ডিসেম্বর মাস, বঙ্গাব্দ ১৩২৮। গভীর রাত। কলকাতার ৩/৪-সি তালতলা লেনের বাড়িতে নিবিষ্ট মনে লিখছেন কবি কাজী নজরুল ইসলাম। সকালে কবিতা সমাপ্ত হলো। নজরুল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনা করলেন

মুজফ্ফর আহ্মদ রচিত কাজী নজরুল ইসলাম

স্মৃতিকথা থেকে নেয়া

 

আসলে ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচিত হয়েছিল ১৯২১ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহে। সব হিসাব খতিয়ে এবং সমসাময়িক ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে বেরিয়ে আসছে যে, এটাই ছিল কবিতাটির রচনার সময়। শুধু একটি ঘটনাকে আমি নজরে রেখেছিলাম বলেই আমার এ ভুলটা হয়েছিল। ‘বিদ্রোহী’ কবিতা প্রথম ছাপা হয়েছিল ‘বিজলী’ নামক সাপ্তাহিক কাগজে। সে সময়ে বৃষ্টি হয়েছিল। এ বৃষ্টিটাই আমার স্মৃতিতে আটকে ছিল। তা থেকে সঙ্গে সঙ্গে মনে এসেছিল যে, বৃষ্টি হওয়া সম্ভব তো শরৎ কালেই। এ কথা মনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই দুর্গা পূজার আগের কিংবা পরের মাসের কথা মনে উদয় হয়েছিল। সে সময়ে যদি পুরনো ‘বিজলী’ হাতের কাছে পেতাম, তবে আমার ভুলটা কিছুতেই হতো না। তাহলে এটাও আমার মনে আসত যে, কোনো কোনো বছর শীতকালেও বৃষ্টি হয়।

আমাদের ৩/৪-সি তালতলা লেনের বাড়িটি ছিল চারখানা ঘরের একটি পুরো দোতলা বাড়ি। তার দোতলায় দুখানা ঘর ও নিচের তলায় দুখানা ঘর ছিল। পুরো বাড়িটি ভাড়া নিয়েছিলেন ত্রিপুরা জেলার পশ্চিমগাঁর নওয়াব ফয়জুন্নিসা চৌধুরাণীর নাতিরা (দৌহিত্ররা)। তারা নিচের দুখানা ঘর আমাদের ভাড়া দিয়েছিলেন। কিছুদিন পরে নিচেরও একখানা ঘরের তাদের দরকার হয়। তখন নজরুল আর আমি নিচের তলার পুব দিকের, অর্থাৎ বাড়ির নিচেকার দক্ষিণ-পুব কোণের ঘরটি নিয়ে থাকি। এ ঘরেই কাজী নজরুল ইসলাম তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতাটি লিখেছিল। সে কবিতাটি লিখেছিল রাত্রিতে। রাত্রির কোন সময়ে তা আমি জানি না। রাত ১০টার পরে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। সকালে ঘুম থেকে উঠে মুখ ধুয়ে এসে আমি বসেছি, এমন সময়ে নজরুল বলল, সে একটি কবিতা লিখেছে। পুরো কবিতাটি সে তখন আমায় পড়ে শোনাল। ‘বিদ্রোহী’ কবিতার আমি প্রথম শ্রোতা। কিন্তু নিজের সম্বন্ধে আমি কী যে বলব, তা জানি না। কোনো দিন কোনো বিষয়ে আমি উচ্ছ্বসিত হতে পারি না। যে লোক প্রশংসা পাওয়ার যোগ্য, তার সামনাসামনি তাকে প্রশংসা করাও আমাকে দিয়ে হয়ে ওঠে না। তার অগোচরে অবশ্য আমি তার প্রশংসায় মুখর হয়ে উঠি। আমার এ স্বভাবের জন্যে আমি পীড়া বোধ করি বটে, তবুও স্বভাব আমার কিছুতেই বদলাল না। নজরুল তার জীবনের শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি আমাকেই প্রথম পড়ে শোনাল। অথচ আমার স্বভাবের দোষে না পারলাম তাকে আমি কোনো বাহ্বা দিতে, না পারলাম এতটুকুও উচ্ছ্বসিত হতে। কী যে কথা আমি উচ্চারণ করেছিলাম, তা এখন আমার মনেও পড়ছে না। আমার স্বভাবটা যদিও নজরুলের অজানা ছিল না, তবুও সে মনে মনে আহত যে হয়েছিল, তাতে সন্দেহ নেই। আমার মনে হয় নজরুল ইসলাম শেষ রাত্রে ঘুম থেকে উঠে কবিতাটি লিখেছিল। তা না হলে এত সকালে সে আমায় কবিতা পড়ে শোনাতে পারত না। তার ঘুম সাধারণত দেরিতেই ভাঙত, আমার মতো তাড়াতাড়ি তার ঘুম ভাঙত না। এখন থেকে ৪৪ বছর আগে নজরুলের কিংবা আমার ফাউন্টেন পেন ছিল না। দোয়াতে বারে বারে কলম ডোবাতে গিয়ে তার মাথার সঙ্গে তার হাত তাল রাখতে পারবে না, এ ভেবেই সম্ভবত সে কবিতাটি প্রথমে পেন্সিলে লিখেছিল।

