১৫৫৬ সাল। পানিপথের যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন সম্রাট আকবর। এ বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখা প্রয়োজন, একই সঙ্গে খাজনা আদায়ের সুবিধার্থেও তিনি নতুন বর্ষপঞ্জি চালু করলেন। বঙ্গাব্দের শুরু হলো। বাংলা নববের্ষের প্রথম দিন পহেলা বৈশাখ

 

১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে মোগল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন বলে বেশির ভাগ পণ্ডিত মনে করেন। ওই সময় বঙ্গে শক ব্যবহূত হতো, যার প্রথম মাস ছিল চৈত্র। বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রথমে ‘তারিখ-ই-এলাহি’ নামে পরিচিত ছিল।

সম্রাট আকবর ৯৬৩ হিজরি, ১০ রবিউল আউয়াল, রোজ শুক্রবার, ১৪৭৯ শকাব্দ, ১৬১৪ বিক্রমাসম্ভাত এবং ইংরেজি ১৫৫৬ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি তারিখে দিল্লির সিংহাসনে আরোহণ করেছিলেন। আর বাংলা সালটি সম্রাট আকবরের রাজত্বের ২৯তম বর্ষে অর্থাৎ ১৫৮৪ সালে প্রবর্তিত হলেও তা গণনা করা হয় ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকে।

একই বছর, অর্থাৎ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর এবং ৯৬৪ হিজরির ১ মহররম তারিখে মাত্র ১৩ বছর বয়সে সম্রাট হেমচন্দ্র বিক্রমাদিত্যকে দ্বিতীয় পানিপথের যুদ্ধে পরাজিত করেন। পানিপথের যুদ্ধে সম্রাট আকবরের বিজয়কে মহিমান্বিত করে রাখার জন্য বঙ্গাব্দ গণনা সে বছর থেকে শুরু হয়। মূলত, অধিকতর পদ্ধতিগত উপায়ে রাজস্ব আদায়ের উদ্দেশ্যে বাংলা সনের প্রবর্তন করা হয়েছিল।

মধ্যযুগে বাংলা সন প্রচলনের আগে কৃষি ও ভূমি কর বা খাজনা আদায় করা হতো ইসলামিক হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুসারে। কিন্তু চাষাবাদ করা হতো সৌর বছর অনুযায়ী। হিজরি বর্ষপঞ্জি চান্দ্র মাসনির্ভর বলে সবসময় কৃষি কর্মকাণ্ড অর্থবর্ষের সঙ্গে মিলত না। কারণ চন্দ্র ও সৌর বছরের মধ্যে ১১ বা ১২ দিনের পার্থক্য ছিল। ফলে ৩১টি চান্দ্র বছর ৩০টি সৌর বছরের সমান হয়ে যেত। তাতে কৃষিজীবীদের ফসলহীন ঋতুতে কর বা খাজনা দেয়ার জন্য বাধ্য করা হতো। সম্রাট আকবর তার শাসনের প্রথমেই এ সমস্যা অনুধাবন করতে পেরেছিলেন এবং এর একটি বৈজ্ঞানিক এবং কার্যকর সমাধান খুঁজছিলেন। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সম্রাট আকবর (শাসনকাল ১৫৫৬ হতে ১৬০৫ খ্রিস্টাব্দ) বর্ষপঞ্জি সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী ও রাজকীয় জ্যোতির্বিদ আমির ফতেউল্লাহ্ সিরাজী চান্দ্র মাসনির্ভর হিজরি বর্ষপঞ্জি এবং সৌর মাসনির্ভর হিন্দু বর্ষপঞ্জি গবেষণা করে একটি নতুন বর্ষপঞ্জি প্রস্তাব করেন। এর ফলেই সূচনা হলো বাংলা বর্ষপঞ্জি বা বাংলা সনের। বাংলা সনের সূচনা হয় ফসল তোলার সময়ে, যখন কৃষকরা অর্থনৈতিকভাবে বছরের অন্য সময়ের চেয়ে সচ্ছল থাকে। নতুন বর্ষপঞ্জি প্রথম দিকে ফসলি সন হিসেবে পরিচিত ছিল।

