১৩২০ বঙ্গাব্দ। রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে, ১৫ নভেম্বর (২৯ কার্তিক), ১৯১৩ সাল। সন্ধ্যায় রবীন্দ্রনাথ জানলেন, বাংলা সাহিত্যে তিনিই প্রথম কাব্যগ্রন্থ গীতাঞ্জলির জন্য ‘নোবেল’ পুরস্কার জিতলেন
পূজার ছুটির পর বিদ্যালয় খুলিয়াছে; রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে আছেন। ১৫ই নভেম্বর (২৯শে কার্তিক) রবীন্দ্রনাথ, রথীন্দ্রনাথ ও দিনুবাবু মোটরযোগে চৌপাড়ির শালবনে বেড়াতে যাইতেছেন— সন্ধ্যার মুখে খবর আসিল ‘নোবেল’ প্রাইজ রবীন্দ্রনাথ পাইয়াছেন। বাকুড়া কলেজের অধ্যাপক ও রবীন্দ্রনাথের জীবনচরিতকার টমসন সাহেব সেদিন শান্তিনিকেতনে ছিলেন। এই সংবাদ আশ্রমে রাষ্ট্র হইয়া পড়িলে খুব আনন্দ উৎসব চলিল।
কলিকাতায় এই সংবাদ প্রথম প্রকাশ করে Empire নামে একখানি সান্ধ্য ইংরেজি কাগজ। It is the First recognition of the indigenous literature of this empire as a world force; it is the first time that an Asiatic has attained distinction at the hands of the Swedish Academies; and this is the first occasion upon which the $ 8,000 prize has been awarded to a poet who writes in a language so entirely foreign to the awarding country is to Sweden.
১৩ই নভেম্বর সুইডিশ একাডেমির বার্ষিক অধিবেশনে এই পুরস্কার ঘোষিত হয়। পৃথিবীময় এই সংবাদ রাষ্ট্র হইয়া গেলে সকলে আশ্চর্য হইয়া গেল। ম্যাকমিলানরা এই বৎসরের মার্চ মাসে গীতাঞ্জলি প্রকাশ করিয়াছিলেন। সেই হইতে এই ক্ষুদ্র গ্রন্থের যে সমাদর হইয়াছিল তাহা অভূতপূর্ব। তারপর এখন নোবেল পুরস্কার প্রদত্ত হইলে লোকের বিস্ময়ের অবধি থাকিল না। সেই সময়ের সংবাদপত্রগুলি পাঠ করিলে দেখা যায় তাহদের বিস্ময় কিরূপ হইয়া ছিল। একখানি কাগজ লিখিলেন, নোবেলের সম্পত্তির অছিরা রবীন্দ্রনাথকে সাহিত্য পুরস্কার দিয়া তাহাদের ট্রাস্টের মর্যাদা রক্ষা করিয়াছেন। The Nobel Trustee. have never fulfilled their trust more thoroughly than by their award of the Literature prize to Rabindranath Tagore (The Pall Mall, 14 Nov. 1918)
আর একজন লিখিলেন রবীন্দ্রনাথকে তাহারা নোবেল প্রাইজ দিয়া তাহাদের উদারতার পরিচয় দিয়াছেন। দুই বৎসর পূর্বে ব্রিটিশ ভারতীয় কিপলিং নোবেল প্রাইজ পাইয়াছিলেন। Post নামে নিউইয়র্কের একখানি দৈনিক লিখিলেন যে, সাহিত্যে আদর্শবাদের জন্য যে তেরোজন সাহিত্যিক পুরস্কার পাইয়াছেন “Kipling is the only one whose work does not really answer to the spirit of the Founder’s testament” (N.Y.15 Nov. 1913). Daily News and Leader নামে একখানি কাগজও এই দুইজনের মধ্যে তুলনা না