মীর মশার্রফ হোসেন, ১২৯১ সাল। মীর মশার্রফ কারবালা প্রান্তরের মর্মন্তুদ ঘটনা নিয়ে উপন্যাস বিষাদসিন্ধু শেষ করেছেন। তিনি লিখেছেন: অশ্ব ছুটিল। হোসেনের অশ্ব বিকট চীত্কার করিতে করিতে সিমারের পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটিল
বিষাদ-সিন্ধু!!! মহরম পর্ব। ১২৯১ সাল (ইং ১৮৮৫)। পৃ. ২০৪।
উদ্ধার পর্ব্ব। ১ শ্রাবণ ১২৯৪ (ইং ১৮৮৭)। পৃ. ১৯১। এজিদ-বধ পর্ব্ব। ১২৯৭ সাল (ইং ১৮৯১)। পৃ. ৪৩।
গ্রন্থের প্রথম খণ্ডের ‘মুখবন্ধে’ প্রকাশ:
চান্দ্রমাসের বৎসরের প্রথম মাসের নাম মহরম। হিজরি ৬১ সালের ৮ই মহরম তারিখে মদিনাধিপতি হোসেন ঘটনাক্রমে সপরিবারে কারবালাভূমিতে উপস্থিত হন; এবং এজিদপ্রেরিত সৈন্যহস্তে রণক্ষেত্রে প্রাণত্যাগ করেন; সেই শোচনীয় ঘটনা মহরম নামে প্রসিদ্ধ হইয়াছে। ওই ঘটনার মূল কি, এবং কি কারণে সেই ভয়ানক যুদ্ধ সংঘটিত হইয়াছিল, ইহার নিগূঢ় তত্ত্ব বোধ হয় অনেকেই অনবগত আছেন। পারস্য ও আরব্য গ্রন্থ হইতে মূল ঘটনার সারাংশ লইয়া ‘বিষাদ-সিন্ধু’ বিরচিত হইল। প্রাচীন কাব্যগ্রন্থের অবিকল অনুবাদ করিয়া প্রাচীন কবিগণের রচনাকৌশল এবং শাস্ত্রের মর্য্যাদা রক্ষা করা অন্যন্ত দুরূহ। সাদৃশ্য লোকের পক্ষে তদ্বিষয়ের যথার্থ গৌরব রক্ষার আকাঙ্ক্ষা বামনের রিধু ধরনের আকাঙ্ক্ষার ন্যায় এক প্রকার দুরাকাঙ্ক্ষা বলিতে হইবে। তবে মহরমের মূল ঘটনাটা বঙ্গভাষাপ্রিয় পাঠক-পাঠিকাগণের সহজে হূদয়ঙ্গম করিয়া দেওয়াই আমার একমাত্র মুখ্য উদ্দেশ্য। শাস্ত্রানুসারে পাপভয়ে ও সমাজের দৃঢ় বন্ধনে বাধ্য হইয়া ‘বিষাদ-সিন্ধু’ মধ্যে কতকগুলি জাতীয় শব্দ ব্যবহার করিতে হইল।...
