আমাদের গ্রামের বাড়িগুলোর দিকে লক্ষ করলে দেখা যায় যে, তাদের বিবর্তনের ইতিহাস আমাদের ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গি, উপলব্ধ উপাদান এবং কারিগরি দক্ষতা এসব স্থানীয় বিষয় দ্বারা প্রভাবিত। এ সূত্রে, গ্রামীণ স্থাপত্য প্রকৃতি ও তার উপাদানগুলোর প্রতি সংবেদনশীলতা প্রদর্শন করে অপরিবর্তিত রয়ে গেছে এবং সময়ের উত্তরণে নিজস্বতা নিয়ে বেঁচে আছে। ‘শাটল লুম শেড ফর আ্যাাম্বার ডেনিম’ প্রকল্পটিও মূলত বাংলাদেশের এসব প্রাকৃতধারা থেকেই অনুপ্রাণিত হয়েছে, যেখানে সাধারণ মানুষের জন্য উপযুক্ত একটি জায়গা তৈরি করা হয়েছে। প্রকল্পটি স্থানীয় মানুষের দ্বারাই নির্মাণ করা হয়েছে, যাদের স্থাপত্যবিষয়ক কোনো প্রশিক্ষণ অথবা পারদর্শিতা নেই বরং যারা বাড়িঘর বানানোর ক্ষেত্রে নিজেদের চাহিদা পূরণ এবং জলবায়ুগত উপযুক্ততাকে প্রাধান্য দিয়ে থাকে।
ঢাকার অদূরে অবস্থিত গাজীপুরের এ কারখানা প্রাঙ্গণে স্থাপনাটিকে একটি প্রাকৃতিক বিন্যাসে স্থাপন করা হয়েছে, যেখানে নকশার বিন্যাসকে যতটা সম্ভব সাধারণ এবং খোলামেলা রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। এ স্থাপনার ভেতরে বেশকিছু লুম মেশিন, বায়ার’স লাউঞ্জ, কর্মীদের জন্য খাবার ও নামাজের জায়গা এবং শৌচালয় রয়েছে। নকশা প্রণয়নের ক্ষেত্রে পুরোটা সময় যে বিষয়টিকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হয়েছে, তাহলো কীভাবে স্বল্প খরচে কাজটিকে সম্পন্ন করা যায়। একই সঙ্গে পরবর্তীতে ব্যবহারিক ক্ষেত্রেও জায়গাটি যেন স্বল্প খরচে রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়, সেটাও বিবেচনায় রাখা হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ বললে, এখানে একটি জলাধার তৈরি করা হয়েছে অভ্যন্তরীণ জায়গার আর্দ্রতা নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে। একইভাবে বাঁশের বেষ্টনী, উঁচু ছাদ এবং অন্যান্য ভার্নাকুলার বা স্বদেশীয় উপাদান ব্যবহারের কারণে প্রাকৃতিক বায়ু চলাচল ও আলোর প্রবেশ ঘটানো হয়েছে। এর ফলে এয়ার কন্ডিশনার ব্যবহার করতে হয়নি। এ ভবনের ভেতরে আর তাই বিদ্যুৎসাশ্রয় হয়েছে এবং জায়গাটিও স্থানীয় লোকজনের ব্যবহার উপযোগী হয়েছে।
এখানে নির্মাণে ব্যবহূত উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে প্রাকৃতিকভাবে টেকসই কংক্রিটের বেষ্টনী, হাতে তৈরি কংক্রিটের রুফিং টাইলস, বাঁশের স্ক্রিনিং ও বেষ্টনী এবং নিট সিমেন্ট ফিনিশের মেঝে।
