সত্তরের দশকে প্রথমাংশে আমার কৈশোরের একটি অংশ কেটেছে বরিশাল। ছিমছাম নিরিবিলি এ শহরের যেখানে আমার বসতবাড়ি, তার কিছুটা দূরে রাস্তার এক প্রান্তে মুসলিম সমাধি ভূমি। মাঝে মধ্যে খুব সকালে একা একা হেঁটে যেতাম অনেক দূরে। রাস্তার পাশে কিছু কিছু বনেদি পরিবারের বড় বড় লাল ভবনের আঙিনায় শিউলি ফুলের গাছের নিচে সেই সকালে ফুল ঝরে পড়ত। পুজোর জন্য কিছু হিন্দু নারী ও শিশু সেই ফুল কুড়িয়ে নিত। ওদের দেখাদেখি আমার চলার পথে আমিও কুড়িয়ে নিতাম। আমার চলা শেষ হতো মুসলিম গোরস্তানে। কখনো কখনো কৌতূহলবশত কিছুটা ভেতরে প্রবেশ করতাম। সবচেয়ে পুরনো কবরগুলো, বিশেষ করে ব্রিটিশ সময়কার কবরগুলো শুরুতেই চোখে পড়ত। তাতে ইংরেজি বা বাংলায় মৃতের নাম, কখনো অহঙ্কারী পরিচয়, উপদেশ, অনুভূতি, আকুতির পঙিক্ত থাকত। আমার কিশোরমনে এক ভিন্ন অনুভূতি কাজ করত। গোরস্তানের গেট দিয়ে মাঝ বরাবর ছোট মসজিদের মতো একটি সমাধিঘর চোখে পড়ত। বন্ধুরা বলত, ওটা বরিশালের তাজমহল। পরে জেনেছি, ওটা আসলে একজন ভদ্রলোকের প্রিয়তমা স্ত্রী ও তার প্রথম সন্তানের কবর। স্ত্রী সন্তান প্রসবকালে মৃত্যুবরণ করেন। ওদের দুজনের কবর রয়েছে সেখানে। বেগম মমতাজের মৃত্যুর মতো এমন মৃত্যুর কারণে এ সমাধিকে সবাই তাজমহল বলত। ওই কৈশোরে সেই সকালে এক অদ্ভুত অনুভূতি আমাকে আলোড়িত করত। ভাবতাম, এই গোরস্তানে যারা শুয়ে আছে, তারা সবাই একসময় আমার মতো ঘুরে বেড়াত এ পৃথিবীতে।
আজ তারা সবাই শুয়ে আছে এখানে। আমাদের একদিন এভাবে শুয়ে থাকতে হবে হয়তো এখানে। এমন সত্যটা সেই কৈশোরে আমাকে কষ্ট দিত। মন খারাপ করে বাড়ি ফিরতাম। বড় হয়ে এখনো মাঝে মাঝে নানা সমাধিতে ঘুরে বেড়াই। দেখি মানুষের এ পৃথিবীর মায়াজাল ছিন্ন করে যাওয়ার বা যেতে না দেয়ার আকুতি বা অনুভূতি ত্রিমাত্রিক একটি স্থাপনায় কেমন করে যুগের পর যুগ মানুষ প্রকাশ করে আসছে, তা অবলোকন করা। এ সমাধিগুলো আমাদের একটি চরম সত্যের কথা মনে করিয়ে দেয়। তা হলো মৃত্যু।
মৃত্যুকে আদিকাল থেকেই নানাভাবে মানুষ সঙ্গায়িত করে যাচ্ছে। মৃত্যুকে এবং মৃত্যুর পরবর্তী অধ্যায় বা অদেখা অজ্ঞাত কোনো লোক বা কালকে কল্পনায় দর্শনে মূর্ত, বিমূর্ত নানাভাবে উপলব্ধির এক নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে ক্ষণস্থায়ী মানুষ। প্রাচ্য-পাশ্চাত্য দর্শন, ধর্মীয় মতবাদ, ব্যক্তিগত উপলব্ধি দিয়ে আসছে নানা ব্যাখ্যা। এ দেশে, ভারতে ও প্রাচ্যে ব্যাখ্যা খুঁজে ফেরার প্রচেষ্টা দেখি। রুমি, লালনের পঙিক্তমালায় নানা ভাব ও প্রশ্ন আমাদের ভাবিয়ে তোলে।
খাঁচার ভেতর অচিন পাখি
কেমনে আসে যায়।।
কিংবা
বাড়ির কাছে আরশি নগর, সেথা এক পড়শি
বসত করে, আমি একদিন না দেখিলাম তারে! (লালন)
“All buildings are but monuments of death,
All clothes but winding-Sheets for our last knell...
