জমিটিতে ছিল দুটি গাড়ির শোরুম। একটি বিখ্যাত এইচএনএস অটো আর অন্যটি জমির মালিকের নিজস্ব ইমপেটাস অটো। জমির মালিক আরিফ ভাই আমেরিকায় পড়াশোনা করে কানাডার সিটিজেনশিপ নিয়ে দেশে এসেছেন মনমতো কিছু কাজ করার জন্য। তিনি আমাদের সঙ্গে দিনের পর দিন সময় দিয়ে দাঁড় করালেন ‘ইমপেটাস সেন্টার’। নিজেই দিন-রাত লেগে থেকে জটিল একটি কনস্ট্রাকশন শেষ করলেন। জটিল বলছি এজন্য যে, এইচএনএসকে চালু রেখেই কাজের অর্ধেকটা শেষ করা হয়েছে। এজন্য বেজমেন্টের একটা অংশ টপ ডাউন পদ্ধতিতে করা হয়েছে। আমাদের এখানে সাধারণত বেজমেন্ট করার জন্য পুরো জমির মাটি খুঁড়ে গর্ত করে ফেলা হয়। কিন্তু টপ ডাউন পদ্ধতিতে আগে ফ্লোর করে পরে নিচের মাটি খোঁড়া হয়। শুনতে বেশ আজব আর বুঝতেও বেশ কঠিন এ পদ্ধতিটা আসলে খুবই সহজ আর আমাদের ঢাকা শহরের জন্য খুবই কার্যকর। জীবনের প্রথম কনস্ট্রাকশন করতে নামা আরিফ ভাইয়ের জন্য এ রকম একটা অপ্রচলিত পদ্ধতিতে কাজ করার সাহস করা ছিল আমাদের কাছে একটা বিস্ময়কর ঘটনা। আমাদের কাছে আরিফ ভাইয়ের চাওয়া ছিল সব রকমের আধুনিক সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন একটি রুচিশীল অফিস কমপ্লেক্স ডিজাইন। আর আরিফ ভাইয়ের কাছে আমাদের চাওয়া ছিল দেশের জন্য উপযোগী যে রকম কাজ করতে আমরা চেষ্টা করছি, তার পরিপূর্ণ প্রয়োগের সুযোগ দেয়া। মানে আমাদের জলবায়ুর সঙ্গে মানানসই আধুনিক কর্মপরিবেশ তৈরি করা। এখানকার জলবায়ু খুবই বন্ধুভাবাপন্ন। মরুভূমি বা বরফের দেশের মতো বদ্ধ ভবন এখানে দরকার নেই। ঠাণ্ডার দেশে কাচ দিয়ে মোড়ানো ভবন পরিবেশবান্ধব হলেও আমাদের দেশের জন্য তা নয়। চারদিক কাচ দিয়ে ঘেরা ভবন গ্রিনহাউজ পদ্ধতিতে গরম ধরে রাখে। তাই তাদের হিটিং খরচ কমে যায়। আর আমাদেরকে যেহেতু ভবন ঠাণ্ডা করার জন্য এসি ব্যবহার করতে হয়, আমাদের ক্ষেত্রে হয় উল্টো। অর্থাৎ কুলিং লোড বেড়ে যায়, সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিনের বিদ্যুতের ব্যবহারও বাড়তে থাকে আনুপাতিক হারে আর কার্বন নিঃসরণের কথা না হয় না-ই বললাম। এ দেশে উত্তর দিকে ইচ্ছামতো কাচ ব্যবহার করা গেলেও অন্যান্য দিকগুলোয় যথাযথ বারান্দা বা শেড দরকার। এছাড়া একটা অফিস কমপ্লেক্স মানে একই ভবনে অনেকগুলো অফিস, মানে অফিসপাড়া। এখানে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ কাজ করতে আসবে। দিনের তিন ভাগের এক ভাগ সময় তারা এখানেই কাটাবে। তাই এখানকার পরিবেশ যতটা ভালো করা যাবে, তাদের কাজের মানও তত বাড়বে। প্রায় আট-নয়শ মানুষ এখানে কাজ করবে। ছোটখাটো একটা স্কুল বা কলেজের সমান জনসংখ্যা। তাই তাদের কাজের জায়গা যেমন খোলামেলা ও আলো-বাতাসময় হওয়া দরকার, তেমনি একটা ক্যাম্পাসের অন্য সুযোগ-সুবিধাও তাদের দরকার।

