শেখ রকিবুল করিম ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশের (আইসিএবি) ফেলো মেম্বার। ২০০৬ সালে আইসিএবির তত্ত্বাবধানে থাকা কেপিএমজি বাংলাদেশ থেকে তিনি এ যোগ্যতা অর্জন করেন। গ্রামীণফোন, বাংলালিংক ও কেপিএমজির মতো অত্যন্ত প্রশংসিত কোম্পানিগুলোয় সিনিয়র ফাইন্যান্সিয়াল ম্যানেজমেন্ট পদে ১৮ বছরেরও বেশি ক্রমবর্ধিত কাজের অভিজ্ঞতা রয়েছে তার। বর্তমানে তিনি গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স লিমিটেডের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) হিসেবে কর্মরত। ডিএমডি পদের পাশাপাশি কোম্পানির ভারপ্রাপ্ত মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে দেশের বীমা খাত এখন কোন পর্যায়ে দাঁড়িয়ে আছে? কোম্পানির সংখ্যা বেশি হলেও সেবার মান ও প্রতিযোগিতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কেন এমন হচ্ছে? এখান থেকে উত্তরণে করণীয় কী হতে পারে?

ধন্যবাদ। দেশের বীমা খাত একটি সম্ভাবনাময় শিল্প। প্রতিনিয়ত এর প্রবৃদ্ধি ঘটছে। বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে ২০১৯ সালে সরকারি-বেসরকারি সব কোম্পানি মিলে লাইফ ইন্স্যুরেন্সের প্রিমিয়াম সংগৃহীত হয়েছে ৯,৬১৪ কোটি টাকা, যা আগের বছর থেকে ৭০০ কোটি টাকা বেশি। এছাড়া নন-লাইফে ২০১৯ সালে প্রিমিয়াম সংগৃহীত হয়েছে ৩,৭৮১ কোটি টাকা, যা আগের বছর থেকে ৪০০ কোটি টাকা বেশি। অর্থাৎ দেশের বীমা খাত ১৩ হাজার কোটি টাকা প্রিমিয়ামের একটি শিল্প। তবে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে চিন্তা করলে বীমার এখনো বিশাল সম্ভাবনা অপেক্ষা করছে। আমরা এটাকে কাজে লাগাতে পারছি না। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে যোগ্য নেতৃত্ব ও সুশাসনের অভাব। আমরা বীমা শিল্পে যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করতে পারিনি। তরুণ প্রজন্ম পড়াশোনা শেষে ব্যাংকের চাকরির পেছনে ছুটছে কিন্তু বীমা শিল্পে কাজ করবে এ ক্যারিয়ার প্ল্যান তারা করছে না। কারণ বীমা শিল্প একটি ইমেজ সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এখান থেকে উত্তরণের জন্য যোগ্য নেতৃত্ব, সুশাসন ও ইমেজ বৃদ্ধিকল্পে উদ্যোগ নিতে হবে। ২০১৩ সালে ব্র্যাক, স্কয়ার ও এপেক্সের পৃষ্ঠপোষকতায় গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্স তার পথচলা শুরু করে। দেশের তিনটি স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠান বীমা শিল্পের নেতৃত্বে আসায় আমরা আশাবাদী গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্সের হাত ধরে বীমা শিল্পের ইমেজ সংকট দূর হবে। এছাড়া গার্ডিয়ান লাইফ শুরু থেকে সারভাইবাল বেনিফিট এবং মেয়াদপূর্তি মূল্য নির্দিষ্ট তারিখে পরিশোধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করেছে, যা বীমা শিল্পে আস্থা ফিরিয়ে আনতে সহায়তা করবে বলে আমি বিশ্বাস করি। 

কভিড-১৯-এ বীমা খাতের ওপর কী প্রভাব পড়েছে এবং তা থেকে ঘুরে দাঁড়াতে কোম্পানিগুলো ও সরকারের কী করা প্রয়োজন?

