স্বাধীনতার পর পরই দুস্থ মহিলাদের সাহায্য ও ক্ষমতায়নের উদ্দেশ্যে পেশাগত প্রশিক্ষণ, আইনগত সহায়তা, নেতৃত্বায়ন এবং সামাজিক সক্রিয়তা কর্মসূচির সূত্র ধরে ‘মহিলা সমিতি’র সূচনা হয়। সেসঙ্গে দুস্থ মহিলাদের শিশুদের জন্য একটি স্কুলও প্রতিষ্ঠা করা হয়।
সাংস্কৃতিক তাত্পর্যের জন্য সবার পরিচিত একটি রাস্তা,নাম বেইলী রোড। এখানেই অবস্থিত মহিলা সমিতি। রাস্তার কর্মব্যস্ত ও চঞ্চল পরিবেশের কারণে এখানে কমবেশি সবসময় জনমানুষের আনাগোনা লেগেই থাকে। মহিলা সমিতির প্রথম ভবনে যে অডিটোরিয়াম ছিল, তা ঢাকার তত্কালীন নাট্য সংগঠনগুলোর মধ্যে এতটা জনপ্রিয় হয়ে ওঠে যে সবার মুখে মুখে বেইলী রোডের নাম বদলে হয় ‘নাটক সরণি’। বলাই বাহুল্য, একটি প্রতিষ্ঠান, সাধারণ জনগণের ওপর কতটা প্রভাব ফেললে সেখান থেকে একটি রাস্তার পরিচয় বদলে যেতে পারে, তা সহজেই অনুমেয়। স্বাভাবিকভাবেই আধুনিক বাংলার নাট্য বিপ্লবের শুরু এখান থেকেই। থিয়েটার কর্মী ও উৎসাহী মানুষের জন্য এই প্রতিষ্ঠান হয়ে ওঠে সবাই মিলে এক হওয়ার একটা জায়গা।
সময়ের গতিতে মহিলা সমিতির কর্মসূচি ও জনমানুষের ওপর এর প্রভাব বাড়তে থাকে। কিন্তু বাড়তি কর্মসূচির জন্য বাড়তি জনসমাগম আর মানুষের বাড়তি চাহিদা মেটাতে পারে না মহিলা সমিতির পুরনো প্রাঙ্গণ। স্বভাবতই, থিয়েটার গ্রুপগুলো নিজেদের প্রয়োজন অনুযায়ী এখানে ওখানে ছড়িয়ে পড়তে থাকে আর মহিলা সমিতি হারিয়ে ফেলে তার আকর্ষণ।
হারানো জৌলুস ফিরে পেতে মহিলা সমিতি একটি উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে এগোয়। পরিকল্পনার আওতায় থাকে একটি সামগ্রিক প্রোগ্রাম, যা বর্তমান ও ভবিষ্যতের প্রয়োজন মেটাতে পারবে
একটি ২৫০ আসনের ও একটি ১০০ আসনের থিয়েটার/অডিটোরিয়াম, সম্মেলন কক্ষ, অফিস, প্রশিক্ষণ কক্ষ এবং একটি প্রাইমারি স্কুলের পরিকল্পনা নিয়ে মহিলা সমিতির উন্নয়নকাজ শুরু হয়।
স্থাপতিক ধারণা: মহিলা সমিতির ডিজাইন বা নকশা গড়েছে কতকগুলো ধারণার সমন্বয়ে।
চত্বর: মূল রাস্তার পাশে পায়ে চলা পথেরই এক ধরনের বিস্তার হিসেবে আকৃতি নিয়েছে মহিলা সমিতি ভবনের নিচতলা। এটাই এই ভবনের ‘চত্বর’ হিসেবে কাজ করছে। এই চত্বরের ব্যবহার দিনে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাবে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দুস্থ মহিলা ও শিশু এবং সন্ধ্যা-পরবর্তী সময়ে পূর্ণ থাকে নাট্যকর্মী ও ভক্তদের সমাগমে।
ডেক: ভবনে দুটি লবি আছে। প্রথমটি ভবনের শুরুতেই, যা দৃশ্যত ও স্থানিকভাবে মূল রাস্তার সঙ্গে, রাস্তার মানুষের সঙ্গে একটা যোগাযোগ তৈরি করে এবং সেই সূত্রে পুরো শহরের সঙ্গে একটা যোগসূত্র গড়ে ওঠে। অন্যটি অভ্যন্তরীণ উঠানের সঙ্গে একটি সম্পর্ক তৈরি করে। স্কুল ও প্রশিক্ষণ কক্ষ থেকে এই উঠান ব্যবহার করা যায়।
