একজন স্থপতি বা যেকোনো সৃষ্টিশীল মানুষের জন্য তাঁর অনেক কাজের মাঝে একটি বেছে নেয়া সবসময়ই কঠিন। এ যেন কোনো পিতার জন্য তার সন্তানদের মধ্যে একজনকে অন্যতমের রায় দেয়ার মতোই দুরূহ। তবু যদি বলতে হয়, ব্যক্তিগতভাবে আমি সবসময়ই প্রাসঙ্গিক ও সংবেদনশীল কাজ করার চেষ্টা করি; কোনো রকম পূর্ব পরিকল্পিত ধারণা থেকে মুক্ত থেকে। সিম্পলট্রি আনারকলি প্রজেক্টটি আমার আকাঙ্ক্ষার অনেকটা পূরণ করতে পেরেছে এর সামগ্রিকতার বিচারে।

মৌলিক স্থাপত্যকে কখনই কোনো বিশেষ ধারা বা সংজ্ঞার মাঝে আবদ্ধ করা যায় না, উচিতও না। সে কথা মাথায় রেখেই বাহুল্য বর্জিত এক পরিমিতি বোধসম্পন্ন স্থাপত্য সৃষ্টির চেতনা থেকে এর সূচনা। প্রকৃতি, সময় ও সংস্কৃতির সম্মিলনে আমাদের এ শহরের পরিপ্রেক্ষিতে ভবিষ্যতের পথে নগরায়ণ ও স্থাপত্যের রূপান্তরটি কেমন হওয়া উচিত, তার একটি যথাযথ উদাহরণ সৃষ্টি করাই ছিল এর মূল প্রেরণা।

