প্রতিদিনকার
খবরের কাগজ, নিউজ বা
অন্যান্য যেকোনো টেলিভিশন চ্যানেল প্রভৃতি মাধ্যমে আমরা নিত্যকার কত অঘটনের
কথা শুনি। দেশ-দেশান্তরে,
আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া এসব ঘটনা যাদের জীবনে ঘটে যায় তা সত্যি
সত্যি অনেক পীড়াদায়ক, অনেক অসহায়ত্বের
কারণ। বর্তমান পৃথিবীর প্রবল পরাক্রমশালী দেশ আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের ঘটনা। সে দেশের
নেব্রাস্কা প্রদেশের ওমাহা শহরে ২৮ বছর
বয়সী শ্যাননের বাস। স্বামী পরিত্যক্তা শ্যানন তার দুই সন্তান, যারা তখনো
স্কুলে যাওয়ার বয়সী হয়নি, তাদের নিয়ে
সে শহরে
বাস করত। জীবিকা অর্জনের জন্য শ্যানন একটি বাণিজ্যিক ব্যাংকে ক্যাশ অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিল। একদিন হলো কী, ব্যাংকে ডাকাত
দলের সশস্ত্র আক্রমণ। ব্যাংকের ক্যাশ অফিসার শ্যাননের কাছে গিয়ে ডাকাত দল অস্ত্রের
মুখে জিম্মি করে টাকা দাবি করে বসল। ব্যাংকের একজন নিরাপত্তারক্ষী এগিয়ে আসতেই ডাকাত দলের একজন নির্মমভাবে শ্যাননের বুকে গুলি করল। তাত্ক্ষণিক লুটিয়ে পড়া শাননকে হাসপাতালে নেয়া হলো। কিন্তু কী দুর্ভাগ্য
যে হাসপাতালে
নিতে নিতেই তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। কর্তব্যরত ডাক্তার শ্যাননের মৃত্যু নিশ্চিত মর্মে সার্টিফিকেট ইস্যু করলেন। শ্যাননের দুই অবুঝ শিশু অনাথ হয়ে গেল।
ফজলার
(ছদ্মনাম) নামে এক
পরিশ্রমী কৃষকের কথা ধরা যাক। সকাল-সন্ধ্যা
কাজ করেন তার এক টুকরো
জমিতে। শীত, গ্রীষ্ম, বর্ষা
সব অগ্রাহ্য
করে লেগে থাকেন ফসল ফলানোর চেষ্টায়। কাঙ্ক্ষিত ফসল ঘরে ওঠানোর পর তার
হাসি আর ধরে
না। এ ফসল
ফলানোর সফলতার ওপরই নির্ভর করে তার পরিবারের রুটিরুজি, ছেলেমেয়েদের পড়াশোনাসহ
যাবতীয় খরচ, ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা
মেটানোর জন্য অল্প কিছু সঞ্চয়। এমনিতেই ফসলের উৎপাদন খরচ নানাভাবে বেড়ে গেছে। সার,
বীজ, সেচ, শ্রমের
মজুরি সবকিছুর মূল্যই আকাশচুম্বী। তার পরও লেগে আছেন এ পেশাতেই।
কৃষিকাজ তার কাছে অহংকার। বাপ-দাদার
পেশা ছেড়ে অন্য কোনো পেশার কথা তাই তিনি কল্পনায়ও আনেন না। বিগত প্রলম্বিত বন্যাকবলিত হয়ে পড়ল তার কৃষিজমি। ভেবেছিলেন অল্প কিছুদিনের জমা পানি নেমে গেলেই ফসলের তেমন ক্ষতি হবে না। কিন্তু বিধিবাম। ফজলারসহ এ রকম
শত শত
কৃষকের মাথায় হাত নয়, পড়ল বাড়ি।
চোখের সামনে ধূলিসাৎ হয়ে গেল তাদের স্বপ্নের ফসল। চোখে ঘোরতর অমানিশার অন্ধকার। অসহায় এসব কৃষক কখনো বন্যা, কখনো খরা,
কখনো অতিবৃষ্টি, কখনোবা অনাবৃষ্টি,
আবার কখনো রোগবালাই, পোকামাকড়ের উপদ্রবে
শস্যহানির মুখোমুখি হয়ে থাকেন।
মানুষের
জীবন থেকে শুরু করে জীবিকা, হোক সে
কৃষি বা শিল্প,
সে শিল্প
পণ্য বা সেবা
খাতের যা-ই
হোক না কেন,
সর্বদাই নানামুখী ঝুঁকি লেগেই থাকে। যেমন সুরুজ মিয়ার কথাই ধরা যাক। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সুরুজ মিয়ার লেপ-তোশক-পর্দার দোকান ঢাকা শহরেই। ভালোই চলছিল। অল্প কিছু প্রাতিষ্ঠানিক ঋণ নিয়ে,
নিজের জমানো টাকা ও মুনাফা
