২০ বছর আগেও ঢাকা থেকে ৪০ কিলোমিটার উত্তরে দুই একর জমির ওপর অবস্থিত এ জায়গাটি সাধারণ একটি গ্রামীণ জনপদ হিসেবেই পরিচিত ছিল। তখনো নাগরিক জীবনের রেশ পৌঁছাতে শুরু করেনি এসব অঞ্চলে। স্থানীয়রা চাষাবাদ, কৃষিকাজের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করত। সময়ের পালাবদলে জায়গাটি এখন সাব-আরবান বা উপনগর হিসেবে পরিচিত। যার উত্তর এবং পূর্বদিকে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণী নিজেদের বসতি গড়ে তুলেছে। গাজীপুরের এ জায়গাটিতে যেখানে ‘অবকাশ ঘর’টি অবস্থিত, তার দক্ষিণ ও পশ্চিম পাশে রয়েছে কৃষিজমি, যা দেখে ২০ বছর আগের একটি দৃশ্যপট মনে মনে সাজিয়ে নিতে পারবে যে কেউ। তাই ভ্যাকেশন হাউজটির নকশা করার আগে যে বিষয়গুলোর ওপর আমি গুরুত্ব দিয়েছি, তা হলো এর চারপাশের উন্মুক্ত জায়গাগুলোর সংরক্ষণ। তিন তলাবিশিষ্ট এ ভ্যাকেশন হাউজটি নকশা করা হয়েছে ৪০র্ × ৪০র্ (১২ মি × ১২ মি) বর্গক্ষেত্রের ওপর ভিত্তি করে। নিসর্গের নিবিড়তায় প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করার জন্য বাড়ির দক্ষিণে রাখা হয়েছে একটি ছিমছাম ছোট জলাশয় বা পুকুর। বলা যায়, বাড়িটির সীমানাঘেঁষেই রয়েছে পুকুরটি। বাড়ির আঙিনা থেকে পুকুরের ঘাট পর্যন্ত পৌঁছতে আগ্রহী ব্যক্তিটিকে অবশ্য বেশ কয়েকটি ধাপ (সিঁড়ি) পার হতে হবে।

ঘনাকৃতির এ বাড়িটি আরসিসি ফ্রেম কাঠামোর ওপর নির্মিত। বিম আর কলামগুলোয় আলাদা করে আরসিসি ফুটিংস ব্যবহার করা হয়েছে। তাছাড়া সম্মুখভাগের কলাম, বিম ও সিলিংয়ে ৩০ শতাংশ হোয়াইট সিমেন্টের সঙ্গে ব্যবহার করা হয়েছে পোর্টল্যান্ড সিমেন্ট (বিলাতি মাটি)। বাড়িটির রূপবর্ধনের জন্য কোনো ধরনের প্লাস্টার বা পেইন্ট ব্যবহার করা হয়নি। কোনো ধরনের ম্যাটেরিয়াল ব্যবহার না করে বাড়িটির দরজা, ক্যাবিনেট, সিঁড়ি এবং ভেতরের দরজাগুলো তৈরিতে কাঠ ব্যবহার করা হয়েছে। তবে জলবায়ু আর আবহাওয়ার দিকটি বিবেচনায় এনে বাইরের দিককার জানালাগুলো তৈরি করা হয়েছে অ্যালুমিনিয়াম ব্যবহার করে। রেলিংয়ে স্টেইনলেস স্টিলের সঙ্গে রাখা হয়েছে কাঠ দিয়ে তৈরি পাত বা রড। বাড়িটির চারপাশে রয়েছে সবুজ লন।

প্রকল্পটি স্থাপত্যিকভাবে তাত্পর্যপূর্ণ। চারদিকেই সমান জোর দেয়া হয় প্রকল্পে, যেন দালানটির চারটি সম্মুখ ভাগ রয়েছে। কঙ্কাল কাঠামো হিসেবে আরসিসি ফ্রেম স্ট্রাকচার করা হয় এবং দৃশ্যগত স্পষ্টতা ও স্বচ্ছতার জন্য চার কোণ ও অন্য স্থান উন্মোচিত রাখা হয়। স্বতন্ত্র পরিচয় ও স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কাঠামোগত ফ্রেমের বাইরে নন-লোড বিয়ারিং ইটের দেয়াল ব্যবহার করা হয়। কোনো ঝামেলা ছাড়াই কংক্রিট মেম্বারের সঙ্গে সমানুপাতিকভাবে ইটের কাজ ব্যবহূত হয়। ভেতর-বাইরে দৃষ্টিগত আগ্রহ সৃষ্টিতেও কাঠামোগত ফ্রেমের সঙ্গে ইটের কাজের সম্মিলন ঘটানো হয়।

জলবায়ুগত প্রতিক্রিয়া বিবেচনায় নিয়ে এ দালানের নকশা উন্নয়ন করা হয়। প্রতিটি কক্ষে অন্তত দুদিক থেকে পর্যাপ্ত আলো ও বাতাস আসার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। অভ্যন্তরীণ সব পরিসরে ক্রস ভেন্টিলেশন পাওয়া যায়। প্রথমত. এটি পাওয়া যায় টেরেসের দিক থেকে। দ্বিতীয়ত. দালানের দক্ষিণাংশের মেঝের দিক থেকে। গরম-আর্দ্র জলবায়ুগত অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে আলোচ্য দালানে স্বস্তিকর পরিসর নিশ্চিতে রিব-বিম ব্যবহার করা হয়েছে।

ঐতিহ্যগত ব্যবহার থেকে পানিপ্রবাহের সঙ্গে দালানের ঘাট সংযোগ উন্নয়ন করা হয়। ঘাটের পাশে একটি গাছ আছে। যেহেতু ছুটির দিন বা অবকাশে বাড়ির মালিক দালানটি ব্যবহার করবেন, সেহেতু দালানটির নিচতলা ও ঘাটসহ উন্মুক্ত পরিসরটি সপ্তাহে পাঁচদিন বিকাল ৪টা থেকে ৭টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য খোলা রাখা হয়। ফলে ব্যক্তিগত বাড়িটি একটি সম্প্রদায়গত স্থাপনায় রূপান্তরিত হয়েছে। এভাবে প্রকল্পটি সংলগ্ন মানুষের মধ্যে একটি ইতিবাচক প্রভাব রেখেছে। (ভাষান্তর)

 

লেখক: স্থপতি ও অধ্যাপক