করিয়া থাকিতে পারিলেন না; “But India could not very well express herself through men more different in spirit and craftmanship than the rough soldire of Imperialism and this delicate artist of the most intimate nationalism” (14 Nov. 1913) সমসাময়িক এমন একখানি পত্রিকা ছিল না, যাহাতে রবীন্দ্রনাথের বিষয় আলোচনা না হইয়া ছিল দুই-একখানি কাগজ Thomas Hardy I Anatole France-কে পুরস্কার দেওয়া হয় নাই বলিয়া অভিযোগ করিয়াছিলেন।
সুইডিশ একাডেমি নোবেলের পুরস্কারের জন্য লোক নির্বাচন করেন। রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি ছাড়া আর কোনো গ্রন্থ তখনো একাডেমির সভ্যদের হস্তগত হয় নাই; গার্ডনার মাত্র অক্টোবর মাসে লন্ডনে বাহির হইয়াছিল, সে-বই পরীক্ষকদের হস্তগত হয় নাই। কেবলমাত্র একখানি বইয়ের সৌন্দর্য দেখিয়া তাহারা রবীন্দ্রনাথের মহত্ত্ব স্বীকার করিলেন। কিন্তু অনেকের ধারণা যে, সুইডিশদের মধ্যে কেহ কেহ রবীন্দ্রনাথের মহত্ত্বর কথা পূর্বেই জানিতে পারিয়াছিলেন। জারমেনির ক্রাউনপ্রিন্স ১৯১১ সালে ভারতে আসেন; তাহার পরে আসেন সুইডেনের রাজকুমার উইলিয়াম; তিনি জোড়াসাঁকোয় আসিয়া অবনীন্দ্রনাথের চিত্রশালা দেখেন এবং সেই সময়ে রবীন্দ্রনাথের কথা জানিতে পারেন। Truth (24. Dec. 1913) বলেন, “The Swedes say that Prince William’s visit to Calcutta brought about the award of the Nobel Prize to Tagore.”
রবীন্দ্রনাথের প্রতিভা ইংরেজের কোনো প্রতিষ্ঠান স্বীকার করিবার পূর্বেই একটি স্বাধীন দেশ স্বীকার করিল। রোদেনস্টাইন লিখিয়াছেন যে, রবীন্দ্রনাথ যখন বিলাতে ছিলেন তখন Fox Strangways অক্সফোর্ড ক্যামব্রিজ হইতে রবীন্দ্রনাথকে একটি সম্মানপূর্ণ উপাধি দানের জন্য চেষ্টা করেন। কিন্তু লর্ড কর্জনের সহিত পরামর্শ করিলে তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথের চেয়ে আরও খ্যাতিমান লোক ভারতবর্ষে আছে। “I Wonder who they were; and I regreted that England had left it to a foreign country to make the first emphatic acknowledgment of his contribution to Literature.” (Men and Memories p 266) রোদেনস্টাইনের আশ্চর্য লাগিয়াছিল যে, যেসব ইংরেজ ভারতবর্ষ সম্বন্ধে অনেক তথ্য জানিতেন, তাহারাও অনেক সময়ে রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে নীরব থাকিতেন; স্তর জন উডরফ অবনীন্দ্রনাথদের খুব ভালো করিয়া জানিতেন, ভারতের শাস্ত্রাদিতে পণ্ডিত বলিয়া তাহার খ্যাতি ছিল, অথচ তিনি কোনো দিন রবীন্দ্রনাথ সম্বন্ধে কোনো কথা রোদেনস্টাইনকে বলেন নাই— ইহাতে তিনি খুবই আশ্চর্য প্রকাশ করিয়াছেন। আমরা আশ্চর্য হই না, কারণ উডরফ যেসব জিনিস বিশ্বাস করিতেন, রবীন্দ্রনাথ সেসব শুধু বিশ্বাস করেন না তাহা নহে, তিনি সেসব বিষয়ে তাহার বিরুদ্ধ মত পোষণ করেন। যাহাই হোক, ইংলন্ড তাঁহাকে স্বীকার না করিলেও ইউরোপ তাহাকে অসংকোচে বরমাল্য দান করিল।
