সুবর্ণ দীঘি একটি অবকাশ কেন্দ্র। কোলাহলপূর্ণ ঢাকা থেকে দূরের গ্রামে এটি অবস্থিত। ঢাকার ব্যস্ত জীবন থেকে ক্ষণিকের মুক্তি পেতে এ কেন্দ্রের স্থাপন।
আমরা যখন এ সাইটটি দেখি, তখন সেখানকার সবুজ-বাদামি আধিক্য দেখে অভিভূত হয়ে পড়েছিলাম। এগুলোই হলো প্রকৃতির সত্যিকারের রঙ এবং আমরা সিদ্ধান্ত নিই যে, এ বিশেষ সাইটটিতে এ রঙের বহিঃপ্রকাশ ঘটাব এবং আমাদের গ্রাহক একজন প্রকৃতিপ্রেমী এবং তাকে প্রকৃতির সঙ্গে একাত্ম করতে চেষ্টা করা হবে। এ প্রকল্পের বাজেট ছিল সীমিত। সীমিত বাজেটের মধ্যে একটি ভালো কাজ করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। আমরা স্থানীয়ভাবে সহজপ্রাপ্ত উপাদানের খোঁজ শুরু করি, যা হতে পারে আকর্ষণীয়।
গাজীপুরের মাটি শক্ত লাল, যার মৃত্তিকা গুণাগুণ খুব ভালো। এ মাটির গুণের কারণে এ অঞ্চলে মাটির বাড়ি সচরাচর দেখা যায়। আমরা দেখলাম যে, পার্শ্ববর্তী গ্রামের লোকেরা, যারা নিজেদের আয় থেকে কিছু অর্থ সাশ্রয় করতে পারে, তারা নিজেদের ঐতিহ্যগত মাটির বাসা ভেঙে সেটিকে ইটের দেয়াল বা ঢেউ খেলানো ধাতু শিট দিয়ে পুনর্নির্মাণ করেছে, যা গরমের দিনগুলোয় খুবই অস্বস্তিকর এবং এটি প্রকৃতি ও মাটির মধ্যকার আকষর্ণীয় ঐক্যকে ভেঙে দিয়েছে। নিজেদের সামাজিক অবস্থান উন্নতির জন্য তারা এটি করেছে। প্রায় ক্ষেত্রে মাটির বাড়িতে থাকা মানে গরিব বলে ধরে নেয়া হয়। কিন্তু ঐতিহ্যগতভাবে গ্রীষ্ম ও শীতের দিনগুলোতে বিদ্যমান মাটির বাসাগুলো দারুণ স্বস্তিদায়ক।
তাই আমরা চেয়েছি সমসাময়িক উপায় অবলম্বন করে এ আইডিয়াটিকে প্রতিষ্ঠিত করতে, যেখানে একজন বাড়ি নির্মাণ করতে পারবে মাটির দেয়াল দিয়ে, যা হবে এ সাইটের মাটি দিয়েই।
আবার বলছি যে, আমাদের নকশাকৃত বাসাটি নিম্ন ব্যয়ে তৈরি নয়, বরং এটি একটি মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য অবকাশ যাপন কেন্দ্র। এখানে তারা স্বস্তিদায়ক আবহাওয়া ও প্রকৃতির সঙ্গে বসবাস উপভোগ করতে পারবে।
স্বাভাবিকভাবেই আমরা সাইটের গাছগুলোকে (কাঁঠাল, সুপারি, বাদাম, আম, কলা) রক্ষা করতে চেয়েছি, যদিও কিছু গাছ কাটতে হয়েছে এবং সাইটে বাসাটিকে এমনভাবে তৈরি করতে চেয়েছি, যাতে চারপাশের পরিবেশের মধ্যে বাসাটি নিজের উপস্থিতি হারিয়ে ফেলে।