সারা বিশ্বেই এখন কাজের পরিবেশ নিয়ে অনেক নতুন নতুন আইডিয়ার চর্চা চলছে। বড় বড় কোম্পানি তাদের কর্মী বাহিনীর কাছ থেকে কোয়ালিটি কাজ পাওয়ার জন্য আনন্দময় কর্মপরিবেশের ওপর গবেষণা করছে। প্রচলিত কেজো টাইপের অফিস ভবনের পরিবর্তে প্রাণবন্ত প্রকৃতির ছোঁয়াময় কিছুটা ঘরোয়া আপন টাইপের ডিজাইন নিয়ে কাজ চলছে সবখানে। এছাড়া সুউচ্চ ভবনের প্রভাবে পশ্চিমা দেশগুলোয় মাটির সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ার কারণে মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এসব চিন্তার সমন্বয় ঘটাতে চেয়েছি আমরা এখানে। জমিটা উত্তরমুখী হওয়ায় ভবনের সামনের অংশে আমরা যথেষ্ট কাচের ব্যবহার করেছি। আর পূর্ব দিকটায় ধাপে ধাপে বাগান উঠে গেছে ছাদ পর্যন্ত। এ টেরাস গার্ডেনগুলো প্রতিটি ফ্লোরকেই মাটির সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। প্রাকৃতিক আলো-বাতাস নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোদ-বৃষ্টি থেকে দিচ্ছে সুরক্ষা। পশ্চিমে লিফট, সিঁড়ি, টয়লেট জোন গরমের হাত থেকে বাঁচাচ্ছে ভেতরের বাসিন্দাদের।

ভবনের প্রবেশ পথে রয়েছে খোলা চত্বর। একসঙ্গে এত মানুষের আনাগোনাকে ধারণ করার মতো আয়তনের এ চত্বরে যাতায়াতের অংশের পাশেই আছে ভিড় থেকে সরে এসে বন্ধুদের সঙ্গে একটু আড্ডা দেয়ার মতো ছায়াময় আঙিনা। যেখান থেকে খোলা সিঁড়ি উঠে গেছে দোতলার রেস্টুরেন্টে, কফি খেতে খেতে আড্ডা বা ছোটখাটো মিটিং সেরে ফেলার মতো আদর্শ জায়গা। আজকাল ফরমাল মিটিংয়ের পাশাপাশি ইনফরমাল মিটিংয়ের চাহিদাও বাড়ছে। তাই প্রতিটি অফিস ইউনিটের বাগানসহ খোলা টেরাসগুলো এ ধরনের মিটিং স্পেসে ভিন্ন মাত্রা আনতে পারে। আর ছাদের বিশাল সুইমিংপুল, জিম আর বাগান, রেস্টুরেন্ট এ ডিজাইনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রতিদিনের কর্মব্যস্ততার পর হাতের কাছেই জিম আর সুইমিংপুল পুরো লিংক রোড এলাকার অফিসপাড়াতেই অন্যতম আকর্ষণ হতে পারে। গাছপালা, পানি আর আকাশ এ ভবনের প্রধান সম্পদ। দেড় বিঘা জমিতে এত মানুষের কর্মচাঞ্চল্যকে ধারণ করার পরও প্রায় এক বিঘা বাগান তৈরি করে প্রকৃতির কাছে ঋণ শোধের চেষ্টা করেছি।

 

লেখক: স্থপতি