বলা বাহুল্য, এই সংবাদে দেশের লোক খুবই আনন্দিত হইল, বাঙালি যে নগণ্য নহে, বাঙালি যে আজ সম্মান পাইল, তাহা প্রত্যেক বাঙালি নিজ গৌরব বলিয়া গ্রহণ করিল। কলিকাতায় যুবমহলে রবীন্দ্রনাথকে সম্মানিত করিবার জন্য বিশেষ উত্সাহ দেখা দিল। তাহারা শান্তিনিকেতনে আসিয়া শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করিবেন ঠিক করিলেন। ৭ই অগ্রহায়ণ ১৩২০ একখানি স্পেশাল ট্রেনে করিয়া ৫০০ নরনারী শান্তিনিকেতনে আসিলেন। এন্ড্রুজ সাহেব, অধ্যাপকগণ ও ছাত্রেরা অতিথিদের অভ্যর্থনা করেন; আশ্রম বিশেষভাবে সাজানো হইয়াছিল।
জষ্টিস আশুতোষ চৌধুরী, জগদীশচন্দ্র বসু, ডা. প্রাণকৃষ্ণ আচার্য্য, রেভারেন্ড মিলবার্ন, মৌলভি আব্দুল কাসেম, পুরণচাঁদ নাহার, সতীশচন্দ্র বিদ্যাভূষণ প্রভৃতি বহু গণ্যমান্য ব্যক্তি আসিয়াছিলেন। সকলেই রবীন্দ্রনাথের এই গৌরবে আত্মগৌরব অনুভব করিতেছিলেন; নানা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মসম্প্রদায় হইতে প্রতিনিধিগণ রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে অবদান সম্বন্ধে ঋণ স্বীকার করিয়া প্রশংসাবাদ করিলেন। (রবীন্দ্র-জীবনী—প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়)
বিশ্বসভায় রবীন্দ্রনাথ: মৈত্রেয়ী দেবী থেকে—
হঠাৎ যখন নোবেল প্রাইজের খবর প্রকাশিত হলো তখন নানা কাগজে নানা মতের উচ্ছ্বাস দেখা গেল। পশ্চিম জগত্জুড়ে এ নিয়ে তুমুল তর্ক-বিতর্ক ঘনিয়ে উঠল স্বপক্ষে-বিপক্ষে। সেই সময় আমেরিকার একটি কাগজ ‘উদ্ধত যৌবন’ এই নাম দিয়ে একটি প্রবন্ধে লিখছে:
এই নোবেল পুরস্কারের ঘোষণা একটা মস্ত কাজ করেছে— কঠিন আঘাত করে আমাদের চোখ খুলে দিয়েছে, এ আঘাত আমাদের প্রাপ্য ছিল— আমাদের গভীর অজ্ঞতা, আমাদের আত্মতৃপ্ত গ্রাম্যতা, আমাদের গর্বিত আত্মপ্রসাদের মূলে এসে এই আঘাত লেগেছে। —সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারের খবর ঘোষিত হওয়ার পূর্বে কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম শুনেছিল? খ্যাতিমান ও কীর্তিমানদের নামের তালিকার অনেক বই আছে (ডযড় রং ডযড়), সেসব বই ইংরেজি ভাষায় লেখা ও ইংরেজি ভাষাভাষীদের কাছে প্রচলিত— সেখানে অসংখ্য রাজা-গজার নাম, চুনোপুঁটি জমিদারদের নাম, নগণ্য লাখপতিদের নাম তালিকাভুক্ত করা আছে— কিন্তু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নাম নেই। সম্প্রতি যখন পাশ্চাত্য সভ্যতা বস্তু জগতের আধিপত্যের লক্ষ্য ভেদ করে এগিয়ে এসেছে, এই নোবেল পুরস্কার ঘোষণা থেকে এখন তার একটি শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে— সে এই, যেকোনো সাম্রাজ্যের সীমারেখা, কোনো জাতিভেদের গণ্ডি, কোনো বংশগত শত্রুতা কিছুই সেই বিশ্বসত্তাকে লুপ্ত করতে পারে না। ...