১৩৬৮ বঙ্গাব্দ। নাম হলো ছায়ানট। সকলে একসঙ্গে কাজ করার ব্রত নিয়ে যার যাত্রা। কিন্তু বাঙালি পরিচয় মুছে ফেলতে উত্সুক যারা, তারা পশ্চিম পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষকে ছায়ানট আর তার অনুষ্ঠান নিয়ে মিথ্যা খবর দিয়ে কান ভারী করে তুলল প্রতিনিয়ত
সন্জীদা খাতুন রচিত সহজ কঠিন দ্বন্দ্বে ছন্দে গ্রন্থের অংশ বিশেষ।
আনন্দিত মনে সিধু ভাই ঘোষণা করলেন, ‘আমরা উদ্যোক্তারা সবাই মিলে জয়দেবপুরে গিয়ে একটি পিকনিক করব।’ সিধু ভাই দায়িত্ব নিলেন আগুনে ঝলসে মুরগির কাবাব করবেন। সরু বাঁশে সার সার মুরগি গেঁথে আগুনের উপরে বাঁশটা দরকার মতন ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দারুণ কাবাব হলো। আমার ভয় হচ্ছিল বাঁশে না আগুন ধরে যায়। কিচ্ছু না! সিধু ভাইকে দেখলাম মহাএক্সপার্ট। রান্নাবান্নায় আমার কোনো ভূমিকা ছিল না। রোজবু-সিধু ভাইরাই সব করলেন। মহাআনন্দে খাওয়া-দাওয়া হলো। সিধু ভাইয়ের মূল পরিকল্পনাটা নির্বাহ হলো এরপর। ছায়া ছায়া হয়ে আসা বিকালে কাদের বাড়ির উঠোনে যেন বৈঠক বসল। তারা খুশিমনে কাঁঠাল আর মুড়ি পাঠিয়ে দিল আমাদের। ভরা পেটে তখন আর ওসব খায় কে? ওদের আন্তরিকতায় আমরা খুশি হলাম।
সিধু ভাই উদ্দেশ্যটা বুঝিয়ে বললেন, ‘আমাদের সবার এক হয়ে কাজ করে চলা দরকার।’ সুফিয়া খালাম্মা সভাপতি, সায়েরা মহিউদ্দীন সহসভাপতি, আরো কে কী হলেন মনে নেই সব। সিধু ভাইয়ের ইচ্ছা, আমি সাধারণ সম্পাদক হই। হেসে বললাম, আমি সরকারি কলেজে চাকরি করি না? বুঝলেন। ফরিদা হাসান ছিলেন আমাদের সঙ্গে। তাকেই সাধারণ সম্পাদক করা হলো। সিধু ভাই কী হলেন? সহসভাপতি না কোষাধ্যক্ষ? মনে নেই। তবে প্রথম থেকেই সংগঠনের নিয়মে পদে থাকলেই কাজ করতে হবে, এমন মনোভাব আসেনি কারো। দলে নাম রইল অনেকের— রোজবু (শামসুন্নাহার রহমান), আহমেদুর রহমান, ওয়াহিদুল হক, সাঈদুল হাসান (ফরিদার স্বামী), ছানা (মীজানুর রহমান), মানিক (সাইফুদ্দীন আহমেদ), নূরুল ইসলাম, দেবদাস চক্রবর্তী ইত্যাদি আরো...। আমার তো সদস্য হওয়ারও উপায় ছিল না সেই সময়ে।
পরের সভাতেই ফরিদা হাসান বললেন, ‘নাম হোক ছায়ানট’। ওয়াহিদুল অবশ্য বলেন, নাম দিয়েছিলেন সাঈদুল হাসান। হতেও পারে। ফরিদা বলেছিলেন, ‘রাগের নাম তো, খুব উপযুক্ত হবে।’ হয়তো স্বামী-স্ত্রী একমত হয়ে নাম ঠিক করেছিলেন।
ফরিদার উপরমহলে দহরম-মহরম ছিল। প্রথমেই আব্দুল আহাদকে ধরে পুরনো বাংলা গানের আসর করবেন ঠিক করলেন। আহাদ ভাই তার শিষ্যশিষ্যাদের নানা গান শিখিয়ে তৈরি করলেন। ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে জমজমাট অনুষ্ঠান হলো। ফেরদৌসী রহমান, আফসারি খানম ইত্যাদি নামি শিল্পীরা গাইলেন অনুষ্ঠানে। আমাকে এখানে ডাকেননি, না ফরিদা হাসান, না আব্দুল আহাদ। ফাহিমদাকেও নয়। মহড়া সম্ভবত রেডিও অফিসেই হয়েছিল— তারও খবর কেউই জানতে পারিনি। অনুষ্ঠান দেখে এলাম, অত্যন্ত পরিপাটি সব আয়োজন। ফরিদা সাহায্য নিতেন ছানা-মানিকদের। জানি না ওদের সঙ্গে কী হলো তার, একটা অনুষ্ঠান করেই একদম চুপ হয়ে গেলেন তিনি!