পুনর্বিনিয়োগ করে উত্তরোত্তর উন্নতি করছিল তার ছোট্ট ব্যবসার। ঢাকা শহরে লেপ, তোশক, পর্দার
চাহিদা বেশ ভালোই বলে তার ব্যবসাও প্রসার লাভ করছিল। দোকানে সে বেশ
কয়েকজন কারিগরও নিয়োগ দিয়েছিল সেলাই প্রভৃতি কাজে। দুর্ভাগ্য সুরুজের। দুর্ভাগ্য তার কর্মচারীদের। কোনো এক সর্বনাশা
রাতে বাজারে আগুন লাগে। পুড়ে ছাই হয়ে যায় সুরুজের দোকানসহ আরো অনেকের কয়েক ডজন দোকান। এখন ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে পাগলপ্রায় সুরুজ মিয়া অসহায় বেকারত্বের নির্মম কশাঘাতে দিনাতিপাত করছে।
শুধু
কি ছোট
ব্যবসা? মোটেই নয়।
এ রকম
অনেক দেশীয় প্রতিষ্ঠিত এমনকি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ টানা যায়, যারা বিভিন্ন
দায় পরিশোধ করতে গিয়ে দেউলিয়া হয়ে গেছে, গুনতে হয়েছে
অনেক লোকসান। সম্প্রতি বিশ্বের খ্যাতনামা একটি প্রতিষ্ঠান, যারা তাদের
পণ্যের গুণগত মান ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। মানহীন সে পণ্য
ব্যবহার করে ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন। ক্ষতিগ্রস্ত ভোক্তা ঠুকে দেন মামলা। উন্নত দেশে ভোক্তা অধিকার আইন খুবই কঠোর। মামলায় হেরে দৃষ্টান্তমূলক জরিমানা গুনতে হয় নামকরা
সেই কোম্পানিকে। হঠাৎ করে এ রকম
বড় আইনি
দায় নির্বাহ করতে অনেক খ্যাতনামা ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানকে বড় মাশুল
গুনতে হয়।
এ
রকম হাজারো উদাহরণ দেয়া যেতে পারে আমাদের ব্যস্ত জীবনের নানামুখী ঝুঁকির। মানুষের জীবন ও জীবিকা,
ব্যবসা-বাণিজ্য,
চাকরি, পেশা, ভবিষ্যৎ
দায়ভার এ রকম
শত শত
অনিশ্চয়তার খাত সর্বদাই আমরা অবলোকন করি। এটাও ঠিক যে সব
ঝুঁকি প্রশমন করা অথবা দূর করা হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু আমাদের চারপাশে বিরাজমান অনেক ঝুঁকি আছে, যেগুলো চাইলে
নানাভাবে দূর করা বা প্রশমন
করা সম্ভব। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে অনন্য এক পদ্ধতির
নাম হচ্ছে বীমা।
ঝুঁকি
ব্যবস্থাপনায় বীমা এমন এক পদ্ধতি
যেখানে প্রধানত দুটি পক্ষ থাকে। প্রথম পক্ষ হলো বীমা সেবা প্রদানকারী আর অন্য
পক্ষটি হলো বীমা সেবা গ্রহণকারী। বীমা সেবা প্রদানকারী এবং বীমা সেবা গ্রহণকারী পক্ষ একটি চুক্তিতে উপনীত হয়। চুক্তির সারবস্তু থাকে ঝুঁকি। ঝুঁকির মাত্রা, স্থায়িত্ব, বিষয়
ও শ্রেণী
ইত্যাদি বিবেচনায় বীমা সেবা প্রদানকারী পক্ষ প্রিমিয়াম বা অগ্রিম
ধার্য করেন এবং বীমা সেবা গ্রহণকারী পক্ষ তা প্রদান
করেন। প্রিমিয়াম বা অগ্রিম
আর্থিক সেবা প্রদানের বিপরীতে বীমা প্রদানকারী বীমা গ্রহণকারীর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করে থাকেন। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় বীমা সেবা প্রদানকারী নানাভাবে পারদর্শী। বীমা কোম্পানিতে ঝুঁকি বিশ্লেষক থাকেন। আধুনিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপকরা গণিত, অর্থনীতি ও
অর্থায়নের নানা বিষয়ে যথেষ্ট পারঙ্গম। তারা এমন অনেক ঝুঁকি আছে যেগুলো অনেক আগে থেকেই পূর্বাভাস দিতে পারেন। আধুনিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য জাতীয় ও আন্তর্জাতিক