সিম্পলট্রি আনারকলি প্রকল্পটি ছিল মূলত নকশা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নমূলক একটি কাজ। আমার স্থাপত্য চর্চা প্রতিষ্ঠান ভলিউমজিরো লিমিটেড থেকে যার পুরো পরিকল্পনা, নকশা ও ড্রয়িং প্রস্তুত করা হয়েছে এবং এটির নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে স্পেসজিরো লিমিটেডের মাধ্যমে। বিশদভাবে এ নির্মাণের ডিজাইন নিয়ে যদি বলি, এ প্রকল্পটির ব্যবহারিক চাহিদা ছিল ২ লক্ষাধিক বর্গফুটের স্থানসংকুলানে সক্ষম একটি উত্কৃষ্ট মানের অফিস ভবন। অভিজাত বাণিজ্যিক এলাকা গুলশান এভিনিউর পশ্চিম পাশের একটি জমি এ প্রকল্পের জন্য নির্ধারিত হয়। মূল সড়ক থেকে এর প্রধান প্রবেশ, তবে পশ্চিমের ২৪ নং শাখা সড়কটি ভবনটির সহায়ক যোগাযোগের জন্য বিশেষ বিবেচনার সুযোগ করে দেয়। আয়তকার জমিটি পূর্ব-পশ্চিম বরাবর প্রলম্বিত, তার মানে দক্ষিণে এর উন্মুক্ততা বেশি। নির্মাণক্ষেত্রের আকৃতি ও পারিপার্শ্বিক বিবেচনা এখানে একটি আয়তকার স্থাপনা দাবি করে, যা থেকে আসলে এর নকশার ধারণাটি উদ্ভব হয়েছে। লে-আউট বা প্ল্যানে এর মূল উলম্ব যোগাযোগ বা Core-টি মোটামুটি কেন্দ্রে অবস্থিত, যা এর কাঠামোকেও বাড়তি দৃঢ়তা দেয়। তিন বেজমেন্ট ও চৌদ্দতলাবিশিষ্ট ভবনটির পরিকল্পনার শুরু থেকেই আমার চেতনায় শহরের সঙ্গে এর আত্মিকতার ভাবনাটি কাজ করেছে। একটি ভবন নির্মিত হলে তা সেই লোকালয় বা শহরেরই অঙ্গ হয়ে যায়। শহর ও মানুষের স্বস্তির জায়গাটুকুর সম্মানে তাই স্থাপনাটিকে আমি নির্মাণ বিধিমালার Floor Area Ratio [FAR]-এর সুযোগ কাজে লাগিয়ে সামনে যথাসম্ভব জায়গা রেখে উত্তোলন করেছি। একটি স্থাপনা যখন উঠে আসে মাটির নিচ থেকে, তার সেই আপাদমস্তক উন্নতি একটি গল্পের মতো। গল্পের ভূমিকা যেমন তার আবেদন বাড়িয়ে তোলে, তেমনিভাবে আমি ভবনটির ভূমি ও নিচের অংশটির মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টি করেছি দ্বিস্তরবিশিষ্ট জলাধার, ফোয়ারা ও সজীব নিসর্গ দিয়ে। সেখানে ভূতলের প্রথম স্তরটিও প্রতুল সূর্যালোক পায়, যা মনোরম একটি জনসমাগমের স্থান হওয়ার জন্য অপেক্ষা করছে। এ জায়গাটি নান্দনিক একটি সিঁড়ির মাধ্যমে ভূমির সঙ্গে যুক্ত। ভবনের প্রবেশপথের আচ্ছাদনটি ভেতর থেকে বের হয়ে এসেছে এবং যেভাবে একে আমি প্লাজার সঙ্গে সম্পৃক্ত করে সামনের সীমানায় একাত্ম করেছি, তাতে ভবনটি চমত্কার একটি Urban intervention-এ পরিণত হয়েছে। সিম্পলট্রি আনারকলির শহরের মাঝে স্বাগতপূর্ণ উপস্থিতি আরো আকর্ষণীয় হয় এর প্রবেশপথের ত্রিমাত্রিক শিল্পকর্মগুলো এবং ভেতরের মার্জিত ও রুচিশীল স্পেসের বিচিত্রতায়। পথ থেকে দৃষ্টি যদি নগরের বিশাল পটভূমিতে প্রসারিত করি, তাহলে আমরা দেখব দালানটির দক্ষিণ পাশজুড়ে আনুভূমিক কাচের আচ্ছাদনের স্তর; যা ভবনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশকে তাপানুকূল রাখতে সাহায্য করে। একই সঙ্গে এ বিশেষ স্তর অভ্যন্তরকে আলোকপ্রাপ্তি থেকেও বঞ্চিত করে না এবং স্থাপত্যেও মাধুর্য যোগ করে। সম্মুখের কাঠামোজুড়ে Ceramic fritted কাচের দেয়ালটি এক অনুপম নান্দনিকতা লাভ করেছে এর ব্যবহারিক তদুপরি শৈল্পিক নকশার উত্কর্ষে। আমি একে নগরের প্রেক্ষাপটে একটি ভাস্কর্য বলব, যা উপরে উঠে গিয়ে ভবনটির চূড়াকে আবৃত করছে চমত্কার একটি স্পেস তৈরির মাধ্যমে। নির্মাণটির উপরের দিকে একাধিক স্তরে উন্মুক্ত টেরাস এবং একদম উপরের বৈচিত্র্যময় বাগান ও সুইমিং পুল যেন পূর্ণতা দেয় সব আয়োজনকে। স্থাপনাজুড়ে এর সব উপকরণের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী উপস্থাপন এবং বিভিন্ন অংশের কার্যকর ডিটেইলই এর প্রকৃত অলঙ্করণ।

আমার যেকোনো প্রজেক্টের মতো এখানেও আমি মাত্রা ও অনুপাতের সঠিক উপস্থাপনকে প্রাধান্য দিয়েছি। ভবনটির প্ল্যানিং [দ্বিমাত্রিক নকশা] থেকে শুরু করে এর ত্রিমাত্রিক অভিব্যক্তি, নির্মাণ ব্যবস্থাপনা থেকে এর ব্যবহারিকতা সবকিছুতেই সেই পরিমিতির ছাপ আছে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস। ভবনের উপকরণগুলোর সংবেদনশীল উপস্থাপনা তাদের যৌক্তিকতাকেই সমর্থন করে। স্থাপত্য আর শিল্পের মেলবন্ধন এখানে মানুষের সূক্ষ্ম অনুভূতির জগতের সঙ্গে যোগাযোগ সৃষ্টি করছে। পথচারী ও আগতদের যাত্রার মনোরম অভিজ্ঞতা তাদের কিছুটা হলেও মুক্তি দেয় শহরের যা কিছু অনাকাঙ্ক্ষিত, সেসবের ক্লেশ থেকে।