ততদিনে সিধু ভাইদের বৈঠকখানায় আমাদের শ্রোতার আসর চালু হয়েছে। ঘরোয়া সমাবেশ। সিধু ভাই খবর দিয়েছিলেন, ফিরোজা বেগম এসেছেন ঢাকায়— তাকে নিয়ে আসর করা যায়। আর কথা কী! সিধু ভাইয়ের মেয়েরা ‘এল’ প্যাটার্নের ঘরটার কোনে মঞ্চ সাজাল। রোজবু তো আছেনই সেই সঙ্গে। ঠিক হলো, মঞ্চে শুধু মোম জ্বলবে, ঘরের সব বিজলি বাতি নেভানো থাকবে। ফিরোজা বেগমের গান বলে আব্বুকেও নিয়ে গেলাম। অনেক গান গেয়েছিলেন তিনি সেদিন, মন খুলে। কানে লেগে রইল ‘গুরু, আমার উপায় বলো না’ আর রজনীকান্তের ‘ওরা চাহিতে জানে না দয়াময়’। সেলিনা মালেক রজনীকান্তের গানখানি বাসায় গিয়ে শিখে নিয়েছিল। ফাহিমদা শিখেছিল ‘আমার যেমন বেণী তেমনি রবে চুল ভিজাব না’। বলেছিলেন, ওর কাছে নজরুলের গানের অনেক স্বরলিপি রয়েছে, ছাপানোর ব্যবস্থা নেই। আমি আলী আহ্সান সাহেবের কাছে ওকে নিয়ে গিয়ে বাংলা একাডেমি থেকে নজরুলের স্বরলিপি বই ছাপানোর ব্যবস্থা করে দিলাম।
সেবার ওর বড় বোন মরিয়ম বেগমের স্বামী ফিরোজা আপাকে বিপদে ফেলার জন্য ওর পাসপোর্ট জব্দ করিয়েছিলেন। সেই বিপদে সিধু ভাই এদিকে ওদিকে প্রভাব খাটিয়ে সেই ভ্রমণ দলিল উদ্ধার করার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। ফিরোজা আপা কলকাতা গিয়ে কমল দাশগুপ্তকে বিয়ে করে ফেলায় তার দুলাভাইয়ের রাগ হয়েছিল। সেই কিছুদিন ফিরোজা বেগম আমাদের প্রতি খুব অনুকূল ছিলেন। এরপরে মাত্র একবার আমাদের অনুষ্ঠানে নজরুলের গান গেয়েছিলেন এসে। আমাদের ওপর একটা বাঁকা ভাব হয়ে গেল যে কখন কে জানে। ইদানীংকালে নজরুল উৎসব উদ্বোধন করার অনুরোধ করায় বলেন, ‘দেখি’। কার্ড ছাপানোয় দেরি হয়ে যাওয়ার দরুন দেখার জন্য অপেক্ষা করা যায়নি।
যা-ই হোক, আমাদের দ্বিতীয় শ্রোতার আসর-এর একক শিল্পী ছিল ফাহিমদা। খুব নাম হচ্ছে তখন ওর। ফাহিমদাও অনেক রবীন্দ্রসংগীত গেয়েছিল। ভক্ততালিকায় নাম লিখিয়ে ফেলল অনেকেই।
এরপর শ্রোতার আসরের নাম ছড়িয়ে গেল খুব। প্রচুর গাড়ি জমে যেত সিধু ভাইয়ের গেটের বাইরে। শুদ্ধ সংগীতের আসরেও মেলা লোক! খাদেম হোসেন খান, মীর কাসেম খান, আবিদ হোসেন খান, ইয়াসীন খান, ক্রমে বারীণ মজুমদার-ইলা মজুমদার! আফসারী আপা ততদিনে সি এস পি শামসুর রহমানের (জনসন) ঘরনী হয়ে পাকিস্তানের নানা দিকে থাকছেন। বিলকিস নাসিরুদ্দিনও বিয়ে হয়ে এদিকে ওদিকে— ঢাকায় ছিলেন না, কলিম শরাফী তো চট্টগ্রামেই ছিলেন প্রথমাবধি, পরে ঢাকায় এলেও আমরা তার নাগাল পেতাম না। কাজী শাহজাহান হাফিজ তো মেডিকেল কলেজে পড়ার সময়েই সামরিক বাহিনীতে চলে গিয়েছিলেন। আসরে একবার মালেকা আজিম খান গাইল। তারপর আমরা ভয় পেলাম, দেশে শিল্পী কোথায়!