সামান্য কিছু বেলা হতে ‘মোসলেম ভারতে’র আফ্জালুল হক সাহেব আমাদের বাড়িতে এলেন। নজরুল তাকেও কবিতাটি পড়ে শোনাল। তিনি তা শুনে খুব হইচই শুরু করে দিলেন, আর বললেন, ‘এখনই কপি করে দিন কবিতাটি, আমি সঙ্গে নিয়ে যাব।’ পরম ধৈর্যের সাথে কবিতাটি কপি করে নজরুল তা আফ্জাল সাহেবকে দিল। তিনি এ কপিটি নিয়ে চলে গেলেন। আফ্জালুল হক সাহেব চলে যাওয়ার পরে আমিও বাইরে চলে যাই। তার পরে বাড়িতে ফিরে আসি ১২টার কিছু আগে। আসামাত্রই নজরুল আমায় জানাল যে, “অবিনাশদা (বারীন ঘোষেদের বোমার মামলার সহবন্দী শ্রীঅবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য) এসেছিলেন। তিনি কবিতাটি শুনে বললেন, ‘তুমি পাগল হয়েছ নজরুল, আফ্জালের কাগজ কখন বা’র হবে তার স্থিরতা নেই, কপি ক’রে দাও ‘বিজলী’তে ছেপে দিই আগে।” তাকেও নজরুল সেই পেন্সিলের লেখা হতেই কবিতাটি কপি করে দিয়েছিল। ১৯২২ সালের ৬ জানুয়ারি (২২ পৌষ, ১৩২৮ বঙ্গাব্দ) তারিখ, শুক্রবারে ‘বিদ্রাহী’ ‘বিজলী’তেই প্রথম ছাপা হয়েছিল। বৃষ্টি হওয়া সত্ত্বেও কাগজের চাহিদা এত বেশি হয়েছিল যে, শুনেছিলাম সে সপ্তাহের কাগজ দুবার ছাপা হয়েছিল। অনেকে যে লিখেছেন ‘বিদ্রোহী’ ‘মোসলেম ভারতে’ প্রথম ছাপা হয়েছিল সেটা ভুল। আফ্জাল সাহেব কার্তিকের ‘মোসলেম ভারতে’র জন্যে যখন কপি নিয়ে গিয়েছিলেন, তখন পৌষ মাস ছিল। আমার ধারণা, তার কার্তিক সংখ্যা ফাল্গুনের আগে বা’র হয়নি। ‘মোসলেম ভারত’ নিয়মিত বের হতো কিনা, সেটা আজ যারা নজরুল সম্বন্ধে লিখেছেন তারা কী করে বুঝবেন? তারা দেখতে পাচ্ছেন কার্তিকের (১৩২৮) ‘মোসেলম ভারতে’ ‘বিদ্রোহী’ ছাপা হয়েছিল, আর ছাপা হয়েছিল ২২ পৌষের (১৩২৮) ‘বিজলী’তে। কাজেই তাদের পক্ষে এটাই ধরে নেয়া হিসাবসঙ্গত যে, ‘মোসলেম ভারতে’ই ‘বিদ্রোহী’ প্রথম ছাপা হয়েছিল। আসলে কিন্তু পৌষের (ডিসেম্বর, ১৯২১-এর শেষ সপ্তাহের) আগে নজরুল ইসলাম তার ‘বিদ্রোহী’ কবিতা রচনাই করেনি। কাজেই ‘বিদ্রোহী’ প্রথম ছাপানোর সম্মান সাপ্তাহিক ‘বিজলী’রই প্রাপ্য। তবে কবিতাটি কার্তিক সংখ্যার ‘মোসলেম ভারতে’ ছাপানোর জন্যেই নজরুল প্রথমে আফ্জালুল হক সাহেবকে দিয়েছিল। সেজন্যই এ কার্তিক সংখ্যার ‘মোসলেম ভারতে’র নামোল্লেখ করেই ‘বিজলী’ কবিতাটি প্রথম ছেপেছিল, যদিও কার্তিকের ‘মোসলেম ভারত’ কখন ছাপা হবে, তা কেউ সেই পৌষেও জানতেন না।