প্রকল্পটির স্থপতি এ প্রকল্পটিকে ট্রপিকে অবস্থিত একটি কনটেম্পোরারি বা সমসাময়িক স্থাপত্যচর্চা হিসেবে দেখেছেন, যার অভ্যন্তরে তিনি আধুনিক সব সুযোগ-সুবিধা সরবরাহের পাশাপাশি স্বদেশীয় বৈশিষ্ট্যগুলোর মৌলিকত্বকে প্রাধান্য দেয়ার মাধ্যমে ট্রাডিশনাল মডার্নিজমের একটি নিদর্শন তৈরি করেছেন।
প্রকল্প পরিধি
এলাকার আয়তন- ১ হাজার ৮৩০ বর্গমিটার
নির্মিত এলাকা- ১ হাজার ৬৮ বর্গমিটার
আমরা বিশ্বাস করি, প্রকৃতির বুকে গাছপালা, বৃক্ষরাজি জন্মানোর সময় ভৌগোলিক অবস্থান, আবহাওয়া ও জলবায়ুর কারণে বিভিন্ন দেশের বাসস্থানের গাছপালার প্রকার ও গঠন যেমন বিভিন্ন রকমের হয়ে থাকে, সে রকম প্রকৃতির বুকে একটি স্থাপনা এবং ওই স্থানের ভৌগোলিক অবস্থান, আবহাওয়া ও জলবায়ু, ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। আমরা চেষ্টা করছি, আমাদের স্থাপনাগুলো যেন বাংলাদেশের আবহাওয়া, জলবায়ু, ইতিহাস ও সংস্কৃতি এবং স্থানীয় সহজলভ্য উপাদান এসব বিষয়কে সন্তুষ্ট করার পাশাপাশি সমসাময়িক বিশ্বস্থাপত্যের আধুনিকতাকেও প্রতিনিধিত্ব করে। এক কথায় বলতে গেলে, বাংলাদেশী আধুনিক স্থাপত্য করার চেষ্টা করছি আমরা।
আমাদের মনে হয়, নানা কারণে আমাদের স্থপতিরা অনেকটা শহরকেন্দ্রিক। আর্কিগ্রাউন্ডের পরিকল্পনা যদি বলতে হয়, তাহলে আমরা বলব, আমরা আরো নতুন নতুন প্রতিভাবান স্থপতিদের সমন্বয়ে আরো বড় পরিসরে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের মানুষের জন্য কাজ করতে চাই এবং বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের স্থাপত্যকে পরিচিত করতে চাই।
প্রকল্প প্রযুক্তি
ভিত্তি: পেডেস্ট্যাল আরসিসি
কাঠামো: ফ্রেম স্ট্রাকচার, ভূমির উপরে কলাম ও বিম হিসেবে এমএস ফাঁপা পাইপ ব্যবহার করা হয়।
পরিসর: মাঝে মধ্যে ইটের দেয়াল ও ব্যাম্বু স্ক্রিনিং দিয়ে ফাংশনাল স্পেস তৈরি করা হয়
ছাদ: ছাদের ট্রাসে সংকুচিত সিসি টাইলস ব্যবহার করা হয়। এছাড়া মূল সম্মুখভাগ প্রাকৃতিকভাবে বায়ু চলাচল উপযোগী রাখার জন্য ব্যাম্বু স্ক্রিন ব্যবহার করা হয়।
ফিনিস: অধিকাংশ ফিনিশিং সারফেসগুলো হাতে তৈরি, ফ্লোর ফিনিস হিসেবে সিসি মাইক্রো টাইলস ব্যবহার করা হয়
উপকরণ
১. ছাদের উপকরণ- সংকুচিত সিসি টাইলস, এমএস পার্লিং, স্ট্রাকচারাল ফ্রেম হিসেবে এমএস ট্রাস ব্যবহার