ওয়াহিদুলের মগজে এক বুদ্ধি এল। আমাকে বললেন, ‘আমরা একটা গানের স্কুল করব।’ ছায়ানটের তখন তহবিল বলে কিছু নেই। অনুষ্ঠানের খরচ-খরচা বেশির ভাগই সিধু ভাইয়ের কাঁধে। সিধু ভাইয়ের বাড়িতে এক মিটিংয়ে ওয়াহিদুল স্কুল করার ঘোষণা দিয়ে বসলেন। সিধু ভাই তো মুখ ঘুরিয়ে নিলেন। সবাই স্তব্ধ, যেন বোমা পড়েছে ঘরের মধ্যে! ওয়াহিদুল হাসতে হাসতে বললেন, ‘কমিটি মেম্বাররা মাসে মাসে চাঁদা দেব! আমি আর মিনু মিলে দেব ৭০ টাকা। আপনার কে কত দেবেন?’ তখন মুখ খুলে কেউ বললেন, ১৫, কেউ ১০, কেউ ২৫— এই রকম।
রেডিওতে এক গুণী বেহালাবাদক শিল্পীদের গানের সঙ্গে সঙ্গত করতেন। কন্ট্রাক্ট সার্ভিস, মাস মাইনে আড়াইশ। মতি মিয়া। ইনি নাকি শিলচরে থাকতে শিশিরকণা ধর চৌধুরীকে বেহালার হাতেখড়ি দিয়েছিলেন। তাকে মাসে সাড়ে তিনশ টাকা বেতন কবুল করে অধ্যক্ষ করে নিয়ে এলেন ওয়াহিদুল। রেডিওর তবলাবাদক বজলুল করিম এলেন তবলার শিক্ষক হিসেবে। আর মতি মিয়া একই একশ! তিনি রাগরাগিণী শেখাবেন গেয়ে গেয়ে। আর শুধু বেহালা কেন— বাঁশি, সেতার, সরোদ সব!
রিকশা নিয়ে আমি আর ওয়াহিদুল চললাম শাজাহানপুর রেলগেট ছাড়িয়ে সরকারি কোয়ার্টার্সে সোহরাব ভাইদের বাসায়। আমাকে উনি এতই স্নেহ করতেন যে অত্যন্ত খুশি হলেন। আবেদন জানালাম, ‘সোহরাব ভাই, একটা গানের স্কুল খুলব আমরা। আপনাকে সেখানে নজরুলগীতি শেখাতে হবে।’ মিনু বলেছে, খুব রাজি!
তেরশ সত্তর সালের পহেলা বৈশাখে বিদ্যালয়ের উদ্বোধন হবে ঠিক হলো। আশ্বর্য এই, এবারে সিধু ভাই মেতে উঠলেন ব্যবস্থাপনায়! কী খাওয়া হবে ঠিক হলো, সিধু ভাই বললেন তারপরে ডাবের পানি। অতগুলো ডাব কাটা নিয়ে দুশ্চিন্তা করতে দেখে উড়িয়ে দিলেন, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে।’ বাড়ির কাজের লোকদের নিয়ে আসতেন এসব সময়ে। তারা দ্রুত ডাব কেটে একটা করে স্ট্র লাগিয়ে হাতে হাতে ধরিয়ে দিতে লাগল। আমি এর আগে এভাবে ডাব খাওয়া দেখিনি। দিব্বি ব্যবস্থা তো।
শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ফিতে কেটে উদ্ঘাটন করলেন সংগীত বিদ্যায়তনের দ্বার। প্রধান অতিথি ওস্তাদ আয়েত আলী খাঁ সরোদে আলাপ করে শুভারম্ভ করলেন। এ অনুষ্ঠান হলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংলিশ প্রিপারেটরি স্কুলে। এ স্কুলের অধ্যক্ষ ছিলেন নাজমা আতহার। ইনি আমাদের রোকেয়া কবীর আপার বান্ধবী। এদের দুজনকেই ছায়ানটের কার্যকরী সংসদে নিয়ে নেয়া হয়েছিল। বিষ্যুত্বার বিকাল আর শুক্রবার সকালে ক্লাস শুরু করা হলো বাংলা একাডেমির তিনতলায়। আমার সঙ্গে রবীন্দ্রসংগীত শেখানোর জন্য যোগ দিল ফরিদা বারি মালিক, আমার বান্ধবী বীথি। বিশেষ করে অনুষ্ঠানের মহড়ার সময়ে আমাকে সাহায্য করত ও।
এমন সময়ে খাঁড়ার ঘা পড়ল। আমাকে পদোন্নতি দিয়ে বদলি করা হলো রাজশাহী কলেজে। এবার? সিধু ভাই মাথা নাড়লেন, ‘দেখি’! এক শুক্রবার ব্যবস্থা হলো, ডিপিআই ডক্টর মুহম্মদ শামসুল হক আমন্ত্রিত হয়ে এলেন ছায়ানট সংগীতবিদ্যায়তনের ক্লাস দেখতে। প্রথম বর্ষ রবীন্দ্রসংগীত ক্লাসের শিক্ষার্থীরা গাইল— ‘মহাবিশ্বে মহাকাশে মহাকাল মাঝে/ আমি মানব একাকী ভ্রমি বিস্ময়ে/ ভ্রমি বিস্ময়ে’। মাত্র সপ্তাহ দুয়েকেই চমত্কার গাইছে তেওড়া তালের ভারিক্কি গানখানি। সেই ক্লাসেই গান শিখতে শুরু করেছিল ক্লাস সিক্সের মেয়ে ইফ্ফাত আরা দেওয়ান।
শিশুরা সোহরাব ভাইয়ের কাছে শিখেছে ‘কানন গিরি সিন্ধুপার ফিরিনু পথিক দেশ বিদেশ’। চমত্কার গেয়ে শোনাল। শিক্ষার্থীদের ক্লাস শুরু করার আগেকার প্রার্থনাসংগীত হলো— ‘মেরি আরযদস্ত’। গানের পর ঘরোয়া জলখাবারের আয়োজন— সব মিলিয়ে মুগ্ধ হলেন মুহাম্মদ শামসুল হক সাহেব।
ওই সময়ে বাংলা একাডেমির বাংলা অভিধানের জন্য সহসম্পাদক পদের বিজ্ঞাপন প্রকাশ হলো। সরকারের অনুমতি নিয়ে আবেদন করলাম। বন্ধুস্থানীয় হাসান হাফিজুর রহমান ও পদের জন্য প্রার্থী ছিলেন। আমি আবেদন করেছি জেনে তিনি ইন্টারভিউতেই এলেন না। লজ্জাই পেলাম শুনে। বাংলা একাডেমির প্রধান সৈয়দ আলী আহ্সানের প্রিয় ছাত্রী ছিলাম আমি। চাকরি হলে ওই পদে যোগ দিলাম সরকারি চাকরি থেকে লিয়েন নিয়ে। সংগীতবিদ্যায়তনের জন্য ঢাকায় থাকাটা জরুরি ছিল। মতি মিয়া অধ্যক্ষ হলেও সবদিকে চোখ রাখতে হতো আমাদেরকেই। জেদ করে শুরু করা স্কুল তো!
দিনে দিনে কঠিন হল দিন। এ দেশের কিছু পাকিস্তানি মুসলমান, যারা নিজেদের বাঙালি পরিচয় মুছে ফেলতে উত্সুক, তারা পশ্চিম পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষকে ছায়ানট আর তার অনুষ্ঠান নিয়ে মিথ্যা খবর দিয়ে তাদের কান ভারী করে তুলল। শেখ লুতফর রহমান একবার পশ্চিম পাকিস্তানে গান গাইতে গিয়ে সেসব শুনে এসে আমাকে বললেন, ‘এ কী ভাই! আমাকে ওরা বলল, আপনি নাকি রবীন্দ্রজয়ন্তী অনুষ্ঠানের আগে গলায় আঁচল জড়িয়ে মঞ্চ প্রদক্ষিণ করে এসে রবীন্দ্রনাথের ছবিতে প্রণাম করার পরে অনুষ্ঠান শুরু করা হয়। দেখিনি তো কখনো?!’