কিছুদিনের জন্য দাবিয়ে রাখতে পারে, নষ্ট করতে পারে না... আমরা যেসব দেশ সম্বন্ধে কিছুমাত্র খবর রাখি সে সমস্ত দেশের চেয়েই ভারতবর্ষ বহু পুরাতন। আমরা কেউ কখনো রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নামও শুনি নাই— যদিও তিনি এক বৃহৎ জাতির আত্মার সংগীত ত্রিশ বৎসর ধরে গান করেছেন, যে গান দুই হাজার বছরের উপলব্ধিসঞ্জাত।’
যখন ইউরোপের বিস্মিত মনে সবেমাত্র গীতাঞ্জলির সুরধ্বনি প্রবেশ করতে শুরু করেছে, সেই সময়ে সে দেশে তার ব্যক্তিগত উপস্থিতিও যে আত্মিক অনুভব বিকীর্ণ করেছে তাও সামান্য নয়— বস্তুত তা তার কাব্যের প্রত্যক্ষ উদাহরণ। ওই সময়ে জেসপার স্মিথ নামে এক ব্যক্তি ইংল্যান্ডের খবরের কাগজে দীর্ঘ একটি প্রবন্ধ লিখেছেন— জেসপার স্মিথের পরিচয় জানি না, তবে তিনি সুলেখক তাতে সন্দেহ নেই।—
‘গত গ্রীষ্মকালে আমাদের মধ্যে একজন মানুষ এসেছিলেন, আমাদের মধ্যে বাস করেছিলেন, আমাদের এই লন্ডনের রাস্তায় হেঁটেছিলেন— যাকে দেখলে হঠাৎ মনে হয় তিনি এ যুগের মানুষ নন— হয় তিনি সুদূর অতীতের, নয় তিনি অনাগত ভবিষ্যতের— এই বর্তমানের নন। তিনি আমাদের কাছে সাগর পার হয়ে এসেছিলেন, কিন্তু তাঁকে দেখে মনে হতো শুধু সাগর পার নয়, তিনি যেন বহুযুগের ওপার থেকে আমাদের কাছে এসেছেন। দীর্ঘ ঋজুদেহ বিলম্বিত শশ্রু, উন্নত মস্তক, রাজকীয় ভঙ্গি, দৃপ্ত নির্ভীক দৃষ্টি, যদিও স্নেহ-নম্র সে চোখ দেখলে মনে বিশ্বাস হয় যেন তিনি নিশ্চয় সেই দূর বিস্মৃত আর্থারের যুগ থেকে উঠে এসেছেন, যখন সবল দুর্বলকে সেবা করতে লজ্জা পেত না, যখন জ্ঞানী অজ্ঞানীকে শিক্ষা দিত, ছলনা করত না এবং যখন নাইটহুড বা বীরত্বের উপাধি-চিহ্নের মহিমা ছিল খেতাব জোগাড় করায় নয়, যোগ্যতায়। কিন্তু যদি তিনি দীর্ঘ ঋজুদেহ নাও হতেন তবু তার মহিমান্বিত শান্ত মূর্তি, তার সমাহিত গভীর নিঃশব্দ ভঙ্গি— এই তুচ্ছ ব্যস্ততা ও ঠেলাঠেলির যুগে মানুষকে আকর্ষণ করতই।
এই ছোট বর্ণনাটি স্মরণ করায় তার সেই শান্ত, আত্মস্থ মূর্তি, যখন ভোরবেলায় সূর্যাভিমুখী হয়ে কোলের কাছে হাত জড়ো করে বসে থাকতেন, দেহের আধারে জ্বলত চিত্তের শিখা-নিবাত নিষ্কম্প। কিন্তু সে সময়ে তো জেসপার স্মিথ তাকে দেখেননি— তবু কর্মব্যস্ত মানুষের ছুটোছুটি ও জীবনযাত্রার কোলাহলের মধ্যে, সেই নিরুদ্বেগ প্রশান্ত মূর্তি তারা বিস্মিত হয়ে দেখেছে— কোনো কাজে তাঁর তাড়া নেই, ঠেলাঠেলি নেই, দৌড়াদৌড়ি নেই— ইউরোপের মানুষের কাছে এই সমাহিত মহিমা বিস্ময়কর ঠেকেছে।