ইহার সমালোচনা প্রসঙ্গে কাঙ্গাল হরিনাথের ‘গ্রামবার্ত্তা-প্রকাশিকা’ (১১ জ্যৈষ্ঠ ১২৯২) লিখিয়াছিলেনঃ—
গ্রন্থকর্ত্তা বিশুদ্ধ বঙ্গভাষায় অনেকগুলি গ্রন্থ লিখিয়া এবং গতজীবন ‘আজীজন নাহার’ সম্বাদ পত্রের সম্পাদকীয় কার্য্য নির্ব্বাহ করিয়া সাহিত্য সমাজের বিশেষ পরিচিত, সুতরাং তাঁহার লেখনীর নূতন পরিচয় প্রদান বাহুল্য। প্রসিদ্ধ মহরমের আমূল বৃত্তান্ত বিষাদসিন্ধুর গর্ভ পূর্ণ হইয়া বিষাদ সিন্ধু নামের সার্থকতা সম্পাদন করিয়াছে। ইহার এক একটা স্থান এরূপ করুণ রসে পূর্ণ যে পাঠকালে চক্ষের জল রাখা যায় না। যাঁহারা মুসলমানদিগের মহরম পর্ব্বের বিবরণ জানিতে ইচ্ছা করেন, অনুরোধ করি, তাঁহারা বিষাদ সিন্ধু পাঠ করুন মনোরথ পূর্ণ হইবে। মুসলমানদিগের গ্রন্থ এরূপ বিশুদ্ধ বঙ্গভাষার অল্পই অনুবাদিত ও প্রকাশিত হইয়াছে। এই সকল গ্রন্থ যে বঙ্গভাষা বিবৃতির আর একটা নুতন পথ এবং মাতৃভাষা বাঙ্গালার প্রতি মুসলমানদিগের শ্রদ্ধা আকর্ষণ করিতেছে, ইহা চিন্তাশীল পাঠক সহজেই বুঝিতে পারেন...।
‘ভারতী’ও (ফাল্গুন ১২৯৩) লিখিয়াছিলেনঃ—
ইহা মহরমের একখানি উপন্যাস ইতিহাস। ইহার বাঙ্গলা যেমন পরিষ্কার, ঘটনাগুলি যেমন পরস্ফুিট, নায়ক নায়িকার চিত্রণ ইহাতে তেমনি সুন্দররূপে চিত্রিত হইয়াছে। ইতিপূর্ব্বে একজন মুসলমানের এত পরিপাটি বাঙ্গলা রচনা আর দেখিয়াছি বলিয়া মনে হয় না।
৩১ মে ১৮৮৫ তারিখে ‘ষ্টেট্সম্যান অ্যান্ড ফ্রেন্ড অব ইন্ডিয়া’ও ইহার প্রশংসাসূচক সমালোচনা করিয়াছিলেন। এই সমালোচনা হইতে আর একটি কথা জানা যায়ঃ— ‘ঞযব ধঁঃযড়ৎ রং গববৎ গড়ড়ংযধত্ত্ঁভ ঐড়ংংবরহ, ধহ ঐড়হড়ত্ধৎু গধমরংঃত্ধঃব.’
রচনার নিদর্শন-স্বরূপ ‘বিষাদ-সিন্ধু’র তিন খণ্ড হইতে কিছু কিছু উদ্ধৃত করিতেছিঃ—
মাবিয়া পীড়িত। তাঁহার ব্যাধি সাংঘাতিক, বাঁচিবার আশা অতি কম; এজিদের সে দিকে দৃক্পাত নাই, পিতার সেবাশুশ্রূষাতেও মন নাই; প্রস্ফুটিভ গোলাপদলবিনিন্দিত জয়নাবের সুকোমল বদনমণ্ডলের আভা, সেই আয়তলোচনার নয়নভঙ্গীর স্বদৃশ্য দৃশ্য দিবারাত্রি তাঁহার অন্তরপটে আঁকা। ভুরুযুগলের অগ্রভাগ, যাহা সুভীরু বাণের ন্যায় অন্তর ভেদ করিয়া অন্তরে রহিয়াছে, দিবারাত্রি সেই বিষেই বিষম কাতর। সেই নাসিকার সরলভাবে সর্ব্বদাই আকুল। সেই ঈষেলাহিত অধরোষ্ঠ পুনঃ পুনঃ দেখিবার আশা সততই বলবতী। আজ পর্যন্ত চিকুরগুচ্ছের লহরীশোভা তুলিতে পারেন নাই। সামান্য অলঙ্কার, যাহা জয়নাবের কর্ণে দুলিতে দেখিয়াছিলেন, সেই দোলায় তাঁহার মস্তক আজ পর্যন্ত