উঠতে যেন কুণ্ঠিত হতে না হয়।

স্থাপত্যের ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া আমাদের শহরকে করেছে বহুমাত্রিক।

বিলবাওয়ের মতো ঘুমন্ত শহর জেগে উঠেছে, কলম্বিয়ার মেডালিন শহর হয়েছে বাসযোগ্য। ভাগ্যের কোনো অমোঘ প্রক্রিয়ায় সংসদ ভবনের মতো অনন্য স্থাপত্যিক নিদর্শন এই আমাদের দেশেই আছে। একদিন সেও জীর্ণ হবে (তখন লুই কানের ভাষায় স্থাপত্য তার শৈলী-সত্য উন্মোচন করবে) ক্ষুদ্র হতে শাশ্বত ব্যাপ্ত এক পরিধি-স্থাপত্য, যা সম্পৃক্ত করে।

প্রকারান্তরে স্থাপত্যের প্রতিক্রিয়া নিরূপিত করতে পারে শহরের ভৌত ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য ধারণা। নগর বা নগরায়িত এলাকা সে অর্থে একটি গবেষণাগার। করবুসিওরয়ের নির্ভৃত রন্শ থেকে হরপ্পার পুরাকীর্তি সবই মানুষ বা মানুষ সভ্যতার জীবাশ্ম।

আমাদের স্থাপনা আমাদের অজান্তেই অনেক বেশি বছর বাঁচে। পম্পেই শহরের ধ্বংসাবশেষ যেমন প্রত্নতাত্ত্বিক, তেমনি তা তাদের চিন্তা বা মননের ইঙ্গিতও ধারণ করে। আমাদের আজকের চিন্তা আগামীর পদচিহ্ন। স্থপতিরা নিরন্তর চেষ্টায় ছিলেন ও থাকবেন, তার স্বপ্ন, তার চিন্তাচেতনা, সীমাবদ্ধতা যেন এ পৃথিবীর বুকে তার পদচিহ্ন রেখে দেয়। হোক আপসে, হোক বিদ্রোহে। স্থাপত্য আবেশায়িত করে, অভিভূত করে, প্রশান্তি দেয়, বাঁচিয়ে রাখে।

পদার্থবিজ্ঞানের সাধারণ সূত্রে, সময়ের পরিক্রমায় অসামঞ্জস্যের মাত্রা বেড়ে যায়। জীবনের সঙ্গে সম্পৃক্ত অনেক ব্যবস্থার ভারসাম্যহীনতা আমাদের প্রতিনিয়ত সমন্বয় করতে হয়। শহর, স্থাপত্য, আমাদের দেহ, কোনোটিই এর ব্যতিক্রম নয়।

সঠিক পরিকল্পনা সবসময় ‘শ্রেষ্ঠ সমাধান’ না হলেও তা উন্নয়নের ও উন্মুক্ততার গাণিতিক প্রত্যাশা বৃদ্ধি করে। ব্যক্তি থেকে রাষ্ট্র পর্যন্ত সর্বস্তর ও বর্ণালিতে সাদৃশ্যতা আনয়নের ক্ষেত্রে পরিকল্পনার বিকল্প নেই। বৈসাদৃশ্যতা আমাদেরই সৃষ্টি ‘কদর্যতা’ বুঝতে ‘সৌন্দর্যবোধ’ যেমন প্রয়োজন, তেমনি এ বোধ তৈরির ব্যাপারটিও বেশ জটিল এবং সময়সাপেক্ষ। দুর্ভাগ্যক্রমে অর্থনৈতিক উন্নাসিকতা এককভাবে ব্যক্তি বা সামাজিক স্তরে সৌন্দর্যবোধ তৈরি করতে পারে না। শুধু বিত্তশীলতাই ভালো রুচি তৈরি করে না। আবার দারিদ্র্যক্লিষ্ট ব্যক্তির কাছে বিষয়টি তেমন গুরুত্ব বহন করতে ব্যর্থ হতে পারে। তদুপরি ব্যক্তি ও জনগোষ্ঠীকে তা অর্জন করতে হয়, নিশ্চয়ই কায়ক্লেশহীনভাবে নয়। প্রশ্ন হলো, এ প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতা ও বাস্তবায়ন নিরন্তর থাকবে কিনা। যোগাযোগ ব্যবস্থা শহর-দেহের সংবহনতন্ত্র, ইন্দ্রিয়তন্ত্র, অবকাঠামোর আওতাধীন এদের পর্যায়ক্রমিক উন্নয়ন, সম্প্রসারণ ও সর্বোপরি সন্নিবেশ বা সমন্বয়করণ অতীব জরুরি। রাস্তা, সংযোগস্থান, লে-বাই, অদল-বদলের স্থান আজ ভীষণ ভারাক্রান্ত। এর ফলে সৃষ্ট অপচয় ও অব্যবস্থাপনা আমাদের টেকসই ও সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়নের অন্তরায়। আমরা হয়তো মধ্যম আয়ের দেশ হইনি, কিন্তু মানসিকতায় উন্নত হতে আমাদের বাধা কোথায়? কর্মস্থল থেকে বাসস্থান এবং তদ্বীপরীত দৈনিক ঘটনায় যে সময় ও শক্তি নষ্ট হয়, তার পরিমাপ না থাকলেও আমরা জানি, এর জ্বালানি বাবদ আর্থিক অপচয় দুর্নীতির থেকেও ভয়ঙ্কর। এতে আমাদের কর্মগোষ্ঠী হচ্ছে হতোদ্যম।