সাঁকো: ভবনের বিভিন্ন লেভেল, ভয়েডের মাঝে র্যাম্প, ব্রিজ এবং সিঁড়ি দ্বারা সংযুক্ত। আবার যার উদ্দেশ্য হচ্ছে রাস্তার সঙ্গে এই থিয়েটার গ্যালারি, লবি স্পেস ইত্যাদির একটা দৃশ্যগত সম্পর্ক তৈরি করা। রাস্তা দিয়ে হাঁটতে থাকা একজন মানুষের দৃষ্টি এই ভবনের উন্মুক্ত স্পেমের মধ্য দিয়ে একটা চলমান পথ ধরে এই ভবনের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে পড়ে, যা তাকে রাস্তা থেকে বিচ্ছিন্ন করে না এবং একটি বহুতল ভবনে ওঠার কষ্টকর অনুভূতিকে অনেকটা কমিয়ে আনে।
থিয়েটার: থিয়েটার হলের পাশে মোটা দেয়ালের ফাঁকে আসা ম্লান আলো, অভ্যন্তরীণ স্পেসের অভিনয়শিল্পী এবং দর্শকদের একটা খোলা ময়দানে বসার অনুভূতি এনে দেয়।
আচ্ছাদন: কারুকার্যময় ইটের মোটা দেয়াল, কংক্রিটের পাতলা ফিন এবং কার্টেন ওয়ালের সমন্বয়ে তৈরি এই ভবনের পার্শ্বিক চেহারা। ইটের দেয়াল ঘিরে আছে অভ্যন্তরীণ কক্ষ, হল, অন্যান্য স্পেস; সেমি-আউটডোর স্পেসগুলোকে আকার দিয়েছে কংক্রিটের পাতলা ফিন।
দিক্মুখিতা: সাইটের আকার-আকৃতি থেকেই ভবনের ‘খ’ আকৃতি ফর্মের উত্পত্তি। ‘খ’ আকৃতি ফর্মের এক বাহু থিয়েটার প্রোগ্রাম ও অন্য বাহু শিক্ষা বিভাগের রূপ নিয়ে দুই বাহুর মাঝে একটি অভ্যন্তরীণ উঠানের জন্ম দেয়। দক্ষিণমুখী এই উঠান, ভবনের অসংখ্য খোলা জায়গার মধ্যে দিয়ে দখিনের বাতাস আসে এবং বিভিন্ন স্পেসকে শ্বাস নেয়ার সুযোগ করে দেয়। তৈরি হয় ট্রপিক্যাল এলাকার জন্য আদর্শ পরিবেশ।
লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য: প্রশস্ত প্রবেশপথ সহজ যাতায়াতের পথ নিশ্চিত করে।
নিচতলায় চত্বর জনসমাগমের জন্য আদর্শ জায়গা, যা সিঁড়ি, র্যাম্প, বাগান আর উঠান থেকে আকৃতি নিয়ে এক মনোরম আবহ তৈরি করে।
দক্ষিণ-পূর্ব দিকের র্যাম্প পাঁচটি তলার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগের মাধ্যমে সার্বজনীন গম্যতা নিশ্চিত করে।
ভবনের মাঝের উঠান আলো-বাতাসের অভাব বোধ করতে দেয় না।
প্রাকৃতিক বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা থাকায় থিয়েটার এবং মাল্টিপারপাস হলের লবি জনসমাগমের জন্য একটি ট্রপিক্যাল প্যাভিলিয়ন হিসেবে কাজ করে।
থিয়েটার হলের মূল ধারণা হচ্ছে একটি খোলামেলা উদ্যানে বসে ঘরোয়া পরিবেশে নাটক উপভোগ করা।
প্রজেক্ট প্রযুক্তি: আরসিসি ফ্রেম কাঠামো।
নির্মাণ সামগ্রী: ইট, কংক্রিট।
ল্যান্ডস্কেপিং: রাস্তা থেকে শুরু হয়ে প্রজেক্টের ল্যান্ডস্কেপিং, সীমানা প্রাচীর ধরে এগিয়ে গিয়ে অভ্যন্তরীণ উঠানকে স্পর্শ করে। র্যাম্প ধরে ওপরে উঠতে থাকলে যে লবি পাওয়া যায়, সেখানেও কংক্রিট স্ক্রিনের ফাঁকে ফাঁকে সবুজের ছোঁয়া খুঁজে পাওয়া যায়।
প্রজেক্ট টিম:
প্রধান স্থপতি: এহসান খান
অন্যান্য সদস্য: নুসরাত জাহান
শরিফুল হক
এশিতা রহমান
জুবায়ের হাসান
স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার: ইঞ্জিনিয়ার মো. তফাজ্জেল হোসেন
মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার: একেএম কামারুজ্জামান
ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার: টেকনো কনসালট্যান্টস
ইন্টেরিওর ডিজাইনার: এহসান খান আর্কিটেক্টস
ল্যান্ডস্কেপ ডিজাইনার: এহসান খান
বিশেষায়িত সাউন্ড ও লাইটিং: ক্রিয়েশন্স আনলিমিটেড
কনস্ট্রাকশন কোম্পানি: নাভানা কনস্ট্রাকশন লিমিটেড
লেখক: স্থপতি