অবিশ্রান্ত দুলিতেছে। ললাটের উপরিস্থিত মালার জালি যাহা অর্ধচন্দ্রাকারে চিকুরের সহিত মিলিত হইয়া কিঞ্চিত্ভাগ ললাটের শোভা বর্দ্ধন করিয়াছিল, তাঁহার মনপ্রাণ সেই জালে আটকা পড়িয়া আজ পর্যন্তও ছট্ফট্ করিতেছে। সেই হাসিপূর্ণ মুখখানির হাসির আভা, যাহা জয়নাবের অজান্তে একবার দেখিয়াছিলেন, কতবার নিদ্রা গিয়াছেন, কতশতবার চক্ষের পলক ফেলিয়াছেন, তথাচ সেই মধুর হাসির আভাটুকু আজ পর্যন্তও চক্ষের নিকট হইতে সরিয়া যায় নাই। সমস্তই মনে জাগিতেছে। —মহরম পর্ব্ব, পৃ. ৩০।
অশ্ব ছুটিল। হোসেনের অশ্ব বিকট চীত্কার করিতে করিতে সিমারের পশ্চাৎ পশ্চাৎ ছুটিল। আবদুল্লা জেয়াদ, অলিদ প্রভৃতি অশ্ব লক্ষ্যে অবিশ্রান্ত শর নিক্ষেপ করিতে লাগিল। সুতীক্ষ তীর অশ্ব-শরীর ভেদ করিয়া পার হইল না, কিন্তু শোণিতের ধার ছুটিল। কে বলে পশুর হূদয়ে বেদনা নাই? কে বলে মানুষের জন্য পশুর প্রাণ কান্দিয়া উঠে না?— মানুষের ন্যায় প্রাণ ফাটিয়া যায় না? অশ্ব ফিরিল। কিছু দূর যাইয়া শরসংযুক্ত শরীরে হোসেনের দুলদুল সিমারের পশ্চাৎ গমন হইতে ফিরিল। তীর চলিতেছে। এমন অশ্বের বক্ষে গ্রীবাদেশে, তীক্ষতর তীর ক্রমাগত বিদ্ধিতেছে; কিন্তু অশ্বের গতি, মুহূর্ত্ত জন্যে থামিতেছে না। মহাবেগে প্রভু হোসেনের শিরশূন্য দেহ সন্নিধানে আসিয়া, পদ হইতে স্কন্ধ, স্কন্ধ হইতে পদ পর্য্যন্ত নাসিকা দ্বারা ঘ্রাণ লইয়া, আবার মস্তক লক্ষ্যে ছুটিবার উদ্যোগ করিতেই বিপক্ষগণে নানা কৌশলে অশ্বকে ধরিবার চেষ্টা করিতে লাগিল। হোসেনের অশ্ব সকলি দেখিতেছে, বোধ হয় অনেক বুঝিতেও পারিতেছে। ধরা পড়িলে তাহার পরিণাম-দশা কি হইবে তাহাও বোধ হয় ভাবিতেছে। প্রভু হোসেন যে পৃষ্ঠে আরোহণ করিতেন; সেই পৃষ্ঠে প্রভুহন্তা কাফেরগণকে লইয়া— আজীবন পাপের বেঝা বহন করিতে হইবে, একথা কি সেই প্রভুভক্ত বাক্শক্তিহীন পশুর অন্তরে উদয় হইয়াছিল? সিমারের দিকে আর ছুটিল না। হোসেনের মৃত শরীর নিকটেও আর রহিল না। বাধা, কৌশল অতিক্রম করিয়া মহাবেগে হোসেনের শিবিরাভিমুখে দৌড়িয়া চলিল। সকলেই দেখিল দুলদুলের চক্ষু, জলে পরিপূর্ণ। —উদ্ধার পর্ব্ব, পৃ. ১-২।