আবার শ্রীঅবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্যও ‘মাসিক বসুমতী’তে (কার্তিক, ১৩৬২) পুরনো কথা লিখতে গিয়ে ঘটনা সম্পর্কে খানিকটা তালগোল পাকিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, পেন্সিলে লেখা কাবিতাটি নিয়ে শুধু তাকে শোনানোর জন্যই নজরুল তাদের প্রেসে গিয়েছিল। তিনিই জোর করে কবিতাটি ‘বিজলী’র জন্য রেখে দেন। এ বিষয়ে নজরুল আমায় যা বলেছিল, তা আমি ওপরে লিখেছি। অবিনাশ বাবু বলছেন, নজরুল পড়ছিল আর তিনি তার শ্রুতিলিখন করছিলেন। নজরুল কখনো এভাবে কবিতা ছাপতে দিত না। সে নিজ হাতে কপি করে কবিতা ছাপতে দিত। বিদ্রোহী’র বেলায়ও সে পেন্সিলের লেখা হতে নিজে কালিতে লিখে সেই কপি অবিনাশ বাবুকে দিয়েছিল। ঘটনার ৩৪ বছর পরে এ সম্বন্ধে লিখতে গিয়ে তার স্মৃতি তাকে বিভ্রমে ফেলেছিল। আসলে অবিনাশবাবু নজরুলের আপন হাতের কপি করা ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ‘বিজলী’তে ছাপতে নিয়ে গিয়েছিলেন। নজরুল আমায় তাই বলেছিল। তিনি পেন্সিলের লেখা যে দেখেছিলেন, সে কথা ঠিকই। আবার কোনো এক কাগজে (আমি নিজে পড়িনি) শ্রীনলিনীকান্ত সরকার নাকি লিখেছিলেন যে, ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ‘বিজলী’তে ছাপানোর জন্য তিনিই নজরুলের কাছ থেকে নিয়ে গিয়েছিলেন। আসলে নিয়েছিলেন তো অবিনাশ বাবুই, কিন্তু শ্রীনলিনীকান্ত সরকারের হঠাৎ মনে এসেছিল যে, তিনিই যখন নজরুলের অন্তরঙ্গ বন্ধু ছিলেন এবং ‘বিজলী’তেও ছিলেন, তখন তারই তো ‘বিদ্রোহী’ কবিতা ‘বিজলী’র জন্য নিয়ে যাওয়ার কথা। এ কথা মনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি কথাটা কাগজে ছেপে দিয়েছিলেন। এভাবেই স্মৃতি মানুষের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।

‘বিদ্রোহী’ ছাপা হওয়ার পরে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে নজরুলের সাক্ষাত্কারের কথাও শ্রীঅবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য লিখেছেন এবং নজরুলের মুখে শুনেই লিখেছেন। তাতে আছে, কবিতাটি রবীন্দ্রনাথকে পড়ে শোনানোর পরে তিনি নজরুলকে বুকে চেপে ধরেছিলেন। নজরুল আমাকে এ খবর দেয়নি। তবে আমাকে কথাটা না বলার কারণ হয়তো এই ছিল যে, আমি তার কবিতার প্রথম শ্রোতা হয়েও কোনো আনন্দোচ্ছ্বাস প্রকাশ করিনি। অবিনাশবাবু লিখেছেন, ঠাকুরবাড়িতে গিয়ে নজরুল নিচে থেকেই ‘গুরুজী, গুরুজী’ বলে চেঁচিয়েছিল। অবিনাশ বাবু হয়তো ভুল বুঝেছিলেন। রবীন্দ্রনাথকে কেউ ‘গুরুজী’ ডাকতেন না, ডাকতেন ‘গুরুদেব’।

শ্রীঅবিনাশচন্দ্র ভট্টাচার্য আজ আর আমাদের মধ্যে বেঁচে নেই।

‘বিদ্রোহী’ রচনার সময়ে কবি শ্রীমোহিতলাল মজুমদার সম্ভবত কলকাতার বাইরে ছিলেন।