(James Shirley 1596-1666)
“We hasten towords one end.
Death summon all under its Laws:
(Publius Ovidius Naso 43BC-AD17)
সম্প্রতি ২১ থেকে ২৫ মে ভারতের জয়পুরে অনুষ্ঠিত ১৯তম আর্কেশিয়া (আর্কিটেক্টস রিজিওনাল কাউন্সিল এশিয়া) ফোরামে আর্কেশিয়া অ্যাওয়ার্ড ফর আর্কিটেকচার ২০১৭তে একটি বিভাগে স্বর্ণপদক পেয়েছেন বাংলাদেশের স্থপতি রফিক আজম। যে স্থাপনাটির জন্য স্থপতি রফিক স্বর্ণপদক পেলেন, সেটি একটি পারিবারিক কবরস্থান। স্থাপনাটির অবস্থান নোয়াখালী জেলার বটখিল গ্রামে। আকারে ছোট এ স্থাপনাটিই এবার ‘পাবলিক অ্যামেনিটি বিল্ডিংস-স্পেশালাইজড’ বিভাগে স্বর্ণপদকে নির্বাচিত হয়।
কংক্রিটের তৈরি একটি লম্বাটে স্থাপনা, যার ছাদ ও দুই পাশের দেয়াল কংক্রিটের। সামনে ও পিছে কোনো দেয়াল নেই। পুরোপুরি উন্মুক্ত। মেঝেতে শুধু একটি লম্বাটে বেঞ্চ, যেখানে বসে সামনের প্রসারিত সমাধিভূমির সবুজ ঘাসের গালিচা দেখা যায়। তাতে পাশাপাশি দুটো সাধারণ কবর, যা সবুজ চত্বরের মাঝে সাধারণ অপ্রকট একটি অংশ হয়ে মিশে গেছে। শান্ত নিরিবিলি সবুজ সমাধি চত্বরে দু-একটি গাছ ছড়িয়ে ছিটিয়ে একা একা দাঁড়িয়ে আছে। বসার বেঞ্চির সম্মুখে সমাধিভূমি আর পেছনের দিকে তাকালে দেখা যাবে ওধারে প্রবেশপথের দিকে কর্মব্যস্ততাপূর্ণ জীবনের উপস্থিতি। নিত্যকার নৈমিত্তিক চলাফেরা আর জীবনের কোলাহল। এমন স্থাপনা
নির্মাণের বিষয়ে রফিকের ভাবনা কী ছিল, সেটা জানা যাবে একটি দৈনিকে প্রকাশিত তার সাক্ষাত্কারে। রফিককে ২০১২ সালের দিকে সালাহউদ্দিন আহমেদ তাদের গ্রামের বাড়ির পারিবারিক অবহেলিত অবস্থায় পড়ে থাকা কবরস্থানটির জন্য একটি নকশা প্রণয়নের অনুরোধ জানান। এর পর থেকেই রফিক আজম কবরস্থান, সমাধি, মানুষের জীবন-মৃত্যু নিয়ে চিন্তাভাবনা শুরু করলেন। রফিক বললেন, লালন সাঁইয়ের একটি তত্ত্ব তাকে প্রভাবিত করেছিল। সেই তত্ত্ব অনুযায়ী শরীর ও মন (আত্মা) দুটি আলাদা হলেও যখন একসঙ্গে থাকে, তখনই মানুষ জীবন্ত হয়ে ধরা দেয়। লালনের মতে, দেহের মধ্যে যদি তার (আত্মা/মন) বাস না-ই থাকে, তবে দেহের বাইরেও তার (মন/আত্মা) অস্তিত্ব নেই। মন যখন দেহ থেকে আলাদা হয়ে যায়, তখন শুধু নিথর দেহ পড়ে থাকে, সেটাকেই মৃত্যু বলা হয়।