রাজার অভাব হইলে রাজা পাওয়া যায়, রাজ-বিপ্লব ঘটিলে তাহারও শাস্তি হয়, রাজ্যমধ্যে বিধোর বিদ্রোহানল প্রজ্বলিত হইলে যথাসময়ে অবশ্যই নির্ব্বাণ হয়, উপযুক্ত দাবী বুঝাইয়া দিলে সে দুর্দ্দমনীয় তেজও একেবারে বিলীন হইয়া উড়িয়া যায়। মহামারী, জলপ্লাবন ইত্যাদি দৈব-দুর্ব্বিপাকে রাজ্য ধ্বংসের উপক্রম শেষ হইলেও নিরাসসাগরে ভাসিতে হয় না— আশা থাকে। রাজার মজ্জা দোষে, কি উপযুক্ত মন্ত্রণা অভাবে রাজ্য-শাসনে অকৃতকার্য্য হইলেও আশা থাকে। মূর্খ রাজার প্রিয়পাত্র হইবার আশয়ে মন্ত্রদাতাগণ অবিচার, অত্যাচার নিবারণ উপদেশ না দিয়া অহরহঃ তোষামোদের ডালী মাথায় করিয়া প্রতি আজ্ঞা অনুমোদন করাতেই যদি রাজা প্রজার মনান্তর ঘটে, তাহাতেও আশা থাকে। —সে ক্ষেত্রেও আশা থাকে, কিন্তু স্বাধীনতা ধনে একবার বঞ্চিত হইলে সহজে সে মহামণির মুখ আর দেখা যায় না। বহু আয়াসেও আর সে রত্ন হস্তগত হয় না। স্বাধীন সূর্য্য একবার আস্তমিত হইলে পুনরুদয় হওয়া বড়ই ভাগ্যের কথা।
রাজা আর রাজ্য এ দুইটা পৃথক্ কথা— পৃথক্ ভাব— পৃথক্ সম্বন্ধ। রাজা নিজ বুদ্ধি দোষে অপদস্থ হউন, সদ্যুক্তি সুমন্ত্রণায় অবহেলা করিয়া পর-পদতলে দলিত হউন, স্বেচ্ছাচারিত্ব দোষে অধঃপাতে যাউন, তাহাতে রাজ্যের কি? কার্য্য অনুরূপ ফল। পাপানুযায়ী শাস্তি। স্বেচ্ছাচারী, সুমন্ত্রণাবিদ্বেষী, নীতিবর্জিত, উচিতে বিরক্ত, এমন রাজার রাজ্যপাট যত সময়ে ধ্বংস হয়, ততই মঙ্গল। ততই রাজ্যের শনিক্ষয়। ভবিষ্যৎ মঙ্গলের আশা। রাজ্যের আর মঙ্গল নাই। বিনা কারণে, প্রেমের কূহকে, পিরীতের দায়ে, প্রণয়বাসনায়, পরিণয় ইচ্ছায়, যদি এই রাজ্য যথার্থই পরকরতলস্থ হয়, পরপদতলে দলিত হয়, আমাদের স্বাধীনতা লোপ হয়, তবে সে দুঃখের আর সীমা থাকিবে না। সে মনঃকষ্টের আর ইতি হইবে না। রাজা প্রজা-রক্ষক, বিচারক, প্রজা-পালক এবং করগ্রাহক। কিন্তু রাজ্যের যথার্থ অধিকারী প্রজা। দায়িত্ব প্রজারই অধিক। রাজ্য প্রজার। রক্ষার দায়িত্ব বাসিন্দা মাত্রেরই। যদি রাজ্যমধ্যে মানুষ থাকে, হূদয়ে বল থাকে, স্বদেশ বলিয়া জ্ঞান থাকে, পরাধীন শব্দের যথার্থ অর্থবোধ থাকে, জন্মভূমির মূল্যের পরিমাণবোধ থাকে, একতা বন্ধনে আস্থা থাকে, ধর্ম্মবিদ্বেষে মনে মনে পরস্পর বিরোধ না থাকে, জাতিভেদে হিংসা, ঈর্ষা এবং ঘৃণার ছায়া না থাকে, অমূল্য সময়ের প্রতি লক্ষ্য থাকে, আলস্যে অবহেলা, এবং শৈথিল্যের বিরোধী যদি কেহ থাকে, আর চেষ্টা থাকে, বিদ্যার চর্চ্চা থাকে এবং ঈশ্বরে ভক্তি থাকে, তবে যুগযুগান্তরে হউক, শতাব্দী পরে হউক, সহস্রাধিক বর্ষ গতে হউক, কোন কালে হউক, পুনরায় অন্ধকারাচ্ছন্ন-পরাধীন-গগনে স্বাধীনতা-সূর্য্যের পুনরুদয় আশা একবার করিলেও করা যাইতে পারে। —এজিদ্-বধ পর্ব্ব, পৃ. ৩-৪।
শ্রীব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় রচিত সাহিত্য-সাধক-চরিতমালা থেকে