আরেকবার সেলিনা মালেক বলল, ‘আপা! রোকেয়া হলের এনএসএফের মেয়েরা বলছে কি, ছায়ানটের ছেলেমেয়েরা নাকি পহেলা বৈশাখের সকালে বর্ষবরণের অনুষ্ঠান শেষ করে সবাই একসঙ্গে লেকের পানিতে নেমে সূর্যবন্দনা করে, জলকেলি করে।’ সেলিনা ওদের বলেছে, ‘এবার আমার সঙ্গে চলো বটমূলে, আমরা কী করি দেখবে।’ ওরা বলে, ‘জানি জানি, আমরা সব জানি। আর দেখতে হবে না।’
পাকিস্তান আমলের শেষদিকে মোনায়েম খান তার পোষ্যপুত্রদের নিয়ে ন্যাশনাল স্টুডেন্টস ফ্রন্ট করেছিলেন। এরা হলে থাকত গুণ্ডামি করে অন্য ছেলেদের কন্ট্রোলে রাখার চেষ্টা করত। পরে মেয়েরাও যোগ দিয়েছিল এনএসএফে।
রোকেয়া কবীর আপা একদিন গল্প করলেন, এখানকার সাংবাদিকদের কোনো ক্যারেক্টার নেই। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আলতাফ গওহর এসেছিলেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে তার একটা বৈঠক হয়েছিল। সেখানে কারা যেন ছায়ানটের সূর্যবন্দনা প্রসঙ্গ নিয়ে অনেক কথা বলেছে। একজন সাংবাদিকও তার কোনো প্রতিবাদ করল না। পাকিস্তানি সরকারি কর্মকর্তাটি নাকি খুব হাসাহাসি করেছেন, বাঙালি মেয়েরা ছেলেদের সঙ্গে জলকেলি করার মতো স্মার্ট হলো আবার কবে!
একের পর এক ধাক্কা আসতে লাগল ছায়ানটের ওপর। আইয়ুব খানের স্বঘোষিত চাকর মোনেম খাঁ নানা বাধার সৃষ্টি করতে লাগলেন। প্রথমে আলী আহ্সান সাহেবকে জিজ্ঞেস করা হলো ছায়ানট কেন বাংলা একাডেমিতে ক্লাস করছে। তার মধ্যে আবার এক একুশে ফেব্রুয়ারিতে আমাকে বাংলা একাডেমির অনুষ্ঠানে গান গাইতে বলা হলে আমি মহাআনন্দে গীতবিতান খুলে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানখানি আগাগোড়া গাইলাম। স্যার দুচারদিন পরে আমাকে তার কক্ষে ডেকে পাঠালেন। বললেন, ‘তুমি সেদিন ওই গানখানি গাইলে কেন, আমাকে সে প্রশ্ন করা হয়েছে।’ আমার জবাব, ‘স্যার, সোনার বাংলা তো আমাদেরই। আমরা সেটা ফরংড়হি করব কেন?’ স্যার আমাকে, পাকিস্তানি মুসলিম হিসেবে এ গান আমাদের গাওয়া ঠিক নয়, বোঝাতে চেষ্টা করলেন। আমি বললাম, ‘আমি মুসলমান, সেটা আমার ব্যক্তিগত পরিচয়। জাতি হিসেবে তো আমি বাঙালি!’ স্যার সতর্ক করে দিলেন, ‘ওসব গান গেয়ো না।’
বাংলা একাডেমি একদিন ওখান থেকে ছায়ানটের স্কুল সরিয়ে নিতে বলে দিল। যাব কোথায়? সভায় রোকেয়া আপা নাজমা আতহারকে বললেন, ‘তোমার ইংলিশ প্রিপারেটরিতেই ক্লাস হোক তবে!’ অন্তত বছর দু-তিন শান্তিতে কাটল। খেয়াল করিনি, কবে এক সময়ে নাজমা আপা ওখানকার কাজ ছেড়ে দিলেন, নূরুল আমিনের এক মেয়ে এলেন অধ্যক্ষ হয়ে। কোনো একটা অনুষ্ঠানের জন্য অনুমতি নিতে গিয়েছিলাম আমরা কয়েকজন। সুফিয়া কামালের নাম শুনে ইনি ভুরু তুলে প্রশ্ন করলেন, ‘তিনি কে?’ প্রশ্ন করার ভঙ্গি দেখে আমরা হতবাক! শিগগিরই একদিন শোনা গেল, গানের স্কুলের লোকজন হল কামরা-সংলগ্ন টয়লেটের পেছনের দরজা খুলে রেখেছিল বলে হলঘরের সব ফ্যান চুরি হয়ে গেছে। তারপরে এটা-ওটা অভিযোগ শুনতে থাকলাম আমরা। বলে দেয়া হলো, ওখান থেকে উঠে যেতে হবে। এবার অকূলে পাথারে।
দুঃসাহসে ওয়াহিদুল তো বিশ্বজয়ী! কোথা থেকে যেন ছাপাখানার টাইপ ইত্যাদি কিনে বসলেন। পাবনার অমল নামের একজনের সঙ্গে পার্টনারশিপে প্রেস চালাবেন। মালিবাগে একখানা বাড়ি ভাড়া করলেন সাধ্যাতিরিক্ত ভাড়া দিয়ে। এবার অমল ছাপার মেশিন কিনে ফেললেই প্রেস চালু করা যাবে। এ বাড়িতেই সংগীতবিদ্যায়তনের ক্লাস শুরু হবে। দারোয়ান রাখা হলো। সবই ঠিকঠাক। ক্লাস আরম্ভও হলো কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার শিক্ষার্থীরা মালিবাগে যেতে ইচ্ছুক নয়। এমন সময়ে কল্পনার ঘোড়ার দৌড় থেমে গেল এক সংবাদে, অমল এ ব্যবসায় যোগ দিচ্ছে না। অর্থনাশ, শ্রমনাশ!