অনেক কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়
পর্যায়ে বিশেষায়িত ডিগ্রি অফার করা হয়। সেখান থেকে অনেকে পাস করে অ্যাকচুয়ারি বা ঝুঁকি
ব্যবস্থাপক হিসেবে দেশ-বিদেশের
অনেক বীমা কোম্পানিতে উচ্চ বেতনে পেশাদারি চাকরি করেন। সুতরাং বোঝা যাচ্ছে যে বীমা
কোম্পানি অনেক দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের
সঙ্গে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করতে পারে, যা কোনো
ব্যক্তি বা অন্যান্য
পেশা ও ব্যবসায়
জড়িত কারো পক্ষে সম্ভব নয়।
কথা
হলো, ঝুঁকি যেহেতু
সার্বজনীন তাই ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও সার্বজনীন হওয়া উচিত। ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সার্বজনীনতা বলতে বোঝায় আপামর জনসাধারণ থেকে শুরু করে ব্যবসা, বাণিজ্য, কৃষি,
শিল্প ইত্যাদি সব ক্ষেত্রেই
জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার আওতায় নিয়ে আসা। মানুষের জীবনধারণের প্রতিটা ধাপে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা অতীব জরুরি। আধুনিক জীবন ব্যবস্থায় মানুষের জীবন ও জীবিকার
মান উন্নয়ন ও তা
ধরে রাখা, মুদ্রাস্ফীতি ও
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস এবং এ রকম
পরিস্থিতিতে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা অটুট রাখতে ব্যক্তির জীবনধারায় বীমা ব্যবস্থাপনা প্রভূত ভূমিকা পালন করতে পারে। আগে অনেক দেশের মতো এ দেশেও
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাকে তেমন গুরুত্ব দেয়া হয়নি। কিন্তু বর্তমানের প্রেক্ষাপট অনেকটাই ভিন্ন। এখন সদ্য বিবাহিত কোনো নবদম্পতি তাদের পরিকল্পনায় আগত সন্তান, সে সন্তানের
জন্মদানের জন্য আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম সংবলিত হাসপাতাল, ডাক্তার, সে
সন্তানের মানসম্পন্ন খাবারদাবার ইত্যাদি বিষয় নিয়ে ভেবে থাকেন। তাদের ভাবনার প্রতিটি পর্যায়ে নানা ঝুঁকির কথা বিবেচনায় থাকে। সন্তান জন্মদানের পর একটি
নির্দিষ্ট বয়সে স্কুলে ভর্তি, পড়াশোনার খরচ
চালানো, সন্তানের চিকিৎসাসহ
নানামুখী খরচের কথা অভিভাবকদের ভাবতে হয়। উন্নত অনেক দেশে সন্তান যখন বয়ঃপ্রাপ্ত হয় তখন
অনেক সামাজিক আচার-অনুষ্ঠান,
রীতি-রেওয়াজ
সম্পাদনে মোটা অংকের অর্থ খরচ করতে হয়। উন্নত বিশ্বের সেসব দেশের অভিভাবকরা এসব ক্ষেত্রে বীমা কোম্পানির বিভিন্ন লাভজনক পলিসি গ্রহণ করে থাকেন। সে কারণে
প্রয়োজনের সময় তারা তাদের আর্থিক ব্যবস্থাপনা সহজভাবে সম্পাদন করতে পারেন।
উঠতি
চাকরিজীবী থেকে শুরু করে যেকোনো পেশাতেই
চাকরি হারানোর একটি ভয় থাকে।
থাকে নানা চাপে তাদের কর্মদক্ষতা ও কর্মক্ষমতা
হারানোর ভয়ও। চলতি করোনা মহামারীর সময় যেমন অনেকেই চাকরি হারিয়ে বেকার জীবনযাপন করছেন। অনেক আধুনিক ও উচ্চ
পেশাতেও শ্রমিক-কর্মচারীদের
বেতন-ভাতা
হ্রাসের ঘটনাও ঘটেছে। উচ্চ বেতন-ভাতা
প্রাপ্ত সেসব চাকরিজীবীর জন্য তাই পরিবর্তিত বেতনে নিজেদের জীবনমান ও সংসার
চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। পেশাগত এসব ঝুঁকিও বীমা কোম্পানির বিভিন্ন পলিসি দিয়ে সমাধান করা যায়।