পুরু কাদা প্রাচীর সাহায্য করেছে গ্রীষ্মের গরমকে কমিয়ে রাখতে এবং অন্তরণ স্তরবিশিষ্ট ঢেউ খেলানো ধাতুর ছাদ সাহায্য করেছে উপর থেকে কম তাপ গ্রহণ করতে।
নিচের তলাটি উঁচু করা হয়েছে সমতল ভূমি থেকে, যাতে প্রাকৃতিক গাছপালা মুক্তভাবে বেড়ে উঠতে পারে এবং কাঠামোটি স্থলকে সামান্য স্পর্শ করেছে এবং এর চারপাশ ঘিরে দেয়া হয়েছে সবুজ গাছপালা দিয়ে।
উঁচু টেরাস বা চত্বরটি করা হয়েছে আশপাশের মনোমুগ্ধকর পরিবেশ উপভোগের জন্য এবং বিশেষ করে প্রথম তলার ডেকটি করা হয়েছে সূর্যাস্ত দেখার জন্য।
ভাঁজ দরজাগুলো পুরোপুরি খোলে বাহ্যকে অন্দরে স্বাগত জানানোর জন্য এবং সন্ধ্যার সূর্যরশ্মি উঁকি মারে আশপাশের গাছের পাতার ভেতর দিয়ে। এবং বর্ষা মৌসুমে উপভোগ করা যায় ঢেউ খেলানো ধাতুর ছাদের ওপর পড়া বৃষ্টি ফোঁটার সংগীত।
নির্মাণ উপকরণ: ভিত্তি: আইসোলেটেড কলাম ফুটিং
সুপার স্ট্রাকচার: ইস্পাত কলাম ও লোড বিয়ারিং ব্রিক ওয়ালস
মেঝে: আরসিসি
ছাদ: অন্তরণ স্তরবিশিষ্ট ঢেউ খেলানো শিল্প ধাতু
সিঁড়ি: ইস্পাত ফ্রেম ও স্থানীয় পাম গাছের কাঠের তক্তা
দেয়াল: সাইটে প্রাপ্ত মাটির তিনটি ভিন্ন রঙ নিয়ে ১৬র্ র্ পেটানো মৃত্তিকা
বিভাজন: পেটানো ভূমি ও ইটের দেয়ালের ওপর স্থানীয় পাম গাছের তক্তা
জানালা ও দরজা: গ্লাস প্যানেলের সঙ্গে কাঠের ফ্রেম
বিশেষ বৈশিষ্ট্য: সাইটের অবস্থান অনুযায়ী ন্যূনতম ঝামেলা। বিদ্যমান গাছপালার মধ্যে পুরো বাড়িটি যেন লুকিয়ে থাকে। আশপাশের মাটির বাড়িতে থাকা প্রতিবেশীরা শান্তির সঙ্গে বসবাস করে। সাইটটি পশ্চিমমুখী হওয়ায় বিদ্যমান সংকীর্ণ জলাধারটি বাড়িটি তৈরির আগেই লেকে পরিণত করা হয়েছে। লেকটি এবং আধা ঘন গাছপালা বাড়িটির প্রাকৃতিক ছায়াদানকারীতে পরিণত হয়েছে। তাই আমরা মনোরম পরিবেশ দেখতে পাই।
স্থানীয় উপকরণগুলোর মধ্যে স্থানীয় বাঁশ ব্যবহার করা হয়েছে আপার ডেক রুফ তৈরিতে।
মাস্টার বেডরুমের পাশে একটি বর্ধিত ডেক রয়েছে, যেখানে রয়েছে একটি ছাতিম গাছ (ডেভিল ট্রি)। এখন চারপাশে বসা লোকদের ছায়া দেয় এ গাছটি। মেঝের ফাঁকা জায়গা দিয়ে গাছটি মুক্তভাবে বেড়ে উঠছে।
দিগন্তে পুরো বাড়িটি গাছপালার দিকে দারুণ রৈখিক পথ, যেখানে যে কেউ খুঁজে পাবে বিশ্রাম নেয়ার স্থান অথবা বসে বা দাঁড়িয়ে নীরবতার সঙ্গে পুরো চারপাশ উপভোগ করতে পারবে।
অ্যাসোসিয়েট আর্কিটেক্ট: নাবিলা বিনতে নাসির (ভাষান্তর)
লেখকদ্বয় স্থপতি