এবার ওয়াহিদুল ৯ হাজার টাকায় কেনা টাইপকেসটেসসুদ্ধ টাইপ বিক্রি করার জন্যে পাগল হলেন। গোপীবাগের এক বৃদ্ধ ব্যবসায়ীকে রাজিও করালেন। তা, উনি পাকা লোক, ৮ হাজার টাকা ধরিয়ে দিয়ে বলে দিলেন এর বেশি দেয়া সম্ভব নয়। আমিও কাকুতিমিনতি করে দেখলাম। তিনি অনড়। অথচ তার ছেলেমেয়েদের সঙ্গে আমাদের ভালোই চেনাজানা। দু-তিন মাস বাড়ি ভাড়া, দারোয়ানের বেতন ইত্যাদির দায় চুকিয়ে গালে হাত দিয়ে বসে থাকা হলো।
হঠাৎ কাজী আনোয়ারা আপার সঙ্গে কথা হতে, উনি বললেন, ‘কেন, অগ্রণী স্কুলে তোমরা ক্লাস চালাও!’ হাতে স্বর্গ পাওয়া বলে একেই। আবার গানের যন্ত্রপাতি চলে গেল আজিমপুরের অগ্রণী স্কুলে। জমে উঠল ফের কাজকর্ম। ও এলাকায় শিক্ষার্থীরা যেতেই পারে, অসুবিধা নেই। এখানেও চলল বেশ কয়েকটা বছর। ঝামেলা ছিল না কোনো। তারপর। আনোয়ারা আপা ডাকলেন আমাকে, ‘শোনো, এখানে ক্লাস করা নিয়ে তো অনেক কথা হচ্ছে, বোধহয় এখানে রাখা যাবে না তোমাদের।’ আবার গেল!
এখানে থাকতে স্কুলের অনেক বাড়বাড়ন্ত হয়েছিল। অগ্রণীতে থাকতেই সেলিনা, ইফফাত আর আহসান মুর্শেদ পাস করে বেরোল। ধুমধাম করে অভিজ্ঞানপত্র বিতরণ হলো ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে। সেলিনার তখন সদ্য বিয়ে হয়েছে। রাগসংগীতে খুবই ভালো নম্বর পেয়ে ও ফার্স্ট হলো। ওকে একজন সোনার মেডেল দিলেন তাই। ছায়ানট বিদ্যায়তনেরই দেয়ার কথা শুনে সেই ভদ্রলোক প্রস্তাব দিয়েছিলেন।
যা হোক, এবার আমাদের উদ্ধার করলেন ইন্স্যুরেন্সের মওলা সাহেব, আমাদের বন্ধু টুলুর (জিয়াউল হক) বাবা। কলাবাগানের লেকসার্কাস স্কুলের উনি ছিলেন প্রেসিডেন্ট। খানিকটা একটেরে হলেও মালিবাগের মতন শহরের আর এক প্রান্তে নয় যা-হোক! ততদিনে পাকিস্তান বেশ জাল গুটিয়ে আনছে। এই স্কুলভবনে থাকতেই সব ফেলে পালাই আমরা একাত্তর সালে। সংগীতবিদ্যায়তনের কথা এ পর্যন্ত।