নিবন্ধের
শুরুতে যে মর্মান্তিক
দুর্ঘটনার কথা বর্ণনা করা হয়েছে, সে রকম
দুর্ঘটনাজনিত বা অন্য
যেকোনো কারণে মৃত্যু এবং তত্পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে পরিবারের অনেকের জীবনেই নেমে আসে ঘন অন্ধকার।
পরিবারে নির্ভরশীল অংশ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়ে। সেক্ষেত্রে জীবিত অবস্থায়ও পরিবারের প্রধান উপার্জনক্ষম ব্যক্তি নানা দুশ্চিন্তায় থাকেন। কোনো কারণে দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু অথবা অপমৃত্যু সব ক্ষেত্রেই
পরিবারের ভবিষ্যতের কথা ভেবে উদগ্রীব থাকেন প্রধান উপার্জনকারী। সুখের কথা হচ্ছে এ রকম
ক্ষেত্রেও বীমা কোম্পানির নানা পলিসি আছে। দুশ্চিন্তা না করে
সামান্য কিছু প্রিমিয়াম দিয়ে বীমা পলিসি গ্রহণ করে এসব কিছু থেকে স্বস্তিতে থাকা সম্ভব।
বীমা
কোম্পানিগুলো নানা ধরনের বিনিয়োগ পলিসিও অফার করে থাকে। সমাজের নানা শ্রেণী-পেশার
মানুষ তাদের উপার্জনের একটি অংশ বীমা কোম্পানির বিভিন্ন পলিসিতে বিনিয়োগ করতে পারেন। সেক্ষেত্রে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সঙ্গে তাদের ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ তহবিলে অর্থ জমা হবে। ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের সে অর্থ
দিয়ে বীমা পলিসি গ্রহণকারী নানামুখী খরচ করতে পারেন।
এরূপ
কৃষি ক্ষেত্রে আবহাওয়া, জলবায়ু সম্পর্কিত
ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার জন্য বিশেষত কৃষকদের জন্য শস্য বীমা পলিসি অফার করা যায়। কৃষকরা যেকোনো অর্থনীতির প্রাণভোমরা এবং তা খুবই
গুরুত্ব দিয়ে বুঝতে হবে। অত্যাধুনিক বিজ্ঞান ও কারিগরি
জ্ঞানের যুগে কৃষকদের গতানুগতিক কারণে শস্যহানি, কম উৎপাদন
প্রভূত ঝুঁকি তাই কাম্য নয়। বীমা কোম্পানিগুলো এক্ষেত্রে সামান্য বা নামমাত্র
প্রিমিয়ামের বিনিময়ে সর্বজনীন শস্য বীমা চালু করতে পারে। সমাজের অপরাপর পেশাজীবী যাদের পেশা নানা কারণে হুমকির মুখে, যেমন কামার,
কুমোর, তাঁতি, জেলে
ইত্যাদি তাদের জন্যও বিশেষ বীমা পলিসি অফার করা যায়।
দেশীয়
ও আন্তর্জাতিক
ব্যবসা-বাণিজ্যে
বীমার গুরুত্ব বলে শেষ করা যাবে না। পণ্যের উৎপাদন থেকে শুরু করে পণ্য পরিবহন, গুদামজাতকরণ, জাহাজীকরণ,
এভিয়েশন বা বেসামরিক
বিমান চলাচল ইত্যাদি সব ক্ষেত্রে
উল্লেখযোগ্য ঝুঁকি রয়েছে। সেজন্য বিশেষত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বীমা কোম্পানির ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার ছাড়পত্র ছাড়া পণ্য আমদানি-রফতানি
সম্ভব নয়। দেশীয় বাজারে পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে বাজারজাতের প্রতিটি ধাপেই তাই বীমা পলিসি বাধ্যতামূলক করা উচিত। এরূপ বাধ্যতামূলক বীমা পলিসি নিশ্চিত করা গেলে ব্যবসা-বাণিজ্য
সংশ্লিষ্ট সবারই মনোবল বাড়বে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য
পরিচালনা করে জাতীয় অর্থনীতিতে প্রভূত অবদান রাখতে পারবে।
প্রশ্ন
হলো বীমা পলিসির মাধ্যমে এতসব সুবিধা থাকলেও তা নিশ্চিত
করা যাচ্ছে না কেন?
