সেদিন হঠাৎ দেখা হয়ে গেল কাশেফ ভাইয়ের সঙ্গে। স্থপতি কাশেফ মাহ্বুব চৌধুরী। তার সঙ্গে সরাসরি কথা হয়েছে বলে মনে পড়ল না। কিন্তু সেদিন খাবারের ফাঁকে তার সঙ্গে আলাপ না করে থাকতে পারলাম না। আমার জন্মস্থান যে গাইবান্ধা, সেটা জানানোর প্রয়োজন বোধ করলাম। আমি নিজের পরিচয় দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি একগাল হেসে বললেন, ‘আরে আপনার পরিচয় দিতে হবে না, আপনাদের দুজনের কাজ আমি খুব ভালো করে চিনি এবং খোঁজখবর রাখি।’ আমি খানিকটা বিস্মিত হয়ে আমার সৌভাগ্যের তারিফ করলাম। এরপর আমার প্রশ্ন, ‘আপনি কি এটা জানেন যে, আমার বাড়ি গাইবান্ধায়? আপনার পরিবারের কেউ থাকে ওখানে? আপনি যান গাইবান্ধায়? আমার বিশাল পরিবারের একটি বড় অংশ ওখানেই থাকে এবং আমি সুযোগ পেলেই যাই জেনে তিনি আমন্ত্রণ জানালেন ফ্রেন্ডশিপ সেন্টারে যাওয়ার জন্য। সবিনয়ে জানালাম আমার যাওয়া হয়নি সেখানে। শেষ যেবার গিয়েছিলাম ঈদের ছুটিতে, তখন তার এ চমত্কার স্থাপত্যটি দেখার সৌভাগ্য হয়নি। এছাড়া সেন্টারটি সবার জন্য উন্মুক্ত নয়। যাওয়ার আগে অনুমতি নিতে হয়। কাশেফ ভাই অত্যন্ত সহূদয়তা দেখিয়ে তার কার্ডটি আমাকে দিলেন এবং বন্ধুবান্ধব-আত্মীয়স্বজন নিয়ে তার এ অসাধারণ স্থাপত্যটি দেখার আহ্বান করলেন।

নভেম্বরের শেষে বৃত্ত আর্টস ট্রাস্টের আয়োজনে কুড়িগ্রামের একটি বড় পূর্ববর্তী ছিটমহল, যা আজ ‘নতুন বাংলাদেশ’— ‘ছিটমহলের বাসিন্দাদের’ কথা অনুযায়ী আমরা সাতজনের একটি দল চলে গিয়েছিলাম পাঁচদিনের জন্য। ফেরার পথে সবাই মিলে গাইবান্ধায় পাড়ি জমালাম। আমাকে আর মাহ্বুবকে রেখে বাকি পাঁচ শিল্পী ঢাকার উদ্দেশে একই রাতে রওনা হয়। মাহ্বুবের শরীর বেশ খারাপ ছিল বলে অনেকটা দ্বিধা নিয়ে দুপুরের দিকে তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, ফ্রেন্ডশিপ সেন্টার দেখতে যেতে চায় কিনা। ও একবাক্যে রাজি হয়ে গেল। কাশেফ ভাইকে ফোন করে পেলাম না। একটা মেসেজ পাঠালাম। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর চলে এল। কাশেফ ভাইয়ের অফিস ‘আরবানা’ থেকেও একজন ফোন করে একজনের নাম দিয়ে দিলেন, যিনি আমাদেরকে সেন্টারটি ঘুরিয়ে দেখাবেন।

