মহিষখোলা নদীর পূর্বপাড়ঘেঁষে একখানা প্রায় নিশ্চিহ্ন টিনের ঘর, যার অস্তিত্ব সরেজমিন প্রত্যক্ষ করেও কল্পনায় তার পূর্ণরূপ দেখা কল্পনাবিলাসীদের জন্যও হয়তো দুরূহ হবে এবং তার আশপাশ ৪২ বছর ধরে মনুষ্যস্পর্শহীন হওয়ায় প্রকৃতির লীলাক্ষেত্র অর্থাৎ জঙ্গলাকীর্ণ। সে ঘরে ১৯৭১ সালে মুক্তিযোদ্ধারা যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে বিশ্রাম নিতেন। পাকিস্তানি হানাদারদের মাঝে মধ্যে ধরে নিয়ে বন্দি করেও রাখতেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় এ অঞ্চলটি ছিল ১১ নং সেক্টরের ১ নম্বর সাব-সেক্টর। পশ্চিমে গাঁ-ঘেঁষে মহিষখোলা নদী, উত্তরে ২০০ গজের মধ্যেই ভারত সীমান্তে মেঘালয়ের পর্বতমালা, পূর্বে সংখ্যাতীত খাল-বিল আর সুবিশাল টাঙ্গুয়ার হাওড়। এ হাওড়ের সঙ্গে রাগে-অনুরাগে জড়িয়ে আছে আরেকটি স্নিগ্ধ নদী যাদুকাটা। শ্রীচৈতন্যের জ্যেষ্ঠ পার্ষদ অদ্বৈতাচার্য এ নদীপাড়েরই সন্তান ছিলেন। যুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে মুক্তিযোদ্ধাদের এক ভয়াল সংঘর্ষ হয়। অনেক যোদ্ধা মারা যান। মহিষখোলা নদীর পাড়ঘেঁষা বাড়িটি ধ্বংস হয়ে যায় তখনই, শহীদ যোদ্ধাদের গণকবর রচিত হয় তারই এদিক-ওদিক। তারপর ৪২ বছর লতা-গুল্ম-বৃক্ষের চাদরে ঢাকা ছিল এ ইতিহাস।

সুনামগঞ্জ জেলার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে ভারত-সীমান্ত লাগোয়া ধর্মপাশা উপজেলায় মহিষখোলার এ প্রকল্পটি সে আচ্ছাদিত সত্য উন্মোচনেরই ফলাফল। কাজ শুরুর আগে প্রকল্প-স্থান প্রস্তুত করতে গিয়ে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানকে শ্বাপদ তাড়ানোরও ঝুঁকি নিতে হয়। আর আমাকে সুবিশালাকৃতি টাঙ্গুয়া ডিঙাতে হয় ২০ বার।

স্থাপত্য সৃষ্টির প্রারম্ভে স্থপতি হিসেবে আমার মনে তাই ‘ঘর’ বিষয়টি ক্রিয়াশীল হয়। নদীর পশ্চিম পাড়ে এ ‘বধ্যভূমি’তে বধ হওয়া শহীদরা ঘুমিয়ে আছেন। ঘুমন্ত এ প্রাণদের জাগ্রত চেতনার ‘আশ্রয়স্থল’ নির্মাণই তাই উদ্দিষ্ট হয়ে ওঠে। নদী রূপ নেয় রূপকে। সে স্বাধীনতার কথা বলা শুরু করে।

পূর্ব-পশ্চিম অক্ষ বরাবর সমান্তরাল দুটি সুউচ্চ দেয়াল ‘ন’ ফুট বেদির ওপর এসে দাঁড়ায়, তার ওপর ছায়া হয়ে ছাদ এসে বসে। সিঁড়ি ভেঙে পূর্বদিকের প্রবেশ বিন্দুতে চোখ রাখলে পশ্চিমের নদী আর তার গায়ে এসে পড়া আকাশ দেখা যায়। পূর্ব-পশ্চিম উন্মুক্ত হওয়ায় দুই দেয়ালের ঘর রচিত হয়ে যায়। উত্তর-দক্ষিণের ২৭ ফুট উঁচু দেয়ালে (দেড় ফুট পুরু) ব্যাকরণ ভেঙে অনেকগুলো ছোট-বড় জানালা আড়াল খুলে আলোর উৎস হয়ে ওঠে। ঠিক চোখ মেলে তাকানোর মতো। ‘যারা এই দেশটাকে ভালবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ’, তারা তো বদ্ধ ঘরে থাকে না, যে ঘরে দরজা-জানালায় অর্গল টানা, যে ঘরে আলোর ঝলক নেই, দোলা নেই, সে ঘরে স্বাধীনতা প্রবেশ করে না। সে ঘর অন্ধকারের অধীন। তাই ‘সব ক’টা জানালা’ই খুলে আছে।

‘জানালা’ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যাংশ, যার ব্যবহারিক ও মনস্তাত্ত্বিক মূল্য অতুলনীয়। এটি আমাদের দর্শনেন্দ্রিয়ের মতো। চোখ দিয়ে যেমন আমাদের দেহঘরে আলো প্রবেশ করে, আমাদের প্রথম অভিজ্ঞতা চোখ দিয়ে হয় (‘জ্ঞান চক্ষু’), তেমনই দেয়ালকে মুক্তি দেয় জানালা। তবেই দেয়ালের চোখ ফুটে আলো-বাতাস প্রবেশ করে গৃহে প্রাণের সঞ্চার হয়। এজন্যই ‘খোলা জানালা’ আর ‘স্বাধীনতার চেতনা’ সমার্থক হয়ে উঠেছে।

বেদির তিন দিক ঘিরে রয়েছে পানির আধার, যা পশ্চিমে নদীর সঙ্গে সংযুক্ত। প্রতি বর্ষাতেই মেঘালয়ের পাহাড়ি ঢল নামলে নদী উপচে বেদির তলায় কিছুক্ষণের জন্য হাঁটুজল জমে যায়। এটা হাওড়াঞ্চলের চেনা দৃশ্য।

এভাবেই হাঁটুজলে দাঁড়িয়ে ‘সব ক’টা জানালা’ খুলে আমাদের ডাকছে ওরা,

‘যারা এই দেশটাকে ভালবেসে দিয়ে গেছে প্রাণ’।

 

লেখক: স্থপতি