১৩৩০ বঙ্গাব্দে পূজার কিছু আগে বেহালার বাড়িতে এসে হাজির হলেন পাণ্ডুবরণ, শীর্ণদেহের ৩০ বছর বয়সী এক যুবক। অতি অল্পভাষী যুবক পল্লীজীবনের অপূর্ব কাহিনী বয়ান করা শুরু করলেন। দীনেশচন্দ্র সেন মৈমনসিংহের অনাবিষ্কৃত পল্লীগাথার বিশাল এক ভাণ্ডারের সন্ধান পেলেন
এই গাথাসমূহের সংগ্রাহক চন্দ্রকুমার দে
১৯১৩ খৃঃ অব্দে মৈমনসিংহ জেলার ‘সৌরভ’ পত্রিকায় শ্রীযুক্ত চন্দ্রকুমার দে প্রাচনী মহিলাকবি চন্দ্রাবতীর সম্বন্ধে একটি প্রবন্ধ প্রকাশিত করেন। গ্রন্থকার চন্দ্রাবতীর কাহিনীর মর্ম্মাংশটি মাত্র দিয়াছিলেন। কিন্তু যেটুকু দিয়াছিলেন, তাহা একবারে চৈত-বৈশাখী বাগানের ফুলের গন্ধে ভরপুর; সেই দিন কেনারামের উপাখ্যানের সারাংশের উপর আমার অনেক চোখের জল পড়িয়াছিল।
এই চন্দ্রকুমার দে কে এবং কেনারামের কবিতাটিই বা আমি কোথায় পাই, এই হইল আমার চিন্তার বিষয়। ‘সৌরভ’ সম্পাদক শ্রীযুক্ত কেদারনাথ মজুমদার মহাশয় আমার পুরাতন বন্ধু। আমি চন্দ্রকুমারের সম্বন্ধে তাহাকে নানা প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করিয়া জানিলাম, চন্দ্রকুমার একটি দরিদ্র যুবক, ভাল লেখাপড়া শিখিতে পারেন নাই, কিন্তু নিজের চেষ্টায় বাঙ্গালা লিখিতে শিখিয়াছেন। আরও শুনিলাম, তাঁঁহার মস্তিষ্কবিকৃতি হইয়াছে এবং তিনি একেবারে কাজের বাহিরে গিয়াছেন।
এই ছড়াটির কথা চন্দ্রকুমার এমনই মনোজ্ঞ ভাষায় লিখিয়াছিলেন যে, উহাতে আমি তাহার পল্লীকবিতার প্রতি উচ্ছ্বসিত ভালবাসার যথেষ্ট পরিচয় পাইয়াছিলাম। আমি মৈমনসিংহের অনেক লোকের নিকটে জিজ্ঞাসা করিলাম, কিন্তু কেহই তথাকার পল্লীগাথার আর কোন সংবাদ দিতে পারিলেন না। কেহ কেহ ইংরাজী শিক্ষার দর্পে উপেক্ষা করিয়া বলিলেন, ‘ছোটলোকেরা, বিশেষতঃ মুসলমানেরা, ঐ সকল মাথামুণ্ডু গাহিয়া যায়, আর শত শত চাষা লাঙ্গলের উপর বাহুভর করিয়া দাঁড়াইয়া শোনে। ঐ গানগুলির মধ্যে এমন কি থাকিতে পারে যে শিক্ষিত সমাজ তত্প্রতি আকৃষ্ট হইতে পারেন? আপনি এই ছেঁড়া পুথি ঘাঁটা দিন কয়েকের জন্য ছাড়িয়া দিন।’
কিন্তু আমি কোন অজানিত শুভ মুহূর্তের প্রতীক্ষায় রহিলাম। কোন্ দিন পল্লীদেবতা আমার উপর তাহার অনুগ্রহ-হাস্য বিতরণ করিবেন এবং কবে তাঁহার কৃপাকটাক্ষে মৈমনসিংহের এই অনাবিষ্কৃত রত্নখনির সন্ধান পাইব— ইহাই আমার অরাধনার বিষয় হইল।
ইহার দুই বৎসর পরে, হঠাৎ একদিন কেদারবাবুর চিঠি পাইলাম। তিনি লিখিলেন, —চন্দ্রকুমার অনেকটা ভাল হইয়াছেন এবং শীঘ্র কলিকাতায় আসিয়া আমার সঙ্গে দেখা করিবেন। তাহার আরও চিকিত্সার দরকার।
