স্থাপত্য সাধনারই আরেক নাম। সংগীত, চিত্রকলা কিংবা সাহিত্যের মতো সৃজনশীল একটি পেশা স্থাপত্য। তবে স্থাপত্য একই সঙ্গে ধারণ করে ইতিহাস, প্রযুক্তি, সংস্কৃতি এবং শিল্পীর শিল্পবোধ। প্রথাগত শিক্ষায় হয়তো ‘স্থপতি’ ডিগ্রি লাভ করা যায় কিন্তু প্রকৃত স্থপতি হতে হলে প্রয়োজন সাধনা আর স্থাপত্যের প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা। স্থপতি মেরিনা তাবাসসুমের সে দীর্ঘ সাধনার স্বীকৃতি তার ‘আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার-২০১৬’। তিনি তার এক সাক্ষাত্কারে বলেছিলেন, ‘স্থাপত্যচর্চাকে আমি কাজ মনে করি না, এটা আমার নেশা।’
স্থাপত্যের ভুবনে নোবেলতুল্য ‘প্রিত্জকার স্থাপত্য পুরস্কার’, এর পরই অত্যন্ত সম্মানজনক পুরস্কার ‘আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার’, যা ১৯৭৭ সালে চতুর্থ আগা খান কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত ‘আগা খান ডেভেলপমেন্ট নেটওয়ার্ক’-এর স্থাপত্যবিষয়ক একটি সম্মাননা। প্রতি তিন বছর পর ইসলামিক সমাজের প্রয়োজন এবং উচ্চাশা ধারণ করে নির্মিত স্থাপনাকে স্বীকৃতিস্বরূপ একাধিক প্রকল্পকে এ পুরস্কার দেয়া হয়, যার আর্থিক মূল্য ১০ লাখ মার্কিন ডলার। পুরস্কারটিতে স্থাপত্যে শ্রেষ্ঠত্ব, পরিকল্পনা এবং ঐতিহাসিক স্থান সংরক্ষণকে গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি স্থাপত্যের মাধ্যমে সামাজিক প্রত্যাশা পূরণের বিষয়টিও বিবেচনা করা হয়। এ পর্যন্ত তিনটি স্থাপনা জাতীয় সংসদ ভবন, গ্রামীণ ব্যাংক হাউজিং প্রকল্প ও রুদ্রপুর মেটিস্কুল ‘আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার’ লাভ করে, যেখানে তিনজনই ছিলেন বিদেশী স্থপতি। বাংলাদেশের প্রথম দুজন স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম ও কাশেফ মাহ্বুব চৌধুরী স্থাপত্যে অনন্য সম্মান ‘আগা খান স্থাপত্য’ লাভ করেন। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ৩৪৮টি প্রকল্পের মধ্য থেকে ১৯টি প্রকল্পকে চূড়ান্ত মনোনয়নের জন্য বাছাই করা হয়, যেখানে স্থাপত্যের স্বকীয়তায় স্থান করে নেয় স্থপতি মেরিনা তাবাসসুমের ঢাকার ‘বায়তুর রউফ মসজিদ’ এবং স্থপতি কাশেফ মাহবুব চৌধুরীর গাইবান্ধার ‘ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার’।