বিশেষত বাংলাদেশে বীমা এখনো কেন গ্রহণযোগ্যতা পাচ্ছে না? এসব প্রশ্নের
কারণ খুঁজে বের করা দরকার এবং সেসবের প্রতিকার করা আশু অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাঞ্ছনীয়। বাংলাদেশ বীমা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটের দেয়া পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে বর্তমানে
৭৯টি বীমা কোম্পানি আছে। এর মধ্যে
৩৩টি জীবন বীমা কোম্পানি এবং ৪৬টি ননলাইফ বা সাধারণ
বীমা কোম্পানি। প্রায় ১৮ কোটি
জনসংখ্যার এ দেশে
৭৯টি বীমা কোম্পানি কম না
বেশি সে প্রশ্নের
উত্তর এড়িয়ে গেলেও এ কথা
সত্য যে বীমা
পলিসি বা এর
মাধ্যমে ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ঝুঁকি প্রশমন বা দূরীকরণ
ইত্যাদি ধারণা তেমন জনপ্রিয় নয়। এ দেশের
অধিকাংশ মানুষ বীমার গুরুত্ব সম্পর্কে ওয়াকিবহাল নয়। বীমা পলিসি গ্রহণ, নিয়মিত প্রিমিয়াম
প্রদানের মাধ্যমে পেশাদারি কোম্পানির দ্বারা ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা করা গেলে মানুষের ব্যক্তি, সমাজ, ব্যবসা
ও পেশাগত
জীবনে নানাবিধ সুবিধা ও উন্নতি
করা সম্ভব, তা গণমানুষকে
বোঝাতে হবে। এটাই ঠিক মানুষ কোনো কিছু গ্রহণ করার ক্ষেত্রে তার সুবিধার অংশটুকুতেই বেশি গুরুত্ব দেবে। বীমা পলিসি গ্রহণের মাধ্যমে পলিসি গ্রহণকারীর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ
যে নিরিখেই
হোক, সুবিধা যে
বেশি তা বোঝানো
গেলে এ দেশেও
বীমা পলিসি জনপ্রিয় করে তোলা সম্ভব।
বীমা
পলিসিকে জনপ্রিয় এবং তা সার্বজনীন
করে তোলার ক্ষেত্রে সমাজের বিভিন্ন পক্ষের দায় রয়েছে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো সীমিত এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা নিম্ন। এ রকম
বাস্তবতায় আইন করে বীমা পলিসিকে সর্বজনীন করতে গেলে মূল বাধা হবে পলিসি প্রিমিয়াম। সমাজের অনেক শ্রেণী-পেশার
মানুষের কাছে তা হবে
গলার কাঁটা। সে অবস্থায়
পলিসি প্রিমিয়াম হারের ভিন্নতা করা যেতে পারে। তাদের আয় ও
ক্রয়ক্ষমতা বিবেচনায় নিয়ে প্রিমিয়াম নির্ধারণ করতে হবে। সেবা ক্ষেত্রে এর মান
নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সেবা প্রদানকারী বীমা কোম্পানিগুলোকে গণমুখী আচরণ করতে হবে। পলিসি গ্রহণকারী, তিনি যে
সমাজ ও শ্রেণী-পেশারই হোন না কেন,
তাকে সম্যক সেবা প্রদানে বীমা কোম্পানিকে কার্পণ্য করলে চলবে না। এসব ক্ষেত্রে বাঁধাধরা আইন থাকতে পারে। বীমা কোম্পানিগুলো এক্ষেত্রে জনসচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে নানামুখী পদক্ষেপ নিতে পারে। এসব পদক্ষেপের মধ্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ইত্যাদি
পদক্ষেপও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। বীমা কোম্পানি ও পলিসি
সম্পর্কে যেসব নেতিবাচক ধারণা আছে সেসব তাদেরই দূর করতে হবে, দূর করতে
কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
আলোচিত
আইনি, ধর্মীয়, সামাজিক,
সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক
নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ ও তার
সঠিক বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাংলাদেশেও বীমা পলিসি সার্বজনীন করা সম্ভব। সর্বজনীন বীমা পলিসি নিশ্চিত করা গেলে এ দেশে
সমাজ ও অর্থনৈতিক
বাস্তবতায় তা হবে
এক যুগান্তকারী
পদক্ষেপ। সর্বজনীন বীমা বাস্তবায়নের মাধ্যমে এ দেশের
গণমানুষের জীবন মান এবং জাতীয় অর্থনীতি এক অনন্য
উচ্চতায় নিয়ে যাওয়া সম্ভব। সে লক্ষ্যে
জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োজন আশু উদ্যোগ গ্রহণ।
ড. শহীদুল জাহীদ: ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের শিক্ষক