সম্রাট আকবর যে মাসে সিংহাসনে আরোহণ করেন, তার নিকটতম হিজরি বছরের প্রথম মাসকে ভিত্তি ধরা হয়। ৯৬৩ হিজরির ১ মহররম ছিল নিকটতম। ওই বছর শকাব্দের ১ বৈশাখ এবং হিজরির ১ মহররম একই দিনে এসেছিল। বৈশাখ হলো শকাব্দের দ্বিতীয় মাস, চৈত্র প্রথম মাস। ৯৬৩ হিজরির ১ মহররমকে বাংলা ৯৬৩ সনের ১ বৈশাখ পরিচিহ্নিত করে বাংলা সন শুরু করা হয়। অর্থাৎ ১, ২, ৩— এভাবে হিসাব না করে মূল হিজরি সনের চলতি বছর থেকেই বাংলা সনের গণনা শুরু হয়। ফলে জন্ম বছরেই বাংলা সন ৯৬৩ বৎসর বয়স নিয়ে যাত্রা শুরু করে।

৯৬৩ অব্দের পূর্বে বাংলাবর্ষে আর কোনো সন ছিল না। আরবি মহররম মাসের সঙ্গে বাংলা বৈশাখ মাসের সামঞ্জস্য থাকায় বাংলা অব্দে চৈত্রের পরিবর্তে বৈশাখকে প্রথম মাস করা হয়। বাংলা সন, ফসলি সন বা তারিখ-ই-এলাহির সূচনা থেকে ৪৫৬ বছর পর বাংলা (১৪১৯) ও হিজরি (১৪৩৩) বর্ষপঞ্জিতে প্রায় ১৪ বছরের ব্যবধান পাওয়া যায়। অর্থাৎ হিজরি সাল বাংলা সন থেকে প্রায় ১৪ বছর এগিয়ে। তার কারণ হিজরি বর্ষ হচ্ছে চন্দ্রনির্ভর আর বাংলা হচ্ছে সূর্যনির্ভর। চান্দ্রবর্ষ হয় ৩৫৪ দিনে আর সৌরবর্ষ হয় ৩৬৫ বা ৩৬৬ দিনে। অর্থাৎ চান্দ্রবর্ষ থেকে সৌরবর্ষ ১১ বা ১২ দিন এগিয়ে। এ কারণেই তারতম্য। তবে উভয়ই সৌরবর্ষভিত্তিক হওয়ায় বাংলা ও গ্রেগরিয়ান বর্ষের মধ্যে পার্থক্য খুব কম। তারিখ-ই-এলাহির সূচনার সময় বাংলা ও গ্রেগরিয়ান বর্ষের মধ্যে পার্থক্য ছিল ১৫৫৬-৯৬৩ = ৫৯৩ বছর, যা বর্তমানেও একই (২০১২-১৪১৯ = ৫৯৩)। অর্থাৎ বাংলা সনের সঙ্গে ৫৯৩ যোগ করলে খ্রিস্টীয় সন পাওয়া যায়।

আগে বাংলা সনে কোনো লিপ-ইয়ার ছিল না। ১৯৬৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি তারিখে বাংলা একাডেমির তত্ত্বাবধানে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর নেতৃত্বে একটি বঙ্গাব্দ সংস্কার কমিটি গঠিত হয়। কমিটি চার বছর পর পর চৈত্র মাস ৩০ দিনের পরিবর্তে ৩১ দিনে গণনা করার পরামর্শ দেয়।