১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় প্রায় তিন হাজার ছাত্রছাত্রীর মধ্যে প্রথম স্থান লাভের মধ্য দিয়ে স্থাপত্যে যাত্রা করেন মেরিনা তাবাসসুম। ১৯৯৫ সালে ডিজাইনে সবচেয়ে বেশি নম্বরপ্রাপ্তির জন্য হাবিবুর রহমান স্বর্ণপদক লাভের মধ্য দিয়ে শেষ করেন বিশ্ববিদ্যালয় জীবন। পাস করার পর কিছুদিন তিনি কাজ করেন স্থপতি উত্তম কুমার সাহার সঙ্গে। ১৯৯৫-এর শেষ দিকে তিনি তার বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠী কাশেফ মাহবুব চৌধুরীকে সঙ্গে নিয়ে গড়ে তোলেন ‘আরবানা’ নামে স্থাপত্য উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান। পরের বছরই তাদের নকশা জয়লাভ করে সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে ‘স্বাধীনতা জাদুঘর ও স্বাধীনতা স্তম্ভ’-এর উন্মুক্ত স্থাপত্য নকশা প্রতিযোগিতা। ২০০১ সালে ভারতের ভাইস প্রসিডেন্টের কাছ থেকে জে.কে সিমেন্ট অ্যাওয়ার্ড পান মেরিনা তাবাসসুম। ২০০৪ সালে তিনি পান ‘অনন্যা শীর্ষ দশ’ পদক। নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য ও পরিচয় নিয়ে কাজ করার তাগিদে ২০০৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন নিজের স্থাপত্যচর্চার প্রতিষ্ঠান ‘মেরিনা তাবাসসুম আর্কিটেক্টস’। সেদিন থেকে স্থাপত্যের ভুবনে শুরু হয় মেরিনা তাবাসসুমের যাত্রা। একজন নারী হয়েও সে যাত্রায় তিনি শুধুই স্থপতি। নিজেকে কখনো তিনি নারী স্থপতি হিসেবে পরিচয় দেন না, সেটা পছন্দও করেন না।
২০০৫ থেকে ২০১৬। অনেক প্রতিকূলতা, প্রতিবন্ধকতার ভেতর দিয়ে একটু একটু করে ‘মেরিনা তাবাসসুম আর্কিটেক্টস’ আজ বিশ্বপরিচিত একটি স্থাপত্য উপদেষ্টা প্রতিষ্ঠান। ধানমন্ডির একটি ছোট পরিসরে অল্প কয়েকজন নবীন স্থপতি নিয়ে তার ডিজাইন স্টুডিও। প্রকৃত অর্থে ডিজাইন স্টুডিও বলতে যা বোঝায়, ‘মেরিনা তাবাসসুম আর্কিটেক্টস’ সে রকমই একটি প্রতিষ্ঠান। প্রচুর স্কেস, ড্রইং, মডেল তৈরি করেন প্রতিটি প্রকল্পের জন্য। তারপর প্রকল্পটির কাজ শুরু হলে চলে বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে এক্সপেরিমেন্ট। ফ্লোর থেকে শুরু করে রুফ কোনো কিছুই বাদ যায় না তার ভাবনা থেকে। প্রতিটি অনুষঙ্গ যেন হতে হবে স্বাতন্ত্র্য। তাই তো তার প্রতিটি প্রকল্প যেন এক একটি গল্প এবং প্রতিটি একে অন্যের থেকে আলাদা। লালমাটিয়ায় নিজেদের অ্যাপার্টমেন্ট ‘এ৫’, গুলশানের রেসিডেন্স ‘নেক ১০’, স্বাধীনতা জাদুঘর, বনানী ‘কমফোর্ট রিভেরি’ অ্যাপার্টমেন্ট আর যশোর পানিগ্রাম রিসোর্ট প্রতিটি প্রকল্পে পাওয়া যায় স্থপতির স্থাপত্যের প্রতি দরদ, সাধনা আর শিল্পীর সৃজনশীলতা। তারই ধারাবাহিকতা আমরা দেখতে পাই ঢাকার দক্ষিণখানের ফায়েদাবাদ এলাকায় নির্মিত ‘বাইতুর রউফ মসজিদ’ প্রকল্পটিতে, যে প্রকল্পটির কারণে তিনি লাভ করেন ‘আগা খান স্থাপত্য পুরস্কার-২০১৬’। সুলতানি আমলের স্থাপত্যের অনুপ্রেরণা আর সঙ্গে নিজস্ব স্বকীয়তা এ দুয়ে মিলে তৈরি মসজিদটি।
