বৈশ্বিকভাবে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে বীমা খাতের বড় ধরনের অবদান রয়েছে। উন্নত দেশগুলোতে বীমা পেনিট্রেশনের হার বাংলাদেশের চেয়ে অনেক বেশি। উন্নয়নশীল ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর বীমা খাত বাংলাদেশের চেয়ে এগিয়ে রয়েছে। এমনকি আমাদের প্রতিবেশী ভারত ও শ্রীলংকাও এক্ষেত্রে আমাদের ওপরে রয়েছে। মূলত বিশ্বাসযোগ্যতার ঘাটতি ও বীমা দাবি পরিশোধে কালক্ষেপণের কারণে খাতটি গ্রাহকদের আস্থা অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। সুশাসনের ঘাটতির কারণে খাতটির বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। অথচ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি বিবেচনায় নিলে বীমা খাত আরো বেশি বিকশিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এক্ষেত্রে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও গ্রাহকদের আস্থা ফিরিয়ে আনাকেই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বলেন মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

দেশের বীমা খাত নিয়ে প্রাইসওয়াটারহাউজকুপার্সের (পিডব্লিউসি) করা গবেষণা প্রতিবেদন বলছে, ২০০৯ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে প্রতি বছরই বীমা করার হার কমেছে। জিডিপির অনুপাতে প্রিমিয়ামের দিক দিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ভারত, শ্রীলংকা, পাকিস্তানেরও নিচে। ২০১৭ সালে বাংলাদেশের জিডিপির অনুপাতে প্রিমিয়ামের পরিমাণ ছিল দশমিক ৫৫ শতাংশ।

দেশে বর্তমানে ৭৮টি বীমা কোম্পানি রয়েছে। এর মধ্যে ৩২টি জীবন বীমা কোম্পানি আর ৪৬টি সাধারণ বীমা কোম্পানি। জীবন বীমা খাতের ৩২টি কোম্পানির গত ১০ বছরের পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১০ সালে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ছিল ১৬ হাজার ৬৪৬ কোটি টাকা, যা সর্বশেষ ২০১৯ সালে এসে ৪১ হাজার ৩৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিগুলোর সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় আড়াই গুণ। ২০১০ সালে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর লাইফ ফান্ডের আকার ছিল ১৪ হাজার ৭৮৫ কোটি টাকা, যা ২০১৯ সাল শেষে ৩৪ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকা হয়েছে। ১০ বছরে কোম্পানিগুলোর লাইফ ফান্ডের আকার ২ দশমিক ৩৩ গুণ বেড়েছে। ২০১০ সালে জীবন বীমা খাতে গ্রস প্রিমিয়ামের পরিমাণ ছিল ৫ হাজার ৮৩৫ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৯ হাজার ৬০৮ কোটি টাকায়। ১০ বছরের ব্যবধানে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর গ্রস প্রিমিয়ামের পরিমাণ বেড়েছে ১ দশমিক ৬৫ গুণ। আর সর্বশেষ গত বছরের ৩০ জুন শেষে জীবন বীমা কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত সম্পদ ৪১ হাজার ৪৮৭ কোটি এবং লাইফ ফান্ডের আকার ৩৪ হাজার ১৪১ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।

২০১০ সালে সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত সম্পদের পরিমাণ ছিল ৪ হাজার ৭৪১ কোটি টাকা, যা সর্বশেষ ২০১৯ সালে এসে ২২ হাজার ৪০৬ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে কোম্পানিগুলোর সম্পদের পরিমাণ বেড়েছে ৪ দশমিক ৭৩ গুণ। ২০১০ সালে সাধারণ বীমা খাতে গ্রস প্রিমিয়ামের পরিমাণ ছিল ১ হাজার ৬৫৭ কোটি টাকা। ২০১৯ সালে এর পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ৫৫০ কোটি টাকায়। ১০ বছরের ব্যবধানে সাধারণ বীমা কোম্পানিগুলোর গ্রস প্রিমিয়ামের পরিমাণ বেড়েছে ২ দশমিক ৭৫ গুণ।

২০১৩ ও ২০১৪ সালে ১৬টি বীমা কোম্পানির অনুমোদন দেয়া হয়। এর মধ্যে ১৪টি ছিল জীবন বীমা কোম্পানি। তবে নতুন অনুমোদিত এসব বীমা কোম্পানিই ব্যবসায়িকভাবে সংকটের মধ্যে রয়েছে। নতুন অনুমোদন পাওয়া জীবন বীমা কোম্পানির মাত্র এক-দুটি প্রত্যাশিত ব্যবসায়িক সফলতা অর্জন করতে পেরেছে।