২. স্ট্রাকচারাল ভার্টিক্যাল হিসেবে এমএস পাইপ ব্যবহার
৩. পেভমেন্ট হিসেবে সংকুচিত সিসি টাইলস ব্যবহার
৪. ফ্লোর ফিনিস হিসেবে পরিচ্ছন্ন সিমেন্ট ব্যবহার
প্রকল্প ব্যয়
১ কোটি ২০ লাখ টাকা
স্থাপতিক ধারণা
গ্রামীণ বাংলাদেশের ভূমি ও পানির অন্তর্নিহিত বৈশিষ্ট্য থেকে এ ডিজাইন উৎসারিত, যেখানে ভূমি ও পানি একে অন্যের পরিপূরক। মূলত এটিই এ ডিজাইনের মূল ধারণা। শাপলাবেষ্টিত পুকুর ও লুম শেডের চারপাশে থাকা বৃক্ষরাজি সত্যিকার অর্থে একটি পরিসর বোধের প্রতিফলন ঘটায়। সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় রেখে অংশীদারিত্বের বোধটি অ্যাড্রেস করা
হয়েছে এ প্রকল্পে। বাংলাদেশী ঐতিহ্যিক স্থাপত্যে শেডিং একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু। হাতে তৈরি ছাদের টালি ব্যবহারের মাধ্যমে এখানে সরলতা ও মৌলিকত্ব নিয়ে
দোচালা নামে ছাদের ঐতিহ্যগত ধরন ব্যাখ্যা করা হয়।
বিশেষ বৈশিষ্ট্য
— প্রাকৃতিক জলাশয়ের পানি ও মানুষের পাশাপাশি অস্তিত
— টেকসই ও প্রাকৃতিকভাবে বায়ু চলাচল উপযোগী
— পারিপার্শ্ব থেকে লুম শেডে পানিপ্রবাহের একটি বাফার সৃষ্টি করা হয়
— লুম শেডের ব্যাম্বু স্ক্রিন স্থাপত্যশৈলীতে আরোপিত মেকি আধুনিকতাবোধকে অস্বীকার করে
ভূদৃশ্যের বর্ণনা
প্রধান কাঠামোটি জলপ্রবাহ দ্বারা পরিবেষ্টিত, যা গ্রামীণ বাংলাদেশের চিরায়ত জলদৃশ্য থেকে উৎসারিত। একটি আবাহনশীল সবুজ বাফার স্পেস সৃষ্টিতে প্রবেশ পথগুলোয় স্থানীয় বাঁশ রোপণ করা হয়।
প্রকল্পটির অর্জিত পুরস্কার
২০১৫ সালে স্থাপত্যে চমত্কারিত্বের জন্য বার্জার পুরস্কার
২০১৫ সালে এশিয়া আর্কিটেকচার অ্যাওয়ার্ড
জেকে সিমেন্ট পুরস্কার, আর্কিটেক্ট অব দ্য ইয়ার, ২০১৬
ভালো কাজের স্বীকৃতি হিসেবে শিল্প ক্যাটাগরিতে ২০১৬ সালে আইএবি অ্যাওয়ার্ড প্রাপ্তি
প্রকল্পের নাম: শাটল লুম শেড
কনসাল্ট্যান্সি ফার্ম: আর্কিগ্রাউন্ড লিমিটেড
ক্লায়েন্ট: মো. শওকত আজিজ রাসেল
ডিজাইন টিম
মূল স্থপতি: মো. জুবায়ের হাসান (এমআইএবি: এইচ-১৬৩)
সহযোগী স্থপতি: লুত্ফুল্লাহিল মাজিদ (এমআইএবি: এম-০৭৬)
সহযোগী স্থপতি: নবী নেওয়াজ খান (এমআইএবি: কে-১০৬)
প্রকল্প স্থপতি: আহমেদ ফয়সাল (সিএমআইএবি: সিএফ-০৪৭)
প্রকল্প স্থপতি: মো. আব্দুর রাকিব রাইন
স্ট্রাকচারাল ডিজাইন: সাইফুল বারী (এফআইবি-৮৩৭৪)
ঠিকাদার প্রতিষ্ঠান: অ্যাম্বার কনস্ট্রাকশন টিম
লেখকত্রয় স্থপতি