১২০৪ থেকে ১৫৭৫ খ্রিস্টাব্দকে বলা হয় সুলতানি আমল। ১৫৭৫ থেকে ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দ মোগল আমল। তারপর শুরু হয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্য। সুলতানি আমলের মসজিদগুলো— বাগেরহাটের ষাট গম্বুজ, এক গম্বুজ, নয় গম্বুজ মসজিদ, ঝিনাইদহের বড়বাজারের জোড় বাংলা মসজিদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের দারাসবাড়ি, ছোটসোনা, রাজবিবি মসজিদ, রাজশাহীর বাঘা মসজিদ ইত্যাদি। মোগল আমলের মসজিদগুলো— টাঙ্গাইলের আতিয়া মসজিদ, চাঁপাইনবাবগঞ্জের শাহ নিয়ামুতল্লাহ মসজিদ, ঢাকার ষাট গম্বুজ মসজিদ, লালবাগ মসজিদ ইত্যাদি। ব্রিটিশ শাসনামলে তৈরি মসজিদগুলোর মধ্যে পুরান ঢাকার তাঁরা মসজিদ, আমিনবাজারের দেওয়ানবাড়ী মসজিদ অন্যতম। এ সময় মসজিদ তৈরির প্রধান উপকরণ ছিল মাটির তৈরি ইট এবং চুন-সুরকি। স্বভাবতই ইট দিয়ে ভবন তৈরিতে আর্চ আর ডোমের বিকল্প ছিল না। কিন্তু ৭৫৪ বর্গমিটারের ‘বাইতুর রউফ’ মসজিদটির বিশেষত্ব হলো পরিচিত আর্চ, ডোম বা মিনার নেই। কেননা ইট এখানে প্রধান কাঠামো ধারক নয়, কাঠামোটি চতুর্দিকে আটটি কলামের ওপর বসানো। মসজিদের প্ল্যানটিতে একটি স্কোয়ারের ভেতর একটি সার্কেল, তার ভেতর আরেকটি ৫০ ফুট ^ ৫০ ফুটের স্কোয়ার। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে রেইনফোর্স কংক্রিট দিয়ে তিনি কলাম ফ্রি ৫০ ফুট ^৫০ ফুটের একটি প্রার্থনা কক্ষ তৈরি করেছেন, যেটি ১৩ ডিগ্রি কোনাকুনি করে বসে আছে কিবলামুখী হয়ে। আবার এ কক্ষটির চতুর্দিকে উপর থেকে আনা হয়েছে সূর্যের আলো। অনেকটা দিনের বিভিন্ন সময়ে সূর্যের অবস্থান পরিবর্তের সঙ্গে আলোর তীব্রতা আর বিচ্ছুরণ যেন খেলা করে হাতে তৈরি ইটের বৃত্তাকার প্রকোষ্ঠে। মসজিদের বাইরের দেয়ালে ব্যবহার করেছেন ইটের জালি, যেন বাতাস ছুঁয়ে যায় প্রার্থনারত মানুষের হূদয়। প্রার্থনা কক্ষটির ফ্লোরে ব্যবহার করেছেন পাথরের গুঁড়ার মোজাইক, কাচের বিভাজন রেখার সমন্বয়ে। পেলাস্টারবিহীন ছাদে এলোমেলো কাটাকাটিতে যেন লুকিয়ে রয়েছে অদ্ভুত ছন্দ। অন্ধকার রাতে নক্ষত্রখচিত আকাশ যেন উঁকি দেয় মসজিদের ছাদে। মসজিদ যেন একটি ভবন নয়, যেন একখানি কবিতা; সেতারে বেজে ওঠা সুর। যে সুর ছুঁয়ে যাবে একাগ্রচিত্তে প্রার্থনারত মুসল্লির হূদয়।
ইট আর কংক্রিটের ভবন, শুধু স্থাপনা নয়। এটি স্থপতির সৃষ্ট শিল্পকর্ম। সবুজ ক্যানভাসে বসানো ভাস্কর্য। ভাস্কর্য আর স্থাপত্যের পার্থক্য হলো, স্থপতিরা সেখানে প্রাণের সঞ্চার ঘটানোর চেষ্টা করেন। সবাই সেটা পারে না, কিন্তু কেউ কেউ সেটা পারেন। ‘বাইতুর রউফ মসজিদ’ তেমনি একটি স্থাপত্য, যেখানে স্থপতি মেরিনা তাবাসসুম ইট আর কংক্রিটের ভবনে প্রাণের সঞ্চার ঘটিয়েছেন।
লেখক: স্থপতি