আমাদের দুর্ভোগ আমাদের পরিকল্পনা এবং এর ভৌত রূপান্তরের কোনো পর্যায়ের অসঙ্গতির সাক্ষী। আমাদের ঐকতান ভবিষ্যতের মুগ্ধতার স্বপ্ন। স্থাপত্য সময়কে বহন করে— স্থাপত্য সময়কে উত্তীর্ণের দাবি রাখে। আমাদের আবেগই পারে নিরেট পার্থক্যে কালজয়ী কাব্যে রূপান্তর করতে বৈসাদৃশ্য ও উন্মত্ততা ভৌগোলিকতা নিরপেক্ষ। সমাজে এর মাত্রা কমলে ধরে নিতে পারি, আমরা সঠিক পথে এগোচ্ছি।

নীতিমালার পেছনে হিতৈষী মনোবৃত্তির কোনো সংকট না থাকলেও এর বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা আমাদের সুফল থেকে বঞ্চিত রাখে। অবকাঠামো থেকে সুউচ্চ কাঠামো ছোট একটি বাসস্থানের ন্যূনতা থেকে বিশাল স্থান ও অনুপাতের কারিগর। আমাদের বিবেচনা একটি স্থানকে দীর্ঘ সময়ের জন্য ভৌতভাবে রূপান্তর করে এবং নিজেও রূপান্তরিত হয়। আমাদের চিন্তা আমাদের স্থানের ভৌত বিন্যাসের ওপর প্রয়োজনশীল।

‘অ্যাকোয়াডাক্ট থেকে টার্মিনাল, পরিখা থেকে সুবিশাল বাঁধ, এ্যাগোরা থেকে আশ্রম, আমাদের ঐকতান কালোত্তীর্ণ স্থাপনা তৈরি করেছে। আধুনিকতার আলোর ফাঁক গলে অনৈতিকতা প্রবেশ করলে আঘাতপ্রাপ্ত হবে শিল্পসত্তা। আসবে ছেদ, বেসুর। স্থান, ঘটনা ও গতির নিরিখে স্থাপত্যকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব। (স্থানের জটিল জ্যামিতিক ব্যাখ্যা কী, এর প্রায়োগিক বা রাজনৈতিক উপলব্ধি ব্যতিরেকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব?)

শহরের ভেতরে বা বাইরে গতিশীল পরিবহন ব্যবস্থা থেকে নাগরিক সুবিধাদির সর্বস্তরেই স্থাপত্যের তাত্ত্বিক ও প্রায়োগিক প্রয়োজনীয়তা আছে। স্থাপত্য যেমন বাণিজ্যিকতা দিয়েছে, তেমনি এর বিরূপ প্রভাবও এসেছে। সময়ের সঙ্গে ব্যবহারও পাল্টায়— গির্জা হয় গ্যালারি, দুর্গ হয় জাদুঘর, নাট্যমঞ্চ হয় পরিত্যক্ত। কালের স্রোতে নগর হয়েছে জনশূন্য। অধিক জনসংখ্যা বিস্তীর্ণ ‘বস্তি’ করেছে, ‘বসতি’ করেনি। পরিকল্পনা নিঃসন্দেহে প্রারম্ভিক। আমাদের দায়িত্বশীল ও কৌশলগত পেশাদারিত্ব সুস্থ শহর, সুস্থ গৃহ ও সুস্থ মন তৈরি করবে— প্রত্যাশী সংস্থা ও স্থপতির প্রজ্ঞা এ দুইয়ের সমন্বয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও অকার্যকারিতার শূন্যস্থান কখনই দীর্ঘ সময় সেবাহীন অবস্থায় থাকবে না। এ শূন্যস্থান ব্যক্তি বা সিন্ডিকেট কিংবা বৃহৎ করপোরেশন দ্বারা নিবৃত হবে। কিন্তু সরকার বা রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যতিরেকে কোনো জনগোষ্ঠীর অধিকার এবং উন্নয়নের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহিতার স্থান বিশেষ কার্যকরী নয়। রাষ্ট্রযন্ত্রের দায়িত্ব এড়ানো মুশকিল। প্রাচীনকাল থেকেই বিভিন্ন সমাজ ব্যবস্থায় এ রকম সাদৃশ্যপূর্ণতা প্রতীয়মান। এ ধারার পরিবর্তন বা পরিবর্ধন ব্যবস্থার কোনো গাণিতিক সূত্র আমাদের অবগত নয়। তবে এটুকু বলাই বাহুল্য যে, ক্ষমতা ও ক্ষমতার প্রয়োগের বিন্যাসে ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বিচক্ষণতা সদিচ্ছা ও সর্বোপরি সামগ্রিক সমন্বয়তা টেকসই অগ্রগতির নিয়ামক। এখানে ‘উদ্দেশ্য’ বিষয়টি ঘটনা পরিক্রমায় অঙ্কুরাবস্থা। এ পর্যায়ের ছোট মাত্রার পরিবর্তন পরবর্তী স্তরে বৃহৎ মাত্রায় চ্যুতি ঘটায়, যা গাণিতিকভাবে প্রতীয়মান। বানৌলির স্রোতের মতো বহমান যন্ত্রধারার সমন্বয় ও ব্যবস্থাপনায় বিচক্ষণতা এবং কুশলী পরিকল্পনা আমাদের বাসযোগ্যতার জাদু।

 

লেখক: স্থপতি