প্রচলিত একটি মত অনুযায়ী— প্রাচীন বঙ্গদেশের (গৌড়) রাজা শশাঙ্ক (রাজত্বকাল আনুমানিক ৫৯০-৬২৫ খ্রিস্টাব্দ) বঙ্গাব্দ চালু করেছিলেন। সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভে শশাঙ্ক বঙ্গদেশের রাজচক্রবর্তী রাজা ছিলেন। আধুনিক ভারতের বাংলা, বিহার ও ওড়িষার অধিকাংশ এলাকা তার সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল। অনুমান করা হয়, জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের সোমবার ১২ এপ্রিল ৫৯৪ এবং গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সোমবার ১৪ এপ্রিল ৫৯৪ বঙ্গাব্দের সূচনা হয়েছিল। শশাঙ্ক বাংলা সনের প্রবর্তক, এ মতের সমর্থক অনেকে থাকলেও তা খারিজ হয়ে গেছে অনেক আগেই। কারণ আসলে ষষ্ঠ বা সপ্তম শতকে বঙ্গাব্দ, বাংলা সন বা বাংলা সাল ব্যবহূত হওয়া অসম্ভব ছিল। অত আগে বঙ্গ বা বাংলা বলে কোনো রাজ্য বা ভৌগোলিকভাবে সুসংবদ্ধ এলাকা গড়ে উঠেছিল, ইতিহাসে তার প্রমাণ নেই। তাই বঙ্গাব্দর মতো আধুনিক শব্দের ব্যবহার যেমন সম্ভব ছিল না, তেমনি সঙ্গত কারণেই আরবি বা ফার্সি শব্দ ‘সন’ বা ‘সাল’-এর ব্যবহার একেবারেই অকল্পনীয়। এসব কারণেই রাজা শশাঙ্কের সঙ্গে বঙ্গাব্দ বা বাংলা সনের সম্পর্ককে ইতিহাসসম্মত প্রত্যয় বলে মনে করেন না অনেক পণ্ডিত।

সন ও তারিখ দুটিই আরবি শব্দ। প্রথমটির অর্থ হলো বর্ষ বা বর্ষপঞ্জি এবং অন্যটির অর্থ দিন। তারিখ বলতে আবার ইতিহাসও বোঝায়। সাল ফারসি শব্দ, যার অর্থ বৎসর।

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, বাংলা সনের মাসগুলোর নাম নিম্নে বর্ণিত নক্ষত্রের নাম থেকে উদ্ভূত হয়েছে—

মাসের নাম   সংশ্লিষ্ট নক্ষত্রের নাম

 

বৈশাখ বিশাখা

জ্যৈষ্ঠ   জ্যেষ্ঠা

শ্রাবণ   শ্রাবণা

ভাদ্র     ভাদ্রপদা

আশ্বিন             আশ্বিনী

কার্তিক             কার্তিকা

অগ্রহায়ণ         অগ্রহায়ণ

পৌষ    পৌষা

মাঘ      মঘা

ফাল্গুন           ফাল্গুনী

চৈত্র     চিত্রা

 

‘ফসলি সন’ যখন প্রবর্তিত হয়, তখন কিন্তু ১২ মাসের নাম ছিল— কারওয়াদিন, আরদি, ভিহিসু, খারদাদ, তীর, আমরারদাদ, শাহরিয়ার, মিহির, আবান, আয়ুব, দায়, বাহমান। পরবর্তী পর্যায়ে সেগুলো বৈশাখ, জ্যৈষ্ঠ, আষাঢ়, শ্রাবণ ইত্যাদিতে রূপান্তরিত হয়।

প্রাথমিক পর্যায়ে বংলা সনের প্রথম মাস কোনটি ছিল, সে বিষয়ে কিঞ্চিৎ মতানৈক্য রয়েছে। অধিকাংশ ঐতিহাসিক অভিমত প্রকাশ করেন, অগ্রহায়ণ হলো অগ্রাধিকার বিধায়, অতীতে আমাদের নববর্ষের দিন ছিল পহেলা অগ্রহায়ণ। অর্থাৎ ‘হায়ণ’ বা বৎসরের প্রারম্ভে যায় যে মাস, তার প্রথম দিন ছিল আমাদের নববর্ষের দিন। কিন্তু ৯৬৩ হিজরিতে যখন ফসলি সন বা বাংলা সন শুরু করা হয়, তখন হিজরি সনের প্রথম মাস মহররম বৈশাখ মাসের সঙ্গে মিশে যায়। ফলে এ দেশে পহেলা বৈশাখই নওরোজ বা নববর্ষ হিসেবে পরিচিহ্নিত হয়। উল্লেখ্য, ইংরেজি তথা গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের ক্ষেত্রেও প্রথমে ১ মার্চ ছিল ‘নিউ ইয়ারস ডে’। কিন্তু পরবর্তী পর্যায়ে ১ জানুয়ারি সে সম্মানজনক স্থান দখল করে নেয়।