স্ত্রীর দুই-একখানি রৌপ্যের অলঙ্কার ছিল, তাহাই বিক্রয় করিয়া চন্দ্রকুমার পাথেয় সংগ্রহ করিলেন; এবং ১৯১৯ সনে পূজার কিছু পূর্ব্বে বেহালায় আসিয়া আমাকে প্রণাম করিয়া দাঁড়াইলেন। রোগে-দুঃখে জীর্ণ, —মুখ পাণ্ডুবরণ, —অর্দ্ধাশনে-অনশনে বিশীর্ণ, ত্রিশ বৎসর বয়স্ক যুবক, অতি অল্পভাষী, তিনি পল্লীজীবনের যে কাহিনী শুনাইলেন ও মৈমনসিংহের অনাবিষ্কৃত পল্লীগাথার যে সন্ধান আমাকে দিলেন, তাহাতে তখনই তাঁহাকে আমার প্রিয় হইতে প্রিয়তর বলিয়া মনে হইল।
এখানে শ্রীযুক্ত যামিনীভূষণ রায় কবিরাজ মহাশয় বিনামূল্যে তাঁহার চিকিত্সার ভার লইলেন এবং শ্রীযুক্ত গোপালদাস চৌধুরী মহাশয় কতকদিনের জন্য তাঁহাকে নিজ বাটীতে আশ্রয় দিলেন। আমি তাহার সংগৃহীত পল্লীগাথা সম্বন্ধে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় মহাশয়কে বলিয়া একটা ব্যবস্থা করিবার চেষ্টা করিব, তাঁহাকে এই ভরসা দিলাম।
চন্দ্রকুমার এইভাবে কতকদিন এখানে কাটাইয়া দেশে চলিয়া গেলেন। কি কষ্টে যে এই সকল পল্লীগাথা তিনি সংগ্রহ করিয়াছেন, তাহা তিনি ও তাঁহার ভগবানই জানেন এবং কতক আমি জানিয়াছি। এই সকল গান অধিকাংশ চাষাদের রচনা। এইগুলির অনেক পালা কখনই লিপিবদ্ধ হয় নাই। পূর্ব্বে যেমন প্রতি বঙ্গপল্লীতে কুন্দ ও গন্ধরাজ ফুটিত, বিল ও পুষ্করিণীতে পদ্ম ও কুমুদের কুঁড়ি বায়ুর সঙ্গে তাল রাখিয়া দুলিত —এই সকল গানও তেমনই লোকের ঘরে ঘরে নিরবধি শোনা যাইত, ও তাহাদের তানে সরল কৃষকপ্রাণ তন্ময় হইয়া যাইত। ফুলের বাগানে ভ্রমরের মত এই গাণগুলিরও শ্রোতার অভাব হইত না। কিন্তু লোকের রুচি এই দিকে এখন আর নাই। এইগুলি গাহিবার লোকেরও অভাব হইয়াছে, যেহেতু এই শ্রেণির গানের উপর শ্রোতার সেই কৌতুকপূর্ণ অনুরাগ ফুরাইয়া আসিয়াছে। যাহা লিখিত হয় নাই, আবৃত্তিই যাহা রক্ষার একমাত্র উপায়, অভ্যাস না থাকিলে সেই কাব্যকথার স্মৃতি মলিন হইয়া পড়িবেই। এখন একটি পালাগান সংগ্রহ করিতে হইলে বহু লোকের দরবার করিতে হয়। কাহারও একটি গান মনে আছে কাহারও বা দুইটি, —নানা গ্রামে পর্য্যটন করিয়া নানা লোকের শরণাপন্ন হইয়া একটি সম্পূর্ণ পালার উদ্ধার করিতে পারা যায়। এই জন্য চন্দ্রকুমার প্রতি পালাটি সংগ্রহ করিতে গিয়া অনেক কষ্ট সহিয়াছেন।
প্রথমতঃ চন্দ্রকুমার মৈমনসিংহ জেলার কবিগণের লিখিত বিশুদ্ধ কাব্যগুলির প্রতি বেশি মনোযোগী হইয়াছিলেন। মুক্তারামের ‘দুগাপুরাণ’, রামকান্তের ‘মনসার ভাসান’, — ‘উমার বিবাহ’, ‘শিবদুর্গার কোন্দল’, ‘দুর্ব্বাসার পারণ’, ‘দ্রৌপদীর বস্ত্রহরণ’ এবং ‘নরমেধ যজ্ঞ’ প্রভৃতি বিষয়ক কবিসংগীতগুলি পাছে নষ্ট হইয়া যায়, এই আশঙ্কা করিয়া তিনি আমাকে পুনঃ পুনঃ পত্র লিখিয়াছেন। এইরূপ পুস্তকের উপরই তাঁহার বেশি ঝোঁক ছিল। যদিও পল্লীর ছড়াগুলিকে ইনি অন্তরের ভালবাসা দিয়াছিলেন, তথাপি সংস্কৃত শব্দবহুল কাব্যগুলির পার্শ্বে সেগুলি সময়ে সময়ে তাঁহার চক্ষে ম্লান বোধ হইত, এজন্য সেই পাড়াগেঁয়ে জিনিষগুলিকে বুকে তুলিয়া আদর করিতে তিনি মাঝে মাঝে ভয় পাইতেন, পাছে সাহিত্যের আসরে সভ্যগণ তাঁহাকে জাতিচ্যুত করিয়া বসেন। বানিয়াচঙ্গ, জঙ্গলবাড়ী, রোয়াইলবাড়ী প্রভৃতি নানা স্থানের ছড়াগুলির সংগ্রহ সম্বন্ধে তিনি একবার আমাকে লিখিয়াছিলেন, ‘এগুলি এত প্রাচীন ও ইহাদের ভাষা এমন পাড়াগেঁয়ে যে শুনিলে হাসি পা... পয়ারের শেষ ভাগে প্রায়ই মিল নাই। এগুলি সংগ্রহ করিব কি?’ অন্য একবার গ্রাম্য ভাষার কিছু নমুনা দিয়া লিখিয়াছিলেন, ‘এই ভাষার সংগ্রহ করিব কি না আমাকে সত্বর লিখিয়া জানাইবেন।’ কিন্তু তিনি আমাকে পুনঃ পুনঃ মৈমনসিংহ-প্রচলিত রাধাকৃষ্ণ এবং উমা মেনকাসম্বন্ধীয় কবিগানের প্রাচুর্য্যের ব্যাখ্যা করা সত্ত্বেও তাঁহার এই উত্সাহ আমি খুব সতেজ হইতে দেই নাই। সেই যে অবজ্ঞাত ‘অশিষ্ট’ ভাষায় অনাড়ম্বর সরলতায় পল্লীলক্ষ্মীর প্রাণটি ধরা দিয়াছে, সেই ছড়াগুলির উপরই আমার লোলুপ দৃষ্টি ছিল। যেহেতু কৃত্রিম ভাষার সোনার পিঞ্জরে তোতা পাখীর স্থান হইতে পারে, কিন্তু বৃষ্টিবাদলে আকাশের মুক্ত আঙ্গিনায়ই কোকিলের পঞ্চম স্বর পৃথিবী ছাপাইয়া উঠে।
‘সৌরভ’-সম্পাদক শ্রীযুক্ত কেদারনাথ মজুমদার মহাশয়ের উত্সাহে চন্দ্রকুমারবাবু বিচিত্রভাবে নানা দিক দিয়া সাহিত্যিক চেষ্টায় উদ্যোগী হইয়াছিলেন। ‘সৌরভে’ তিনি নানা বিষয়ক প্রবন্ধ লিখিতে প্রবৃত্ত হন। এ সম্বন্ধে তিনি আমাকে লিখিয়াছিলেন, “চন্দ্রবাতীর উপাখ্যান রচনা করিতে আরম্ভ করিলাম। ‘সৌরভে’ চন্দ্রাবতীর উপাখ্যান আমার প্রথম উদ্যম। ইহার পরে ‘লোহার মাঞ্জাস’ নামে একখানি কাব্য লিখিতে আরম্ভ করি। বলা বাহুল্য, ইহা চাঁদ সদাগর এবং বেহুলা-নক্ষ্মীন্দরের কাহিনী। ইহার সপ্তম সর্গ পর্য্যন্ত লেখা আছে। শেষ করিতে পারি নাই। সেই সময়ে শরীরের দিকে দৃক্পাত না করিয়া গুরুতর পরিশ্রম করিতাম। প্রাতে পত্রিকার জন্য গল্প, বিকালে উপন্যাস ও গভীর রাতে ‘লোহার মাঞ্জাস’ লিখিতাম।”
কেদারবাবু নানা দিক দিয়া ইঁহার সাহিত্যিক চেষ্টায় উত্সাহ দিতেছিলেন। কিন্তু ‘সৌরভে’ চন্দ্রকুমারবাবুর প্রবন্ধে প্রাচীন পালাগানের যে সামান্য কিছু নমুনা প্রকাশিত হইয়াছিল, তাহা পড়িয়া আমি কেদারবাবুকে সেইগুলি সংগ্রহের জন্যই প্রবন্ধ লেখককে বিশেষভাবে উত্সাহিত করিতে অনুরোধ করিয়া চিঠি লিখিয়াছিলাম। কবিকঙ্কের ‘বিদ্যাসুন্দর’ অপেক্ষ কবিকঙ্কের সম্বন্ধে কবিচতুষ্টয়-বিরচিত পালাটিই আমার নিকট বিশেষ মূল্যবান বলিয়া বোধ হইয়াছিল। চন্দ্রকুমারবাবুর স্বরচিত ‘চন্দ্রাবতী’র উপাখ্যান অপেক্ষা নয়ানচাঁদ-বিরচিত জয়চন্দ্র ও চন্দ্রাবতীর পালাটি জানিবার জন্যই আমি বিশেষরূপ লালায়িত হইয়াছিলাম। যাহা হউক, ‘সৌরভে’ সেই সকল পালাগানের কিছু কিছু নমুনা প্রকাশিত না হইলে তত্পতি কাহারও দৃষ্টি আকৃষ্ট হইত না। বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্রবে আসার পর আমি চন্দ্রকুমারবাবুকে তাঁহার অন্যান্য সর্ব্ববিধ সাহিত্যিক প্রচেষ্টা হইতে বিরত করিয়া শুধু পালাগান-সংগ্রহে মনোযোগী হইতে উপদেশ দেই।
পৌরাণিক উপাখ্যান-বিষয়ক কাব্যকথা তো প্রাচীন বঙ্গসাহিত্যে ঝুড়ি ঝুড়ি পাওয়া যাইতেছে। বিজয় গুপ্ত, নারায়ণ দেব, বংশীদাস ও কেতকাদাসের ‘মনসামঙ্গলের’ পরে রামকান্তের একখানি ‘পদ্মাপুরাণ’ না পাওয়া গেলেও বঙ্গসাহিত্য বিশেষ শ্রীহীন হইবে না; ভারতচন্দ্রের বিদ্যাসুন্দরের পরে কবিকঙ্কের ‘বিদ্যাসুন্দর’ না পাওয়া গেলেই বা বিশেষ ক্ষতি কি? ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে ইহাদের অবশ্যই কিছু মূল্য আছে। কিন্তু ‘মহুয়া’, ‘মলুয়া’ বঙ্গের অন্যত্র কোথায় পাইব? ‘দেওয়ানা মদিনা’, ‘ফিরোজ খাঁ’ প্রভৃতির পালা যে বঙ্গসাহিত্যের একটা নূতন দিকের উপর আলোকপাত করিতেছে— এই অপূর্ব্ব জিনিষ বঙ্গসাহিত্যে সুদুর্ল্লভ। বঙ্গসাহিত্য পৌরাণিক উপাখ্যানগুলিতে সংস্কৃত শব্দের সোনালী চুমিক দেওয়া বেনারশী চেলী পরিয়া ঝলমল করিতেছে— কিন্তু পাড়াগাঁয়ের এই সকল সরল কথা, যাহাতে সংস্কৃতের একটুকুও ধারকরা শোভা নাই, যাহা নিজ স্বাভাবিক রূপে অপূর্ব্ব সুন্দর, —তাহার নমুনা আমরা কোথায় পাইতাম। নানা দিক দিয়া এই সকল পল্লীগাথায় খাঁটি বাঙ্গালী জীবনের অফুরন্ত সুধা, অচিন্তিতপূর্ব্ব মাধুর্য্য ঝরিয়া পড়িতেছে। ইহা স্বর্গ হইতে আহূত অমৃতভাণ্ড নহে, ইহা আমাদের দেশের আমগাছের মৌচাক, এজন্য এই খাঁটি মধুর আস্বাদ আমাদের নিকট এত ভাল লাগিয়াছে। চন্দ্রকুমার বঙ্গসাহিত্যের নিজ ভাঁড়ার ঘরের সন্ধান দিয়াছেন, —উহা হোটেলের মসলা-দেওয়া মুখরোচক বিলাসখাদ্যসম্ভার নহে, উহা আমাদের পল্লী-অন্নপূর্ণার শ্রীকরকমলের দান— জীবনদায়ী অন্নব্যঞ্জন। এগুলি জানিতাম না বলিয়া আমরা এতকাল শুধু সীতা-সাবিত্রীকে লইয়া গৌরব করিয়াছি— এখন আমরা মলুয়া, মদিনা ও কমলাকে লইয়া তদপেক্ষা বেশি গৌরব করিতে পারিব— যেহেতু তাহারা ঘাগরা-পরা বিদেশিনী নহে, শাড়ী-পরা আমাদেরই ঘরের মেয়ে।
(মৈমনসিংহ গীতিকা গ্রন্থে দীনেশচন্দ্র সেন লিখিত ভূমিকার অংশবিশেষ)