কভিড-১৯-এ বীমা খাতের ওপর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুই ধরনের প্রভাব পড়েছে। ইতিবাচক দিক হলো বীমা নিয়ে মানুষ সচেতন হয়েছে। তাদের ইন্স্যুরেন্স পলিসি গ্রহণের প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। কভিড-১৯ বীমা শিল্পের ডিজিটালাইজেশনের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করেছে। ঘরে বসেই কাজ বা ওয়ার্ক ফ্রম হোম আইডিয়া আমরা কভিড-১৯-এর কারণেই গ্রহণ করেছি। নেতিবাচক দিক হলো যারা প্রযুক্তির বাইরে আছে অর্থাৎ ফেস টু ফেস পদ্ধতিতে বীমা পলিসি গ্রহণ করেন তাদের কাছে আমাদের বীমাকর্মী পৌঁছাতে না পারায় বীমা পলিসি বিক্রিতে নতুন ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছি। এ সমস্যা থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর জন্য সরকারের উচিত প্রযুক্তি পণ্য সহজলভ্য করা, দ্রুতগতির ইন্টারনেট প্রত্যন্ত অঞ্চলে পৌঁছে দেয়া এবং ডিজিটালাইজেশনের প্রতি নজর দেয়া। আমরা যেমন কভিড-১৯ চলাকালে অনলাইন ক্লেইম সাবমিশন (ওসিএস) পোর্টাল চালু করেছি। অর্থাৎ আমাদের গ্রাহকরা অনলাইনেই তাদের বীমা দাবি উত্থাপন করতে পারবেন। ঘরে বসেই গ্রাহকের অ্যাকাউন্টে বীমা দাবি পৌঁছে দিতে আমাদের উদ্দীপক হিসেবে কাজ করেছে কভিড-১৯।

একুশ শতকের উপযোগী করে বীমা খাত গড়ে তুলতে কোন দিকগুলোতে দৃষ্টি দেয়া জরুরি বলে মনে করেন?

একুশ শতকে আমরা মিলেনিয়ালস প্রজন্মের গ্রাহক পেতে যাচ্ছি। যারা মিলেনিয়ালস প্রজন্ম তারা তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর, তারা ঘরে বসেই সব সেবা পেতে চায়, তারা রিভিউ দেখে যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। মিলেনিয়ালস প্রজন্মকে টার্গেট করে আমাদের বীমা শিল্পকে তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর করা উচিত। মিলেনিয়ালস প্রজন্ম দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে না, তারা স্বল্পমেয়াদি পরিকল্পনা করে। মিলেনিয়ালস প্রজন্মের কথা চিন্তা করে আমাদের স্বল্পমেয়াদি ইন্স্যুরেন্স প্রোডাক্ট যেমন রাইড ইন্স্যুরেন্স, ট্রাভেল ইন্স্যুরেন্স ইত্যাদি চালু করতে হবে। ইনোভেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট বিভাগ চালু করতে হবে এবং এ বিভাগের জন্য অর্থ বরাদ্দ রাখতে হবে। আমরা গার্ডিয়ান লাইফ প্রথম দেশে ই-কেওয়াইসির মাধ্যমে ইন্স্যুরেন্স পলিসি গ্রহণের সুযোগ রেখেছি। আমাদের ‘ইজি লাইফ’ অ্যাপসের মাধ্যমে গ্রাহকরা মাত্র ৫ মিনিটের মধ্যে ইন্স্যুরেন্স পলিসি গ্রহণ করতে পারবেন। ‘ইজি লাইফ’ কাগজবিহীন ইন্স্যুরেন্স পলিসি গ্রহণে আমাদের একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ। আমাদের এ উদ্যোগে চ্যালেঞ্জ হচ্ছে বীমা স্ট্যাম্প ও গ্রাহকের স্বাক্ষর। ডিজিটাল বীমা স্টাম্প এবং ইলেকট্রনিক স্বাক্ষর চালু হলে আমরা পলিসি ডকুমেন্ট পেপারলেস করতে পারব বলে আমার বিশ্বাস এবং এটি ডিজিটালি বীমা পলিসি গ্রহণকে আরো ত্বরান্বিত করবে।

বীমা খাতের মূল চ্যালেঞ্জগুলো কী? মানুষের আস্থা প্রতিষ্ঠায় এ খাতের সংশ্লিষ্টরা কী করতে পারেন?