আমার ছোট ভাই পিটার ও তার বউ লাবণী, মেয়ে ছাওমী আর আমার বড় বোন লাকী আপাসহ মাহ্বুব আর আমি চড়ে বসলাম একটি ভাঙাচোরা তিন চাকার যন্ত্রচালিত অটোতে। সামনে এসে বাইরে থেকে সেন্টারটিকে বেশ ছোট মনে হলো। প্রবেশ পথে লোক দাঁড়িয়ে ছিল, যাদের জানা ছিল আমরা আসছি। বিকালের আলোয় সেন্টারের একজন কর্মী এগিয়ে এলেন পুরোটা ঘুরিয়ে দেখাবেন বলে। তারা অনেকেই লাকী আপা ও পিটারকে চেনেন। পরিমিত গাছপালা, সবজি বাগান, পরিচ্ছন্ন লন সব সামনে রেখে আমরা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগলাম। নিচে নেমেই থমকে দাঁড়ালাম— এ তো অনেক বড় জায়গা। অথচ বাইরে থেকে কত ছোট মনে হচ্ছিল। বিকালের মায়াবী রোদ লাল ইটের দেয়ালে আর পানিতে ভরা চারকোনা পরিকল্পিত চৌবাচ্চাগুলো। আমাদের গাইডের সঙ্গে হেঁটে হেঁটে মিটিংরুম, অফিস, ডাইনিং রুম আর বেডরুমগুলো দেখে বেড়ালাম। খাবার জায়গাটিকে মনে হলো অসাধারণ। চারদিকে খোলা চমত্কার কাঠের আসবাবপত্র, সাধারণ সহজ বসবার আয়োজন। কোনো অতিশয়োক্তি নেই। বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ। শোওয়ার ঘরগুলো নানাভাবে বিন্যাসিত। দুজন বা দুজনার অধিক লোক থাকতে পারে। শোওয়ার ঘরের জানালা কি একটু ছোট মনে হলো? নিশ্চয়ই কোনো কারণ আছে এর। অধিকাংশ ঘরেই একটি করে জানালা।

আমাদের আগ্রহ ছিল অন্য একটি ব্যাপারে। বুঝতে পারছিলাম হিউমিডিটির এ দেশে অনেক ভেবেচিন্তে কাশেফ ভাই এয়ার সার্কুলেশনের কথা ভেবেছেন। কিন্তু পানি বা ওয়াশরুমের ময়লা ইত্যাদি নিষ্কাশনের কি ব্যবস্থা?

হাঁটতে হাঁটতে পেছনের দিকটায় চলে গেলাম আমরা। সিঁড়ি বেয়ে উপড়ে উঠতেই খাবার পানি বিশুদ্ধ করার ঘরটিতে পৌঁছে গেলাম। বড় বড় ফিল্টার দিয়ে বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে এ ঘরটি থেকে। এখান থেকে চিকন হাঁটাপথ ধরে ছোটবড় গাছের পাশ দিয়ে এগিয়ে চললাম আমরা। তলদেশে পানি নিষ্কাশনের পরিখা। হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম একেবারে পেছন দিকটায়। নিচে দেখলাম ময়লা পানিতে ভরা একটি বড় জলের চৌবাচ্চা। আমাদের গাইড জানালেন, ওখান থেকে পরিশোধিত পানি বের হবে আগামীকাল। দুদিনের মাঝেই তাদের এই এনজিওটির একটি বড় অনুষ্ঠান শুরু হতে যাচ্ছে বলে চারদিকে কাজ চলছে। এমনকি ঢুকতেই যে পাঠাগারটি রয়েছে, সেটিও ঢেলে সাজানো হচ্ছে। নিচের চৌবাচ্চাটি থেকে আমাদের দৃষ্টি সরে গেল উপরের বাঁধানো পুকুরে। একই ডিজাইন এবং সামঞ্জস্য বজায় রেখে ওই পুকুরটিও বানানো হয়েছে, যার সম্পর্ক রয়েছে ভেতরের সব জল নিষ্কাশনের পথগুলোর। পুরো বিষয়টিই একটির সঙ্গে আরেকটি সম্পর্কযুক্ত, যা অটোমেটিক সিস্টেমে ভেতরে ভেতরে নিয়ন্ত্রিত হয়ে আসছে। পুকুরের পাড়ে শেষ মাথায় একটি বসার জায়গা করা হয়েছে। সামনে ফসলের ক্ষেত, জমিয়ে আড্ডা দেয়ার জন্য আদর্শ জায়গার কোনো অভাব নেই। আমরা কতগুলো নতুন বৃক্ষেরও পরিচয় পেলাম। শীতের এ সন্ধ্যায় বেরিয়ে পড়লাম আমরা শান্ত-সুন্দর গম্ভীর কিন্তু খোলামেলা শান্তিময় একটা চমত্কার শিল্পকর্মটি থেকে। পূর্বপুরুষদের করা মহাস্থান গড় বা পাহাড়পুরের সেই অতি পুরনো ভাবনার যেন এক সম্পূর্ণ নতুন আর আধুনিক উপস্থাপনা দেখার অভিজ্ঞতা হলো।

 

লেখক: চারুশিল্পী