ওই সময়ে কবির সঙ্গে সাক্ষাত্কারের কথা স্মরণ করে আর একজন বলেছিলেন: ‘আমি লন্ডনের একটি হোটেলে ঠাকুরের সঙ্গে আমার সাক্ষাতের কথা আজ স্মরণ করছি।— মানুষ যেন বিস্ময়বিমূঢ় হয়ে তাকে দেখে মন বলে— যা কিছু এই আমাদের গোলার্ধে, মর্তলোকে স্পন্দিত, শ্বসিত হচ্ছে, যা কিছু জীবিত, তার কোনো কিছুই এই মানুষটির সৌন্দর্য ও প্রশান্তির সঙ্গে তুলনীয় নয়। এ এমনি ত্রুটিহীন সৌন্দর্য যে, সে আপনাতে আপনি প্রতিষ্ঠিত— যখন তিনি কথা বলেছিলেন তখন যেন শুধু সেইটুকুই সত্য ছিল, আর সবকিছু— দৌড়াদৌড়ি মলিনতা, বাহিরে রাস্তায় কুশ্রী শব্দ সব যেন তার সামনে একেবারে অবিশ্বাস্য অবাস্তব হয়ে গেল।’
যে ভাব রবীন্দ্র-কাব্যে, সেই ভাব ছিল রবীন্দ্র-জীবনে, আচরণে, জীবন-বিন্যাসে। তিনি যে শান্তির বাণী শোনাতে চেয়েছেন তা মুখের কথা মাত্র নয়, কবির কল্পনা নয়, ক্ষণিকের উচ্ছ্বাস নয়— তা জীবনের গভীরে পরিব্যাপ্ত। ওই সময়ে নানা নিমন্ত্রণে খ্যাতিমান অন্যান্য ব্যক্তির সান্নিধ্যে সম্মানের আসনে তাকে দেখলে স্বতঃই তুলনা মনে এসেছে। একটি সাধারণ ইংরেজ তাকে বড় বড় নিমন্ত্রণসভায় সম্মানিত হতে দেখেছিলেন— তখনই তিনি অনুভব করেছিলেন সকলের মাঝখানে থেকেও সকলের চেয়ে কত দূরে কবি দাঁড়িয়ে আছেন। সে দূরত্ব অহমিকার নয়— জীবনবোধের ভিন্নতায়।
‘আমাদের মনে হয় কোনো কবিরই যশের আনুষঙ্গিক অনুষ্ঠানে এমন অন্তরের সঙ্গে অরুচিবোধ হয়নি ও ধৈর্যের সঙ্গে, ইংল্যান্ড ও আমেরিকার সান্ধ্যভোজের নিমন্ত্রণের সমাদর, বৈজ্ঞানিক চায়ের আসরের কৌতূহল, স্বর্গের রহস্যের মধ্যে উঁকিঝুঁকি মারবার জন্য বাজে বকবকানি, এমন করে সহ্য করতে হয়নি। অল্পদিন পূর্বে যখন তিনি লন্ডনে ছিলেন তখন এই সমস্ত সভায় তাকে দেখলে চঞ্চলরসনা, বৃথালাপী, সাপের মতো ধূর্ত ও আরো অনেক কারণে সাপের সঙ্গে তুলনীয় মহামহারথীরা, যারা জীবনে কখনো ধ্যান কাকে বলে জানে না, তাদের মাঝখানে তাঁর সেই ধ্যান-মগ্ন মূর্তি, সেই নিশ্চল প্রশান্তি আর হরিণের মতো নিরীহ মুখ দেখলে মনে হতো অদৃষ্ট যেন কৌতুক করে আমাদের শিক্ষা দিচ্ছে। তার সঙ্গে কেউ কথা বললে তখনই অতি ভদ্রতার সঙ্গে উত্তর দিতেন— আহা, তাঁর সেই কোমল কণ্ঠস্বর যেন লন্ডন শহরে শোনবার নয়— এমন স্বর বুঝি স্বর্গেই শোনা যায়— তারপর আবার সেই গভীর নৈঃশব্দে ফিরে যেতেন, সময়ের প্রবাহ বয়ে যেত, তাঁর কোনো তাড়া ছিল না।’