রফিকের ভাষায়: ‘এ চিন্তা থেকেই আমার মাথায় কাজ করে যে, আসলেই তো জীবন এক পাশে প্রাণপ্রাচুর্যে ভরা, আর অন্য পাশে নীরব নিস্তব্ধ। একপাশে জীবনকে জাগতিক ও অস্থায়ী এবং অন্যপাশে মৃত্যুকে মহাজাগতিক বা স্বর্গীয় (celestial), অনন্ত ধরে এ দুই জগতের মাঝ বরাবর একটি রেখা টেনে বিভক্ত বা বিভাজন করেছি। এ রেখাটিকে ঊর্ধ্বমুখী করে, সম্প্রসারণ করে বড় আকারে একটি জানালার রূপ দিলাম, যা ওই দুই জগতকে বিভাজন করে, ঠিক তেমনি এ জানালার মাধ্যমের ইহজগত ও পরজগতের সংযোগ ঘটায়।’
এ কংক্রিটের সেলরূপী জানালাটির নিচের প্লাটফর্মটি একটি মধ্যবর্তী নীরব সুনসান স্পেস তৈরি করেছে, যেখানে আমাদের এ দুই জগত সম্পর্কে ভাবিয়ে তোলে। এক অব্যাখ্যাত অনুভূতির সৃষ্টি হয়।
এ দেশের সন্তান রফিককে লালন বা প্রাচ্য দর্শন যে প্রভাবিত করবে, সেটাই স্বাভাবিক। দর্শন, মৃত্যু ও পরবর্তী জীবন সম্পর্কে আমাদের ভাবনা ভারতীয় উপমহাদেশের সমাধি স্থাপনাগুলোকে ইউরোপীয় সমাধি থেকে আলাদা স্বকীয়তা দান করেছে। এই ভারতীয় সমাধি স্থাপনা অতীতে ইউরোপে কতটা প্রভাব ফেলেছিল, রফিকের স্থাপত্যের বিস্তারিত আলোচনার আগে এ অজানা অধ্যায়ের কিছুটা উল্লেখ করছি। অতীতে ইউরোপীয়রা ভারতে ব্যবসা করতে এসে ভারতের নানা অংশে, বিশেষ করে সুরাট, আগ্রায় ভারতীয়দের অনুকরণে খ্রিস্টানদের জন্য সমাধি গড়ে তুলেছিল। তারা মোগলদের মতো বিস্তৃত জায়গায় বড় বড় সমাধি নির্মাণ করেছিল। ভারতে অবস্থিত অনেক ইউরোপীয়র সমাধি ইংল্যান্ডের তুলনায় আয়তনে ব্যাপক ও বিশাল, সে সময় ইংল্যান্ডে যার উদাহরণ দুর্লভ। সুরাটে অবস্থিত সমাধিভূমি সব দর্শনার্থীকেই মুগ্ধ করেছিল। ঢাকায় নারিন্দা খ্রিস্টান সমাধিভূমিতে কলম্বো সাহেবের সমাধিটির কথা অনেকেই শুনে থাকবেন। সেটিও ঢাকায় আসা অনেক পর্যটক ও পাদ্রিকে বিস্মিত করেছিল। ১৬৮৩ সালে লন্ডন থেকে আসা ইংরেজ তরুণ স্থপতি জন ভ্যানবুর্গ সুরাটের সমাধিক্ষেত্র দেখে বিস্মিত হয়েছিলেন এবং এগুলোর অনেক ছবি এঁকেছিলেন, যা পরে বই আকারে গার্ডেন টেম্পল নামে প্রকাশিত হয়। ভ্যানবুর্গ ইউরোপেও ভারতের মাতা এ ধরনের সমাধিসৌধ নির্মাণ করার পক্ষে প্রচারণা চালিয়েছিলেন। তখন পর্যন্ত ইংল্যান্ডে এ বিষয়ে প্রায় কোনো ধারণাই ছিল না। এর ফলে আঠারো শতকে ইউরোপ ও ইংল্যান্ডে সবুজ বাগানবেষ্টিত পারিবারিক সমাধি নির্মাণ হয়ে