বীমা খাতের মূল চ্যালেঞ্জগুলো হচ্ছে আস্থার সংকট, সুশাসনের অভাব, প্রযুক্তিহীনতা এবং যোগ্য নেতৃত্ব। আস্থার সংকট দূর করার জন্য আমাদের বীমা নিয়ে প্রচার ও প্রসারের দিকে নজর দিতে হবে। গ্রাহকদের মধ্যে বীমা অজ্ঞতা আছে। বীমা অজ্ঞতা দূরীকরণের জন্য আমাদের পাঠ্যপুস্তকে বীমা নিয়ে একটি অধ্যায় রাখার জন্য আমি জোর সুপারিশ করছি। কথার সঙ্গে যখন কাজে মিল থাকবে এবং সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে যখন সব কাজ করা হবে তখন সুশাসন নিশ্চিত হবে। প্রযুক্তি খাতে আরো বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রযুক্তি খাতে আমাদের রেগুলেটর বিনিয়োগ করে আমাদের সহযোগিতা করতে পারেন। যোগ্য নেতৃত্ব তৈরি করার জন্য মেধাবী কর্মীদের প্রেষণা ও প্রশিক্ষণ দিতে হবে। বীমা শিল্পের উন্নয়নে প্রশিক্ষণের কোনো বিকল্প নেই। যুগোপযোগী প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করার জন্য কোম্পানির নিজস্ব প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট তৈরি করতে পারলে এটা আরো বেশি কার্যকর হবে।

আমরা যদি গার্ডিয়ান লাইফের গল্পটি বলি আমরা শুরু থেকে ‘সবার জন্য বীমা’ এ স্লোগান সামনে রেখে কাজ করে যাচ্ছি। আমাদের ‘গার্ডিয়ান ব্র্যাক বীমা’ ক্ষুদ্র বীমার ক্ষেত্রে অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে। আমাদের প্রায় এক কোটি গ্রাহক রয়েছে অর্থাৎ প্রতি ১৭ জনে একজনের গার্ডিয়ান লাইফ ইন্স্যুরেন্সের পলিসির মাধ্যমে সুরক্ষিত আছে। আমরা ক্ষুদ্র বীমাকে আরো প্রসারিত করতে চাই। অতি সম্প্রতি আমরা ‘গার্ডিয়ান এডুমেন’ প্রকল্পের মাধ্যমে ২০ লাখ শিক্ষার্থীর বৈধ অভিভাবকদের নামমাত্র প্রিমিয়ামের মাধ্যমে ২ লাখ টাকা কাভারেজের আওতায় আনার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। আমাদের এ উদ্যোগে শিক্ষার্থীর অভিভাবকের অকালমৃত্যুতে শিক্ষার্থী ঝরে পড়া কমাবে। গার্ডিয়ান লাইফ ইনোভেটিভ আইডিয়াকে সব সময় উৎসাহিত করে। আমাদের পরিচালনা পর্ষদে যারা আছেন তারা আমাদের সব সময় উৎসাহিত করেন বীমা শিল্পে ইতিবাচক পরিবর্তন আনয়নে উদ্যোগ গ্রহণ করতে।

দেশের বীমা খাত পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে থাকার কারণ কী?

এটা সত্যি আমাদের বীমা খাত পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর চেয়ে পিছিয়ে। আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতে জিডিপিতে ইন্স্যুরেন্স পেনেট্রেশনের হার ৩.৬৯ শতাংশ, সেখানে বাংলাদেশে ইন্স্যুরেন্স পেনেট্রেশনের হার শূন্য দশমিক ৫৫ শতাংশ। এর অন্যতম কারণ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং মনিটরিং। আমাদের এখানে রেগুলেটর গঠিত হয়েছে মাত্র ১০ বছর হলো। এছাড়া মিডিয়া গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। ইন্ডিয়ার চলচ্চিত্র বা নাটকগুলোতে ইন্স্যুরেন্সের গুরুত্ব তুলে ধরে অনেক সংলাপ থাকে। আমাদের বাংলাদেশী চলচ্চিত্র বা নাটকগুলোতে সেই ধরনের কোনো দৃশ্য দেখা যায় না। আমাদের মিডিয়া, রেগুলেটর ও সব কোম্পানি একজোট হয়ে কাজ করলে বীমা খাতে সুদিন ফিরে আসতে বেশি দেরি নেই। আমরা খুবই আশাবাদী বীমা শিল্প নিয়ে।