সবার মাঝখানে বসে সবার থেকে দূরে চলে যাওয়ার এই আশ্চর্য ক্ষমতা আমরা অনেকেই দেখেছি, বিস্মিত হয়েছি— কিন্তু এত অল্প সময়ে সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে গঠিত চিত্তেও তার এই বিশেষ ভঙ্গিটি লক্ষ হয়েছে। চায়ের সভায় গল্পগুজবে যুক্ত থেকেও ভেতরে চলেছে যে মনন-প্রক্রিয়া তারই গভীর সৌন্দর্যের ছায়া পড়েছে প্রত্যেক আচরণে, কর্মব্যস্ত ইউরোপ বিস্মিত হয়ে দেখেছে ধ্যানী ভারতের প্রবুদ্ধ সত্তা। রোটেনস্টাইন তার স্মৃতিচিত্রে লিখেছেন: ওই সময়ে রবীন্দ্রনাথের পায়ের কাছে ইংল্যান্ডের নবীন কবিরা একত্র হতেন, তার মধ্যে সব চেয়ে উত্সাহী ছিলেন এজরা পাউন্ড, বয়স মাত্র সাতাশ, তরুণ উদীয়মান কবি— আধুনিক যুগের কবিদের মুখপাত্র। রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে তিনি সাক্ষাৎ করতে আসতেন, সেই সময়ে তার সংস্পর্শে মনে যে আনন্দ উদ্বেল হয়ে উঠত, এজরা পাউন্ড নিপুণ ভাষায় তা নানা প্রবন্ধে প্রকাশ করেছেন।
‘রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কবিতাগুলো প্রকাশিত হওয়া আমার মতে অতি প্রয়োজনীয় ছিল। যদিও জানি না সবাই আমার সঙ্গে একমত হবেন কিনা। আমার কথার সত্যতা যাচাই করতে হলে তার কাব্য পড়তে হবে। শান্ত মনে পড়তে হবে। যদি সম্ভব হয় উচ্চকণ্ঠে আবৃত্তি করতে হবে। যদিও আপাতদৃষ্টিতে দেখলে অনুবাদের ইংরেজি অতি সরল তবু এই কাব্য এক শিল্পী ও সুরকারের রচনা, যিনি আমাদের সংগীতের চেয়ে সূক্ষ্মতার সুরের সঙ্গে পরিচিত।...
এক মাসের কিছু উপরে হবে যখন আমি ইয়েটসের বাড়ি গিয়েছিলাম, দেখলাম তিনি উচ্ছ্বসিত হয়ে আছেন— তিনি বললেন, ‘আমাদের সবার চেয়ে বড় একজন এসেছেন (Some one greater than any of us)।’
কবির ব্যক্তিত্ব সম্বন্ধে ও তাঁর কাব্য সম্বন্ধে বিস্তারিত আলোচনা করতে করতে এজরা পাউন্ড মনে করেছেন কিছুই বলা হলো না। রবীন্দ্রনাথ নিজেই বলেছেন যে— ‘আমি আমারে বুঝিতে বোঝাতে নারি, আপন গানের কাছেতে আপনি হারি, সেই আমি কবি কে পারে আমারে ধরিতে।’ সেই স্বপ্নমূর্তি গোপনচারী কবির অধরা স্বরূপ এজরা পাউন্ড নানা ব্যাখ্যায় ধরার চেষ্টা করেছেন কিন্তু তার মনে হয়েছে কোনো কথা দিয়েই বুঝি তার কাব্য ও ব্যক্তিত্বের ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ হয় না। যারা তার অনির্বচনীয় স্বরূপের সম্মোহনের সামনে দাঁড়িয়েছেন তাঁরা জানেন সেই কবি ও তাঁর কাব্যের মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না। এজরা পাউন্ডও বলছেন:
‘যদি একটা কথা সহজভাবে স্বীকার করি তাহলেই হয়তো আমার সমালোচনাটি উপযুক্ত হবে। অবশ্য আমি ঠাকুরের ব্যক্তিত্বের সঙ্গে তার কাজকে মিলিয়ে ফেলতে চাই না, তবু উভয়ের মধ্যে এমন গভীর সম্বন্ধ রয়েছে যে, এ প্রসঙ্গে আমি যে দুটি কথা বলব তা হয়তো অযোগ্য হবে না। যখন রবীন্দ্রনাথের সঙ্গ লাভের পর তার কাছ থেকে উঠে আসি, আমার মনে হয় আমি যেন চামড়ার আচ্ছাদন জড়ানো সেই আদিম যুগের বর্বর মানুষ, যারা পাথরের অস্ত্র লাঠিতে বেঁধে ঘাড়ে ঝুলিয়ে ফিরত।...’