উঠল একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ধারণাটি ভারত থেকে ভ্যানবুর্গের মাধ্যমে পুরো ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। উল্লেখ্য, ভ্যানবুর্গ সবুজ চত্বরে সমাধি নির্মাণের যে উচ্ছ্বাস ছড়িয়েছিলেন, তা প্যারিসের গ্রেট মেট্রোপলিটন সিমেট্রি তৈরির আগ পর্যন্ত ১০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে টিকে ছিল। ভারতীয় সমাধির এ বিশাল প্রভাব ইউরেপীয় ঐতিহাসিকরা দুঃখজনকভাবে এড়িয়ে বা উপেক্ষা করেছেন। ফেরা যাক, স্থাপতি রফিকের স্থাপত্য কর্মে।
স্থপতি রফিক আজম তার দর্শন বা ভাবনাগুলো তার প্রণীত নকশায় কিংবা সৃষ্ট স্থাপনায় যথার্থভাবেই প্রয়োগ করতে পেরেছেন। তার স্থাপত্যকর্ম একজন স্থপতি হিসেবে তার সেই দক্ষতার ছাপ স্পষ্ট হয়ে ধরা দিয়েছে। রফিকের এ স্থাপত্যকর্মের বড় দিক হলো এর আপাত সরলতা, শুদ্ধতা। মহৎ কাজের মধ্যে এমন গুণাবলি প্রায়ই লক্ষ করা যায়। এক জটিল দর্শনকে অপরিপক্ব জটিলতা পরিহার করে সর্বজনীন সরলতা ও শুদ্ধতায় কোনো শিল্পকর্মকে উপস্থাপন শুধু একজন দক্ষ শিল্পীর পক্ষেই সম্ভব। তার এ শিল্পকর্মের কোথাও কোনো অতিরিক্ত কিছুর সংযোজন নেই। নেই কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত চমক দেয়ার প্রয়াস। পুরো স্থাপনায় কোথাও কোনো অংশই প্রকট হয়ে ওঠেনি। আছে সেই রফিকের ভাষায় জানালা আর তার দুই ধারে দুই জগত। সমাধিভূমির সবুজ ঘাসের গালিচায় বর্তমান কবর দুটোর অবস্থান এবং তাদের আকৃতি প্রকট না হয়ে বরং সবুজ চত্বরের সঙ্গে একাকার হয়ে গেছে। কল্পনা করতে পারি, সমাধি চত্বরের সম্মুখের সড়ক দিয়ে হেঁটে যেতে কোনো ক্লান্ত পথিক রফিকের জানালারূপী স্থাপনার ছাদের নিচের বেঞ্চিতে এক মুহূর্তের জন্য বসে পড়বেন, জাগতিক সব ভুলে গিয়ে সব পিছে ফেলে কোনো সুনসান দুপুরে। সম্মুখে তার বিস্তৃত সমাধিভূমি। আমি নিশ্চিত এক অব্যাখ্যাত অনুভূতি এসে ভর করবে সেই পথিকের মনে। এক চরম সত্যের মুখোমুখি করে দেবে তাকে। রফিকের ওই ঐশ্বরিক জানালাটি সেই কাজটিই করে যাবে অনন্ত আগত দিনগুলোয়। রফিকের ভাবনায়, তার সৃষ্টির সার্থকতাই সেখানে। তাই এ অনন্যসাধারণ স্থাপত্যকর্মের আর্কেশিয়া পুরস্কার প্রাপ্তি খুবই স্বাভাবিক মনে হয়।
লেখক: স্থপতি ও গবেষক