পয়লা বৈশাখ বা পহেলা বৈশাখ (বাংলা পঞ্জিকার প্রথম মাস বৈশাখের ১ তারিখ) বাংলা সনের প্রথম দিন, তথা বাংলা নববর্ষ। দিনটি বাংলাদেশ ও ভারতের পশ্চিমবঙ্গে নববর্ষ হিসেবে বিশেষ উৎসবের সঙ্গে পালিত হয়। ত্রিপুরায় বসবাসরত বাঙালিরাও এ উৎসবে অংশ নেন। সে হিসেবে এটি বাঙালির একটি সর্বজনীন উৎসব। বিশ্বের সব প্রান্তের সব বাঙালি এ দিনে নতুন বছরকে বরণ করে নেন। বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা একে নতুনভাবে ব্যবসা শুরুর উপলক্ষ হিসেবে বরণ করে নেন। গ্রেগরীয় বর্ষপঞ্জি অনুসারে ১৪ এপ্রিল অথবা ১৫ এপ্রিল পহেলা বৈশাখ পালিত হয়। আধুনিক বা প্রাচীন যেকোনো পঞ্জিকাতেই এ বিষয়ে মিল রয়েছে। বাংলাদেশে প্রতি বছর ১৪ এপ্রিল এ উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে এ দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এদিন বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকে।

আকবরের সময়কাল থেকেই পহেলা বৈশাখ উদযাপন শুরু হয়। তখন প্রত্যেককে চৈত্র মাসের শেষ দিনের মধ্যে সব খাজনা, মাশুল ও শুল্ক পরিশোধ করতে হতো। এর পরদিন অর্থাৎ পহেলা বৈশাখে ভূমির মালিকরা নিজ নিজ অঞ্চলের অধিবাসীদের মিষ্টান্ন দ্বারা আপ্যায়ন করতেন। এ উপলক্ষে বিভিন্ন উৎসবের আয়োজন করা হতো। এ উৎসব একটি সামাজিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়, যার রূপ পরিবর্তন হয়ে বর্তমানে এ পর্যায়ে এসেছে। তখনকার সময় এ দিনের প্রধান ঘটনা ছিল একটি হালখাতা তৈরি করা। হালখাতা বলতে একটি নতুন হিসাব বই বোঝানো হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হালখাতা হলো বাংলা সনের প্রথম দিনে দোকানপাটের হিসাব আনুষ্ঠানিকভাবে হালনাগাদ করার প্রক্রিয়া। গ্রাম, শহর বা বাণিজ্যিক এলাকা— সব স্থানেই পুরনো বছরের হিসাব বই বন্ধ করে নতুন হিসাব বই খোলা হয়। হালখাতার দিনে দোকানদাররা তাদের ক্রেতাদের মিষ্টান্ন আপ্যায়ন করে থাকেন। এ প্রথা এখনো অনেকাংশে প্রচলিত আছে, বিশেষত স্বর্ণের দোকানে।

আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। প্রথম মহাযুদ্ধে ব্রিটিশদের বিজয় কামনা করে সে বছর পহেলা বৈশাখে হোম কীর্তন ও পূজার ব্যবস্থা করা হয়। ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকাণ্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়। ১৯৬৭ সালের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়নি।

(বিভিন্ন উৎস থেকে সংগৃহীত)