একজন ডিজাইনারের ব্যক্তিগত অনুভূতির বাইরে, সংবেদনশীল একজন মানুষ হিসেবে ও প্রকৃতির প্রতি দায়বদ্ধতা থেকেও দেখতে গেলে, এ ভবনটি সবুজ স্থাপনা ও টেকসই স্থাপত্য [Sustainable Architecture] হিসেবেও উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। সত্যি বলতে একটি সফল পরিবেশবান্ধব দালান নির্মাণের সৎ প্রচেষ্টাই আসলে একে তার স্বীকৃতি এনে দিয়েছে। বিদ্যুতের পরিমিত ব্যবহার, দুই স্তরের Low-E প্রলেপযুক্ত কাচের ব্যবহারের মাধ্যমে দিনের আলোর পর্যাপ্ততা কাজে লাগানোর পাশাপাশি ভেতর বাইরের পরিবেশের আরামদায়ক সমন্বয় নিশ্চিত করা, পানির অপচয় রোধ নিশ্চিত করা, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ও ব্যবহার, বর্জ্য পানি পরিশোধন ব্যবস্থা, বৈদ্যুতিক ও হাইব্রিড গাড়ি চার্জ করার সুবিধা, সাইকেল পার্কিং ইত্যাদি বিশেষত্বের সার্থক উপস্থিতি সিম্পলট্রি আনারকলিকে এনে দিয়েছে U.S.G.B.C. [United States Green Building Council] কর্তৃক প্রদত্ত বাংলাদেশের প্রথম বাণিজ্যিক ভবনের LEEDÓ GOLD সনদের গৌরব। ভবনটির নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটির পূর্ণ ব্যবহার শুরু হয়ে গেছে এবং আশানুরূপভাবে এটি পরিবেশবান্ধব নির্মাণ হিসেবে প্রমাণ রাখছে।

স্থপতি লুই কানের দর্শন ও কাজগুলো আমাকে সবসময়ই অনুপ্রাণিত করে। সে অনুপ্রেরণাতেই আমার আজীবন অনুশীলন আর শেখার চেষ্টা বহাল আছে। সিম্পলট্রি আনারকলি আমার নিরলস সে প্রচেষ্টায় একটি মাইলফলক অবশ্যই। রেখা ও তলের জ্যামিতিক প্রয়োগ, স্বস্তিদায়ক সেটব্যাক এগুলো নিয়ে কাজ করতে আমি পছন্দ করি। সহজভাবে বলতে পারি, আমার অনুভূতি ও দর্শনকে এ নির্মাণে আমি বহুলাংশে ধরতে পেরেছি। আজকের এ বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে ঢাকার গুলশান এভিনিউর দুই পাশজুড়ে এক নব্য নগর সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। এ নতুন নগর ধারার সবই যে মৌলিক ও শাশ্বত তা নয়। অনেক চাকচিক্য ও বাহুল্যের ভিড়ে যে আশা ও সত্যিকার উন্নয়নের আশ্বাস আছে, তাকেই লক্ষ করে আমার এগিয়ে যাওয়ার প্রয়াস এ সিম্পলট্রি আনারকলি। আমি মনে করি, নতুন ধারার সূচনায় প্রগতিশীলতার প্রেরণা আনতে এ ভবনটি বিশেষ অবদান রাখছে। সর্বস্তরের মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত প্রশংসা থেকে আমি এ ধারণা করতে পারি।

 

লেখক: স্থপতি ও প্রিন্সিপাল, ভলিউমজিরো লিমিটেড