দেশের বীমা খাতকে আন্তর্জাতিক মানের হিসেবে তৈরি করতে কোন কোন জায়গায় উন্নতি করা দরকার?

সুন্দর প্রশ্ন করেছেন। বীমা খাতকে আন্তর্জাতিক মানের হিসেবে তৈরি করতে আমাদের গ্রাহক সেবার মানের দিকে নজর দিতে হবে। করপোরেট কালচারকে উৎসাহিত করতে হবে। বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানকে বীমা শিল্পে কাজ করার জন্য উৎসাহ দিতে হবে। বাইরের দেশের বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এ দেশে কাজ করার সুযোগ পেলে প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হবে। আর প্রতিযোগিতা সেবার মান উত্তরোত্তর বৃদ্ধি করবে।

কীভাবে বীমা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আরো বাড়ানো যায়?

বীমা খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার জন্য রেগুলেটরকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। রেগুলেটরে লোকবল সংকট আছে। এ সংকট দূর করে রেগুলেটরের উচিত হবে নিয়মিত মনিটরিংয়ের ব্যবস্থা করা। এছাড়া ডিজিটালাইজেশন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে পারলে এটা আমাদের কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে। আমাদের যেমন ‘মাই গার্ডিয়ান’ নামে অ্যাপস আছে। এ অ্যাপসের মাধ্যমে গ্রাহক তার পলিসির সব তথ্য সহজেই দেখে নিতে পারে, এমনকি তার বোনাসসহ। গ্রাহক যখন তার মুঠোফোনে ঘরে বসেই তার পলিসির সব তথ্য দেখতে পারবে তখন এটা কাজের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।

দ্বিতীয়বারের মতো দেশে বীমা দিবস পালিত হচ্ছে। দিবস পালনের মধ্য দিয়ে এ খাতে কী ধরনের প্রভাব পড়ছে বলে মনে করেন? একে আরো সার্থক করে তুলতে কী করা যেতে পারে?

আমরা খুবই গর্বিত ও আনন্দিত, বীমা খাতের জন্য একটি দিবস বরাদ্দ আছে। সাধারণত দিবস পালিত হয় গুরুত্ব বোঝাতে। ‘বীমা দিবস’ বীমার গুরুত্ব বোঝানোর জন্য ব্যাপক সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। বঙ্গবন্ধু ১৯৬০ সালের ১ মার্চ আলফা ইন্স্যুরেন্স কোম্পানিতে যোগদান করেন। তার এ যোগদানের তারিখটিকে স্মরণীয় করে রাখতে ২০২০ সাল থেকে ১ মার্চ সারা দেশে প্রথম বীমা দিবস উদযাপিত হয়। এ বছর দ্বিতীয়বারের মতো বীমা দিবস উদযাপিত হচ্ছে। এ দিবস উদযাপনের মাধ্যমে বীমা নিয়ে সবার মনে যে অজ্ঞতা, অসচেতনতা, ভীতি ও অদূরদর্শিতা আছে তা দূর হবে বলে আমার বিশ্বাস। স্বচ্ছতা তৈরি, দক্ষ জনবলের প্রতি অধিক গুরুত্ব আরোপ, সেবার ক্রমাগত উন্নয়নের ওপর আলোকপাতের পাশাপাশি বিভিন্ন মিডিয়ায় বীমা নিয়ে বিশেষ পরিবেশনা নিশ্চিত করতে পারলে বীমার বার্তা আমরা সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিতে পারব।