লাইফ ফান্ড নেগেটিভ, বীমা গ্রাহকদের দাবির টাকা পরিশোধে গড়িমসি ও ক্ষেত্রমতে দাবি পরিশোধ না করা, বীমা এজেন্টদের অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অসাধু কার্যক্রম কোম্পানিগুলোর নাজুক পরিস্থিতিকেই নির্দেশ করছে। নতুন বীমা কোম্পানিগুলোর আয়ের তুলনায় কোম্পানিগুলোর ব্যবস্থাপনা ব্যয় বেশি হচ্ছে। এ অবস্থায় পরিচালন ব্যয় মেটাতে গ্রাহকের সঞ্চয়ের টাকার বড় একটি অংশ খরচ করে ফেলছে বীমা কোম্পানিগুলো। ফলে ঝুঁকিতে রয়েছেন এসব কোম্পানির গ্রাহক। আবার আর্থিক সংকটে অনেক কোম্পানি কর্মচারীদের বেতন দিতে পারছে না, সামগ্রিকভাবে যা বীমা খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) তথ্যমতে, নতুন বীমা কোম্পানির ৮৮ শতাংশ ব্যবসাই তামাদি হয়ে যাচ্ছে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে না জানিয়েই অননুমোদিত খাতে ব্যয় করছে। বীমা কোম্পানির যেকোনো ধরনের ঋণের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদনের বিধান রয়েছে। তবে সেক্ষেত্রেও নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়েছে নতুন বীমা কোম্পানিগুলো। ব্যবসা ও নবায়ন প্রিমিয়াম আয় সেভাবে না থাকলেও শুধু ব্যবস্থাপনার কাজে প্রারম্ভিক মূলধনের অর্থ ব্যয় করেছে অধিকাংশ নতুন জীবন বীমা কোম্পানি। প্রতিষ্ঠানগুলো মূলত বিলাসবহুল গাড়ি ক্রয় ও অফিস ভাড়া দিতেই এ অর্থ ব্যয় করেছে। বিভিন্ন জেলায় শাখা খুলে ব্যবসা করলেও তাতে সাফল্য পায়নি নতুন বীমা কোম্পানিগুলো। পরবর্তী সময়ে বাধ্য হয়ে একের পর এক শাখা বন্ধ করতে হয়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বীমা পণ্যের স্বল্পতা, উন্নত বিশ্বের মতো ব্যাপক মানুষকে বীমার আওতায় আনতে না পারা, বীমা লিটারেসির ব্যবস্থা না থাকা, বীমা দাবি যথাসময়ে নিষ্পত্তিতে বিদ্যমান জটিলতা, সাধারণ বীমা করপোরেশন ব্যতীত পুনর্বীমা প্রতিষ্ঠান না থাকা, বীমা কোম্পানিগুলোতে করপোরেট গভর্ন্যান্সের অভাব, জীবন বীমা প্রতিষ্ঠানগুলোতে অ্যাকচুয়ারির অভাব এবং আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তির অপর্যাপ্ত ব্যবহার বীমা কোম্পানিগুলোর সীমাবদ্ধতা। তাছাড়া প্রিমিয়াম সংগ্রহ, পুনর্বীমা, দাবি নিষ্পত্তিসহ কিছু বিষয়ে বড় দুর্নীতির অভিযোগ আছে। অনেক মালিকই মিথ্যা দাবি সাজিয়ে আগের তারিখে কাভার নোট ইস্যু এবং অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে বীমা গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ করছে। এ খাতে অভ্যন্তরীণ বাণিজ্য, পরিচালকদের দুর্নীতি ও নিয়ন্ত্রণহীনতার অনেক উদাহরণ রয়েছে। বীমা শিল্পে জনশক্তির মান খুবই দুর্বল এবং তাদের উন্নয়নে তেমন বিনিয়োগ কিংবা সংশ্লিষ্টদের দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই। প্রবাসী শ্রমিক-রেমিট্যান্স প্রেরণকারী থেকে কৃষিজীবীসহ বিপুলসংখ্যক জনগোষ্ঠী এখনো বীমার আওতার বাইরে রয়ে গেছে।

দেশের বীমা খাতের সার্বিক করপোরেট সুশাসনের ঘাটতির বিষয়টি বহুল আলোচিত। এ খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে বীমা দাবির অর্থ পরিশোধ না করার অভিযাগ সবচেয়ে বেশি। তাছাড়া পারিবারিক নিয়ন্ত্রণের কারণে প্রতিষ্ঠানগুলো এক বা একাধিক ব্যক্তির সিদ্ধান্তে পরিচালিত হচ্ছে। বীমা আইনে একই পরিবারের সদস্যদের ১০ শতাংশের বেশি শেয়ার ধারণে বিধিনিষেধ থাকলেও কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান প্রকাশ্যেই সেটি লঙ্ঘন করছে। আবার কেউ কেউ বেনামে কোম্পানির শেয়ার ধারণ করে পারিবারিক আধিপত্য বজায় রাখছে। এ খাতের করপোরেট কাঠামো আর্থিক খাতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের তুলনায় অনেক পিছিয়ে রয়েছে। 

 মেহেদী হাসান রাহাত: সাংবাদিক